ঢাকা ০৮:২৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৮ নভেম্বর ২০২২, ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

গ্যাস সংকট-লোডশেডিংয়ে কারখানার উৎপাদনে ধস

গাজীপুরে প্রতিদিন ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে বিভিন্ন কলকারখানায় উৎপাদনে ধস নেমেছে। শিল্প মালিকরা এক প্রকার লোকসান দিয়ে কোনোমতে কারখানা টিকিয়ে রেখেছেন বলে জানিয়েছেন। শিল্পকারখানা অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে গাজীপুরে লোডশেডিং কম হওয়ার কথা থাকেলেও তা মানা হচ্ছে না। এমনকি শিডিউল মেনে ও আগাম তথ্য দিয়ে লোডশেডিং করার যে ঘোষণা সরকার দিয়েছে- তাও এখানে মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ শিল্প মালিকদের। এ অবস্থায় বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদন একেবোরেই কমে এসেছে। ফলে বড় ধরনের লোকসানের আশঙ্কা করছেন শিল্প মালিকরা।

বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের সঙ্গে যোগ হয়েছে গ্যাস সংকট। দীর্ঘদিন ধরে গাজীপুরের কোনাবাড়ি, কালিয়াকৈর, ভোগড়া, কাশিমপুর, শ্রীপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের সংকট লেগেই আছে। বারবার তিতাস কর্তৃপক্ষকে এ ব্যাপারে অভিযোগ জানানো হলেও এখন পর্যন্ত সংকট নিরসনে কোনো উদ্যোগ নেয়নি তিতাস।

এসব বিষয়ে কয়েকজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তারা জানান, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে বায়ারদের দেওয়া অর্ডার ঠিক মতো সরবরাহ করা যাচ্ছে না। এতে লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে কারখানাকে। ঠিকমতো পোশাক সরবরাহ করতে না পারলে শ্রমিকদেরও বেতন দেওয়া সম্ভব হবে না। ব্যবসায়ীরা উৎপাদন ধসের জন্য বিদ্যুতের পাশাপাশি গ্যাস সংকটকেও দায়ী করেছেন। কারখানার বয়লার চালাতে যেখানে ১৫ পিএসআই প্রেসার দরকার সেখানে অনেকসময় তা নেমে এক বা দুই পিএসআইয়ে দাঁড়ায়। এসময় কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়।

গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জানায়, গাজীপুরে প্রায় দুই হাজারের মতো শিল্পকারখানা থাকলেও এসব কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। চাহিদা ও প্রাপ্তির বিস্তর ফারাক থাকায় শিল্প, বাণিজ্য ও আবাসিকে বিদ্যুৎ সংকট থেকেই যাচ্ছে। ফলে বাধ্য হয়ে লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।

এদিকে, গত ১৮ জুলাই মধ্যরাত থেকে এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং পদ্ধতি চালু হওয়ার কথা থাকলেও গাজীপুরে লোডশেডিং চলছে আগের নিয়মেই। যখন ইচ্ছে বিদ্যুৎ যায়, আসেও ইচ্ছেমাফিক। সারাদিন দফায় দফায় লোডশেডিংয়ের কারণে তীব্র গরমে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনজীবন।

গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সূত্রে জানা গেছে, জেলায় বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে ৬৫০ মেগাওয়াট। পাওয়া যাচ্ছে প্রায় অর্ধেক পরিমাণ। বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ঘাটতি থাকার কারণে লোডশেডিং করতে হচ্ছে দফায় দফায়।

গাজীপুর পল্লী বিদ্যুত সমিতি-১ এর সিনিয়র জিএম যুবরাজ চন্দ্র পাল জানান, ১৫৫টি ফিডারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ গ্রাহকের কাছে পৌঁছানো হয়। এর মধ্যে ১০০টি ফিডারে শিল্পকারখানা রয়েছে। বাকিগুলো আবাসিক। শিল্পকারখানায় লোডশেডিং না করার জন্য সরকারের নির্দেশনা থাকলেও বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে তা পুরোপুরি মানা সম্ভব হচ্ছে না।

তিনি আরও জানান, জাতীয় গ্রিড থেকে সরাসরি লোড ম্যানেজমেন্ট করা হয়। উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা করে দ্রুত নতুন নিয়মে লোডশেডিং করা হয়। ফলে গ্রাহক জানতে পারছে না কোন এলাকায় কখন লোডশেডিং হবে।

বিদ্যুতে দফায় দফায় লোডশেডিংয়ের কারণে ছোট শিল্প প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানে নিজেদের বিদ্যুতের ব্যাকআপ থাকলেও ছোট প্রতিষ্ঠানে তা নেই। এর ফলে আরও বেশি সমস্যায় পড়েছেন ছোট শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকরা।

কয়েকজন কারখানা মালিক জানান, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের কারণে মালিক-শ্রমিকদের মধ্যে দুশ্চিন্তা ক্রমশ প্রকট হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে কারখানা মালিকদের ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে হবে। এতে কর্মহীন হয়ে পড়বেন হাজার হাজার শ্রমিক।

এদিকে, শ্রমিকদের মধ্যে যারা উৎপাদন চুক্তি অর্থাৎ প্রোডাকশন রেটে কাজ করেন, তারা স্বাভাবিকের চেয়ে পারিশ্রমিক কম পাচ্ছেন। গাজীপুর মহানগরীর শিল্প কারখানা অধ্যুষিত ভোগড়া, লক্ষ্মীপুরা, বোর্ডবাজার, কোনাবাড়ী, কাশিমপুর, নাওজোর, বাইপাসসহ আশপাশের এলাকায় অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের কারণে তাদের উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। যেহেতেু উৎপাদন কম হচ্ছে, ফলে তারা পারিশ্রমিকও কম পাচ্ছেন।

গাজীপুর মহানগরীতে থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠান মিম ডিজাইনের ব্যবস্থাপক আবু তাহের মিয়াজী জানান, ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে বিকল্প ব্যবস্থায় জেনারেটর চালিয়ে কারখানা সচল রাখতে গিয়ে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। বেশি সময় ধরে জেনারেটর চালু রাখতে গিয়ে জেনারেটরও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তা মেরামত করতে সময় ও অর্থ দুটিই অপচয় হচ্ছে। আবার গ্যাস নির্ভর জেনারেটরও প্রেসার না থাকার কারণে মাঝেমধ্যে বন্ধ থাকছে। এতে উভয় দিক থেকে কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

শ্রীপুরের ডার্ড নিট কম্পোজিট কারখানার রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের জিএম প্রকৌশলী মো. সাইদুর রহমান জানান, কারখানায় প্রতিদিন গ্যাসের চাপ প্রয়োজন ১৫ পিএসআই। কিন্তু কয়েক মাস ধরে কারখানাটিতে দিনের বেলায় (পিক আওয়ার) চাপ শুন্যে নেমে আসছে। আর সন্ধ্যায় চাপ কিছুটা বেড়ে ৩ থেকে ৪ পিএসআইয়ে উঠলেও একসঙ্গে সব মেশিন চালানো সম্ভব হয় না। ফলে গ্যাস না পেয়ে প্রায়ই দিনের বেলা হয় কারখানা বন্ধ রাখতে হয়, তা না হলে ডিজেল দিয়ে জেনারেটর চালাতে হয়। বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের কারণে কারখানার প্রায় ৩০ শতাংশ উৎপাদন কম হচ্ছে। এত শ্রমিক-মালিক উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

গাজীপুর শহরের তিনসড়ক এলাকায় অবস্থিত স্প্যারো অ্যাপারেলস কারখানার জিএম (অ্যাডমিন) শরিফুল রেজা জানান, তাদের কারখানায় কাজ করেন সাড়ে ৪ হাজারের বেশি শ্রমিক। গ্যাস সংকটে কারখানার বয়লার বন্ধ হয়ে পড়ায় উৎপাদন তিন ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে। গ্যাস না পেয়ে কারখানা বন্ধের উপক্রম হয়েছে। সমস্যার বিষয়টি তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত জানানো হচ্ছে। কিন্তু সমাধান হচ্ছে না।

প্রিন্ট এশিয়া ফেব্রিক্স লিমিটেডের পরিচালক শোয়েব আহমেদ জানান, অব্যাহত গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে কারখানার উৎপাদন ৪০-৫০ ভাগ কম হচ্ছে। বাধ্য হয়ে কারখানার শ্রমিক সংখ্যা কমানো হচ্ছে। এ সংকট অব্যাহত থাকলে কারখানা বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া কোনো গতি থাকবে না। সময় মতো বায়ারদের অর্ডার সরবরাহ করতে না পারলে পরবর্তীতে আর নতুন করে অর্ডার পাওয়া যাবে না।

তিতাস গ্যাসের গাজীপুরের জয়দেবপুর বিপণন অফিস সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুরের শিল্প প্রতিষ্ঠান, ক্যাপটিভ পাওয়ার কেন্দ্র, সিএনজি স্টেশন ও আবাসিক মিলয়ে প্রতিদিন ৬শ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু পাওয়া যাচ্ছে ৩শ থেকে ৪শ মিলিয়ন ঘনফুট। গড়ে প্রতিদিন আড়াইশ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। কখনো কখনো ঘাটতি আরও বেড়ে যায়। ফলে সরবরাহের ক্ষেত্রে আরও সমস্যা হয়। এছাড়া সার কারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহ করতে হয়। এর ফলে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে আরও সংকট দেখা দিয়েছে।

তিতাস গ্যাসের জয়দেবপুর শাখার ব্যবস্থাপক নৃপেন্দ্রনাথ বিশ্বাস জানান, গাজীপুরে মিটার যুক্ত আবাসিক গ্রাহকের সংখ্যা ২৭০টি আর মিটারবিহীন গ্রাহক রয়েছেন ৬৪ হাজার। এর মধ্যে সিঙ্গেল চুলা ৬ হাজার আর ডাবল চুলা ২ লাখ ৩০ হাজার। সিএনজি স্টেশন রয়েছে ৫৪টি। পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ না থাকায় কলকারখানা থেকে শুরু করে বাসাবাড়িতেও গ্যাস না পাওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে প্রতিনিয়ত।

তিনি বলেন, শীতের শুরুতে প্রতিবছরই জাতীয় গ্রিড লাইনে গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। এ কারণে গাজীপুরে আবাসিক ও শিল্পকারখানায় গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। প্রতিদিন বহু অভিযোগ আসছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সিএনজি স্টেশনগুলো কিছু সময় বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংকট কাটিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার কাজ চলছে।

জাতীয় গ্রিড থেকে যে পরিমাণ গ্যাস পাওয়া যায় তা দিয়ে পুরো জেলায় সরবরাহ করা হয়। তবে গাজীপুরের গ্যাসের চাহিদা কথা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। সার কারখানা চালু থাকলে গ্যাসের চাপও কম থাকে, যোগ করেন নৃপেন্দ্রনাথ বিশ্বাস।

Tag :
জনপ্রিয়

নির্বাচিত হলে ১৩নং ওয়ার্ড বাসীর জন্য এ্যাম্বুলেন্স উপহার দিব; রসিকের কাউন্সিলর প্রার্থী তুহিন

গ্যাস সংকট-লোডশেডিংয়ে কারখানার উৎপাদনে ধস

প্রকাশের সময় : ০২:০৮:৪৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২২

গাজীপুরে প্রতিদিন ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে বিভিন্ন কলকারখানায় উৎপাদনে ধস নেমেছে। শিল্প মালিকরা এক প্রকার লোকসান দিয়ে কোনোমতে কারখানা টিকিয়ে রেখেছেন বলে জানিয়েছেন। শিল্পকারখানা অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে গাজীপুরে লোডশেডিং কম হওয়ার কথা থাকেলেও তা মানা হচ্ছে না। এমনকি শিডিউল মেনে ও আগাম তথ্য দিয়ে লোডশেডিং করার যে ঘোষণা সরকার দিয়েছে- তাও এখানে মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ শিল্প মালিকদের। এ অবস্থায় বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদন একেবোরেই কমে এসেছে। ফলে বড় ধরনের লোকসানের আশঙ্কা করছেন শিল্প মালিকরা।

বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের সঙ্গে যোগ হয়েছে গ্যাস সংকট। দীর্ঘদিন ধরে গাজীপুরের কোনাবাড়ি, কালিয়াকৈর, ভোগড়া, কাশিমপুর, শ্রীপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের সংকট লেগেই আছে। বারবার তিতাস কর্তৃপক্ষকে এ ব্যাপারে অভিযোগ জানানো হলেও এখন পর্যন্ত সংকট নিরসনে কোনো উদ্যোগ নেয়নি তিতাস।

এসব বিষয়ে কয়েকজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তারা জানান, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে বায়ারদের দেওয়া অর্ডার ঠিক মতো সরবরাহ করা যাচ্ছে না। এতে লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে কারখানাকে। ঠিকমতো পোশাক সরবরাহ করতে না পারলে শ্রমিকদেরও বেতন দেওয়া সম্ভব হবে না। ব্যবসায়ীরা উৎপাদন ধসের জন্য বিদ্যুতের পাশাপাশি গ্যাস সংকটকেও দায়ী করেছেন। কারখানার বয়লার চালাতে যেখানে ১৫ পিএসআই প্রেসার দরকার সেখানে অনেকসময় তা নেমে এক বা দুই পিএসআইয়ে দাঁড়ায়। এসময় কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়।

গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জানায়, গাজীপুরে প্রায় দুই হাজারের মতো শিল্পকারখানা থাকলেও এসব কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। চাহিদা ও প্রাপ্তির বিস্তর ফারাক থাকায় শিল্প, বাণিজ্য ও আবাসিকে বিদ্যুৎ সংকট থেকেই যাচ্ছে। ফলে বাধ্য হয়ে লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।

এদিকে, গত ১৮ জুলাই মধ্যরাত থেকে এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং পদ্ধতি চালু হওয়ার কথা থাকলেও গাজীপুরে লোডশেডিং চলছে আগের নিয়মেই। যখন ইচ্ছে বিদ্যুৎ যায়, আসেও ইচ্ছেমাফিক। সারাদিন দফায় দফায় লোডশেডিংয়ের কারণে তীব্র গরমে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনজীবন।

গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সূত্রে জানা গেছে, জেলায় বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে ৬৫০ মেগাওয়াট। পাওয়া যাচ্ছে প্রায় অর্ধেক পরিমাণ। বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ঘাটতি থাকার কারণে লোডশেডিং করতে হচ্ছে দফায় দফায়।

গাজীপুর পল্লী বিদ্যুত সমিতি-১ এর সিনিয়র জিএম যুবরাজ চন্দ্র পাল জানান, ১৫৫টি ফিডারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ গ্রাহকের কাছে পৌঁছানো হয়। এর মধ্যে ১০০টি ফিডারে শিল্পকারখানা রয়েছে। বাকিগুলো আবাসিক। শিল্পকারখানায় লোডশেডিং না করার জন্য সরকারের নির্দেশনা থাকলেও বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে তা পুরোপুরি মানা সম্ভব হচ্ছে না।

তিনি আরও জানান, জাতীয় গ্রিড থেকে সরাসরি লোড ম্যানেজমেন্ট করা হয়। উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা করে দ্রুত নতুন নিয়মে লোডশেডিং করা হয়। ফলে গ্রাহক জানতে পারছে না কোন এলাকায় কখন লোডশেডিং হবে।

বিদ্যুতে দফায় দফায় লোডশেডিংয়ের কারণে ছোট শিল্প প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানে নিজেদের বিদ্যুতের ব্যাকআপ থাকলেও ছোট প্রতিষ্ঠানে তা নেই। এর ফলে আরও বেশি সমস্যায় পড়েছেন ছোট শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকরা।

কয়েকজন কারখানা মালিক জানান, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের কারণে মালিক-শ্রমিকদের মধ্যে দুশ্চিন্তা ক্রমশ প্রকট হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে কারখানা মালিকদের ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে হবে। এতে কর্মহীন হয়ে পড়বেন হাজার হাজার শ্রমিক।

এদিকে, শ্রমিকদের মধ্যে যারা উৎপাদন চুক্তি অর্থাৎ প্রোডাকশন রেটে কাজ করেন, তারা স্বাভাবিকের চেয়ে পারিশ্রমিক কম পাচ্ছেন। গাজীপুর মহানগরীর শিল্প কারখানা অধ্যুষিত ভোগড়া, লক্ষ্মীপুরা, বোর্ডবাজার, কোনাবাড়ী, কাশিমপুর, নাওজোর, বাইপাসসহ আশপাশের এলাকায় অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের কারণে তাদের উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। যেহেতেু উৎপাদন কম হচ্ছে, ফলে তারা পারিশ্রমিকও কম পাচ্ছেন।

গাজীপুর মহানগরীতে থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠান মিম ডিজাইনের ব্যবস্থাপক আবু তাহের মিয়াজী জানান, ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে বিকল্প ব্যবস্থায় জেনারেটর চালিয়ে কারখানা সচল রাখতে গিয়ে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। বেশি সময় ধরে জেনারেটর চালু রাখতে গিয়ে জেনারেটরও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তা মেরামত করতে সময় ও অর্থ দুটিই অপচয় হচ্ছে। আবার গ্যাস নির্ভর জেনারেটরও প্রেসার না থাকার কারণে মাঝেমধ্যে বন্ধ থাকছে। এতে উভয় দিক থেকে কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

শ্রীপুরের ডার্ড নিট কম্পোজিট কারখানার রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের জিএম প্রকৌশলী মো. সাইদুর রহমান জানান, কারখানায় প্রতিদিন গ্যাসের চাপ প্রয়োজন ১৫ পিএসআই। কিন্তু কয়েক মাস ধরে কারখানাটিতে দিনের বেলায় (পিক আওয়ার) চাপ শুন্যে নেমে আসছে। আর সন্ধ্যায় চাপ কিছুটা বেড়ে ৩ থেকে ৪ পিএসআইয়ে উঠলেও একসঙ্গে সব মেশিন চালানো সম্ভব হয় না। ফলে গ্যাস না পেয়ে প্রায়ই দিনের বেলা হয় কারখানা বন্ধ রাখতে হয়, তা না হলে ডিজেল দিয়ে জেনারেটর চালাতে হয়। বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের কারণে কারখানার প্রায় ৩০ শতাংশ উৎপাদন কম হচ্ছে। এত শ্রমিক-মালিক উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

গাজীপুর শহরের তিনসড়ক এলাকায় অবস্থিত স্প্যারো অ্যাপারেলস কারখানার জিএম (অ্যাডমিন) শরিফুল রেজা জানান, তাদের কারখানায় কাজ করেন সাড়ে ৪ হাজারের বেশি শ্রমিক। গ্যাস সংকটে কারখানার বয়লার বন্ধ হয়ে পড়ায় উৎপাদন তিন ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে। গ্যাস না পেয়ে কারখানা বন্ধের উপক্রম হয়েছে। সমস্যার বিষয়টি তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত জানানো হচ্ছে। কিন্তু সমাধান হচ্ছে না।

প্রিন্ট এশিয়া ফেব্রিক্স লিমিটেডের পরিচালক শোয়েব আহমেদ জানান, অব্যাহত গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে কারখানার উৎপাদন ৪০-৫০ ভাগ কম হচ্ছে। বাধ্য হয়ে কারখানার শ্রমিক সংখ্যা কমানো হচ্ছে। এ সংকট অব্যাহত থাকলে কারখানা বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া কোনো গতি থাকবে না। সময় মতো বায়ারদের অর্ডার সরবরাহ করতে না পারলে পরবর্তীতে আর নতুন করে অর্ডার পাওয়া যাবে না।

তিতাস গ্যাসের গাজীপুরের জয়দেবপুর বিপণন অফিস সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুরের শিল্প প্রতিষ্ঠান, ক্যাপটিভ পাওয়ার কেন্দ্র, সিএনজি স্টেশন ও আবাসিক মিলয়ে প্রতিদিন ৬শ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু পাওয়া যাচ্ছে ৩শ থেকে ৪শ মিলিয়ন ঘনফুট। গড়ে প্রতিদিন আড়াইশ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। কখনো কখনো ঘাটতি আরও বেড়ে যায়। ফলে সরবরাহের ক্ষেত্রে আরও সমস্যা হয়। এছাড়া সার কারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহ করতে হয়। এর ফলে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে আরও সংকট দেখা দিয়েছে।

তিতাস গ্যাসের জয়দেবপুর শাখার ব্যবস্থাপক নৃপেন্দ্রনাথ বিশ্বাস জানান, গাজীপুরে মিটার যুক্ত আবাসিক গ্রাহকের সংখ্যা ২৭০টি আর মিটারবিহীন গ্রাহক রয়েছেন ৬৪ হাজার। এর মধ্যে সিঙ্গেল চুলা ৬ হাজার আর ডাবল চুলা ২ লাখ ৩০ হাজার। সিএনজি স্টেশন রয়েছে ৫৪টি। পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ না থাকায় কলকারখানা থেকে শুরু করে বাসাবাড়িতেও গ্যাস না পাওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে প্রতিনিয়ত।

তিনি বলেন, শীতের শুরুতে প্রতিবছরই জাতীয় গ্রিড লাইনে গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। এ কারণে গাজীপুরে আবাসিক ও শিল্পকারখানায় গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। প্রতিদিন বহু অভিযোগ আসছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সিএনজি স্টেশনগুলো কিছু সময় বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংকট কাটিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার কাজ চলছে।

জাতীয় গ্রিড থেকে যে পরিমাণ গ্যাস পাওয়া যায় তা দিয়ে পুরো জেলায় সরবরাহ করা হয়। তবে গাজীপুরের গ্যাসের চাহিদা কথা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। সার কারখানা চালু থাকলে গ্যাসের চাপও কম থাকে, যোগ করেন নৃপেন্দ্রনাথ বিশ্বাস।