ঢাকা ০৭:২৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৮ নভেম্বর ২০২২, ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

শিক্ষায় পেশাগত মূল্যবোধ ও নৈতিকতা

শিক্ষা মানুষের মূল্যবোধগুলো জাগিয়ে তোলে। শিক্ষা মানুষকে মানবীয় প্রাণীতে রূপান্তারিত করে। সমাজের প্রত্যাশা এমনটিই। এজন্য দেখা যায়, একজন শিক্ষিত মানুষ কোনো অন্যায় ও অমানবিক কাজ করলে সমাজের অন্য লোকেরা বলাবলি করতে থাকে, ‘শিক্ষিত লোকটি একি করল?’ বাস্তবে দেখা যায়, সমাজ ও রাষ্ট্রের অধিকাংশ অন্যায় ও অমানবিক কাজ শিক্ষিত লোকের দ্বারাই সংঘটিত হচ্ছে। এজন্যই শিক্ষার সঙ্গে মূল্যবোধের সমন্বয় অতি জরুরি। যে শিক্ষা ব্যবস্থায় মূল্যবোধ ও নৈতিকতার বালাই নেই সে ব্যবস্থা না মানবিক না কল্যাণকর। নবী মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘যারা মানুষকে কল্যাণের শিক্ষা দেয় আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতারা, আসমান ও জমিনের বাসিন্দারা, এমনকি গর্তের পিপীলিকা এবং মাছ তাদের জন্য দোয়া করতে থাকে।’ শিক্ষা মানুষকে জীব-জন্তু থেকে আলাদা করেছে এবং স্বাতন্ত্র্য দান করেছে। শিক্ষার মাধ্যমেই মানুষের সুপ্রবৃত্তির উন্মোচন ঘটে এবং কুপ্রবৃত্তির অবদমিত হয়। ফলে মানুষ ভালো-মন্দ বিচার-বিবেচনা করতে সক্ষম হয় এবং পাপের কাজ পরিহার করে চলে। এমন শিক্ষার ব্যাপারেই বলা হয় Education is the backbone of the Nation. শিক্ষা যে মানুষের মধ্যে মূল্যবোধসহ অন্যান্য ভালো গুণগুলো জাগিয়ে তোলে সে প্রসঙ্গে World Book of Encyclopedia -তে বলা হয়েছে, ‘শিক্ষা এমন একটি পদ্ধতির নাম যার মাধ্যমে মানুষ জ্ঞান, দক্ষতা, অভ্যাস, মূল্যবোধ কিংবা আচরণ আয়ত্ত করে থাকেন।

এরিস্টটল মনে করেন, ‘শিক্ষার উদ্দেশ্য বড় মাপের মানুষ তৈরি করা।’ আর এই কাজটি সুনিপুনভাবে করে থাকেন একজন শিক্ষক। শিক্ষক হলেন মানুষ গড়ার কারিগর। সুতরাং শিক্ষক যদি মূল্যবোধ সম্পন্ন মানুষ না হন তাহলে বড় মাপের মানুষ তৈরি করা সম্ভব না। বাট্রার্ন্ড রাসেল মনে করেন, ‘শিক্ষা মানুষকে দৈহিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক বিকাশ ঘটিয়ে সত্যিকারের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।’ শিক্ষা-শিক্ষক, মূল্যবোধ-নৈতিকতা শব্দগুলো একটি অপরটির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সুতরাং শিক্ষকের দায়িত্ব হলো শিক্ষার্থীর মধ্যে মানবিক গুণাবলির বিকাশ ঘটানো এবং মুক্তবুদ্ধি ও মুক্তচিন্তার চর্চার মানসিকতা ও পরিবেশ সৃষ্টি করা। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রসার ঘটিয়ে জীবনধারার মান উন্নয়ন করা এবং দেশপ্রেম ও সাম্প্রদায়িক সৌহার্দে শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করে ধর্মীয় ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন সুনাগরিক তৈরি করা। সৃজনশীল চিন্তাধারার বিকাশ ঘটিয়ে জাতীয় ইতিহাস-ঐতিহ্য, সংস্কৃতি-কষ্ঠির প্রতি অনুরাগ সৃষ্টি করা। এ প্রসঙ্গে আল্লামা ইকবাল বলেন, ‘একজন ব্যক্তির জীবন নির্ভর করছে আত্মাও দেহের সম্পর্কের ওপর, আর একটি জাতির জীবন নির্ভর করছে তার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ওপর। আত্মার জীবন প্রভাব বন্ধ হলে ব্যক্তির জীবন প্রবাহ হয় মৃত। জাতি মৃত্যুবরণ করে যদি তার আদর্শ হয় পদদলিত।’ শিক্ষক বাস্তব জীবনের ভালো দিকগুলো নিজের মধ্যে ধারণ করে আদর্শ ও মূল্যবোধের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের গড়ে তুলবেন। শিক্ষকদের কথায় ও কাজে মিল থাকতে হবে এবং আদর্শ বাস্তবায়নে কুশলী ও সাহসী হতে হবে। শিক্ষকের থাকতে হবে জ্ঞানের গভীরতা ও নির্ভুলতা, ব্যক্তিত্ববোধ, বিশুদ্ধ উচ্চারণ ও সহজ-সাবলীল ও আকর্ষণীয় প্রকাশভঙ্গি, আচার-আচরণে সংযত ও কৌশলী। নিয়মণ্ডনীতির ক্ষেত্রে তিনি থাকবেন নিরপেক্ষ ও কঠোর। শিক্ষার্থীর প্রতি শিক্ষকের থাকবে গভীর মমত্ববোধ ও দায়িত্ববোধ এবং অভিভাবক হিসেবে তিনি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণ করবেন যেন শিক্ষার্থী তার ওপর পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করতে পারে। তিনি শিক্ষার্থীদের সুবিধা-অসুবিধার প্রতি নিরপেক্ষ থাকবেন ও সুবিচার করবেন। শিক্ষক হবেন নীতি ও বিচক্ষণতাবোধ সম্পন্ন মানুষ।

ব্যক্তি জীবনের সুষম বিকাশ নির্ভর করে তার নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের ওপর। মূলত এ মানবিক মূল্যবোধ অর্জিত হয় সুশিক্ষার মাধ্যমে। ব্যক্তি জীবনের দুটি দিক আছে। যথা বহির্জগৎ ও অন্তর্জগৎ। বহির্জগতে মানুষ পরিবেশের সঙ্গে সংগতি সাধন করে বেঁচে থাকতে চান এবং অন্তর্জগতে তার সে আশা-আকাঙ্ক্ষার পরিতৃপ্তি সাধন করতে চায়। এসব আশা-আকাঙ্ক্ষা, বুদ্ধিবৃত্তি, আবেগ, প্রবণতা এবং বিভিন্ন ধরনের নৈতিকতা ও চারিত্রিক আদর্শকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। সুতরাং শিক্ষার কাজ হচ্ছে ব্যক্তির বহির্জগৎ ও অন্তর্জগতের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করে তার সুষ্ঠু বিকাশে সহায়তা করা। এ সম্পর্কে জে এম রস বলেন, Education must be religious, moral, intellectual and aesthetic. None of the aspects may be neglected, is a harmonious balanced personality is to be the result. শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে উত্তম নৈতিক চরিত্র গঠন করা। মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাক্রম মূল্যায়ন ও চাহিদা নিরূপণ সমীক্ষা ২০১০ পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, ৪৩.২ শতাংশ বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা হচ্ছে প্রচলিত মাধ্যমিক শিক্ষা শিক্ষার্থীদের নৈতিক চরিত্র গঠন করতে পারছে না। ৫৮ শতাংশ কলেজ শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা হচ্ছে প্রচলিত মাধ্যমিক শিক্ষা শিক্ষার্থীদের নৈতিক চরিত্র গঠনে সাহায্য করতে পারছে না। ৮৮ শতাংশ অভিভাবক মনে করেন মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাক্রম ও বিদ্যালয়ের শিক্ষাক্রম শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় মূল্যবোধ অর্জনে সহায়ক নয়। ৯৩ শতাংশ এসএমসি সদস্যদের মত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় নৈতিকতা ও সামাজিত মূল্যবোধ বিকাশ বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা সক্ষম নয়। জনপ্রতিনিধিদের ৮৯.২৯ শতাংশের মতে প্রচলিত শিক্ষা কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধ তৈরি করতে পারছে না। ফলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা প্রতি বছর মন্ত্রী, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবী, প্রশাসক সবই প্রসব করছে, কিন্তু মানবিক, নৈতিক মূল্য বোধসম্পন্ন মানুষ প্রসব করছে কম। শিক্ষার সঙ্গে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের সংযোগ না হলে এ সমস্যা থেকেই যাবে।

একজন শিক্ষক হবেন জ্ঞানবান, দায়িত্বশীল, মূল্যবোধসম্পন্ন এবং নিজ কাজ ও দায়িত্বের প্রতি সর্বদা সচেতন ও নিবেদিত। এ রকম একজন শিক্ষকের দায়বদ্ধতা থাকে প্রধানত তার বিবেকের কাছে, এরপর শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের কাছে এবং সর্বোপরি সেই প্রতিষ্ঠানের কাছে। তিনি কোনোভাবে সম্পৃক্ত হবেন না অনৈতিক ঘৃণ্য কাজে, ক্লাসে না পড়িয়ে প্রাইভেট, টিউশনি ও বাণিজ্যিক কোচিং সেন্টারে পাঠদানে, ক্লাস ফাঁকি দেওয়া, বিভিন্ন অজুহাতে শিক্ষার্থীদের থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অর্থসম্পদ আত্মসাতের মতো ঘৃণ্য কাজে। শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা প্রদানের সঙ্গে সঙ্গে সম্মানজনক আর্থিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। ফলে শিক্ষক সমাজ তাদের মেধা-মনন, চিন্তা-চেতনা, মন-মানসিকতা ও পূর্ণ মনোযোগে শিক্ষার কাজে নিয়োজিত করবে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, শিক্ষকতার মতো মহান পেশার প্রতি সমাজে এক ধরনের অনীহা সৃষ্টি হয়েছে। এর কারণ অবশ্যই স্পষ্ট। এ পেশায় আকর্ষণীয় আর্থিক সুবিধা প্রাপ্তির নিশ্চয়তা কম। অপরদিকে সামাজিক মর্যাদা ও খ্যাতি অর্থ বিত্তের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায়, সমাজে প্রকৃত উচ্চশিক্ষিত মেধাবীরা এ পেশায় আসতে নারাজ। এটা সমাজের জন্য কোনো শুভ লক্ষণ নয়।

শিক্ষার সঙ্গে মানবিকতা ও মূল্যবোধের ওতপ্রোত যোগসাজশ রয়েছে। এজন্য ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের স্বার্থে প্রত্যেককে সুশিক্ষা অর্জন করতে হবে। আর এ শিক্ষা মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করবে মানবীয় গুণাবলি, তাহলেই চারদিকে মানবতার বিজয় পরিলক্ষিত হবে।

লেখক : প্রভাষক, সরকারি ইস্পাহানী

ডিগ্রি কলেজ, কেরানীগঞ্জ, ঢাকা

eliayhossain@gmail.com

Tag :
জনপ্রিয়

নির্বাচিত হলে ১৩নং ওয়ার্ড বাসীর জন্য এ্যাম্বুলেন্স উপহার দিব; রসিকের কাউন্সিলর প্রার্থী তুহিন

শিক্ষায় পেশাগত মূল্যবোধ ও নৈতিকতা

প্রকাশের সময় : ১২:৩১:৪১ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অক্টোবর ২০২২

শিক্ষা মানুষের মূল্যবোধগুলো জাগিয়ে তোলে। শিক্ষা মানুষকে মানবীয় প্রাণীতে রূপান্তারিত করে। সমাজের প্রত্যাশা এমনটিই। এজন্য দেখা যায়, একজন শিক্ষিত মানুষ কোনো অন্যায় ও অমানবিক কাজ করলে সমাজের অন্য লোকেরা বলাবলি করতে থাকে, ‘শিক্ষিত লোকটি একি করল?’ বাস্তবে দেখা যায়, সমাজ ও রাষ্ট্রের অধিকাংশ অন্যায় ও অমানবিক কাজ শিক্ষিত লোকের দ্বারাই সংঘটিত হচ্ছে। এজন্যই শিক্ষার সঙ্গে মূল্যবোধের সমন্বয় অতি জরুরি। যে শিক্ষা ব্যবস্থায় মূল্যবোধ ও নৈতিকতার বালাই নেই সে ব্যবস্থা না মানবিক না কল্যাণকর। নবী মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘যারা মানুষকে কল্যাণের শিক্ষা দেয় আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতারা, আসমান ও জমিনের বাসিন্দারা, এমনকি গর্তের পিপীলিকা এবং মাছ তাদের জন্য দোয়া করতে থাকে।’ শিক্ষা মানুষকে জীব-জন্তু থেকে আলাদা করেছে এবং স্বাতন্ত্র্য দান করেছে। শিক্ষার মাধ্যমেই মানুষের সুপ্রবৃত্তির উন্মোচন ঘটে এবং কুপ্রবৃত্তির অবদমিত হয়। ফলে মানুষ ভালো-মন্দ বিচার-বিবেচনা করতে সক্ষম হয় এবং পাপের কাজ পরিহার করে চলে। এমন শিক্ষার ব্যাপারেই বলা হয় Education is the backbone of the Nation. শিক্ষা যে মানুষের মধ্যে মূল্যবোধসহ অন্যান্য ভালো গুণগুলো জাগিয়ে তোলে সে প্রসঙ্গে World Book of Encyclopedia -তে বলা হয়েছে, ‘শিক্ষা এমন একটি পদ্ধতির নাম যার মাধ্যমে মানুষ জ্ঞান, দক্ষতা, অভ্যাস, মূল্যবোধ কিংবা আচরণ আয়ত্ত করে থাকেন।

এরিস্টটল মনে করেন, ‘শিক্ষার উদ্দেশ্য বড় মাপের মানুষ তৈরি করা।’ আর এই কাজটি সুনিপুনভাবে করে থাকেন একজন শিক্ষক। শিক্ষক হলেন মানুষ গড়ার কারিগর। সুতরাং শিক্ষক যদি মূল্যবোধ সম্পন্ন মানুষ না হন তাহলে বড় মাপের মানুষ তৈরি করা সম্ভব না। বাট্রার্ন্ড রাসেল মনে করেন, ‘শিক্ষা মানুষকে দৈহিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক বিকাশ ঘটিয়ে সত্যিকারের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।’ শিক্ষা-শিক্ষক, মূল্যবোধ-নৈতিকতা শব্দগুলো একটি অপরটির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সুতরাং শিক্ষকের দায়িত্ব হলো শিক্ষার্থীর মধ্যে মানবিক গুণাবলির বিকাশ ঘটানো এবং মুক্তবুদ্ধি ও মুক্তচিন্তার চর্চার মানসিকতা ও পরিবেশ সৃষ্টি করা। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রসার ঘটিয়ে জীবনধারার মান উন্নয়ন করা এবং দেশপ্রেম ও সাম্প্রদায়িক সৌহার্দে শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করে ধর্মীয় ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন সুনাগরিক তৈরি করা। সৃজনশীল চিন্তাধারার বিকাশ ঘটিয়ে জাতীয় ইতিহাস-ঐতিহ্য, সংস্কৃতি-কষ্ঠির প্রতি অনুরাগ সৃষ্টি করা। এ প্রসঙ্গে আল্লামা ইকবাল বলেন, ‘একজন ব্যক্তির জীবন নির্ভর করছে আত্মাও দেহের সম্পর্কের ওপর, আর একটি জাতির জীবন নির্ভর করছে তার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ওপর। আত্মার জীবন প্রভাব বন্ধ হলে ব্যক্তির জীবন প্রবাহ হয় মৃত। জাতি মৃত্যুবরণ করে যদি তার আদর্শ হয় পদদলিত।’ শিক্ষক বাস্তব জীবনের ভালো দিকগুলো নিজের মধ্যে ধারণ করে আদর্শ ও মূল্যবোধের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের গড়ে তুলবেন। শিক্ষকদের কথায় ও কাজে মিল থাকতে হবে এবং আদর্শ বাস্তবায়নে কুশলী ও সাহসী হতে হবে। শিক্ষকের থাকতে হবে জ্ঞানের গভীরতা ও নির্ভুলতা, ব্যক্তিত্ববোধ, বিশুদ্ধ উচ্চারণ ও সহজ-সাবলীল ও আকর্ষণীয় প্রকাশভঙ্গি, আচার-আচরণে সংযত ও কৌশলী। নিয়মণ্ডনীতির ক্ষেত্রে তিনি থাকবেন নিরপেক্ষ ও কঠোর। শিক্ষার্থীর প্রতি শিক্ষকের থাকবে গভীর মমত্ববোধ ও দায়িত্ববোধ এবং অভিভাবক হিসেবে তিনি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণ করবেন যেন শিক্ষার্থী তার ওপর পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করতে পারে। তিনি শিক্ষার্থীদের সুবিধা-অসুবিধার প্রতি নিরপেক্ষ থাকবেন ও সুবিচার করবেন। শিক্ষক হবেন নীতি ও বিচক্ষণতাবোধ সম্পন্ন মানুষ।

ব্যক্তি জীবনের সুষম বিকাশ নির্ভর করে তার নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের ওপর। মূলত এ মানবিক মূল্যবোধ অর্জিত হয় সুশিক্ষার মাধ্যমে। ব্যক্তি জীবনের দুটি দিক আছে। যথা বহির্জগৎ ও অন্তর্জগৎ। বহির্জগতে মানুষ পরিবেশের সঙ্গে সংগতি সাধন করে বেঁচে থাকতে চান এবং অন্তর্জগতে তার সে আশা-আকাঙ্ক্ষার পরিতৃপ্তি সাধন করতে চায়। এসব আশা-আকাঙ্ক্ষা, বুদ্ধিবৃত্তি, আবেগ, প্রবণতা এবং বিভিন্ন ধরনের নৈতিকতা ও চারিত্রিক আদর্শকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। সুতরাং শিক্ষার কাজ হচ্ছে ব্যক্তির বহির্জগৎ ও অন্তর্জগতের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করে তার সুষ্ঠু বিকাশে সহায়তা করা। এ সম্পর্কে জে এম রস বলেন, Education must be religious, moral, intellectual and aesthetic. None of the aspects may be neglected, is a harmonious balanced personality is to be the result. শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে উত্তম নৈতিক চরিত্র গঠন করা। মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাক্রম মূল্যায়ন ও চাহিদা নিরূপণ সমীক্ষা ২০১০ পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, ৪৩.২ শতাংশ বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা হচ্ছে প্রচলিত মাধ্যমিক শিক্ষা শিক্ষার্থীদের নৈতিক চরিত্র গঠন করতে পারছে না। ৫৮ শতাংশ কলেজ শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা হচ্ছে প্রচলিত মাধ্যমিক শিক্ষা শিক্ষার্থীদের নৈতিক চরিত্র গঠনে সাহায্য করতে পারছে না। ৮৮ শতাংশ অভিভাবক মনে করেন মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাক্রম ও বিদ্যালয়ের শিক্ষাক্রম শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় মূল্যবোধ অর্জনে সহায়ক নয়। ৯৩ শতাংশ এসএমসি সদস্যদের মত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় নৈতিকতা ও সামাজিত মূল্যবোধ বিকাশ বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা সক্ষম নয়। জনপ্রতিনিধিদের ৮৯.২৯ শতাংশের মতে প্রচলিত শিক্ষা কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধ তৈরি করতে পারছে না। ফলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা প্রতি বছর মন্ত্রী, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবী, প্রশাসক সবই প্রসব করছে, কিন্তু মানবিক, নৈতিক মূল্য বোধসম্পন্ন মানুষ প্রসব করছে কম। শিক্ষার সঙ্গে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের সংযোগ না হলে এ সমস্যা থেকেই যাবে।

একজন শিক্ষক হবেন জ্ঞানবান, দায়িত্বশীল, মূল্যবোধসম্পন্ন এবং নিজ কাজ ও দায়িত্বের প্রতি সর্বদা সচেতন ও নিবেদিত। এ রকম একজন শিক্ষকের দায়বদ্ধতা থাকে প্রধানত তার বিবেকের কাছে, এরপর শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের কাছে এবং সর্বোপরি সেই প্রতিষ্ঠানের কাছে। তিনি কোনোভাবে সম্পৃক্ত হবেন না অনৈতিক ঘৃণ্য কাজে, ক্লাসে না পড়িয়ে প্রাইভেট, টিউশনি ও বাণিজ্যিক কোচিং সেন্টারে পাঠদানে, ক্লাস ফাঁকি দেওয়া, বিভিন্ন অজুহাতে শিক্ষার্থীদের থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অর্থসম্পদ আত্মসাতের মতো ঘৃণ্য কাজে। শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা প্রদানের সঙ্গে সঙ্গে সম্মানজনক আর্থিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। ফলে শিক্ষক সমাজ তাদের মেধা-মনন, চিন্তা-চেতনা, মন-মানসিকতা ও পূর্ণ মনোযোগে শিক্ষার কাজে নিয়োজিত করবে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, শিক্ষকতার মতো মহান পেশার প্রতি সমাজে এক ধরনের অনীহা সৃষ্টি হয়েছে। এর কারণ অবশ্যই স্পষ্ট। এ পেশায় আকর্ষণীয় আর্থিক সুবিধা প্রাপ্তির নিশ্চয়তা কম। অপরদিকে সামাজিক মর্যাদা ও খ্যাতি অর্থ বিত্তের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায়, সমাজে প্রকৃত উচ্চশিক্ষিত মেধাবীরা এ পেশায় আসতে নারাজ। এটা সমাজের জন্য কোনো শুভ লক্ষণ নয়।

শিক্ষার সঙ্গে মানবিকতা ও মূল্যবোধের ওতপ্রোত যোগসাজশ রয়েছে। এজন্য ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের স্বার্থে প্রত্যেককে সুশিক্ষা অর্জন করতে হবে। আর এ শিক্ষা মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করবে মানবীয় গুণাবলি, তাহলেই চারদিকে মানবতার বিজয় পরিলক্ষিত হবে।

লেখক : প্রভাষক, সরকারি ইস্পাহানী

ডিগ্রি কলেজ, কেরানীগঞ্জ, ঢাকা

eliayhossain@gmail.com