Alokito Sakal
‘ক্যাসিনো’ বিষয়ে কি আছে দেশের আইনে?
শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০৫:৫৯ AM
Alokito Sakal Alokito Sakal :

 

বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ প্রায়শই দাবি করে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর তখনকার সরকার দেশে মদ-জুয়া নিষিদ্ধ করেছিলো। কারণ ১৯৭২ সালের সংবিধানে জুয়া বন্ধের বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার জন্য রাষ্ট্রকে নির্দেশনা দেয়া আছে।

যদিও পরবর্তীকালে এ বিষয়ে আর নতুন কোনও আইন হয়নি। তাই এখনও কার্যকর রয়ে গেছে দেড়শ বছরের বেশি পুরনো একটি আইন। যে আইনে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও সরকারের কাছ থেকে লাইসেন্স বা পারমিট নিয়ে মদ বিক্রি ও পানের সুযোগ আছে এ দেশে।

বুধবার রাতে রাজধানীতে র‍্যাবের সমন্বিত অভিযানে চারটি কথিত ‘ক্যাসিনো’ সিলগালা ও বহু মানুষকে আটকের পর জুয়াখেলা এবং ক্যাসিনো নিয়ে এখন আলোচনা হচ্ছে বিস্তর। আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর বরাতে জানা গেছে, ঢাকায় এ রকম অন্তত ৬০টি ক্যাসিনোর অস্তিত্ব রয়েছে।

পশ্চিমা উন্নত দেশগুলোর পাশাপাশি বাংলাদেশের আশপাশের দেশ সিঙ্গাপুর, ম্যাকাও, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া এমনকি নেপালেও জুয়া খেলার জায়গা হিসেবে ক্যাসিনোর জনপ্রিয়তা আছে।

কিন্তু বিভিন্ন ক্লাবে বা আড্ডায় গোপনে জুয়াখেলার অনেক আসর বসার কথা নানা সময়ে শোনা গেলেও একেবারে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও উপকরণসজ্জিত এই ক্যাসিনোগুলোর অস্তিত্ব থাকবার খবর বাংলাদেশের মানুষের কাছে একেবারেই নতুন।

অথচ মদ বিক্রি বা পানের মতো ক্যাসিনোর অনুমোদন বা লাইসেন্স দেয়ার কোনও ব্যবস্থা বা সুযোগই বাংলাদেশের কোন আইনে নেই।

জুয়ার বিষয়ে যে আইনটি কার্যকর আছে তা হলো- বঙ্গীয় প্রকাশ্য জুয়া আইনে ৩ ও ৪ নম্বর ধারা। যেখানে বলা আছে, ‘প্রকাশ্য জুয়া আইন ১৮৬৭’। সেখানে অবশ্য ক্যাসিনো বিষয়ে কিছু বলা নেই। তবে ওই আইনে – ‘কেউ তার ঘর, তাঁবু, কক্ষ, প্রাঙ্গণ বা প্রাচীরবেষ্টিত স্থানের মালিক বা রক্ষণাবেক্ষণকারী বা ব্যবহারকারী হিসাবে যে কোনও ব্যক্তি জ্ঞাতসারে বা স্বেচ্ছায় অন্য লোককে, উক্ত স্থানকে সাধারণ জুয়ার স্থান হিসাবে ব্যবহৃত করিতে দিলে অর্থদণ্ড ও কারাদণ্ডের বিধান’ রাখা হয়েছে।

এমনকি ‘তাস, পাশা, কাউন্টার অর্থ বা অন্য যে কোনও সরঞ্জামসহ যে কোনও ব্যক্তিকে ক্রীড়ারত বা উপস্থিত দেখিতে পাওয়া গেলেও’ শাস্তি দেয়ার সুযোগ আছে এই আইনে।

এ বিষয়ে আইনজীবী জোতির্ময় বড়ুয়া বলছেন, ঢাকায় বছরের পর বছর ধরে প্রকাশ্যে দিবালোকে সবার নাকের ডগাতেই এসব চলেছে। কিন্তু অন্য অনেক বিষয়ের মতো এখানেও আইনের প্রয়োগ ছিলোনা।

তিনি বলেন, “কিছু মানুষকে অভিযানে আটক করা হয়েছে ঘটনাস্থল থেকে। কিন্তু জুয়া খেলার মেশিনগুলো কারা আমদানির অনুমতি দিয়েছে? কোন আইনে দিয়েছে? রাজস্ব বোর্ড, কাস্টমস কোন আইনে এগুলো আনার অনুমতি বা ছাড়পত্র দিয়েছে? কিভাবে পরিবহন হলো? কারা সহযোগিতা করেছে আর কারা কোন আইনে লাভবান হয়েছে -এগুলোও খুঁজে বের করা উচিত”।

সম্প্রতি চারটি ক্যাসিনোতে অভিযান চালিয়েছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের একটি দল। এসময় পাঁচজন ম্যাজিস্ট্রেট ক্যাসিনোগুলো সিলগালা করার পাশাপাশি সেখান থেকে ১৮২ জনকে আটক করে।

তাদের প্রত্যেককে ছয় মাস থেকে এক বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে র‍্যাবের ভ্রাম্যমান আদালত। বৃহস্পতিবার আটককৃতদের আদালতে হাজির করার কথা রয়েছে। এছাড়া, জব্দ করা হয় প্রায় ৪০ লাখ নগদ টাকা, বিপুল পরিমাণ জাল টাকা, জুয়া খেলার সরঞ্জাম, ইয়াবাসহ দেশি-বিদেশি মদ।

এই ক্যাসিনোগুলো হল- ফকিরাপুলের ইয়ংমেনস ক্লাব, মতিঝিলের ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাব, গুলিস্তানের মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়াচক্র এবং বনানীর গোল্ডেন ঢাকা বাংলাদেশ।

এক সময় ঢাকায় ফুটবল লিগের দাপুটে দল ছিলো ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ও ওয়ান্ডারার্স ক্লাব। পরে স্বাধীনতার পর আবাহনী-মোহামেডানের দ্বৈরথের মধ্যেও বহুদিন ধরে উজ্জ্বল ছিলো আরামবাগ ক্রীড়া সংঘ, ফকিরাপুল ইয়াংমেন্স, এবং ব্রাদার্স ইউনিয়নের মতো দলগুলো।

ফুটবলের পাশাপাশি অনেকগুলো দলেরই ক্রিকেট ও হকি দলও ছিলো, যেখানে বিশ্বের নামী দামী অনেক খেলোয়াড়ও খেলে গেছেন। ফুটবলের সেই জৌলুস এখন আর নেই। এমনকি ক্রিকেট ভালো করলেও এসব দলগুলোর অনেকগুলোই আর তাতে নেই। নেই তারা হকিতেও।

এমনকি যেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে তৈরি হয়েছিলো মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়াচক্র, সেই প্রতিষ্ঠানের মূল কাজই হয়ে দাঁড়িয়েছে জুয়ার আয়োজন করা।

বুধবার রাতে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের যৌথ অভিযানে দেখা গেছে স্পোর্টস বাদ দিয়ে ক্লাবগুলো মজে আছে জুয়ার এমন আয়োজনে। যার আধুনিক নাম ক্যাসিনো।

ক্লাবগুলোর নিয়ন্ত্রণের ভূমিকাতেও আর খেলোয়াড় কিংবা সংগঠকরা নেই। আছেন সরকারদলীয় কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা। যাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কার্যকলাপের অভিযোগ আসছে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ মহল থেকেই। সূত্র- বিবিসি।