ঢাকা ০৮:২০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৮ নভেম্বর ২০২২, ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

জ্বালানি সংকট উত্তরণে চাই কার্যকর পদক্ষেপ

বর্তমানে ইউক্রেন ও রাশিয়ার চলমান যুদ্ধের কারণে সারা পৃথিবীতে জীবাশ্ম জ্বালানির তীব্র সংকট একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। যার ফলে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ লোডশেডিং প্রতিনিয়ত বাড়ছে। কারণ বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভর। জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করার জন্য সব দেশের সরকার জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়িয়ে দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশ সরকার জ্বালানি তেলের ভর্তুকি দিয়ে যাচ্ছে। সরকারের অদূরদর্শী কর্মকাণ্ডের কারণে প্রকৃতপক্ষে লাভবান হচ্ছে বিভিন্ন কোম্পানি। অর্থ মন্ত্রণালয় তথ্য মতে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকার প্রয়োজন। যে ভর্তুকির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে তা গত পাঁচ অর্থবছরের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। যদিও ২০২০-২১ অর্থবছরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের জন্য বরাদ্দ ছিল ২৬ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য বরাদ্দ ছিল ২৮ হাজার ৫০ কোটি টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ২৪ হাজার ৯২০ কোটি এবং ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২৮ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ সরকার জ্বালানিতে ভর্তুকি দেওয়ার কারণে দরিদ্র মানুষদের ওপর ঋণের বোঝা বাড়ছে এবং ঋণের বোঝা চাপিয়ে কোম্পানিগুলো আনন্দণ্ডফুর্তি করে চলছে। যাতায়াতে ভর্তুকি দিলে সরাসরি লাভবান হতো সাধারণ নাগরিক। আর জ্বালানিতে ভর্তুকি প্রদান করার ফলে প্রকৃতপক্ষে লাভবান হয় কোম্পানিগুলো। তারপরও সরকারগুলো যাতায়াতে ভর্তুকি না দিয়ে, অর্বাচীনের মতো জ্বালানিতে ভর্তুকি দিয়ে আসছে। পৃথিবীর বেশ কিছু দেশে যাতায়াতে ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। লুক্সেমবার্গসহ পৃথিবীতে অনেক দেশে গণপরিবহনে সাধারণ নাগরিকদের জন্য যাতায়াত ভাড়া অর্ধেক এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ভাড়া মওকুফ বা ফ্রি করা হয়েছে। নেদারল্যান্ডসে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় অযান্ত্রিক যানবাহন নির্ভর যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে।

জ্বালানির ওপর ভর্তুকি দেওয়ার যুক্তি হিসেবে কৃষি উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহকে গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা দেখানো হয়। যা খোঁড়া যুক্তি ছাড়া আর কিছুই নয়। কারণ কৃষিতে ভর্তুকি দিলে লাভবান হয় মূলত বীজ, সার, কীটনাশক ও বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো। এছাড়াও আরেকটি দৃশ্যমান সমস্যা দৃষ্টিগোচর হয়, তা হলো সেই জীবাশ্ম জ্বালানি ভর্তুকির সুবাদে কিছু মানুষ সহজ সত্ত্বেও সুলভ মূল্যের গাড়ি চড়ে বিলাসী জীবনযাপন করে। যা শুধুমাত্র জ্বালানি সংকটের কারণই নয়, শহরে তীব্র যানজট, বায়ু ও শব্দদূষণের জন্যও দায়ী বটে। বিগত বছরগুলোতে এই সমস্যার ভুক্তভোগী নগরবাসী। ব্যক্তিগত গাড়ি কেনার একটি অমূলক যুক্তি সন্তানকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানো, অফিসে ও শপিংয়ে যাওয়া এবং ছুটির দিনে ঘুরে বেড়ানো, দাওয়াত খাওয়া ইত্যাদি। এই কর্মকাণ্ডের অস্বাভাবিক ও অসুস্থ প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয়েছে। যদিও গণমাধ্যমের সহায়তায় জানা যায়, পৃথিবীর অনেক দেশের রাষ্ট্র নেতা, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও নীতিনির্ধারকরা যাতায়াতের ক্ষেত্রে গণপরিবহন ও অযান্ত্রিক যানবাহন (বাইসাইকেল) ব্যবহার করেন। হওয়ার কথা ছিল ‘মানুষের জন্য শহর’, আর আমরা বর্তমানে দেখতে পাচ্ছি রাজধানী ঢাকা হয়ে গেছে ‘গাড়ির জন্য শহর’। যা হওয়া অনুচিত ছিল।

তারপরও আমরা অনেকেই ব্যক্তিগত গাড়ি কেনার স্বপ্ন দেখছি। কারণ বর্তমান পরিস্থিতিতে হেঁটে গেলে বিদ্যালয়, গাড়ি চাপায় পড়তে হয়। গরিব দেশগুলোর শহর এলাকার শিশুদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া-আসায় সড়কে মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি। বেশির ভাগ গরিব দেশে মহাসড়কের পাশেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবস্থানের কারণে এসব দেশের শিশুদের সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মৃত্যুর ঝুঁকি অন্য দেশগুলোর তুলনায় বেশি হয়। এসব দেশগুলোর শহর এলাকার বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শিশুদের হেঁটে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে হয়। পথচারীদের সমতলে রাস্তা পারাপারে ও চলাচলের জন্য নেই জেব্রা ক্রসিং ও ফুটপাত, সড়কের অবস্থাও বেহাল। শিশুদের জন্য নিরাপদ সড়ক তৈরিতে সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে দক্ষিণ কোরিয়া। এমন উদ্যোগের ফলে দেশটির সড়কে শিশুদের হতাহতের ঘটনা ১৯৮৮ সালের তুলনায় ২০১২ সালে ৯৫ শতাংশ কমে এসেছে। জাতিসংঘের বিজ্ঞান, শিক্ষা ও ঐতিহ্যবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকোর গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং (জিইএম) শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে দরকার ছিল ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিটি এলাকায় একই ও ভালো মানসম্পন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। তাহলে সড়কে অপমৃত্যু ও দুর্ঘটনা বন্ধ করা যেত। সকাল-বিকালে স্কুল-কলেজ শুরু ও ছুটির সময়ে ঢাকা শহরে সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট, বায়ু ও শব্দদূষণ। কিছু শিক্ষার্থীর বাসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে অনেক দূরে। আবার অনেকেই বাসা বাড়ির কাছের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়তে চায় না, ভালো মানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকার কারণে। কেউ কেউ পড়লেও তারা ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করে।

চলতি বছরের ২০২২ সালের প্রথম দুই মাসের নিবন্ধিত চিত্র দেখে জানা যায়, ঢাকা শহরে প্রতিদিনে গাড়ি নামছে ৪৯৫টি। বিপুলসংখ্যক নতুন ব্যক্তিগত গাড়ি রাস্তায় নামলেও ঢাকায় সড়ক বাড়েনি, বাড়ানো সম্ভবও নয়। সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) গাড়ি নিবন্ধন নিয়ন্ত্রণ না করার কারণে রাজধানীর যাতায়াত ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। বোঝানোর সুবিধার্থে ছোট একটি উদাহরণ দেওয়া যায় গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, কিছুদিন আগে ২৭ কোটি টাকা মূল্যের রাজস্ব ও শুল্ক ফাঁকি দেওয়া ব্যক্তিগত গাড়ি আটক করা হয়। আর সিঙ্গাপুরের রয়েছে চমৎকার মনোরেল সিস্টেম, যা স্বর্গে, মর্ত্যে ও পাতালে সমানভাবে প্রযোজ্য। কী রকম অদ্ভুত একটা ব্যাপার বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে। দুই দেশের জাতীয় পতাকা রং ভিন্ন দুটি রঙের। তবে জাপান গাড়ি তৈরি করে কিন্তু বাইসাইকেলে যাতায়াতকে পৃষ্ঠপোষকতা করে। আর বাংলাদেশ বাইসাইকেল তৈরি ও রপ্তানি করি কিন্তু অর্বাচীনের মতো বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়ে ব্যক্তিগত গাড়িকে পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। ফলে বাংলাদেশে জ্বালানি সংকটের আরো তীব্রতা দেখা দিয়েছে।

তীব্র জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যেও ধনীরা নির্দয়ভাবে বাসা-বাড়িতে, অফিস ও ব্যক্তিগত গাড়িতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র ব্যবহার করছে। যার কারণে অতিমাত্রায় কার্বন নিঃসরণের ফলে জলবায়ু বিপর্যয়ও তীব্রতর হচ্ছে। ভূ-পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে তীব্র গরমে আমরা হাঁসফাঁস করছি। কিন্তু এসব অর্বাচীনের মতো কর্মকাণ্ডে সৃষ্ট সমস্যার দিকে আমাদের নজর নেই। আমরা যদি বিবেচক হতাম তাহলে বুঝতাম এবং সমস্যার স্থায়ী সমাধানে কার্যকর পদক্ষপ গ্রহণ করতাম, তখন আমাদের টেকসই উন্নয়ন আরো অনেক ধাপ উপরে যেত। জ্বালানি সংকট সমাধানে কীভাবে গ্রাম থেকে শহরে স্রোতের বেগে ব্যাপক হারে ছুটে আসা মানুষের স্রোত বন্ধ করা যায়, এই বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের নজর দেওয়া দরকার। এর কার্যকর সমাধান হতে পারে, গ্রাম ও শহরের মানুষের মাঝে আয় বৈষম্য দূর করা। নাগরিকদের জন্য উপজেলা ও মফস্বল শহরগুলোতে শিক্ষা গ্রহণ, কর্মসংস্থান, জীবিকার নিশ্চয়তা ও চিকিৎসা প্রাপ্তির সব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা। জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে আনার জন্য সতর্ক হওয়া এই বিষয়টি সাধারণ জনগণ বুঝলেই হবে না, নীতিনির্ধারকদেরও বুঝতে হবে। আমাদের এখন মনোযোগী হওয়া দরকার কীভাবে ভবন, বাড়ি-ঘর নির্মাণ করে দিনের আলো, প্রকৃতির বাতাস ব্যবহার করে ভালো জীবনযাপন করা যায়। ভবন, বাড়ি ও অফিসের আশপাশে খোলা জায়গা নিশ্চিত করা। অযান্ত্রিক যানবাহন নির্ভর যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ, অযান্ত্রিক যানবাহনের ওপর কর রেয়াত ও ভর্তুকি প্রদান। ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের ওপর উচ্চহারে কর আরোপ, জ্বালানি সরবরাহ সীমিত

করা ও নিবন্ধন বন্ধ করে দেওয়া। পাশাপাশি গণপরিবহনের (পাবলিক ট্রান্সপোর্ট) মান উন্নত করা। জ্বালানি সংকট পরিস্থিতিতে তাই আমরা উদ্বিগ্ন হচ্ছি এই ভেবে কীভাবে বৈদেশিক ঋণ শোধ করব। এমন সময়ে জ্বালানির ওপর ভর্তুকি বন্ধ একটি বুদ্ধিদীপ্ত পদক্ষেপ।

ইউক্রেন ও রাশিয়ার চলমান যুদ্ধের পরিস্থিতি থেকে আমরা যদি শিক্ষা গ্রহণ না করি এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করি। আমাদের সন্তানদের যদি ব্যক্তিগত গাড়িতে করে স্কুলে নিয়ে যাই এবং ব্যক্তিগত গাড়ি নির্ভর যাতায়াত করি, তবে কোনো দিনই বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারব না। সুশিক্ষা ও নৈতিকতার ঘাটতি আমাদের উন্নয়নের প্রতিবন্ধকতা ও সব অসুখের কারণ। জ্বালানির ব্যবহার সাশ্রয়ী হওয়ার জন্য নেতৃত্বের ব্যর্থতা রয়েছে। সরকার জ্বালানি সংগ্রহ ও ভর্তুকি দিতে যতটা তৎপর, জ্বালানি সাশ্রয়ে তেমন তৎপর ও আন্তরিক নয়। যদি আন্তরিক ও তৎপর হতো তাহলে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কঠোর ভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে, অযান্ত্রিক যানবাহন নির্ভর যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে তোলতে এবং এয়ারকন্ডিশন ব্যবহার বন্ধ করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করত। অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখতে এবং জ্বালানি সংকট উত্তরণের জন্য জ্বালানিতে ভর্তুকি নয়, বরং জ্বালানি সাশ্রয়ী হওয়া প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তাই সাধারণ জনগণের সুবিধার্থে রাষ্ট্রের শুভবুদ্ধির উদয় হোক এই আহ্বান জানাই।

লেখক : আইনজীবী ও কলামিস্ট

masumbillahlaw06@gmail.com

Tag :
জনপ্রিয়

নির্বাচিত হলে ১৩নং ওয়ার্ড বাসীর জন্য এ্যাম্বুলেন্স উপহার দিব; রসিকের কাউন্সিলর প্রার্থী তুহিন

জ্বালানি সংকট উত্তরণে চাই কার্যকর পদক্ষেপ

প্রকাশের সময় : ১২:৩১:৪২ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অক্টোবর ২০২২

বর্তমানে ইউক্রেন ও রাশিয়ার চলমান যুদ্ধের কারণে সারা পৃথিবীতে জীবাশ্ম জ্বালানির তীব্র সংকট একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। যার ফলে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ লোডশেডিং প্রতিনিয়ত বাড়ছে। কারণ বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভর। জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করার জন্য সব দেশের সরকার জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়িয়ে দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশ সরকার জ্বালানি তেলের ভর্তুকি দিয়ে যাচ্ছে। সরকারের অদূরদর্শী কর্মকাণ্ডের কারণে প্রকৃতপক্ষে লাভবান হচ্ছে বিভিন্ন কোম্পানি। অর্থ মন্ত্রণালয় তথ্য মতে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকার প্রয়োজন। যে ভর্তুকির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে তা গত পাঁচ অর্থবছরের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। যদিও ২০২০-২১ অর্থবছরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের জন্য বরাদ্দ ছিল ২৬ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য বরাদ্দ ছিল ২৮ হাজার ৫০ কোটি টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ২৪ হাজার ৯২০ কোটি এবং ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২৮ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ সরকার জ্বালানিতে ভর্তুকি দেওয়ার কারণে দরিদ্র মানুষদের ওপর ঋণের বোঝা বাড়ছে এবং ঋণের বোঝা চাপিয়ে কোম্পানিগুলো আনন্দণ্ডফুর্তি করে চলছে। যাতায়াতে ভর্তুকি দিলে সরাসরি লাভবান হতো সাধারণ নাগরিক। আর জ্বালানিতে ভর্তুকি প্রদান করার ফলে প্রকৃতপক্ষে লাভবান হয় কোম্পানিগুলো। তারপরও সরকারগুলো যাতায়াতে ভর্তুকি না দিয়ে, অর্বাচীনের মতো জ্বালানিতে ভর্তুকি দিয়ে আসছে। পৃথিবীর বেশ কিছু দেশে যাতায়াতে ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। লুক্সেমবার্গসহ পৃথিবীতে অনেক দেশে গণপরিবহনে সাধারণ নাগরিকদের জন্য যাতায়াত ভাড়া অর্ধেক এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ভাড়া মওকুফ বা ফ্রি করা হয়েছে। নেদারল্যান্ডসে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় অযান্ত্রিক যানবাহন নির্ভর যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে।

জ্বালানির ওপর ভর্তুকি দেওয়ার যুক্তি হিসেবে কৃষি উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহকে গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা দেখানো হয়। যা খোঁড়া যুক্তি ছাড়া আর কিছুই নয়। কারণ কৃষিতে ভর্তুকি দিলে লাভবান হয় মূলত বীজ, সার, কীটনাশক ও বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো। এছাড়াও আরেকটি দৃশ্যমান সমস্যা দৃষ্টিগোচর হয়, তা হলো সেই জীবাশ্ম জ্বালানি ভর্তুকির সুবাদে কিছু মানুষ সহজ সত্ত্বেও সুলভ মূল্যের গাড়ি চড়ে বিলাসী জীবনযাপন করে। যা শুধুমাত্র জ্বালানি সংকটের কারণই নয়, শহরে তীব্র যানজট, বায়ু ও শব্দদূষণের জন্যও দায়ী বটে। বিগত বছরগুলোতে এই সমস্যার ভুক্তভোগী নগরবাসী। ব্যক্তিগত গাড়ি কেনার একটি অমূলক যুক্তি সন্তানকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানো, অফিসে ও শপিংয়ে যাওয়া এবং ছুটির দিনে ঘুরে বেড়ানো, দাওয়াত খাওয়া ইত্যাদি। এই কর্মকাণ্ডের অস্বাভাবিক ও অসুস্থ প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয়েছে। যদিও গণমাধ্যমের সহায়তায় জানা যায়, পৃথিবীর অনেক দেশের রাষ্ট্র নেতা, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও নীতিনির্ধারকরা যাতায়াতের ক্ষেত্রে গণপরিবহন ও অযান্ত্রিক যানবাহন (বাইসাইকেল) ব্যবহার করেন। হওয়ার কথা ছিল ‘মানুষের জন্য শহর’, আর আমরা বর্তমানে দেখতে পাচ্ছি রাজধানী ঢাকা হয়ে গেছে ‘গাড়ির জন্য শহর’। যা হওয়া অনুচিত ছিল।

তারপরও আমরা অনেকেই ব্যক্তিগত গাড়ি কেনার স্বপ্ন দেখছি। কারণ বর্তমান পরিস্থিতিতে হেঁটে গেলে বিদ্যালয়, গাড়ি চাপায় পড়তে হয়। গরিব দেশগুলোর শহর এলাকার শিশুদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া-আসায় সড়কে মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি। বেশির ভাগ গরিব দেশে মহাসড়কের পাশেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবস্থানের কারণে এসব দেশের শিশুদের সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মৃত্যুর ঝুঁকি অন্য দেশগুলোর তুলনায় বেশি হয়। এসব দেশগুলোর শহর এলাকার বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শিশুদের হেঁটে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে হয়। পথচারীদের সমতলে রাস্তা পারাপারে ও চলাচলের জন্য নেই জেব্রা ক্রসিং ও ফুটপাত, সড়কের অবস্থাও বেহাল। শিশুদের জন্য নিরাপদ সড়ক তৈরিতে সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে দক্ষিণ কোরিয়া। এমন উদ্যোগের ফলে দেশটির সড়কে শিশুদের হতাহতের ঘটনা ১৯৮৮ সালের তুলনায় ২০১২ সালে ৯৫ শতাংশ কমে এসেছে। জাতিসংঘের বিজ্ঞান, শিক্ষা ও ঐতিহ্যবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকোর গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং (জিইএম) শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে দরকার ছিল ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিটি এলাকায় একই ও ভালো মানসম্পন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। তাহলে সড়কে অপমৃত্যু ও দুর্ঘটনা বন্ধ করা যেত। সকাল-বিকালে স্কুল-কলেজ শুরু ও ছুটির সময়ে ঢাকা শহরে সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট, বায়ু ও শব্দদূষণ। কিছু শিক্ষার্থীর বাসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে অনেক দূরে। আবার অনেকেই বাসা বাড়ির কাছের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়তে চায় না, ভালো মানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকার কারণে। কেউ কেউ পড়লেও তারা ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করে।

চলতি বছরের ২০২২ সালের প্রথম দুই মাসের নিবন্ধিত চিত্র দেখে জানা যায়, ঢাকা শহরে প্রতিদিনে গাড়ি নামছে ৪৯৫টি। বিপুলসংখ্যক নতুন ব্যক্তিগত গাড়ি রাস্তায় নামলেও ঢাকায় সড়ক বাড়েনি, বাড়ানো সম্ভবও নয়। সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) গাড়ি নিবন্ধন নিয়ন্ত্রণ না করার কারণে রাজধানীর যাতায়াত ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। বোঝানোর সুবিধার্থে ছোট একটি উদাহরণ দেওয়া যায় গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, কিছুদিন আগে ২৭ কোটি টাকা মূল্যের রাজস্ব ও শুল্ক ফাঁকি দেওয়া ব্যক্তিগত গাড়ি আটক করা হয়। আর সিঙ্গাপুরের রয়েছে চমৎকার মনোরেল সিস্টেম, যা স্বর্গে, মর্ত্যে ও পাতালে সমানভাবে প্রযোজ্য। কী রকম অদ্ভুত একটা ব্যাপার বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে। দুই দেশের জাতীয় পতাকা রং ভিন্ন দুটি রঙের। তবে জাপান গাড়ি তৈরি করে কিন্তু বাইসাইকেলে যাতায়াতকে পৃষ্ঠপোষকতা করে। আর বাংলাদেশ বাইসাইকেল তৈরি ও রপ্তানি করি কিন্তু অর্বাচীনের মতো বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়ে ব্যক্তিগত গাড়িকে পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। ফলে বাংলাদেশে জ্বালানি সংকটের আরো তীব্রতা দেখা দিয়েছে।

তীব্র জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যেও ধনীরা নির্দয়ভাবে বাসা-বাড়িতে, অফিস ও ব্যক্তিগত গাড়িতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র ব্যবহার করছে। যার কারণে অতিমাত্রায় কার্বন নিঃসরণের ফলে জলবায়ু বিপর্যয়ও তীব্রতর হচ্ছে। ভূ-পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে তীব্র গরমে আমরা হাঁসফাঁস করছি। কিন্তু এসব অর্বাচীনের মতো কর্মকাণ্ডে সৃষ্ট সমস্যার দিকে আমাদের নজর নেই। আমরা যদি বিবেচক হতাম তাহলে বুঝতাম এবং সমস্যার স্থায়ী সমাধানে কার্যকর পদক্ষপ গ্রহণ করতাম, তখন আমাদের টেকসই উন্নয়ন আরো অনেক ধাপ উপরে যেত। জ্বালানি সংকট সমাধানে কীভাবে গ্রাম থেকে শহরে স্রোতের বেগে ব্যাপক হারে ছুটে আসা মানুষের স্রোত বন্ধ করা যায়, এই বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের নজর দেওয়া দরকার। এর কার্যকর সমাধান হতে পারে, গ্রাম ও শহরের মানুষের মাঝে আয় বৈষম্য দূর করা। নাগরিকদের জন্য উপজেলা ও মফস্বল শহরগুলোতে শিক্ষা গ্রহণ, কর্মসংস্থান, জীবিকার নিশ্চয়তা ও চিকিৎসা প্রাপ্তির সব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা। জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে আনার জন্য সতর্ক হওয়া এই বিষয়টি সাধারণ জনগণ বুঝলেই হবে না, নীতিনির্ধারকদেরও বুঝতে হবে। আমাদের এখন মনোযোগী হওয়া দরকার কীভাবে ভবন, বাড়ি-ঘর নির্মাণ করে দিনের আলো, প্রকৃতির বাতাস ব্যবহার করে ভালো জীবনযাপন করা যায়। ভবন, বাড়ি ও অফিসের আশপাশে খোলা জায়গা নিশ্চিত করা। অযান্ত্রিক যানবাহন নির্ভর যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ, অযান্ত্রিক যানবাহনের ওপর কর রেয়াত ও ভর্তুকি প্রদান। ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের ওপর উচ্চহারে কর আরোপ, জ্বালানি সরবরাহ সীমিত

করা ও নিবন্ধন বন্ধ করে দেওয়া। পাশাপাশি গণপরিবহনের (পাবলিক ট্রান্সপোর্ট) মান উন্নত করা। জ্বালানি সংকট পরিস্থিতিতে তাই আমরা উদ্বিগ্ন হচ্ছি এই ভেবে কীভাবে বৈদেশিক ঋণ শোধ করব। এমন সময়ে জ্বালানির ওপর ভর্তুকি বন্ধ একটি বুদ্ধিদীপ্ত পদক্ষেপ।

ইউক্রেন ও রাশিয়ার চলমান যুদ্ধের পরিস্থিতি থেকে আমরা যদি শিক্ষা গ্রহণ না করি এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করি। আমাদের সন্তানদের যদি ব্যক্তিগত গাড়িতে করে স্কুলে নিয়ে যাই এবং ব্যক্তিগত গাড়ি নির্ভর যাতায়াত করি, তবে কোনো দিনই বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারব না। সুশিক্ষা ও নৈতিকতার ঘাটতি আমাদের উন্নয়নের প্রতিবন্ধকতা ও সব অসুখের কারণ। জ্বালানির ব্যবহার সাশ্রয়ী হওয়ার জন্য নেতৃত্বের ব্যর্থতা রয়েছে। সরকার জ্বালানি সংগ্রহ ও ভর্তুকি দিতে যতটা তৎপর, জ্বালানি সাশ্রয়ে তেমন তৎপর ও আন্তরিক নয়। যদি আন্তরিক ও তৎপর হতো তাহলে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কঠোর ভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে, অযান্ত্রিক যানবাহন নির্ভর যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে তোলতে এবং এয়ারকন্ডিশন ব্যবহার বন্ধ করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করত। অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখতে এবং জ্বালানি সংকট উত্তরণের জন্য জ্বালানিতে ভর্তুকি নয়, বরং জ্বালানি সাশ্রয়ী হওয়া প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তাই সাধারণ জনগণের সুবিধার্থে রাষ্ট্রের শুভবুদ্ধির উদয় হোক এই আহ্বান জানাই।

লেখক : আইনজীবী ও কলামিস্ট

masumbillahlaw06@gmail.com