Alokito Sakal
অপ্রিয় হওয়ার গল্প
মঙ্গলবার, ২৭ জুলাই ২০২১ ০৯:৪৮ AM
Alokito Sakal Alokito Sakal :

সহস্র সুমন:

তখন আমি ফার্মগেইটে একটা কোচিং সেন্টারে পড়াইতাম। আমার অনেক ছাত্র – ছাত্রীর মাঝে একজন ছাত্রী ছিল নাম হৃদিতা। কঠিন নাম, ছাত্রী হিসেবেও ভালো না। এ কারণে ওকে আমার খুব একটা ডাকিতে লাগিতো না। কিন্তু আমার ক্লাসে সে আমাকে বড্ড বিরক্ত করিত। বিরক্ত করিত মানে এমন নয় যে কথা বেশি বলিত বা অবান্তর প্রশ্ন করিত। পুরুষকে জ্বালাতন করিবার নিঃশব্দ অস্ত্র নারীদের আছে সে হইলো চাহুনী, কেমন করিয়া আমার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিত যে সে আমাকে বিরক্ত না করিলেও আমি নিজ দায়িত্বেই বিরক্ত হইতাম। মেজাজ খারাপ হইতো, কেন ওভাবে তাকাবি আমার দিকে? কেন অক্ষিকোটরে গোলক দুটো ওভাবে ঘুরিবে? কেন ওষ্ঠে অমন দুষ্টুমি মাখা হাসি লেপিয়া নিয়া আসিবে প্রতিটা দিন?
একদিন বলিলাম, হৃদিতা বলো তো, মনমাঝি কোন সমাস?
সে বলিল, স্যার আপনি কি নৌকা চালাতে পারেন?
– এর সাথে আমার নৌকা চালাইতে পারার কি সম্পর্ক?
-এমনি স্যার, আমার মনে হয় আপনি পারেন না। আপনি লেখাপড়া ছাড়া আর কিছুই পারেন না।
বলিলাম, তুমি এতো ভাষণ না দিয়া সমাসটা বলো দেখি!
সে বলিলো, আপনিই বলেন স্যার।
ক্লাসে সকলে হাসিয়া উঠিল। এরপর থেকে তাহার দিকে চাহিয়াও দেখিতাম না। সে আসিয়াছে কি না না আসিয়াছে তাহা ভাবিতেও চাহিতাম না। কিন্তু সে দুষ্টের শিরোমণি। সাজিয়া গুজিয়া, হেলিয়া দুলিয়া প্রকম্পিত করিত সে প্রতিষ্ঠান। একদিন সিড়ি দিয়া আরোহণ করিবার কালে কোথা হইতে সে বাছুরের মতো ছুটিয়া আসিলো। প্রবল এক সংঘর্ষে দুজন ছিটকাইয়া পরিলাম এদিক ওদিক। হৃদিতার চুড়ি ভাঙ্গিয়া চূর্ণ হইলো, নতুন জামায় ধুলোর আস্তুর পড়িল, হাত পা কোথাও কোথাও একটু আধটু যখম হইলো। আমিতো তাও হুটোপাটি করে নিজেকে সামলে নিলাম, কিন্তু বালিকা পড়িয়া রহিলো। চোখ মুখ কুঁচকে আমাকে বলিলো, “স্যার আমাকে ধাক্কা মারলেন কেন? আর মেরে ফেলেই যদি দিলেন তবে এখনও টেনে তুলছেন না কেন? আপনি কি অন্ধ? ”
আমি আসলে কি করিবো ঠাওর করিতে পারিতেছিলাম না। ইতিমধ্যে অনেকে জমিয়া গিয়াছে, সে প্রতিষ্ঠানে আমি বেশ জনপ্রিয় একজন শিক্ষক ছিলাম। এই বালিকার পাল্লায় পরিয়া সে জনপ্রিয়তা বুঝি তলানিতে নামিবে। যাহা হউক, দ্রুত তাহার হাত ধরিয়া কোন মতে টানিয়া তুলিয়া বিদায় হইলাম। সেই ঘটনার পরে হৃদিতার সাথে সামনাসামনি হইলে সে আমাকে কানা বলিয়া ত্যাক্ত বিরক্ত করিতো। অনেকেই মিটমিট করিয়া হাসিতো। আমি বুঝিলাম, জনপ্রিয়তা খানিক নামিয়া গিয়া তামাশায় রূপ লইয়াছে। তবে যাহারা আমাকে চিনিতো ও জানিতো তাহারা কিন্তু এসবে কর্ণপাত করিতো না।

প্রতিষ্ঠানটি ছাড়িয়াছি, আমানত গ্রহণ ও ঋণ প্রদান সম্পর্কিত সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে দু বছর শ্রম দিয়াছি ; তাহাও ত্যাগ করে গেজেটেড পদে যোগ দিয়াছি। ম্যাজিস্ট্রেসি করিয়াছি, করিতেছি। এখানেও আমার দৃষ্টিগ্রাহ্য ও অনুভব করিবার মত জনপ্রিয়তা আছে তা আমি উপলব্ধি করিতে পারি। একদিন ম্যাজিস্ট্রেসি করিতেছি আমার কর্মক্ষেত্রে। ভোক্তা অধিকার আইনে বাজার পরিবীক্ষণকালে একখানা প্রসাধনীর দোকানে ঢুকিলাম। রাজ্যের শ্যাম্পু, ক্রিম ঝুলাইয়া দোকানটার এমন অবস্থা যে দোকানের ভেতর কে আছে তা বাহির হইতে বোঝা যায় না। আমার পেশকার সাহেব আমাকে পথ দেখাইবার উদ্দেশ্যে বেগ বাড়াইলেন, আমাকে অতিক্রম করিয়া শ্যাম্পুর সারি ভেদ করিবেন তখন ওপার হইতে মেরুন রঙ্গের বোরকা পরিহিতা এক নারী তাহাকে প্রবল ধাক্কা মারিলো। সে সংঘর্ষ ওখানেই মিটিলো না। মেয়েটি পেশকারকে ধাক্কা দিয়া এবার উড়িয়া আসিয়া আমাকেও সজোরে আঘাত করিলো। এবারো আমি পরিলাম না, সে পরিলো পাশে অবস্থিত একখানা প্লাস্টিকের ড্রামের ওপর। আমি দ্রুত পাশে একজন মহিলাকে বলিলাম, “ওঠান তাকে। ” আমার সঙ্গীয় পুলিশ সদস্যদের একজন তাহাকে সাহায্য করিলো। মেয়েটি উঠিলো, পেশকারের দিকে তাকাইলো, আমাকেও নীরিক্ষণ করিলো। তারপর আমার দিকে তাকাইয়া বলিলো, “আপনার চোখ এখনো ভালো হয় নাই স্যার? ” কি করেন এখানে? আমার পিছু নিয়েছেন? ”
ভোক্তা অধিকারের কথা কী বলিবো, আমার মানিবাধিকার লঙ্ঘিত হইতেছে বলিয়া মনে হইলো। সাথে এতো লোক লস্কর, উপস্থিত জনতা বলিলো, “এই মেয়ে স্যারের সাথে এভাবে কথা বলে? জানো ইনি কে? ”
হৃদিতা বলিল, হ্যাঁ আমি চিনি। ইনি কানাদের হেড মাস্টার।
আমার লোকেরা রাগান্বিত হইলো।
আমি থামাইলাম, বলিলাম, “তুমি আমাকে চিনতে পেরেছো হৃদিতা? আমিতো অনেক বদলে গেছি, মোটা হয়েছি একটু। ”
হৃদিতা বলিল, “আপনার সাথে আমার যেদিন প্রথম ক্লাস সেদিনের কথাও আমার মনে আছে। ”
– বলো কি? বলো তো সেদিন তোমাদের কি পড়িয়েছিলাম? কি আলোচনা করেছিলাম?
হৃদিতা অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে ওপরে তাকালো, কিছু একটা স্মরণ করার ভঙ্গিতে বলিলো, সেদিন আপনি একটা নীল পাঞ্জাবি পড়েছিলেন স্যার। কি যে সুন্দর লাগছিল! শুকনা ছিলেন, ওটাই ভালো লাগতো। এখন টামি হয়ে গেছে।
আমি বলিলাম, “তুমি কি কোন দিনই ভালো হবে না হৃদিতা? কোন দিনই না? ”
ও হাসতে হাসতে প্রস্থান করিলো।
দোকানদারকে বলিলাম, এভাবে মাল সাজায় কেউ? সাবান শ্যাম্পু দিয়া নাট্যমঞ্চের পর্দা বানিয়ে রেখেছেন! ” সেদিন আর কাজে মন বসে নাই। শুধু ভাবিয়াছি, পরবিতো পর মালির ঘারে!
প্রার্থণা করিয়াছি সে আমার এবং আমি তাহার সামনে যেন এ জনমে আর না পড়ি।

লোকে বলে, এ অঞ্চলে আমার সুখ্যাতি হইয়াছিল আচারে, ব্যবহারে ও মানবিক বিচারের কারণে। সেতো আর যাচাই করিবার সুযোগ ছিল না। কিন্তু মহামারীর কালে এতো বেশি মানুষকে আর্থিক দণ্ড দিতে হইলো যে সেসব জনপ্রিয়তা উড়িতে বসিলো উদ্বায়ী কর্পুরের মতো। কিন্তু কিছু করার ছিল না, জনগণের জীবন আমার সুখ্যাতি অপেক্ষা মূল্যবান সে আমি বুঝিয়াছিলাম। তবুও অর্থনৈতিক অবস্থা আর প্রেক্ষিত বুঝিয়া যতটা মানবিক হওয়া যায় হইয়াছি। কিন্তু দেখিলাম, দোকানী, রিক্সাওয়ালা, মোটর আরোহী কেউই আমাকে আর ভালোভাবে দেখিতেছে না। আমার হইতে দূরে সরিয়া যাইতেছে। আমি ক্রমেই অপ্রিয় হইয়া উঠিতেছি। আতঙ্কে পরিণত হইতেছি। অপ্রিয় হইবার জন্য প্রস্তুত হইয়া গেলাম, যাহাদের জীবন বাচাইবার জন্য এ অপ্রিয় হইবার প্রক্রিয়া তাহারা বাঁচিয়া থাকিলে একদিন হয়তো বুঝিবে। একদিন গোবরচাপা নামের এক বাজারে গমন করিলাম। সাথে উর্দি আর অস্ত্রধারী বাহিনী। একটা দোকানীকে বেশ কয়েকদিন কয়েকবার সাবধান করিবার পরও সে বারে দোকান উন্মুক্ত করিয়া অনেক রাত অব্দি জনসমাগম ঘটাইতেছিল। সংক্রামক রোগ বিস্তারে তার এ আচরণ মূলত অবহেলা মূলক আচরণ। দণ্ডবিধি ১৮৬০ এর মাধ্যমে তা দণ্ডনীয় এবং এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক বিচার্য। তাই উপায় অন্ত না দেখিয়া তাহাকে প্রাথমিক ভাবে সামান্য কিছু অর্থদণ্ড প্রদান করিলাম। মামলার আদেশ ও জরিমানা রশিদে স্বাক্ষর করিয়া সারিতে পারি নাই, কোথা হইতে হৃদিতা আসিয়া হাজির।
– স্যার, বেছে বেছে আমাদের দোকানেই জরিমানা করতে এসেছেন? আপনি কি কানা?
তাহাকে উত্তেজিত মনে হইতেছিল। আমার সঙ্গীয় ব্যাক্তিরা তাহাকে থামাইলো।
হৃদিতা দ্রোহের সুরে বলিলো, স্যার আপনি জরিমানা তুলে নেন। আমার ভাইয়ের দোকান, পেছনেরটা আমাদের বাড়ি। করবেন না জরিমানা প্লিজ।
আমি বলিলাম, “হৃদিতা, তোমার আপত্তি থাকিলে তুমি জেলায় গিয়া অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে একখানা আপিল ফাইল করো। ”
– আমি ওসব আপিল টাপিল করতে পারবো না। আপনি আমার দিকে তাকিয়ে হলেও জরিমানা করবেন না।
কি বলিব বুঝিতেছি না। স্বাক্ষর দিয়াছি, জনগণ সাক্ষী হইয়াছে। আমি ভীষণ কড়া একজন মানুষ। মেজাজ খারাপ হইতেছে। কিন্তু এ অবুঝের ওপর রাগিয়া কি হইবে! বাচ্চা মানুষ। বলিলাম, আইনের চোখে সবাই সমান।
সে বলিলো, “আপনিও কানা, আপনার আইনও কানা। ” সে রাগান্বিত ভঙ্গিতে বলিলো, আমিও ম্যাজিস্ট্রেট হবো, কাল থেকেই পড়াশোনা শুরু করব। দেখিয়ে দেবো আপনাকে।

প্রস্থান করিলাম। এমন অবুঝ অনেকেই। অনেকেই দন্ড দেখে, ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলিয়া বিবেচনা করে, কিন্তু আইনের ভেতরে প্রবেশ করে না। তার অজ্ঞতার কারণে আমরা অপ্রিয় হইয়া উঠি ক্রমেই। এ অঞ্চল ছাড়িবার সরকারি আদেশ হইয়াছে পদোন্নতির কারণে। ছাড়িয়া ছুটিয়া যাওয়াই আমাদের কাজ। মানুষের নিঃশর্ত ভালোবাসা আমাদের জোটে না। এখানে অন্ধ আইনের পাল্লায় পরিয়া অনেকের বাড়া ভাতে ছাই দিতে হয় আমাদের, অনেকের অবৈধ স্বার্থে হানি করিতে হয়। এ কারণে অপ্রিয় হওয়া এখানে অনেক সহজ, আমাদের মত মানুষদের অমানুষ বলিয়া আঙ্গুল তোলাটাও অনেক সহজ। কিন্তু তাহারা কী জানে এ অপ্রিয় হয়ে ওঠাটা তাহাদেরই বৃহত্তর স্বার্থে? হৃদিতা ভালোভাবে পড়াশোনা করুক, ম্যাজিস্ট্রেট হোউক, অপ্রিয় হইবার এ প্রক্রিয়ার মাঝে আসিলে সে বুঝিবে এইখানে প্রতি নিয়ত প্রতি মুহুর্তে রাম এবং রাবণ উভয় হইবারই রস অনুভব করা যায়। কখনও সে রস আনন্দের, কখনও অপ্রিয় হইবার – তথা বেদনার।

 

বিঃ দ্র : গল্পের সব চরিত্র কাল্পনিক। বাস্তবের সাথে যে কোন ধরণের মিল কাকতালীয়।