Alokito Sakal
আয়কর পেশাজীবি থেকে উদ্যোক্তা বনানী
শনিবার, ১০ এপ্রিল ২০২১ ০৭:৪৮ PM
Alokito Sakal Alokito Sakal :

সাজেদুর আবেদীন শান্তঃ ইসরাত জাহান বনানী, খুলনার মেয়ে জন্ম ও বেড়ে ওঠা খুলনাতেই। বনানী খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ ও পরবর্তীতে এমবিএ করেন। তিনি ইনকাম ট্যাক্স প্রাকটিশনার পাস করে একজন আয়কর পেশাজীবির পাশাপাশি কাজ করছেন একজন উদ্যোক্তা হিসেবেও। সরকারিভাবে ফুড মেকিং এবং এন্ট্রেপ্রেনিয়রশীপ ট্রেনিং, যুব উন্নয়ন থেকে ব্লক, বাটিক এবং সিঙ্গার থেকে টেইলারিং ও এমব্রয়ডারি কোর্স করেন বনানী।

এরপর তিনি গড়ে তুলেন অফলাইন এবং অনলাইন ভিত্তিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান fusionFoodsbd.com ও JB COLLECTIONS। ছোটবেলা থেকেই বনানী স্বাধীনভাবে কাজ করতে পছন্দ করতেন।

বনানী বলেন, ‘আমি এমন একটা পেশা বেছে নিতে চেয়েছি যেখানে আমার পরিবারকে সময় দিয়েও আমি যেনো আমার অন্য কাজগুলো করতে পারি। এজন্য বিভিন্ন বিষয়ে ট্রেনিং নিয়ে উদ্যোক্তার স্বপ্ন পূরনের পথে চলছি। বাচ্চাকে স্কুলের টিফিন দিতে যেয়ে ভালো মানের খাবারের প্রয়োজনীয়তা যখন অনুভব করি তখন মনে হলো আমার মতো এমন অনেকেই এই একই সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। তাছাড়া যেসব নারীরা ঘরের বাইরে জব করছে তারাও অনেক সময় বাধ্য হয়ে বাইরের খাবার কিনে খায় যেটা অস্বাস্থ্যকর। তাই সব দিক মাথায় রেখে আমি হোমমেড ফুড নিয়ে কাজ করা শুরু করি। ২০০৯ সাল থেকে ভালো মানের বাসায় বানানো খাবার ক্রেতাদের হাতে পৌছে দেয়ার লক্ষ্যে আমার কাজের শুরু হয়েছিলো’।

বনানী আরও বলেন, ‘বৈবাহিক সূত্রে দোহারের এক তাঁতী বাড়ির বউ হই আমি, স্বামী ডাঃ জালাল উদ্দীন। জীবনে কোনদিন তাঁত দেখিনি, দোহারে এসেই প্রথম দেখেছিলাম। যদিও আমার বিয়ের আগেই আমার শ্বশুর বাড়ির তাঁত বন্ধ হয়ে গেছে, নিকটাত্মীয়রা অনেকেই এই পেশার সাথে জড়িত। বলছি ২০০০ সালের কথা। তখনও দোহারের তাঁতী পাড়া বেশ সরব এবং এখনও এখানকার লুঙ্গি দেশ বিদেশে সমাদৃত। সেই তাঁতী পাড়া থেকে তাঁতগুলো হারিয়ে যেতে থাকলো, মেশিনে বানানো লুঙ্গির সাথে পাল্লা দিয়ে খরচ কুলিয়ে উঠতে পারছিলো না তাঁতীরা। ধীরে ধীরে তারা কেউ কেউ অন্য পেশায় জড়ালো, কেউবা প্রবাসে পাড়ি জমালো। তাঁতের খটখট ছন্দের মুখরিত গান থেমে গেলো অনেকটাই। কান পাতলেও এখন শোনা যায় না সেই ছন্দ। আর প্রবাসে যারা পাড়ি জমিয়েছিলো দেশে ফিরে বেশীর ভাগই বেকার হয়ে পড়ছিলো। পুরো ব্যাপারটা আমাকে কষ্ট দিতে লাগলো। আমি ব্যক্তিগত ভাবে তাঁত নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী হলাম, স্বপ্ন দেখলাম আমাদের ঐতিহ্য হাতে বোনা তাঁতের লুঙ্গিকে বিশ্ব বাজারে পরিচিত করতে, আমাদের তাঁতী সম্প্রদায়ের পরিবারের পাশে থাকার প্রত্যয়ে এবং ভালো রাখার উদ্যোগ নিয়ে আমি ডিসেম্বরে আমার চাচাতো ভাশুরের ছেলেকে সাথে নিয়ে কাজ শুরু করলাম হাতে বোনা তাঁতের লুঙ্গি নিয়ে। কাজের জন্য প্রাথমিকভাবে অন্য লাইনকে বেছে নিলাম এবং ই-কমার্স নিয়ে পড়ালেখা শুরু করলাম। তারপর আলহামদুলিল্লাহ ক্রেতাদের ভালো সাড়া পেতে শুরু করলাম। এর মধ্যেই করোনার প্রকোপ শুরু হলো, ঘরবন্দী হয়ে গেলো মানুষ। এই সময়ে সাময়িক কিছু হতাশা লাগলেও আমাকে অবাক করে দিয়ে লুঙ্গির অনেক অর্ডার আসা শুরু হলো।

আসলে করোনায় গৃহবন্দী পুরুষের আরামের পোশাক ছিলো হাতে বোনা তাঁতের লুঙ্গি। আর যেহেতু কেউ বাইরে যেতে পারছে না তাই অনলাইনই ছিলো ভরসা। আমার ক্রেতারা আমাদের দোহারের জেবি কালেকশনস এর লুঙ্গিগুলো খুব পছন্দ করলো। আমাদের তাঁত এই করোনাতেও চলতে থাকলো। এই কিছুদিন আগে এক প্রবাসীর হাত ধরে তাঁতের লুঙ্গি পৌছে গেলো প্রবাসে। করোনায় আমার স্বপ্ন পূরনের পথে হাঁটছি। আমাদের কাজের সাথে জড়ানো পরিবারগুলোতে কোনো আর্থিক অনিশ্চয়তা নাই। আলহামদুলিল্লাহ এই বৈশ্বিক অস্থিরতায় পৃথিবীর অসুখেও আমি স্বপ্ন শুধু দেখছিই না পূরনের পথে হাঁটছি’।

বনানী তার তাঁত শিল্প দিয়ে রঙিন করতে চায় বাংলাদেশকে। জীবন, জীবিকা নিয়ে দেশ ও দেশীয় পন্য নিয়ে সৎ ও সুন্দরভাবে পথ চলতে পারাটাই এখন লক্ষ্য তার।