ঢাকা ০৮:৩৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৮ নভেম্বর ২০২২, ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

সংকটকালে বোরো মৌসুমকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে

  • মুঈদ রহমান
  • প্রকাশের সময় : ০১:১৮:০৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অক্টোবর ২০২২
  • 40

করোনা অতিমারির বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার মুহূর্তেই বিশ্বব্যাপী আঘাত হেনেছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এ যুদ্ধের অবসান শিগগিরই হবে বলে মনে হয় না; কিন্তু যুদ্ধের কারণে মানুষকে প্রতিদিনের গৃহীত খাদ্য থেকে নিজেকে বিরত রাখার কোনো সুযোগ নেই। তাই বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি এ সময়ে অনেক বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক অনেক নির্ভরযোগ্য গবেষণা সংস্থা আগামী বছরের সারা বিশ্বে তীব্র খাদ্য সংকটের পূর্বাভাস দিয়েছে। এ নিয়ে সব দেশই নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী প্রস্তুতি নিচ্ছে; খাদ্য উৎপাদনকে সর্বোচ্চ মাত্রায় রাখার চেষ্টা করছে। আমরা যেহেতু বিশ্ব থেকে আলাদা কিছু নই, তাই আমরাও সংকটের সম্ভাব্য সম্ভাবনার মধ্যে পড়ি। সেদিকে সরকারের দৃষ্টি থাকবে সন্দেহ নেই। তবে প্রয়োজন হলো, সম্ভাব্য সংকটের জায়গাগুলোকে অধিকতর নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় পরিচর্চা করা।

আর কিছুদিন পরই আমাদের বোরো ও রবি মৌসুম শুরু হবে। এ দেশে সব মৌসুমেই কৃষিকাজ অব্যাহত থাকে; তবে সবচেয়ে বেশি খাদ্যশস্য যে এ মৌসুমেই উৎপাদিত হয়-রাসায়নিক সারের ব্যবহার দেখেই তা বোঝা যায়। মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) তথ্য অনুযায়ী, আমাদের দেশের কৃষিকাজে আমরা প্রতিবছর যে পরিমাণ রাসায়নিক সার ব্যবহার করে থাকি, তার প্রায় ৭০ শতাংশ ব্যবহার করা হয় বোরো ও রবি মৌসুমে। যেহেতু বর্তমান কৃষি উৎপাদনব্যবস্থা রাসায়নিক সারনির্ভর আর আমাদের সার সরবরাহ আমদানিনির্ভর, তাই আন্তর্জাতিক বর্তমান পরিস্থিতি একটি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃষিকাজে রাসায়নিক সারের ব্যবহার, স্থানীয়ভাবে উৎপাদন ও আমদানির চিত্রটি তুলে ধরলে উৎপাদন ধারণাটি পরিষ্কার হতে পারে। দেশের কৃষিকাজে ব্যবহৃত সারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ইউরিয়া, ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি), ডাইঅ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) ও মিউরেট অব পটাশ (এমওপি)। এ চার ধরনের সারের মধ্যে প্রথম তিনটির একটি ক্ষুদ্র অংশ বাংলাদেশে উৎপাদিত হলেও শেষোক্ত অর্থাৎ এমওপি সারের পুরোটাই আমদানি করতে হয়। ২০২১-২২ অর্থবছরের মে মাস পর্যন্ত একটি হিসাব তুলে ধরা যাক। বলে রাখা ভালো যে, বিগত বছরের আমদানির একটি অংশ এ বছর ব্যবহার করা হয়েছে। এ সময়ে দেশে ব্যবহৃত মোট ইউরিয়া সারের পরিমাণ ছিল ২৫ লাখ ১৯ হাজর টন, যার মধ্যে দেশে উৎপাদিত হয়েছে ৭ লাখ ৯৮ হাজার টন আর আমদানি করা হয়েছিল ১৩ লাখ ৮ হাজার টন। আমরা টিএসপি সার ব্যবহার করেছি ৬ লাখ ৮৫ হাজার টন। এর মধ্যে দেশীয়ভাবে উৎপাদন করতে পেরেছি মাত্র ৭১ হাজার টন, যার বিপরীতে আমদানি করতে হয়েছে ৩ লাখ ৮৬ হাজার টন। আমাদের কৃষিতে গেল বছর ডিএপি সারের ব্যবহার হয়েছে ১৬ লাখ ৩৮ হাজর টন। এর মধ্যে আমরা উৎপাদন করেছি ১ লাখ ২ হাজার টন আর আমদানি করেছি ১৪ লাখ ২৬ হাজার টন। এমওপি সারের পুরোটাই আমদানি করেছি, যার পরিমাণ ৯ লাখ ৩ হাজার টন। তাহলে হিসাব অনুযায়ী, আমরা গত অর্থবছরের মে মাস পর্যন্ত অভ্যন্তরীণভাবে মোট ৯ লাখ ৭১ হাজার টন সার উৎপাদন করতে পেরেছি, যার বিপরীতে আমাদের ৪৭ লাখ ৭৪ হাজার টন আমদানি করতে হয়েছে। এর মানে হলো, মোট ব্যবহৃত সারের প্রায় ৮০ শতাংশই আমাদের আমদানি করতে হয় এবং এ সারের ৭০ শতাংশই ব্যবহার করা হয় বোরো ও রবি মৌসুমে, যা আসন্ন।

বিভিন্ন প্রকার ব্যবহৃত সারের মধ্যে ইউরিয়া, টিএসপি ও ডিএপি সার আমদানি করা হয়ে থাকে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, চীন, কাতার, মরক্কো, রাশিয়া, ইউক্রেন, বেলারুশ ও তিউনিসিয়া থেকে। যেহেতু এমওপি সার অভ্যন্তরীণভাবে উৎপাদিত হয় না, তাই এর ৪০ শতাংশ আমদানি করা হয়ে থাকে কানাডা থেকে আর বাদবাকি ৬০ শতাংশ আসে বেলারুশ ও রাশিয়া থেকে। এ কারণেই ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ আমাদের শঙ্কিত করে তুলেছে। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত হলো, বাংলাদেশে সার আমদানির বিকল্প উৎস খুঁজতে হবে। রাশিয়া ছাড়া অন্য যেসব দেশ সার উৎপাদন করে, তাদের সঙ্গে চুক্তি করে সেসব দেশ থেকে সার আমদানির ব্যবস্থা করতে হবে। আগামীর সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলা করার বিষয়ে সাবেক খাদ্য সচিব আবদুল লতিফ মনে করেন, আসন্ন বোরো মৌসুমে সারের সর্বোচ্চ সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গত কয়েক মাসে সারের অবস্থা কিন্তু খুব সুবিধাজনক অবস্থায় নেই। যুদ্ধ দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। বিদ্যুৎ সংকটের কারণে সেচ ব্যবস্থাতেও বিড়ম্বনা দেখা দিতে পারে। তাই অবস্থার নিরিখে ব্যবস্থা নিতে হবে। কেননা বোরো মৌসুমই আমাদের খাদ্য নিরাপত্তায় সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে।

তবে কৃষি মন্ত্রণালয়সংশ্লিষ্টরা আমাদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছেন। তাদের মতে, আসন্ন বোরো মৌসুমসহ চলতি অর্থবছরে সারের সংকট দেখা দেওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। তাদের মতে, বর্তমানে দেশে যে পরিমাণ সার মজুত আছে, তা গত বছরের তুলনায় বেশি। কোনো সারেরই সংকট নেই। দেশে বছরে মোট সাড়ে নয় লাখ টন এমওপি প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে চাহিদা রয়েছে সাড়ে সাত লাখ টন। বাকি দুই লাখ টন নিরাপত্তা মজুত হিসাবে রাখা হয়। গত বছর কানাডা থেকে দেড় লাখ টন, বেলারুশ থেকে দুই লাখ টন ও রাশিয়া থেকে প্রায় ছয় লাখ টন এমওপি সার আমদানি করা হয়েছিল। যুদ্ধের আগেই বেলারুশ থেকে দুই লাখ টন আমদানি করা হয়েছিল। আর রাশিয়া থেকে প্রায় তিন লাখ টন আনা হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর কারণে চাহিদার বাকিটা আমদানি করা যায়নি; যদিও যুদ্ধের আভাস পেয়ে চলতি অর্থবছরের জন্য কানাডা থেকে দেড় লাখ টনের জায়গায় সাড়ে পাঁচ লাখ টন পটাশ আমদানির চুক্তি করা হয়েছিল। এটি ছিল দুই দেশের সরকারের মধ্যে চুক্তি (জি টু জি)। এরই মধ্যে কানাডা থেকে সার আসা শুরু হয়েছে। কানাডার সঙ্গে এ চুক্তির ফলে বাংলাদেশ কিছুটা স্বস্তিতে রয়েছে। আর বাকি থাকল চার লাখ টন। এটি নিয়ে কিছু সংকট হতে পারে। তবে এ অর্থবছরে অর্থাৎ ২০২২-২৩-এ কোনো সংকট হবে না। এবার বোরো মৌসুমের জন্য পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে। আগামী জুন পর্যন্ত কোনো সারেরই সংকট হবে না।

বাস্তব প্রতিফলন যাই হোক, আশ্বাস আর প্রতিশ্রুতি নিয়েই আমাদের জীবনচলা। মন্ত্রণালয়সংশ্লিষ্টদের আশ্বাসেও আমরা আশ্বস্ত। তবে আশ্বাসের ওপর আস্থা দিনকে দিন কমে যাচ্ছে। বর্তমানে দুটি বিষয় বিবেচনা করে আমরা নিশ্চিন্ত থাকতে পারছি না। প্রথমত, আমাদের দেশে সার একটি অতি আমদানিনির্ভর পণ্য। বর্তমান বৈশ্বিক সংকটে পৃথিবীজুড়েই কমবেশি মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, কমেছে স্থানীয় মুদ্রার মূল্যমান। ডলারের বিপরীতে আমাদের স্থানীয় মুদ্রা টাকার অবমূল্যায়নও হয়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। তাই আমদানিনির্ভর এ পণ্যটির জন্য সরকারের দেওয়া ভর্তুকির ওপর চাপ বাড়বে। এ চাপের দোহাই দিয়ে গত আগস্টে ইউরিয়া সারের দাম বাড়ানো হয়েছে। কৃষকের উৎপাদন খরচ দুদিক দিয়ে বেড়েছে-জ্বালানির জন্য সেচের এবং সারের ব্যবহারে। কৃষিপণ্য যখন ভোক্তার কাছে পৌঁছায়, তখন পরিবহণের বাড়তি খরচ যোগ হয়। স্বাভাবিভাবেই পণ্যের দাম বেড়ে মূল্যস্ফীতির সৃষ্টি করেছে। এ মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির হার এতটাই বেশি যে, সাধারণ ভোক্তা তার ভার বইতে অক্ষম; যে কারণে সরকারকে ভর্তুকি কমানোর কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। ভর্তুকি কমানো হলে কৃষিপণ্যের দাম আরেক দফা বাড়বে, যা ক্রেতাসাধারণের জীবন দুর্বিষহ করে তুলবে।

আশ্বাসের পরও নিশ্চিন্ত থাকতে না পারার দ্বিতীয় কারণটি হলো রাজনৈতিক পরিস্থিতি। বোরো ও রবি মৌসুমের সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচনের মৌসুমও আসন্ন। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী বছরের শেষদিকে দ্বাদশ সাধারণ নির্বাচন হওয়ার কথা। এরই মধ্যে রাজনৈতিক ময়দান উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ২২ অক্টোবর খুলনায় বিভাগীয় মহাসমাবেশের ডাক দিয়েছিল বিরোধী দল বিএনপি। সমাবেশকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য সরকার সমর্থকরা খুলনা অঞ্চলে পরিবহণ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে ২০ অক্টোবর থেকে। কার্যত ১৯ অক্টোবর থেকেই সারা দেশের সঙ্গে খুলনা বিভাগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল; ফেরি চলাচলও প্রায় বন্ধ ছিল। সরকার সমর্থকদের পক্ষ থেকে এই যে পরিবহণ ব্যবস্থাকে অচল করে দেওয়ার সংস্কৃতি চালু করা হলো, তা আগামীতে বিরোধী দলকে পালটা ব্যবস্থা নিতে উৎসাহ দেবে। চলবে অচলাবস্থার রাজনীতি। আমাদের উৎকণ্ঠার কারণ হলো, সময় বিবেচনায় কৃষি উৎপাদনে সার একটি সংবেদনশীল উপকরণ। একটি নির্দিষ্ট সময়ের একদিন আগেও সার ব্যবহার করা যায় না, আবার একদিন পরে ব্যবহার করলেও কাক্সিক্ষত সুফল পাওয়া যায় না। সঠিক সময়ে সঠিক পরিমাণে সার ব্যবহার করতে হয়। তার জন্য চাই নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ব্যবস্থা। যদি পরিবহণ খাতে অচলাবস্থার রাজনীতি চলে, তাহলে সার সরবরাহ বিঘ্নিত হবে, বিঘ্নিত হবে উৎপাদন। তাই সরকারকে অনেক বিবেচনাপ্রসূত কর্মসূচির কথা ভাবতে হবে, অন্তত খাদ্য নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

Tag :
জনপ্রিয়

নির্বাচিত হলে ১৩নং ওয়ার্ড বাসীর জন্য এ্যাম্বুলেন্স উপহার দিব; রসিকের কাউন্সিলর প্রার্থী তুহিন

সংকটকালে বোরো মৌসুমকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে

প্রকাশের সময় : ০১:১৮:০৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অক্টোবর ২০২২

করোনা অতিমারির বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার মুহূর্তেই বিশ্বব্যাপী আঘাত হেনেছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এ যুদ্ধের অবসান শিগগিরই হবে বলে মনে হয় না; কিন্তু যুদ্ধের কারণে মানুষকে প্রতিদিনের গৃহীত খাদ্য থেকে নিজেকে বিরত রাখার কোনো সুযোগ নেই। তাই বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি এ সময়ে অনেক বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক অনেক নির্ভরযোগ্য গবেষণা সংস্থা আগামী বছরের সারা বিশ্বে তীব্র খাদ্য সংকটের পূর্বাভাস দিয়েছে। এ নিয়ে সব দেশই নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী প্রস্তুতি নিচ্ছে; খাদ্য উৎপাদনকে সর্বোচ্চ মাত্রায় রাখার চেষ্টা করছে। আমরা যেহেতু বিশ্ব থেকে আলাদা কিছু নই, তাই আমরাও সংকটের সম্ভাব্য সম্ভাবনার মধ্যে পড়ি। সেদিকে সরকারের দৃষ্টি থাকবে সন্দেহ নেই। তবে প্রয়োজন হলো, সম্ভাব্য সংকটের জায়গাগুলোকে অধিকতর নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় পরিচর্চা করা।

আর কিছুদিন পরই আমাদের বোরো ও রবি মৌসুম শুরু হবে। এ দেশে সব মৌসুমেই কৃষিকাজ অব্যাহত থাকে; তবে সবচেয়ে বেশি খাদ্যশস্য যে এ মৌসুমেই উৎপাদিত হয়-রাসায়নিক সারের ব্যবহার দেখেই তা বোঝা যায়। মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) তথ্য অনুযায়ী, আমাদের দেশের কৃষিকাজে আমরা প্রতিবছর যে পরিমাণ রাসায়নিক সার ব্যবহার করে থাকি, তার প্রায় ৭০ শতাংশ ব্যবহার করা হয় বোরো ও রবি মৌসুমে। যেহেতু বর্তমান কৃষি উৎপাদনব্যবস্থা রাসায়নিক সারনির্ভর আর আমাদের সার সরবরাহ আমদানিনির্ভর, তাই আন্তর্জাতিক বর্তমান পরিস্থিতি একটি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃষিকাজে রাসায়নিক সারের ব্যবহার, স্থানীয়ভাবে উৎপাদন ও আমদানির চিত্রটি তুলে ধরলে উৎপাদন ধারণাটি পরিষ্কার হতে পারে। দেশের কৃষিকাজে ব্যবহৃত সারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ইউরিয়া, ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি), ডাইঅ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) ও মিউরেট অব পটাশ (এমওপি)। এ চার ধরনের সারের মধ্যে প্রথম তিনটির একটি ক্ষুদ্র অংশ বাংলাদেশে উৎপাদিত হলেও শেষোক্ত অর্থাৎ এমওপি সারের পুরোটাই আমদানি করতে হয়। ২০২১-২২ অর্থবছরের মে মাস পর্যন্ত একটি হিসাব তুলে ধরা যাক। বলে রাখা ভালো যে, বিগত বছরের আমদানির একটি অংশ এ বছর ব্যবহার করা হয়েছে। এ সময়ে দেশে ব্যবহৃত মোট ইউরিয়া সারের পরিমাণ ছিল ২৫ লাখ ১৯ হাজর টন, যার মধ্যে দেশে উৎপাদিত হয়েছে ৭ লাখ ৯৮ হাজার টন আর আমদানি করা হয়েছিল ১৩ লাখ ৮ হাজার টন। আমরা টিএসপি সার ব্যবহার করেছি ৬ লাখ ৮৫ হাজার টন। এর মধ্যে দেশীয়ভাবে উৎপাদন করতে পেরেছি মাত্র ৭১ হাজার টন, যার বিপরীতে আমদানি করতে হয়েছে ৩ লাখ ৮৬ হাজার টন। আমাদের কৃষিতে গেল বছর ডিএপি সারের ব্যবহার হয়েছে ১৬ লাখ ৩৮ হাজর টন। এর মধ্যে আমরা উৎপাদন করেছি ১ লাখ ২ হাজার টন আর আমদানি করেছি ১৪ লাখ ২৬ হাজার টন। এমওপি সারের পুরোটাই আমদানি করেছি, যার পরিমাণ ৯ লাখ ৩ হাজার টন। তাহলে হিসাব অনুযায়ী, আমরা গত অর্থবছরের মে মাস পর্যন্ত অভ্যন্তরীণভাবে মোট ৯ লাখ ৭১ হাজার টন সার উৎপাদন করতে পেরেছি, যার বিপরীতে আমাদের ৪৭ লাখ ৭৪ হাজার টন আমদানি করতে হয়েছে। এর মানে হলো, মোট ব্যবহৃত সারের প্রায় ৮০ শতাংশই আমাদের আমদানি করতে হয় এবং এ সারের ৭০ শতাংশই ব্যবহার করা হয় বোরো ও রবি মৌসুমে, যা আসন্ন।

বিভিন্ন প্রকার ব্যবহৃত সারের মধ্যে ইউরিয়া, টিএসপি ও ডিএপি সার আমদানি করা হয়ে থাকে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, চীন, কাতার, মরক্কো, রাশিয়া, ইউক্রেন, বেলারুশ ও তিউনিসিয়া থেকে। যেহেতু এমওপি সার অভ্যন্তরীণভাবে উৎপাদিত হয় না, তাই এর ৪০ শতাংশ আমদানি করা হয়ে থাকে কানাডা থেকে আর বাদবাকি ৬০ শতাংশ আসে বেলারুশ ও রাশিয়া থেকে। এ কারণেই ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ আমাদের শঙ্কিত করে তুলেছে। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত হলো, বাংলাদেশে সার আমদানির বিকল্প উৎস খুঁজতে হবে। রাশিয়া ছাড়া অন্য যেসব দেশ সার উৎপাদন করে, তাদের সঙ্গে চুক্তি করে সেসব দেশ থেকে সার আমদানির ব্যবস্থা করতে হবে। আগামীর সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলা করার বিষয়ে সাবেক খাদ্য সচিব আবদুল লতিফ মনে করেন, আসন্ন বোরো মৌসুমে সারের সর্বোচ্চ সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গত কয়েক মাসে সারের অবস্থা কিন্তু খুব সুবিধাজনক অবস্থায় নেই। যুদ্ধ দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। বিদ্যুৎ সংকটের কারণে সেচ ব্যবস্থাতেও বিড়ম্বনা দেখা দিতে পারে। তাই অবস্থার নিরিখে ব্যবস্থা নিতে হবে। কেননা বোরো মৌসুমই আমাদের খাদ্য নিরাপত্তায় সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে।

তবে কৃষি মন্ত্রণালয়সংশ্লিষ্টরা আমাদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছেন। তাদের মতে, আসন্ন বোরো মৌসুমসহ চলতি অর্থবছরে সারের সংকট দেখা দেওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। তাদের মতে, বর্তমানে দেশে যে পরিমাণ সার মজুত আছে, তা গত বছরের তুলনায় বেশি। কোনো সারেরই সংকট নেই। দেশে বছরে মোট সাড়ে নয় লাখ টন এমওপি প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে চাহিদা রয়েছে সাড়ে সাত লাখ টন। বাকি দুই লাখ টন নিরাপত্তা মজুত হিসাবে রাখা হয়। গত বছর কানাডা থেকে দেড় লাখ টন, বেলারুশ থেকে দুই লাখ টন ও রাশিয়া থেকে প্রায় ছয় লাখ টন এমওপি সার আমদানি করা হয়েছিল। যুদ্ধের আগেই বেলারুশ থেকে দুই লাখ টন আমদানি করা হয়েছিল। আর রাশিয়া থেকে প্রায় তিন লাখ টন আনা হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর কারণে চাহিদার বাকিটা আমদানি করা যায়নি; যদিও যুদ্ধের আভাস পেয়ে চলতি অর্থবছরের জন্য কানাডা থেকে দেড় লাখ টনের জায়গায় সাড়ে পাঁচ লাখ টন পটাশ আমদানির চুক্তি করা হয়েছিল। এটি ছিল দুই দেশের সরকারের মধ্যে চুক্তি (জি টু জি)। এরই মধ্যে কানাডা থেকে সার আসা শুরু হয়েছে। কানাডার সঙ্গে এ চুক্তির ফলে বাংলাদেশ কিছুটা স্বস্তিতে রয়েছে। আর বাকি থাকল চার লাখ টন। এটি নিয়ে কিছু সংকট হতে পারে। তবে এ অর্থবছরে অর্থাৎ ২০২২-২৩-এ কোনো সংকট হবে না। এবার বোরো মৌসুমের জন্য পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে। আগামী জুন পর্যন্ত কোনো সারেরই সংকট হবে না।

বাস্তব প্রতিফলন যাই হোক, আশ্বাস আর প্রতিশ্রুতি নিয়েই আমাদের জীবনচলা। মন্ত্রণালয়সংশ্লিষ্টদের আশ্বাসেও আমরা আশ্বস্ত। তবে আশ্বাসের ওপর আস্থা দিনকে দিন কমে যাচ্ছে। বর্তমানে দুটি বিষয় বিবেচনা করে আমরা নিশ্চিন্ত থাকতে পারছি না। প্রথমত, আমাদের দেশে সার একটি অতি আমদানিনির্ভর পণ্য। বর্তমান বৈশ্বিক সংকটে পৃথিবীজুড়েই কমবেশি মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, কমেছে স্থানীয় মুদ্রার মূল্যমান। ডলারের বিপরীতে আমাদের স্থানীয় মুদ্রা টাকার অবমূল্যায়নও হয়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। তাই আমদানিনির্ভর এ পণ্যটির জন্য সরকারের দেওয়া ভর্তুকির ওপর চাপ বাড়বে। এ চাপের দোহাই দিয়ে গত আগস্টে ইউরিয়া সারের দাম বাড়ানো হয়েছে। কৃষকের উৎপাদন খরচ দুদিক দিয়ে বেড়েছে-জ্বালানির জন্য সেচের এবং সারের ব্যবহারে। কৃষিপণ্য যখন ভোক্তার কাছে পৌঁছায়, তখন পরিবহণের বাড়তি খরচ যোগ হয়। স্বাভাবিভাবেই পণ্যের দাম বেড়ে মূল্যস্ফীতির সৃষ্টি করেছে। এ মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির হার এতটাই বেশি যে, সাধারণ ভোক্তা তার ভার বইতে অক্ষম; যে কারণে সরকারকে ভর্তুকি কমানোর কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। ভর্তুকি কমানো হলে কৃষিপণ্যের দাম আরেক দফা বাড়বে, যা ক্রেতাসাধারণের জীবন দুর্বিষহ করে তুলবে।

আশ্বাসের পরও নিশ্চিন্ত থাকতে না পারার দ্বিতীয় কারণটি হলো রাজনৈতিক পরিস্থিতি। বোরো ও রবি মৌসুমের সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচনের মৌসুমও আসন্ন। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী বছরের শেষদিকে দ্বাদশ সাধারণ নির্বাচন হওয়ার কথা। এরই মধ্যে রাজনৈতিক ময়দান উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ২২ অক্টোবর খুলনায় বিভাগীয় মহাসমাবেশের ডাক দিয়েছিল বিরোধী দল বিএনপি। সমাবেশকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য সরকার সমর্থকরা খুলনা অঞ্চলে পরিবহণ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে ২০ অক্টোবর থেকে। কার্যত ১৯ অক্টোবর থেকেই সারা দেশের সঙ্গে খুলনা বিভাগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল; ফেরি চলাচলও প্রায় বন্ধ ছিল। সরকার সমর্থকদের পক্ষ থেকে এই যে পরিবহণ ব্যবস্থাকে অচল করে দেওয়ার সংস্কৃতি চালু করা হলো, তা আগামীতে বিরোধী দলকে পালটা ব্যবস্থা নিতে উৎসাহ দেবে। চলবে অচলাবস্থার রাজনীতি। আমাদের উৎকণ্ঠার কারণ হলো, সময় বিবেচনায় কৃষি উৎপাদনে সার একটি সংবেদনশীল উপকরণ। একটি নির্দিষ্ট সময়ের একদিন আগেও সার ব্যবহার করা যায় না, আবার একদিন পরে ব্যবহার করলেও কাক্সিক্ষত সুফল পাওয়া যায় না। সঠিক সময়ে সঠিক পরিমাণে সার ব্যবহার করতে হয়। তার জন্য চাই নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ব্যবস্থা। যদি পরিবহণ খাতে অচলাবস্থার রাজনীতি চলে, তাহলে সার সরবরাহ বিঘ্নিত হবে, বিঘ্নিত হবে উৎপাদন। তাই সরকারকে অনেক বিবেচনাপ্রসূত কর্মসূচির কথা ভাবতে হবে, অন্তত খাদ্য নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়