ঢাকা ০৭:৫৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৮ নভেম্বর ২০২২, ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

বিরল পাখি ‘ছোট কালি পেঁচা’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছয়টি পেঁচা থাকে। নতুন এলো বন্য বিরল পাখি ‘ছোট কালি পেঁচা’। আবিষ্কার করেছেন প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান মো. সালেহ রেজা। লিখেছেন আসাদুল্লাহ গালিব। ছবি তুলেছেন আব্দুল্লাহ আল মামুন।

২০২১ সালের ১৩ অক্টোবর দেশের পাখি তালিকায় নতুন সংযোজন ঘটেছে বিরল একটি বন্য পেঁচার প্রজাতির। নাম ‘জঙ্গল আউলেট’ বা ‘ছোট কালি পেঁচা’। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যারিস রোডে ইতিহাসে প্রথম দেখা মিললো পাখিটির। ক্যাম্পাসটিতে ছাড়া এখনো দেশের কোথাও দেখা যায়নি ক্ষুদ্রাকৃতির পাখিটি।

ভারত ও শ্রীলঙ্কার সমভূমি, আর্দ্র অঞ্চল এবং জি রেডিয়াটাম শুষ্ক বনাঞ্চলে পাওয়া যায় বলে জানা গিয়েছে। দৈর্ঘ্য সাধারণত ২০ সে.মি. হয়ে থাকে। কালি পেঁচাটির গোলাকার মাথাটি সর্বত্র সুক্ষ্মভাবে বাঁধা। সমস্ত শরীরে ঘন বাদামি ডোরাকাটা রেখা আছে। পাখার বাদামি রেখাগুলো সুনিপুণ চিত্রকলার মতো মনে হয়। এই বৈশিষ্ট্যগুলো অন্যান্য অনেক প্রজাতির পেঁচা থেকে তাকে আলাদা করেছে। বৈজ্ঞানিক নাম (Glaucidium radiatum)। এরা ফড়িং, পঙ্গপাল ও অন্যান্য বড় পোকামাকড়, টিকটিকি, ইঁদুর ইত্যাদি খেয়ে বেঁচে থাকে।

পাখি গবেষকরা ১৯৫১ সাল থেকে দেশে এর ডাক শোনার কথা বলে আসলেও পাখি ডাটাবেসে নথিভুক্ত হয়েছে ২০২১ সালে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক, বাংলাদেশের প্রখ্যাত বন্যপ্রাণী গবেষক ও লেখক অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান মো. সালেহ রেজার প্রথমে নজরে পড়েছে ছোট কালি পেঁচা। তারপর খবর ছড়িয়ে পড়লে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ছোট কালি পেঁচার ছবি তুলতে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতে থাকেন পাখিপ্রেমীরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র ও পাখিপ্রেমী আব্দুল্লাহ আল মামুনের ক্যামেরায় ফ্রেমবন্দী এই পাখিটি। তিনি বলেন, ‘গত বছর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাখিটি দেখতে ক্যাম্পাসে পাখিপ্রেমীদের আনাগোনা চলছিল, তখন আমি পরীক্ষার জন্য ঘরবন্দী। পরীক্ষা শেষে জানুয়ারি থেকে পাখিটিকে ক্যামেরাবন্দী করতে টুকটাক খোঁজ করতে থাকি। দীর্ঘ একটি বছর প্রতীক্ষার পর গতকাল দেখতে পেয়েছি। দেরি না করেই চট করে কয়েকটি ছবি ক্যাপচার করলাম। ছবি তোলার চেয়ে চোখে দেখাতেই বেশি আনন্দ পেয়েছি।’

অধ্যাপক ড. সালেহ রেজার প্রচেষ্টায় ছোট কালি পেঁচা এরই মধ্যে বাংলাদেশের পাখিদের তালিকায় স্থান পেয়েছে। আলাপকালে তিনি বলেন, ‘২০২১ সালের ১৩ অক্টোবর সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে হাঁটতে গিয়ে প্রথম পাখিটির দেখা পেলাম। ছোট কালি পেঁচা বলে মনে হলো। পরে পাখিটির ছবি তুলে ও ডাক সংগ্রহ করে বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব ও ইন্টারন্যাশনাল বার্ড ক্লাবের ওয়েব সাইটে দিলাম। দুটি ক্লাব ও ভারতীয় বার্ড ক্লাব নিশ্চিত করলো যে, পাখিটি ছোট কালি পেঁচাই। বাংলাদেশের পাখির তালিকায় প্রথম নাম উঠলো পাখিটির। আমাদের জন্য খুব গর্বের বিষয়। পাখিটির ডাক পর্যালোচনা করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আমার বিভাগের অধ্যাপক ড. মনিরুল এইচ. খান এবং বার্ডস বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞ পল থম্পসন ও সায়েম ইউ. চৌধুরী।’

অধ্যাপক ড. সালেহ রেজা জানিয়েছেন, ‘সারা বিশ্বের মোট ২শ ৫০টি প্রজাতির মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় ১৮ প্রজাতির পেঁচা রয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেই ছয়টি জাতের পেঁচা তাদের আবাসস্থল তৈরি করেছে। নতুন প্রজাতিটি সংযোজনের ফলে সাতটিতে পৌঁছাল। প্যারিস রোডের আম ও গগনশিরিশ গাছগুলোতে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় এই পেঁচা সবচেয়ে সক্রিয় থাকে। নতুন পাখির প্রজাতিটি আবিষ্কার বাংলাদেশের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের পরিচয় বহন করে। দেশের প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় গভীর মনোযোগের প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে।’

Tag :
জনপ্রিয়

নির্বাচিত হলে ১৩নং ওয়ার্ড বাসীর জন্য এ্যাম্বুলেন্স উপহার দিব; রসিকের কাউন্সিলর প্রার্থী তুহিন

বিরল পাখি ‘ছোট কালি পেঁচা’

প্রকাশের সময় : ০১:৪২:২৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অক্টোবর ২০২২

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছয়টি পেঁচা থাকে। নতুন এলো বন্য বিরল পাখি ‘ছোট কালি পেঁচা’। আবিষ্কার করেছেন প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান মো. সালেহ রেজা। লিখেছেন আসাদুল্লাহ গালিব। ছবি তুলেছেন আব্দুল্লাহ আল মামুন।

২০২১ সালের ১৩ অক্টোবর দেশের পাখি তালিকায় নতুন সংযোজন ঘটেছে বিরল একটি বন্য পেঁচার প্রজাতির। নাম ‘জঙ্গল আউলেট’ বা ‘ছোট কালি পেঁচা’। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যারিস রোডে ইতিহাসে প্রথম দেখা মিললো পাখিটির। ক্যাম্পাসটিতে ছাড়া এখনো দেশের কোথাও দেখা যায়নি ক্ষুদ্রাকৃতির পাখিটি।

ভারত ও শ্রীলঙ্কার সমভূমি, আর্দ্র অঞ্চল এবং জি রেডিয়াটাম শুষ্ক বনাঞ্চলে পাওয়া যায় বলে জানা গিয়েছে। দৈর্ঘ্য সাধারণত ২০ সে.মি. হয়ে থাকে। কালি পেঁচাটির গোলাকার মাথাটি সর্বত্র সুক্ষ্মভাবে বাঁধা। সমস্ত শরীরে ঘন বাদামি ডোরাকাটা রেখা আছে। পাখার বাদামি রেখাগুলো সুনিপুণ চিত্রকলার মতো মনে হয়। এই বৈশিষ্ট্যগুলো অন্যান্য অনেক প্রজাতির পেঁচা থেকে তাকে আলাদা করেছে। বৈজ্ঞানিক নাম (Glaucidium radiatum)। এরা ফড়িং, পঙ্গপাল ও অন্যান্য বড় পোকামাকড়, টিকটিকি, ইঁদুর ইত্যাদি খেয়ে বেঁচে থাকে।

পাখি গবেষকরা ১৯৫১ সাল থেকে দেশে এর ডাক শোনার কথা বলে আসলেও পাখি ডাটাবেসে নথিভুক্ত হয়েছে ২০২১ সালে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক, বাংলাদেশের প্রখ্যাত বন্যপ্রাণী গবেষক ও লেখক অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান মো. সালেহ রেজার প্রথমে নজরে পড়েছে ছোট কালি পেঁচা। তারপর খবর ছড়িয়ে পড়লে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ছোট কালি পেঁচার ছবি তুলতে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতে থাকেন পাখিপ্রেমীরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র ও পাখিপ্রেমী আব্দুল্লাহ আল মামুনের ক্যামেরায় ফ্রেমবন্দী এই পাখিটি। তিনি বলেন, ‘গত বছর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাখিটি দেখতে ক্যাম্পাসে পাখিপ্রেমীদের আনাগোনা চলছিল, তখন আমি পরীক্ষার জন্য ঘরবন্দী। পরীক্ষা শেষে জানুয়ারি থেকে পাখিটিকে ক্যামেরাবন্দী করতে টুকটাক খোঁজ করতে থাকি। দীর্ঘ একটি বছর প্রতীক্ষার পর গতকাল দেখতে পেয়েছি। দেরি না করেই চট করে কয়েকটি ছবি ক্যাপচার করলাম। ছবি তোলার চেয়ে চোখে দেখাতেই বেশি আনন্দ পেয়েছি।’

অধ্যাপক ড. সালেহ রেজার প্রচেষ্টায় ছোট কালি পেঁচা এরই মধ্যে বাংলাদেশের পাখিদের তালিকায় স্থান পেয়েছে। আলাপকালে তিনি বলেন, ‘২০২১ সালের ১৩ অক্টোবর সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে হাঁটতে গিয়ে প্রথম পাখিটির দেখা পেলাম। ছোট কালি পেঁচা বলে মনে হলো। পরে পাখিটির ছবি তুলে ও ডাক সংগ্রহ করে বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব ও ইন্টারন্যাশনাল বার্ড ক্লাবের ওয়েব সাইটে দিলাম। দুটি ক্লাব ও ভারতীয় বার্ড ক্লাব নিশ্চিত করলো যে, পাখিটি ছোট কালি পেঁচাই। বাংলাদেশের পাখির তালিকায় প্রথম নাম উঠলো পাখিটির। আমাদের জন্য খুব গর্বের বিষয়। পাখিটির ডাক পর্যালোচনা করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আমার বিভাগের অধ্যাপক ড. মনিরুল এইচ. খান এবং বার্ডস বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞ পল থম্পসন ও সায়েম ইউ. চৌধুরী।’

অধ্যাপক ড. সালেহ রেজা জানিয়েছেন, ‘সারা বিশ্বের মোট ২শ ৫০টি প্রজাতির মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় ১৮ প্রজাতির পেঁচা রয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেই ছয়টি জাতের পেঁচা তাদের আবাসস্থল তৈরি করেছে। নতুন প্রজাতিটি সংযোজনের ফলে সাতটিতে পৌঁছাল। প্যারিস রোডের আম ও গগনশিরিশ গাছগুলোতে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় এই পেঁচা সবচেয়ে সক্রিয় থাকে। নতুন পাখির প্রজাতিটি আবিষ্কার বাংলাদেশের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের পরিচয় বহন করে। দেশের প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় গভীর মনোযোগের প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে।’