ঢাকা ০৯:০৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২২, ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

বন্ধুর পথে বন্ধু হয়ে…

রজার ফেদেরারের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের সেরা অর্জন কী? মিরকা ভাব্রিনেচ!

উত্তরটা শুনে অনেকেই হয়তো ভ্রু কুচকাবেন- এটা কোনো উত্তর হলো! কোর্টের সাফল্য হিসেবে তো আর সহধর্মিণীকে পাননি ফেদেরার। তবে এটাও তো অস্বীকারের কোনো জো নেই, টেনিসে না এলে হয়তো জীবনসঙ্গী হিসেবে মিরকা ভাব্রিনেচকে পাওয়াই হতো না ফেদেরারের। আর মিরকা পাশে না থাকলে যে ফেদেরারেরও ‘ফেদেরার’ হওয়া হয়ে ওঠে না!

মোটা দাগে মনে হতে পারে, এটা অতিসরলীকরণ। কিন্তু ফেদেরারের পূর্বাপর যারা জানেন, তাদের কাছে এটাই সত্যি! গত শনিবার ফেদেরারের বিদায়ী বক্তব্যে অবশ্য তার জীবনের ‘কোহিনুর’ হিসেবে আসেননি মিরকা, যা এসেছে সেটা ধন্যবাদসূচক বাণী মাত্র। কিন্তু দিন কয়েক আগেই মিরকা তার জীবনের কতখানি সেটি এক সাক্ষাৎকারে খোলাখুলি জানিয়েছেন ফেদেরার। টেনিস ওয়ার্ল্ড সাময়িকীকে দেয়া সে সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘ওর গুরুত্ব বলে বোঝানো যাবে না। এটা শুধু টেনিসেই নয়, সব ক্ষেত্রেই। আমার দিকটা বোঝা, কী করলে আমার ভালো হয়, সেসব চিন্তা করাই যেন ওর জীবনের একমাত্র ভাবনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

মিথ্যা বলেননি ফেদেরার।

সিডনি অলিম্পিক গেমস টেনিসে অংশ নিতে গিয়ে প্রথম দেখা। গেমস ভিলেজে থাকার সময়ে পরস্পরকে জানা, অভিসারের শুরু। হ্যাঁ, ওই অলিম্পিক গেমস ভিলেজেই ১৮ বছর বয়সী ফেদেরার প্রথম চুমু খেয়েছিলেন ২১ বছর বয়সী মিরকাকে! এমন ‘সাহসী’ হয়ে ওঠার প্রেরণা পেয়েছিলেন সুইস অলিম্পিক দলের সদস্যদের কাছ থেকেই।

সে ঘটনা নিয়ে পরে সিএনএনে এক সাক্ষাৎকারে ফেদেরারের স্মৃতিচারণা, ‘গেমস ভিলেজের ডরমেটরিতে আমরা সপ্তাহ দুয়েক ছিলাম। রেসলার থেকে শুরু করে অন্য সব দুর্দান্ত অ্যাথলেটদের সঙ্গেই ছিলাম। আমার ধারণা, ওই দুই সপ্তাহে আমাদের সম্পর্কটা অনেক জমে উঠেছিল। এক দিন এক রেসলার বলল, “আরে এখন কাছে গিয়ে ওকে চুমু দাও। তখন আমার মনে হচ্ছিল, ‘না…মানে…কী করব বুঝতে পারছি না…।’ যা-ই হোক, আমি শেষ পর্যন্ত চুমু খেলাম। ও আমাকে বলছিল, ও আমাকে যখন চুমু খেয়েছিল তখন আমি খুবই তরুণ ছিলাম। আমি ওকে বোঝানোর চেষ্টা করছিলাম যে, আমার বয়স সাড়ে আঠারো।”

এরপর? অলিম্পিক থেকে দেশে ফেরা, পরস্পরকে আরও ভালোভাবে জানা, সম্পর্কটা আরও গাঢ় হওয়া। বছরখানেক যেতেই কোর্টে জুটি বেঁধে খেলতেও শুরু করেছিলেন তারা। ২০০২ সালে মিশ্র দ্বৈতের টুর্নামেন্ট হপম্যান কাপেও সুইজারল্যান্ডের হয়ে একসঙ্গে খেলেছেন। ওই বছরই পায়ের চোটে পড়েন মিরকা। চিকিৎসকরা জানিয়ে দেন, এই চোট সহজে ভালো হওয়ার নয়। অগত্যা টেনিসকেই বিদায় বলে দিলেন মিরকা।

এরপর মিরকার ধ্যান-জ্ঞান হয়ে উঠলেন ফেদেরার। সেটা আক্ষরিক অর্থেই। প্রেমিকপ্রবরের সার্বক্ষণিক দেখভালের জন্য হয়ে গেলেন ফেদেরার জনসংযোগ কর্মকর্তা। আর সেই সুবাদে ফেদেরারের বিশ্বভ্রমণের সার্বক্ষণিক সঙ্গী।

তবে নিজেকে জাহির করার ইচ্ছা কখনোই ছিল না মিরকার। ফেদেরারের ছায়াসঙ্গী হিসেবে থেকেছেন বটে কিন্তু কখনোই ঈগলের চোখ নিয়ে লেগে থাকা পাপারাজ্জিদের খোরাক হননি। মারিয়া শারাপোভার সঙ্গে গ্রিগর দিমিত্রভের দুই দিনের সম্পর্ক কিংবা লেইটন হিউইটের সঙ্গে বেক ক্যাটরাইটের লম্বা সময়ের প্রেম যেভাবে সংবাদমাধ্যমের খোরাক হয়েছে, তেমনটা কখনোই দেখা যায়নি ফেদেরার-মিরকার ক্ষেত্রে। তবে লোকের চোখের আড়ালে মনের দেয়া-নেয়া থেমে থাকেনি।

২০০৯ সালে সাত পাকে বাঁধা পড়েন তারা। ততদিনে রজারের নামের পাশে ১৪টি গ্র্যান্ড স্লাম। চারদিকে নাম-যশ। প্রাইজমানি আর এনডোর্সমেন্ট মিলে ফুলে-ফাঁপা বিত্তবৈভব। কিন্তু সেটা বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলেনি ফেদেরারের জীবনে। প্রভাব ফেলতে দেননি মিরকা।

মধ্যবিত্তের আটপৌরে জীবনের সঙ্গে হয়তো পরিচিত নন মিরকা, কিন্তু ফেদেরারের জীবনটাকে তিনি যে ছকে সাজিয়েছেন, সে ছকের সঙ্গে যেন আটপৌরে জীবনের অনেক মিল! ‘বাইরে খেয়ে পয়সা ধ্বংস করা যাবে না’, ‘মাছ হলে আর মাংসের বিলাসিতা নয়’- এমন অনুশাসনের সঙ্গে ফেদেরারকে নিয়ে মিরকার অনুশাসনের কত মিল! ‘বেশি রাত করা যাবে না আগে আগে ঘুমোতে যাবে’, ‘কাল তুমি জিমে আধা ঘণ্টা কম কাটিয়েছ, এটা ঠিক হয়নি’… আপনজনের অধিকার তো এমনই হয়।

পেশাদার সার্কিটে খেললেও নিজে নাম-যশ কামাতে পারেননি মিরকা। সর্বোচ্চ ক্যারিয়ার র‌্যাঙ্কিং ছিল ২১৪। চোটের কারণে আগেভাগে টেনিসকে বিদায় বলে দেয়ায় তার যে অতৃপ্তি ছিল, ফেদেরারের মধ্যেই সে অতৃপ্তির পূর্ণতা খুঁজেছেন। নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর ভালোবাসার মানুষের পূর্ণতার খোঁজ যখন মিলে যায়, এর চেয়ে বড় প্রেরণা হয়তো ফেদেরারের আর হতে পারত না।

সেই মিরকা ফেদেরারের ক্যারিয়ারের ‘কোহিনুর’ নয় তো কে? অবশ্য শুধু ক্যারিয়ারের কথাই বলা হচ্ছে কেন!

Tag :
জনপ্রিয়

নিরব-আরিয়ানা জামানের ‘স্পর্শ’

বন্ধুর পথে বন্ধু হয়ে…

প্রকাশের সময় : ০৮:১৪:৪২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২

রজার ফেদেরারের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের সেরা অর্জন কী? মিরকা ভাব্রিনেচ!

উত্তরটা শুনে অনেকেই হয়তো ভ্রু কুচকাবেন- এটা কোনো উত্তর হলো! কোর্টের সাফল্য হিসেবে তো আর সহধর্মিণীকে পাননি ফেদেরার। তবে এটাও তো অস্বীকারের কোনো জো নেই, টেনিসে না এলে হয়তো জীবনসঙ্গী হিসেবে মিরকা ভাব্রিনেচকে পাওয়াই হতো না ফেদেরারের। আর মিরকা পাশে না থাকলে যে ফেদেরারেরও ‘ফেদেরার’ হওয়া হয়ে ওঠে না!

মোটা দাগে মনে হতে পারে, এটা অতিসরলীকরণ। কিন্তু ফেদেরারের পূর্বাপর যারা জানেন, তাদের কাছে এটাই সত্যি! গত শনিবার ফেদেরারের বিদায়ী বক্তব্যে অবশ্য তার জীবনের ‘কোহিনুর’ হিসেবে আসেননি মিরকা, যা এসেছে সেটা ধন্যবাদসূচক বাণী মাত্র। কিন্তু দিন কয়েক আগেই মিরকা তার জীবনের কতখানি সেটি এক সাক্ষাৎকারে খোলাখুলি জানিয়েছেন ফেদেরার। টেনিস ওয়ার্ল্ড সাময়িকীকে দেয়া সে সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘ওর গুরুত্ব বলে বোঝানো যাবে না। এটা শুধু টেনিসেই নয়, সব ক্ষেত্রেই। আমার দিকটা বোঝা, কী করলে আমার ভালো হয়, সেসব চিন্তা করাই যেন ওর জীবনের একমাত্র ভাবনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

মিথ্যা বলেননি ফেদেরার।

সিডনি অলিম্পিক গেমস টেনিসে অংশ নিতে গিয়ে প্রথম দেখা। গেমস ভিলেজে থাকার সময়ে পরস্পরকে জানা, অভিসারের শুরু। হ্যাঁ, ওই অলিম্পিক গেমস ভিলেজেই ১৮ বছর বয়সী ফেদেরার প্রথম চুমু খেয়েছিলেন ২১ বছর বয়সী মিরকাকে! এমন ‘সাহসী’ হয়ে ওঠার প্রেরণা পেয়েছিলেন সুইস অলিম্পিক দলের সদস্যদের কাছ থেকেই।

সে ঘটনা নিয়ে পরে সিএনএনে এক সাক্ষাৎকারে ফেদেরারের স্মৃতিচারণা, ‘গেমস ভিলেজের ডরমেটরিতে আমরা সপ্তাহ দুয়েক ছিলাম। রেসলার থেকে শুরু করে অন্য সব দুর্দান্ত অ্যাথলেটদের সঙ্গেই ছিলাম। আমার ধারণা, ওই দুই সপ্তাহে আমাদের সম্পর্কটা অনেক জমে উঠেছিল। এক দিন এক রেসলার বলল, “আরে এখন কাছে গিয়ে ওকে চুমু দাও। তখন আমার মনে হচ্ছিল, ‘না…মানে…কী করব বুঝতে পারছি না…।’ যা-ই হোক, আমি শেষ পর্যন্ত চুমু খেলাম। ও আমাকে বলছিল, ও আমাকে যখন চুমু খেয়েছিল তখন আমি খুবই তরুণ ছিলাম। আমি ওকে বোঝানোর চেষ্টা করছিলাম যে, আমার বয়স সাড়ে আঠারো।”

এরপর? অলিম্পিক থেকে দেশে ফেরা, পরস্পরকে আরও ভালোভাবে জানা, সম্পর্কটা আরও গাঢ় হওয়া। বছরখানেক যেতেই কোর্টে জুটি বেঁধে খেলতেও শুরু করেছিলেন তারা। ২০০২ সালে মিশ্র দ্বৈতের টুর্নামেন্ট হপম্যান কাপেও সুইজারল্যান্ডের হয়ে একসঙ্গে খেলেছেন। ওই বছরই পায়ের চোটে পড়েন মিরকা। চিকিৎসকরা জানিয়ে দেন, এই চোট সহজে ভালো হওয়ার নয়। অগত্যা টেনিসকেই বিদায় বলে দিলেন মিরকা।

এরপর মিরকার ধ্যান-জ্ঞান হয়ে উঠলেন ফেদেরার। সেটা আক্ষরিক অর্থেই। প্রেমিকপ্রবরের সার্বক্ষণিক দেখভালের জন্য হয়ে গেলেন ফেদেরার জনসংযোগ কর্মকর্তা। আর সেই সুবাদে ফেদেরারের বিশ্বভ্রমণের সার্বক্ষণিক সঙ্গী।

তবে নিজেকে জাহির করার ইচ্ছা কখনোই ছিল না মিরকার। ফেদেরারের ছায়াসঙ্গী হিসেবে থেকেছেন বটে কিন্তু কখনোই ঈগলের চোখ নিয়ে লেগে থাকা পাপারাজ্জিদের খোরাক হননি। মারিয়া শারাপোভার সঙ্গে গ্রিগর দিমিত্রভের দুই দিনের সম্পর্ক কিংবা লেইটন হিউইটের সঙ্গে বেক ক্যাটরাইটের লম্বা সময়ের প্রেম যেভাবে সংবাদমাধ্যমের খোরাক হয়েছে, তেমনটা কখনোই দেখা যায়নি ফেদেরার-মিরকার ক্ষেত্রে। তবে লোকের চোখের আড়ালে মনের দেয়া-নেয়া থেমে থাকেনি।

২০০৯ সালে সাত পাকে বাঁধা পড়েন তারা। ততদিনে রজারের নামের পাশে ১৪টি গ্র্যান্ড স্লাম। চারদিকে নাম-যশ। প্রাইজমানি আর এনডোর্সমেন্ট মিলে ফুলে-ফাঁপা বিত্তবৈভব। কিন্তু সেটা বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলেনি ফেদেরারের জীবনে। প্রভাব ফেলতে দেননি মিরকা।

মধ্যবিত্তের আটপৌরে জীবনের সঙ্গে হয়তো পরিচিত নন মিরকা, কিন্তু ফেদেরারের জীবনটাকে তিনি যে ছকে সাজিয়েছেন, সে ছকের সঙ্গে যেন আটপৌরে জীবনের অনেক মিল! ‘বাইরে খেয়ে পয়সা ধ্বংস করা যাবে না’, ‘মাছ হলে আর মাংসের বিলাসিতা নয়’- এমন অনুশাসনের সঙ্গে ফেদেরারকে নিয়ে মিরকার অনুশাসনের কত মিল! ‘বেশি রাত করা যাবে না আগে আগে ঘুমোতে যাবে’, ‘কাল তুমি জিমে আধা ঘণ্টা কম কাটিয়েছ, এটা ঠিক হয়নি’… আপনজনের অধিকার তো এমনই হয়।

পেশাদার সার্কিটে খেললেও নিজে নাম-যশ কামাতে পারেননি মিরকা। সর্বোচ্চ ক্যারিয়ার র‌্যাঙ্কিং ছিল ২১৪। চোটের কারণে আগেভাগে টেনিসকে বিদায় বলে দেয়ায় তার যে অতৃপ্তি ছিল, ফেদেরারের মধ্যেই সে অতৃপ্তির পূর্ণতা খুঁজেছেন। নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর ভালোবাসার মানুষের পূর্ণতার খোঁজ যখন মিলে যায়, এর চেয়ে বড় প্রেরণা হয়তো ফেদেরারের আর হতে পারত না।

সেই মিরকা ফেদেরারের ক্যারিয়ারের ‘কোহিনুর’ নয় তো কে? অবশ্য শুধু ক্যারিয়ারের কথাই বলা হচ্ছে কেন!