ঢাকা ০৮:০৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৮ নভেম্বর ২০২২, ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

শপথ ভাঙার ইশতেহার : সাবলীল ভাষায় সাহসী উচ্চারণ

‘ঝলসে দেবে? দাও। / মুখরিত প্রাণের শোভাযাত্রা বন্ধ করবে? করো। / সুশোভিত ফুলের বাগানে আগুন দাও / মাটিতে পুতে রাখো গ্রেনেড / তবু কিঞ্চিৎ পরিমাণও বিচলিত হবো না।…’ কবিতার লাইনগুলো ‘শপথ ভাঙার ইশেতহার’ বইয়ের ফ্ল্যাপ থেকে নেওয়া। আর এই লাইনগুলোই যেন প্রতিনিধিত্ব করছে পুরো বইয়ে কেমন কবিতা আছে, এ যেন শিল্পরোচিত বিজ্ঞাপন যা পাঠককে টেনে নিয়ে যাবে বইয়ের ভেতরে। আমার ক্ষেত্রেও তেমনটা ঘটেছে।

‘শপথ ভাঙার ইশতেহার’ শফিকুল ইসলাম সোহাগের কাব্যগ্রন্থ। এটি তাঁর তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ। নভেম্বর ২০২১- এ বইটি প্রকাশ করেছে বুনন প্রকাশন। শিল্পমানসম্মত প্রচ্ছদ করেছেন আইয়ূব আল আমিন। ৬৪ পৃষ্ঠার বইটির মূল্য ধরা হয়েছে ১৮০ টাকা।

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে উৎসর্গকৃত বইটির প্রেক্ষাপট বিচারেই উপলব্ধি করা যায় এই গ্রন্থের কবিতাগুলো বিদ্রোহী ধাচের, বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী তরুণদের রক্তগরম করার মতো। এর প্রমাণ মেলে প্রথম কবিতা ‘অবিনশ্বর ভাবনা স্মারক’ নামের কবিতায়। কবি লিখেছেন, ‘অবিশ্রান্ত লিখে যাও / বিপন্ন মুক্তির এই করিডোরে / প্রতিবাদী প্লাবনে উছলে উঠুক যৌবন।’ এই কবিতার মধ্যদিয়ে তারুণ্যকে প্রতিবাদমূখর হওয়ার আহ্বান করেছেন, তার ছাপ স্পষ্ট পুরো কবিতায়।

কবির প্রতিবাদী চেতনাবোধ বেশ প্রগাঢ়। বিদ্রোহচিত্তে তিনি লিখেছেন ‘অনিয়মের কুচকাওয়াজ’ যেখানে তিনি স্বকণ্ঠে উচ্চারণ করেছেন, ‘উত্তপ্ত হই, যখন দেখি- / অবিশ্বাসে আহত হয় সুখের মিছিল/ ইচ্ছেগুলো ঝলসে ওঠে আগুনপাড়ায় / দগ্ধ মনে বিষাদক্ষণে উল্টে যাই ইতিহাসের বিরাগ পাতা।’ ‘বিক্ষুদ্ধ ঢেউ আছড়ে পড়ে’ কবিতাতেও কবি বিদ্রোহী মনোভাবকে ফুটিয়ে তুলেছেন দারুণভাবে। সাহসসঞ্চারিত কলমে লিখেছেন, ‘আগুন নেভাই প্রসন্ন এক নির্বাসিত মানুষ আমি / আঁধারগুলো যাই ছাড়িয়ে ঠোঁটের বাহার দাগ এঁটে দিই / আর্তনাদের প্রলয় শিখায় জ্বলতে থাকি নীরব বাতি।’

কবি ব্যক্তিচিন্তার বাইরে এসে রাষ্ট্রচিন্তায় নিমগ্ন- তাই হওয়া উচিত কবিসমাজের। ব্যক্তিগত গুণগান আর ঠুনকো প্রেমের কথোপকথনকে কবি দুমড়ে-মুচড়ে ফেলে দিয়ে যে বিদ্রোহ, মানবতাবোধ ও দেশপ্রেমকে তিনি উপজীব্য করেছেন, তা সত্যি প্রশংসনীয়। কবি ‘মেঘাচ্ছন্ন বাংলার আকাশ’ কবিতায় লিখেছেন, ‘মেঘাচ্ছন্ন বাংলার আকাশ / প্রতিনিয়ত ভিজছে জমিন, কাঁদছে মানুষ / অপকীর্তির প্রকোপে- / বিপন্ন বিস্ময়ের জাল ফেলি আমি / নিঃসঙ্গ শূন্যতায়-’ এ যেন দেশপ্রেমের বিপরীতে মৌন আন্দোলন। কবি যে বাংলার আকাশ হতে কালো মেঘকে বিদায় দিতে ব্যতিব্যস্ত, তারই নামান্তর এই কবিতা।

‘শপথ ভাঙার ইশতেহার’-এ মোট তেপান্নটি কবিতা আছে, যেসব কবিতা প্রতিনিধিত্ব করে বিদ্রোহের। এক কথায় বলতে গেলে বলা যায়, কবিতাগুলো সাবলীল ভাষায় সাহসী উচ্চারণ। নেই কোনো কঠিন কোনো বাক্যের প্রয়োগ যা পাঠককে কবিতার ভাবার্থ উপলব্ধিতে বিন্দুমাত্র বাধাগ্রস্থ করবে না। আমার উপলব্ধিতে কবিতাগুলো যেন ‘আগুনগরম’ যা মাথায় গাঁথতে পারলে সমাজপরিবর্তনের ঐচিত্যবোধ পাঠকের মন-মগজে বদ্ধপরিকর হবে নিশ্চিত।

কবিতার বিষয়বস্তুবোধ থেকে ‘শপথ ভাঙার ইশতেহার’ নামকরণটি যথার্থ ও গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়েছে। নামভূমিকার একটি কবিতা থাকলে সেটি উপলদ্ধি করতে আরও সুবিধা হত। বইয়ের বাহ্যিক সৌন্দর্যের বিষয়ে বলতে গেলে ক্রীম কালারের ঝকঝকে প্রিন্ট ও হার্ডকভারে চমৎকার বাধাই বইটিকে অনন্ত যৌবনা করে তুলেছে। তবে একটি কথা না বললেই নয়, কবিতায় যৎসামান্য বানান ভুল লক্ষ্য করা গেছে যা হতে পারে উচ্চারণবিধির তারতম্যের কারণে; তবে ব্যাকরণগত ভুল। যেমন- ‘দেই’ হবে না, হবে ‘দিই’। আশা করছি, পরবর্তী মুদ্রণে ত্রুটিগুলো সংশোধন করবেন প্রকাশক।

সবমিলিয়ে ‘শপথ ভাঙার ইশতেহার’ কবিতার মানবিচারে উত্তীর্ণ। এমন সাহসী উচ্চারণে কবিতা এই সময়ে খুব বেশি জরুরি, যে জরুরি কাজটি শফিকুল ইসলাম সোহাগ দেখাতে পেরেছেন বলে তিনি প্রশংসা পাওয়ার দাবিদার।

কাব্যগ্রন্থ : শপথ ভাঙার ইশতেহার
কবি : শফিকুল ইসলাম সোহাগ
প্রচ্ছদ : আইয়ূব আল আমিন
প্রকাশক : বুনন প্রকাশন
মূল্য : ১৮০ টাকা
আইএসবিএন : ৯৭৮-৯৮৪-৯৫৯৪৪-৮-২

Tag :
জনপ্রিয়

নির্বাচিত হলে ১৩নং ওয়ার্ড বাসীর জন্য এ্যাম্বুলেন্স উপহার দিব; রসিকের কাউন্সিলর প্রার্থী তুহিন

শপথ ভাঙার ইশতেহার : সাবলীল ভাষায় সাহসী উচ্চারণ

প্রকাশের সময় : ১১:০৪:২৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ অক্টোবর ২০২২

‘ঝলসে দেবে? দাও। / মুখরিত প্রাণের শোভাযাত্রা বন্ধ করবে? করো। / সুশোভিত ফুলের বাগানে আগুন দাও / মাটিতে পুতে রাখো গ্রেনেড / তবু কিঞ্চিৎ পরিমাণও বিচলিত হবো না।…’ কবিতার লাইনগুলো ‘শপথ ভাঙার ইশেতহার’ বইয়ের ফ্ল্যাপ থেকে নেওয়া। আর এই লাইনগুলোই যেন প্রতিনিধিত্ব করছে পুরো বইয়ে কেমন কবিতা আছে, এ যেন শিল্পরোচিত বিজ্ঞাপন যা পাঠককে টেনে নিয়ে যাবে বইয়ের ভেতরে। আমার ক্ষেত্রেও তেমনটা ঘটেছে।

‘শপথ ভাঙার ইশতেহার’ শফিকুল ইসলাম সোহাগের কাব্যগ্রন্থ। এটি তাঁর তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ। নভেম্বর ২০২১- এ বইটি প্রকাশ করেছে বুনন প্রকাশন। শিল্পমানসম্মত প্রচ্ছদ করেছেন আইয়ূব আল আমিন। ৬৪ পৃষ্ঠার বইটির মূল্য ধরা হয়েছে ১৮০ টাকা।

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে উৎসর্গকৃত বইটির প্রেক্ষাপট বিচারেই উপলব্ধি করা যায় এই গ্রন্থের কবিতাগুলো বিদ্রোহী ধাচের, বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী তরুণদের রক্তগরম করার মতো। এর প্রমাণ মেলে প্রথম কবিতা ‘অবিনশ্বর ভাবনা স্মারক’ নামের কবিতায়। কবি লিখেছেন, ‘অবিশ্রান্ত লিখে যাও / বিপন্ন মুক্তির এই করিডোরে / প্রতিবাদী প্লাবনে উছলে উঠুক যৌবন।’ এই কবিতার মধ্যদিয়ে তারুণ্যকে প্রতিবাদমূখর হওয়ার আহ্বান করেছেন, তার ছাপ স্পষ্ট পুরো কবিতায়।

কবির প্রতিবাদী চেতনাবোধ বেশ প্রগাঢ়। বিদ্রোহচিত্তে তিনি লিখেছেন ‘অনিয়মের কুচকাওয়াজ’ যেখানে তিনি স্বকণ্ঠে উচ্চারণ করেছেন, ‘উত্তপ্ত হই, যখন দেখি- / অবিশ্বাসে আহত হয় সুখের মিছিল/ ইচ্ছেগুলো ঝলসে ওঠে আগুনপাড়ায় / দগ্ধ মনে বিষাদক্ষণে উল্টে যাই ইতিহাসের বিরাগ পাতা।’ ‘বিক্ষুদ্ধ ঢেউ আছড়ে পড়ে’ কবিতাতেও কবি বিদ্রোহী মনোভাবকে ফুটিয়ে তুলেছেন দারুণভাবে। সাহসসঞ্চারিত কলমে লিখেছেন, ‘আগুন নেভাই প্রসন্ন এক নির্বাসিত মানুষ আমি / আঁধারগুলো যাই ছাড়িয়ে ঠোঁটের বাহার দাগ এঁটে দিই / আর্তনাদের প্রলয় শিখায় জ্বলতে থাকি নীরব বাতি।’

কবি ব্যক্তিচিন্তার বাইরে এসে রাষ্ট্রচিন্তায় নিমগ্ন- তাই হওয়া উচিত কবিসমাজের। ব্যক্তিগত গুণগান আর ঠুনকো প্রেমের কথোপকথনকে কবি দুমড়ে-মুচড়ে ফেলে দিয়ে যে বিদ্রোহ, মানবতাবোধ ও দেশপ্রেমকে তিনি উপজীব্য করেছেন, তা সত্যি প্রশংসনীয়। কবি ‘মেঘাচ্ছন্ন বাংলার আকাশ’ কবিতায় লিখেছেন, ‘মেঘাচ্ছন্ন বাংলার আকাশ / প্রতিনিয়ত ভিজছে জমিন, কাঁদছে মানুষ / অপকীর্তির প্রকোপে- / বিপন্ন বিস্ময়ের জাল ফেলি আমি / নিঃসঙ্গ শূন্যতায়-’ এ যেন দেশপ্রেমের বিপরীতে মৌন আন্দোলন। কবি যে বাংলার আকাশ হতে কালো মেঘকে বিদায় দিতে ব্যতিব্যস্ত, তারই নামান্তর এই কবিতা।

‘শপথ ভাঙার ইশতেহার’-এ মোট তেপান্নটি কবিতা আছে, যেসব কবিতা প্রতিনিধিত্ব করে বিদ্রোহের। এক কথায় বলতে গেলে বলা যায়, কবিতাগুলো সাবলীল ভাষায় সাহসী উচ্চারণ। নেই কোনো কঠিন কোনো বাক্যের প্রয়োগ যা পাঠককে কবিতার ভাবার্থ উপলব্ধিতে বিন্দুমাত্র বাধাগ্রস্থ করবে না। আমার উপলব্ধিতে কবিতাগুলো যেন ‘আগুনগরম’ যা মাথায় গাঁথতে পারলে সমাজপরিবর্তনের ঐচিত্যবোধ পাঠকের মন-মগজে বদ্ধপরিকর হবে নিশ্চিত।

কবিতার বিষয়বস্তুবোধ থেকে ‘শপথ ভাঙার ইশতেহার’ নামকরণটি যথার্থ ও গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়েছে। নামভূমিকার একটি কবিতা থাকলে সেটি উপলদ্ধি করতে আরও সুবিধা হত। বইয়ের বাহ্যিক সৌন্দর্যের বিষয়ে বলতে গেলে ক্রীম কালারের ঝকঝকে প্রিন্ট ও হার্ডকভারে চমৎকার বাধাই বইটিকে অনন্ত যৌবনা করে তুলেছে। তবে একটি কথা না বললেই নয়, কবিতায় যৎসামান্য বানান ভুল লক্ষ্য করা গেছে যা হতে পারে উচ্চারণবিধির তারতম্যের কারণে; তবে ব্যাকরণগত ভুল। যেমন- ‘দেই’ হবে না, হবে ‘দিই’। আশা করছি, পরবর্তী মুদ্রণে ত্রুটিগুলো সংশোধন করবেন প্রকাশক।

সবমিলিয়ে ‘শপথ ভাঙার ইশতেহার’ কবিতার মানবিচারে উত্তীর্ণ। এমন সাহসী উচ্চারণে কবিতা এই সময়ে খুব বেশি জরুরি, যে জরুরি কাজটি শফিকুল ইসলাম সোহাগ দেখাতে পেরেছেন বলে তিনি প্রশংসা পাওয়ার দাবিদার।

কাব্যগ্রন্থ : শপথ ভাঙার ইশতেহার
কবি : শফিকুল ইসলাম সোহাগ
প্রচ্ছদ : আইয়ূব আল আমিন
প্রকাশক : বুনন প্রকাশন
মূল্য : ১৮০ টাকা
আইএসবিএন : ৯৭৮-৯৮৪-৯৫৯৪৪-৮-২