ঢাকা ০২:২৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২২, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

আসছে নির্বাচন বাড়ছে সহিংসতা

নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই উত্তপ্ত হচ্ছে রাজনীতির মাঠ। বাড়ছে রাজনৈতিক সহিংসতা। এসব সহিংসতায় ঝরছে তাজা প্রাণ। ইতোমধ্যে অর্ধশত ছাড়িয়ে গেছে রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণহানির সংখ্যা। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, চলতি বছরে রাজধানীসহ সারা দেশে ৩৪১টি ঘটনায় ৫৪ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। আহত হয়েছেন চার হাজার ৩৭৯ জন। গত পাঁচ বছরে দুই হাজার ৩৪০টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৩৮৪ জন। আহত হয়েছেন ২৬ হাজার ৬৪৭ জন। এর মধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠন এবং বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের ঘটনাও রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিএনপি মাঠের রাজনীতিতে সরব হয়ে ওঠায় সহিংসতার দিকে যাচ্ছে পরিস্থিতি। এ অবস্থা বজায় থাকলে দিন যত গড়াবে পরিস্থিতি ততই অবনতির দিকে যেতে পারে।

সম্প্রতি কয়েকটি স্থানে বিএনপির সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রাণহানিও হয়েছে। এসব সংঘর্ষ আর উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য বিএনপিকে দায়ী করছে সরকার ও আওয়ামী লীগ। অপরদিকে বিএনপির নেতারা বলছেন, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী তাদের ওপর হামলা করছে। পুলিশও তাদের পক্ষ নিচ্ছে। বিএনপি নেতাকর্মী নিহত হলেও উল্টো তাদের বিরুদ্ধেই মামলা হচ্ছে। গত মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাসে ঢোকার আগেই হামলা করে ছাত্রলীগ। এতে ১৫ জন আহত হয়েছেন বলে অভিযোগ করেন। এর আগে সোমবার বিকালে রাজধানীর হাজারীবাগে বিএনপির সভায় হামলা করে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরে আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপির ৫৩টি সংঘর্ষে আহত হয়েছেন এক হাজার ২৪ জন, বিএনপির সঙ্গে যুবলীগ-ছাত্রলীগের সাতটি সংঘর্ষ হয়েছে। একই সময় বিএনপির সঙ্গে পুলিশের ১৭টি সংঘর্ষে ৩৬৫ জন আহত ও দুজন নিহত হয়।
বলেন, ‘আমরা বরাবরই বলে আসছি আওয়ামী লীগ একটা সন্ত্রাসী দল। সন্ত্রাস না করে তারা ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবে না। বিএনপি যেন গণতান্ত্রিকভাবে সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগ করতে না পারে, সভা-সমাবেশ মিছিল করতে না পারে, তার জন্যই পরিকল্পিতভাবে সন্ত্রাসের মধ্য দিয়েই ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে এরা।’ তিনি বলেন, ‘তারা তো জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। বিএনপি যখনই জনসম্পৃক্ত আন্দোলনে গেছে তখনই অপকর্ম শুরু করেছে। এসব করে বাধা দিতে পারবে না, কারণ মানুষ এখন জেগে উঠেছে।’

বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘২০১২ সাল থেকে বিএনপির বিরুদ্ধে গায়েবি মামলার ব্যাপকতা শুরু হয়। আমার নিজের নামেও সিটি কর্পোরেশনের গাড়ি পোড়ানোসহ বিপুলসংখ্যক উদ্ভট মামলা দেওয়া হয়েছে। ঘটনাস্থলে না থাকলেও অনেকের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৩৫ লাখেরও বেশি নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়েছে ক্ষমতাসীন দল ও পুলিশ। বিএনপির প্রত্যেক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে পাঁচ থেকে ৫০টির অধিক মামলা রয়েছে। সুতরাং মামলাকে আমরা আর ভয় পাই না।’ মির্জা ফখরুল আরও বলেন, ‘যেখানে আমাদের কর্মী নিহত হয়েছে সেখানে আমরা মামলা করেছি। কিন্তু সেই মামলা কোর্ট খারিজ করে দিচ্ছে।’

এসব অভিযোগের বিষয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেন, ‘আওয়ামী লীগ কোথাও বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালায়নি। বিএনপি গত ১২ বছর ধরেই সরকারের পতন ঘটাচ্ছে। এখনও একই কথা বলছে।’

তিনি বলেন, ‘এর আগে কুমিল্লায় বরকতউল্লা বুলুর ওপর হামলা হয়েছে চায়ের দোকানে। এটা তার ব্যক্তিগত বা পারিবারিক শত্রু করেছে কি না আমরা কি জানি? এখন কোথাও কোনো বিএনপি নেতার ওপর ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণে হামলা হলেও আওয়ামী লীগকে দায়ী করা হয়।’ তিনি বলেন, ‘তারা তাদের আন্দোলকে একটা হাস্যকর পর্যায়ে নিয়ে গেছে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে সাধারণ মানুষ যদি প্রতিবাদ করে তাতে আমাদের কী করার আছে।’

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) মো. আব্দুর রশীদ বলেন, ‘আমাদের দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা অস্বাভাবিক কিছু না। আমরা অতীতে দেখে এসেছি, নির্বাচন সামনে এলে সব দলই তাদের শক্তিতে মেতে ওঠে। প্রতিপক্ষের প্রচারণাকে বাধাগ্রস্ত করে। বর্তমানে সেটাই হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক দলের কৌশলের মধ্যে তারা যদি বাধাগ্রস্ত না করে তাহলে সহিংসতা কমে আসবে।’ তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের আগে সবাই শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচনি প্রচারণা করবে, এ সংস্কৃতি বাংলাদেশে গড়ে ওঠেনি। এটি গড়ে তোলা একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জিয়া রহমান বলেন, ‘সামনে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপি আন্দোলনে নামছে। আর আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সহিংসতার সৃষ্টি হচ্ছে। নির্বাচন এলেই সহিংসতা বেড়ে যায়। এ দেশে রাজনৈতিক পরিবেশ উন্নত হয়নি। এ কারণেই সহিংসতার ঘটনা ঘটে।’

তিনি আরও বলেন, ‘জনগণের যে ডিমান্ড বা জনগণ যেটা চায় সেই বিষয়গুলো সিরিয়াসলি পর্যালোচনা করলে আমার মনে হয় সহিংসতা হবে না। এসব ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলো যদি না ভাবে তাহলে গণতন্ত্রের চর্চার কথা বলি বা জনগণের ভালোর কথা চিন্তা করি, তা কিছুই হবে না।’

অধ্যাপক জিয়া বলেন, ‘সবশেষে বলতে চাই, আমাদের পলিটিক্যাল কালচার যদি আমরা সঠিক চর্চা না করতে পারি তাহলে এ সহিংসতা থেকে বের হওয়া সম্ভব নয়।’

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান বলছে, ‘চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ৩৪১টি রাজনৈতিক সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন ৫৪ জন। আহত হয়েছেন চার হাজার ৩৭৯ জন। এ সময় আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপির ৫৩টি সংঘর্ষে আহত হয়েছেন এক হাজার ২৪ জন, বিএনপির সঙ্গে যুবলীগ-ছাত্রলীগের সাতটি সংঘর্ষ হয়েছে। একই সময় বিএনপির সঙ্গে পুলিশের ১৭টি সংঘর্ষে ৩৬৫ জন আহত ও দুজন নিহত হয়।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত ১৫ সেপ্টেম্বর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বাধা ও হামলায় রাজধানীর পল্লবীতে সমাবেশ পণ্ডের পর বিএনপির ৭৫ নেতাকর্মীর নামে মামলা করে পুলিশ। এ ঘটনায় তিতুমীর কলেজ শাখা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি জসিম রানাসহ বিএনপি ও ছাত্রদলের সাত নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। এসব মামলায় দাঙ্গা সৃষ্টি, পুলিশের কাজে বাধা ও ভাঙচুর করে ক্ষতিসাধনের অভিযোগ আনা হয়েছে।

গত ২১ সেপ্টেম্বর বিকালে মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার মুক্তারপুর পুরনো ফেরিঘাট এলাকায় বিএনপির মিছিল চলাকালে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে। এতে পুলিশ-সাংবাদিকসহ উভয় পক্ষের অন্তত ৭০ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে বিএনপির নেতা-কর্মী ৫০-৬০ জন, ছয়জন সংবাদকর্মী এবং সাত থেকে আটজন পুলিশ সদস্য রয়েছেন। অভিযোগ উঠেছে, আওয়ামী লীগের পক্ষ নিয়ে পুলিশ গুলি চালিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের হত্যা ও গুরুতর আহত করেছে।

আহত ব্যক্তিদের মধ্যে মুক্তারপুর ওয়ার্ড যুবদলের কর্মী শহীদুল ইসলাম শাওন খান (২২) ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ওই ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়। মামলায় নিহত শাওনকে ৩ নম্বর আসামি করা হয়।

এ ছাড়াও গত ২৬ আগস্ট মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে যুশুরগাঁও বাইপাস এলাকায় বিএনপির প্রতিবাদ বিক্ষোভ মিছিলে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের হামলায় শ্রীনগর উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব হাফিজুল ইসলাম খানসহ প্রায় অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন।

বিএনপির সহ-দফতর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু জানিয়েছেন, গত ২২ আগস্ট থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩০ দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপির ৫২টি কর্মসূচিতে হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২৭টি স্থানে বিএনপির নেতাকর্মীদের বাড়িঘর, গাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের হামলা-ভাঙচুর হয়েছে। আর বিএনপির পূর্বঘোষিত সমাবেশস্থলে সমাবেশ ডাকে ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠন। প্রশাসন এ সুযোগ নিয়ে ১৪৪ ধারা জারি করে ১৮টি স্থানে। ২২ আগস্ট থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪৬ মামলার মধ্যে ২৯টির বাদী পুলিশ, ১৭টির আওয়ামী লীগ। এসব ঘটনায় মামলায় আসামি করা হয়েছে ২৯ হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে। এসব মামলার বাদী হচ্ছেন পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। হামলার শিকার হয়ে থানায় মামলা দিতে গেলেও তাদের তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। পরে বাধ্য হয়ে তারা আদালতে মামলা করতে গেলেও সেই মামলা খারিজ করে দেন আদালত।

Tag :
জনপ্রিয়

বস্ত্রশিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তি: রাষ্ট্রপতি।

আসছে নির্বাচন বাড়ছে সহিংসতা

প্রকাশের সময় : ০৬:৪৫:৩২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২

নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই উত্তপ্ত হচ্ছে রাজনীতির মাঠ। বাড়ছে রাজনৈতিক সহিংসতা। এসব সহিংসতায় ঝরছে তাজা প্রাণ। ইতোমধ্যে অর্ধশত ছাড়িয়ে গেছে রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণহানির সংখ্যা। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, চলতি বছরে রাজধানীসহ সারা দেশে ৩৪১টি ঘটনায় ৫৪ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। আহত হয়েছেন চার হাজার ৩৭৯ জন। গত পাঁচ বছরে দুই হাজার ৩৪০টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৩৮৪ জন। আহত হয়েছেন ২৬ হাজার ৬৪৭ জন। এর মধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠন এবং বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের ঘটনাও রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিএনপি মাঠের রাজনীতিতে সরব হয়ে ওঠায় সহিংসতার দিকে যাচ্ছে পরিস্থিতি। এ অবস্থা বজায় থাকলে দিন যত গড়াবে পরিস্থিতি ততই অবনতির দিকে যেতে পারে।

সম্প্রতি কয়েকটি স্থানে বিএনপির সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রাণহানিও হয়েছে। এসব সংঘর্ষ আর উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য বিএনপিকে দায়ী করছে সরকার ও আওয়ামী লীগ। অপরদিকে বিএনপির নেতারা বলছেন, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী তাদের ওপর হামলা করছে। পুলিশও তাদের পক্ষ নিচ্ছে। বিএনপি নেতাকর্মী নিহত হলেও উল্টো তাদের বিরুদ্ধেই মামলা হচ্ছে। গত মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাসে ঢোকার আগেই হামলা করে ছাত্রলীগ। এতে ১৫ জন আহত হয়েছেন বলে অভিযোগ করেন। এর আগে সোমবার বিকালে রাজধানীর হাজারীবাগে বিএনপির সভায় হামলা করে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরে আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপির ৫৩টি সংঘর্ষে আহত হয়েছেন এক হাজার ২৪ জন, বিএনপির সঙ্গে যুবলীগ-ছাত্রলীগের সাতটি সংঘর্ষ হয়েছে। একই সময় বিএনপির সঙ্গে পুলিশের ১৭টি সংঘর্ষে ৩৬৫ জন আহত ও দুজন নিহত হয়।
বলেন, ‘আমরা বরাবরই বলে আসছি আওয়ামী লীগ একটা সন্ত্রাসী দল। সন্ত্রাস না করে তারা ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবে না। বিএনপি যেন গণতান্ত্রিকভাবে সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগ করতে না পারে, সভা-সমাবেশ মিছিল করতে না পারে, তার জন্যই পরিকল্পিতভাবে সন্ত্রাসের মধ্য দিয়েই ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে এরা।’ তিনি বলেন, ‘তারা তো জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। বিএনপি যখনই জনসম্পৃক্ত আন্দোলনে গেছে তখনই অপকর্ম শুরু করেছে। এসব করে বাধা দিতে পারবে না, কারণ মানুষ এখন জেগে উঠেছে।’

বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘২০১২ সাল থেকে বিএনপির বিরুদ্ধে গায়েবি মামলার ব্যাপকতা শুরু হয়। আমার নিজের নামেও সিটি কর্পোরেশনের গাড়ি পোড়ানোসহ বিপুলসংখ্যক উদ্ভট মামলা দেওয়া হয়েছে। ঘটনাস্থলে না থাকলেও অনেকের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৩৫ লাখেরও বেশি নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়েছে ক্ষমতাসীন দল ও পুলিশ। বিএনপির প্রত্যেক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে পাঁচ থেকে ৫০টির অধিক মামলা রয়েছে। সুতরাং মামলাকে আমরা আর ভয় পাই না।’ মির্জা ফখরুল আরও বলেন, ‘যেখানে আমাদের কর্মী নিহত হয়েছে সেখানে আমরা মামলা করেছি। কিন্তু সেই মামলা কোর্ট খারিজ করে দিচ্ছে।’

এসব অভিযোগের বিষয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেন, ‘আওয়ামী লীগ কোথাও বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালায়নি। বিএনপি গত ১২ বছর ধরেই সরকারের পতন ঘটাচ্ছে। এখনও একই কথা বলছে।’

তিনি বলেন, ‘এর আগে কুমিল্লায় বরকতউল্লা বুলুর ওপর হামলা হয়েছে চায়ের দোকানে। এটা তার ব্যক্তিগত বা পারিবারিক শত্রু করেছে কি না আমরা কি জানি? এখন কোথাও কোনো বিএনপি নেতার ওপর ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণে হামলা হলেও আওয়ামী লীগকে দায়ী করা হয়।’ তিনি বলেন, ‘তারা তাদের আন্দোলকে একটা হাস্যকর পর্যায়ে নিয়ে গেছে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে সাধারণ মানুষ যদি প্রতিবাদ করে তাতে আমাদের কী করার আছে।’

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) মো. আব্দুর রশীদ বলেন, ‘আমাদের দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা অস্বাভাবিক কিছু না। আমরা অতীতে দেখে এসেছি, নির্বাচন সামনে এলে সব দলই তাদের শক্তিতে মেতে ওঠে। প্রতিপক্ষের প্রচারণাকে বাধাগ্রস্ত করে। বর্তমানে সেটাই হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক দলের কৌশলের মধ্যে তারা যদি বাধাগ্রস্ত না করে তাহলে সহিংসতা কমে আসবে।’ তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের আগে সবাই শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচনি প্রচারণা করবে, এ সংস্কৃতি বাংলাদেশে গড়ে ওঠেনি। এটি গড়ে তোলা একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জিয়া রহমান বলেন, ‘সামনে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপি আন্দোলনে নামছে। আর আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সহিংসতার সৃষ্টি হচ্ছে। নির্বাচন এলেই সহিংসতা বেড়ে যায়। এ দেশে রাজনৈতিক পরিবেশ উন্নত হয়নি। এ কারণেই সহিংসতার ঘটনা ঘটে।’

তিনি আরও বলেন, ‘জনগণের যে ডিমান্ড বা জনগণ যেটা চায় সেই বিষয়গুলো সিরিয়াসলি পর্যালোচনা করলে আমার মনে হয় সহিংসতা হবে না। এসব ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলো যদি না ভাবে তাহলে গণতন্ত্রের চর্চার কথা বলি বা জনগণের ভালোর কথা চিন্তা করি, তা কিছুই হবে না।’

অধ্যাপক জিয়া বলেন, ‘সবশেষে বলতে চাই, আমাদের পলিটিক্যাল কালচার যদি আমরা সঠিক চর্চা না করতে পারি তাহলে এ সহিংসতা থেকে বের হওয়া সম্ভব নয়।’

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান বলছে, ‘চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ৩৪১টি রাজনৈতিক সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন ৫৪ জন। আহত হয়েছেন চার হাজার ৩৭৯ জন। এ সময় আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপির ৫৩টি সংঘর্ষে আহত হয়েছেন এক হাজার ২৪ জন, বিএনপির সঙ্গে যুবলীগ-ছাত্রলীগের সাতটি সংঘর্ষ হয়েছে। একই সময় বিএনপির সঙ্গে পুলিশের ১৭টি সংঘর্ষে ৩৬৫ জন আহত ও দুজন নিহত হয়।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত ১৫ সেপ্টেম্বর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বাধা ও হামলায় রাজধানীর পল্লবীতে সমাবেশ পণ্ডের পর বিএনপির ৭৫ নেতাকর্মীর নামে মামলা করে পুলিশ। এ ঘটনায় তিতুমীর কলেজ শাখা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি জসিম রানাসহ বিএনপি ও ছাত্রদলের সাত নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। এসব মামলায় দাঙ্গা সৃষ্টি, পুলিশের কাজে বাধা ও ভাঙচুর করে ক্ষতিসাধনের অভিযোগ আনা হয়েছে।

গত ২১ সেপ্টেম্বর বিকালে মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার মুক্তারপুর পুরনো ফেরিঘাট এলাকায় বিএনপির মিছিল চলাকালে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে। এতে পুলিশ-সাংবাদিকসহ উভয় পক্ষের অন্তত ৭০ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে বিএনপির নেতা-কর্মী ৫০-৬০ জন, ছয়জন সংবাদকর্মী এবং সাত থেকে আটজন পুলিশ সদস্য রয়েছেন। অভিযোগ উঠেছে, আওয়ামী লীগের পক্ষ নিয়ে পুলিশ গুলি চালিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের হত্যা ও গুরুতর আহত করেছে।

আহত ব্যক্তিদের মধ্যে মুক্তারপুর ওয়ার্ড যুবদলের কর্মী শহীদুল ইসলাম শাওন খান (২২) ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ওই ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়। মামলায় নিহত শাওনকে ৩ নম্বর আসামি করা হয়।

এ ছাড়াও গত ২৬ আগস্ট মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে যুশুরগাঁও বাইপাস এলাকায় বিএনপির প্রতিবাদ বিক্ষোভ মিছিলে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের হামলায় শ্রীনগর উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব হাফিজুল ইসলাম খানসহ প্রায় অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন।

বিএনপির সহ-দফতর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু জানিয়েছেন, গত ২২ আগস্ট থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩০ দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপির ৫২টি কর্মসূচিতে হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২৭টি স্থানে বিএনপির নেতাকর্মীদের বাড়িঘর, গাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের হামলা-ভাঙচুর হয়েছে। আর বিএনপির পূর্বঘোষিত সমাবেশস্থলে সমাবেশ ডাকে ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠন। প্রশাসন এ সুযোগ নিয়ে ১৪৪ ধারা জারি করে ১৮টি স্থানে। ২২ আগস্ট থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪৬ মামলার মধ্যে ২৯টির বাদী পুলিশ, ১৭টির আওয়ামী লীগ। এসব ঘটনায় মামলায় আসামি করা হয়েছে ২৯ হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে। এসব মামলার বাদী হচ্ছেন পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। হামলার শিকার হয়ে থানায় মামলা দিতে গেলেও তাদের তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। পরে বাধ্য হয়ে তারা আদালতে মামলা করতে গেলেও সেই মামলা খারিজ করে দেন আদালত।