ঢাকা ০৮:৪০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২২, ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

যে কারণে ইউএনওরা অসংযত

বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২২(২)-এ উল্লেখ আছে, ‘সকল সময়ে জনগণের সেবা করিবার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য।’ আর সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালার ২৭ নম্বর বিধিতে বলা হয়েছে ‘সরকারি কর্মচারী সংকীর্ণতা, প্রিয়তোষণ, বেআইনিভাবে ক্ষতিগ্রস্তকরণ এবং ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করিতে পারিবেন না।’ কিন্তু সম্প্রতি প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা ইউএনওদের অসৌজন্যমূলক আচরণ কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় অপরাধ প্রবণতা বন্ধ করা যাচ্ছে না বলে মনে করেন আইনবিদ ও প্রশাসনের সাবেক কর্মকর্তারা।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালায় বিভিন্ন অপরাধের শাস্তি নির্ধারিত আছে। নাগরিকদের সঙ্গে যেকোনো অসদাচারণ শাস্তিযোগ্য অপরাধ হবে এমন বিধান আছে সরকারি কর্মচারী(শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালায়। সেখানে অসদাচরণ বলতে বোঝানো হয়েছে-অসঙ্গত আচরণ বা চাকরি শৃঙ্খলার জন্য হানিকর আচরণ অথবা সরকারি কর্মচারীদের আচরণসংক্রান্ত বিদ্যমান বিধিমালার কোনো বিধানের পরিপন্থি কোনো কার্য অথবা কোনো সরকারি কর্মচারীর পক্ষে শিষ্টাচার বহির্ভূত কোনো আচরণকে।

এ ছাড়া বলা হয়েছে সরকারি কর্মচারীরা উপদলীয় ধর্মীয় মতবাদের পক্ষপাতিত্ব এবং স্বজনপ্রীতিকে প্রশ্রয় দিতে পারবেন না, যা প্রশাসনকে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ফেলতে পারে বা সাধারণ জনগণের মধ্যে অসন্তোষ বা অপ্রীতিকর মনোভাবের সৃষ্টি করতে পারে। এই আচরণবিধি এবং সরকারি কর্মচারী বিধির প্রশিক্ষণ নিয়েই কর্মকর্তারা চাকরিতে যোগ দিয়ে থাকেন। কর্মকর্তারা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে ইউএনওসহ প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের কিছু কর্মকর্তার চাকরির আচরণবিধি লঙ্ঘন ও অকর্মকর্তাসুলভ আচরণে সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

সূত্র জানায়, গত তিন বছরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ১০৫টি অভিযোগ আমলে নিয়ে তদন্ত করেছে। এর মধ্যে ৯ জনকে বরখাস্ত ও বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো ও তিনজনকে নিম্ন্ন পদে নামানো এবং ৪৭ জনকে তিরস্কারসহ লঘুদণ্ড দেওয়া হয়। আর অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় অব্যাহতি দেওয়া হয় ৪৬ জনকে। তিন বছরে প্রশাসন ক্যাডারের ৫৯ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অসদাচরণ প্রমাণিত হলেও ৪৭ জনকে শুধু লঘুদণ্ড দিয়েই দায় সেরেছে মন্ত্রণালয়। আর বরখাস্ত ও বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে মাত্র ৯ জনকে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী যথাক্রমে অসদাচরণ এবং দুর্নীতির অভিযোগে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। ব্যক্তিগত শুনানি ও লিখিত বক্তব্য সন্তোষজনক বিবেচিত না হলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার সিদ্ধান্ত নিয়ে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণ হলে চাকরি থেকে বরখাস্ত করারও বিধান রয়েছে। কিন্তু বতর্মানে দেখা যাচ্ছে, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রমাণ হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই লঘুদণ্ড দেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে নেওয়া অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হচ্ছে গুচ্ছগ্রাম। এখানে গৃহহীন মানুষের ঘরসহ বিভিন্ন ধরনের কর্ম সৃষ্টির মাধ্যমে গরিবদের সহায়তা করে সরকার। সিনিয়র সহকারী সচিব শফিকুর রহমান ২০১৮ সালের এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত গাইবান্ধা সদর উপজেলায় ইউএনও’র দায়িত্ব পালন করার সময় গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পের ৪৩ লাখ টাকার বেশি আত্মসাৎ করার অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হয়। মাটির কাজ না হওয়া সত্ত্বেও ঘরের জন্য বরাদ্দ করা টাকা উত্তোলন করেন তিনি। সম্প্রতি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, তার বিরুদ্ধে অদক্ষতা, অসদাচরণ ও দুর্নীতিপরায়ণতার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ হয়েছে।

কিন্তু দুর্নীতি প্রমাণ হওয়ার পরও এই কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত না করে লঘুদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া মধ্যরাতে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় কুড়িগ্রামের আলোচিত সাবেক জেলা প্রশাসক (ডিসি) সুলতানা পারভীনকে দুই বছরের বেতন বৃদ্ধি স্থগিত করে ‘লঘুদণ্ড’ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সেই দণ্ড বাতিল করে তাকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। একইভাবে মধ্যরাতে কুড়িগ্রামে মোবাইল কোর্ট বসিয়ে সাংবাদিক নির্যাতন করে পদাবনতির সাজা পাওয়া আলোচিত সিনিয়র সহকারী সচিব নাজিম উদ্দিনের সাজাও পরবর্তী সময়ে মওকুফ করা হয়।

দুর্নীতি ও অসদাচরণ প্রমাণ হওয়ার পরও চাকরিচ্যুত না করে লঘুদণ্ড দেওয়ার ঘটনায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা আরও বাড়াচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। প্রচলিত আইনে সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে প্রশাসনিক ও ফৌজদারি মামলা করার মতো কঠোর বিধান রয়েছে। অপরাধীর যথাযথ শাস্তি না হওয়ায় ইউএনওসহ মাঠ প্রশাসনে কর্মরত কর্মকর্তাদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা বেড়েই চলেছে। যার দৃষ্টান্ত সম্প্রতি বান্দরবানের আলীকদমের ইউএনও মেহরুবা ইসলাম ও বগুড়া সদরের ইউএনও সমর পালের অসদাচরণের ঘটনা। এ ছাড়া ইউএনওদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিজ ক্যাডারের সিনিয়র কর্মকর্তারা তদন্ত করায় নানা কৌশলে অভিযুক্ত জুনিয়র কর্মকর্তাদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়। কিছু ঘটনা গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রকাশিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে লোক দেখানো ওএসডি করা হলেও পরবর্তী সময়ে বিভাগীয় মামলায় গুরুদণ্ডের মতো অভিযোগ প্রমাণ হলেও দেওয়া হচ্ছে লঘুদণ্ড।

সাবেক সিনিয়র সচিব আবু আলম মো. শহীদ খান বলেন, দেশের সব নাগরিককে সংবিধান মানতে হবে। সংবিধান লঙ্ঘন করলে কী হবে সেই শাস্তির বিধান সংবিধানে নেই, তবে সংবিধানের আলোকে অন্যান্য আইনে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য চাকরির আচরণবিধি রয়েছে। কেউ সেই আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে তার বিভাগীয় মামলাসহ কী কী শাস্তি হবে তা বলা আছে। আবার যদি কেউ ফৌজদারি অপরাধ করে তাহলে ফৌজদারি আইনে তার বিচার হবে। এটা সব নাগরিকের জন্য যে নিয়ম সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম।

তিনি বলেন, একজন সরকারি কর্মচারীর মানসিকতা হওয়া উচিত দেশের সংবিধান, আইন ও বিধি মেনে জনগণের সেবা করা। কিন্তু এই মানসিকতা কারও কারও মধ্যে নেই। মানসিকতা কতটুকু পজিটিভ সেটা দেখতে হবে। কেউ আইন ভঙ্গ করলে তার বিচার হতে হবে। কিন্তু বিচার না হলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি অনেককে আইন লঙ্ঘঘনে উৎসাহিত করে।

হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের(এইচআরপিবি) সভাপতি অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদে পরিষ্কার বলা আছে সব সময়ে জনগণের সেবা করিবার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য। কিন্তু মাঠ ইউএনওসহ মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রায়ই সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসাদচরণের ঘটনা ঘটছে। বিভিন্ন সময় প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা অসাদচরণ করলেও তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় এটা বন্ধ করা যাচ্ছে না।’

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব(প্রশাসন অনুবিভাগ) মো. আবুল হাছানাত হুমায়ুন কবীর বলেন, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি তিনজন ইউএনও’র বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠার সঙ্গে সঙ্গে তদন্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পেলেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’

তিনি বলেন, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হলে তা নিষ্পত্তি করতে শৃঙ্খলা ও তদন্ত অনুবিভাগ টিম গঠন করে কাজ করছে। অভিযোগ প্রমাণ হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে লঘুদণ্ড দেওয়া হয় এমন অভিযোগ ঠিক নয় বলে দাবি করে তিনি বলেন, প্রত্যেক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সঙ্গে সঙ্গেই তদন্ত কমিটি গঠন করে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি এমন কোনো নজির কিন্তু নেই। সূত্র সময়ের ‍আলো

Tag :
জনপ্রিয়

গোমস্তাপুরে বাল্য বিয়ে বন্ধ করলো উপজেলা প্রশাসন

যে কারণে ইউএনওরা অসংযত

প্রকাশের সময় : ০৮:০৪:১৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২

বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২২(২)-এ উল্লেখ আছে, ‘সকল সময়ে জনগণের সেবা করিবার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য।’ আর সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালার ২৭ নম্বর বিধিতে বলা হয়েছে ‘সরকারি কর্মচারী সংকীর্ণতা, প্রিয়তোষণ, বেআইনিভাবে ক্ষতিগ্রস্তকরণ এবং ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করিতে পারিবেন না।’ কিন্তু সম্প্রতি প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা ইউএনওদের অসৌজন্যমূলক আচরণ কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় অপরাধ প্রবণতা বন্ধ করা যাচ্ছে না বলে মনে করেন আইনবিদ ও প্রশাসনের সাবেক কর্মকর্তারা।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালায় বিভিন্ন অপরাধের শাস্তি নির্ধারিত আছে। নাগরিকদের সঙ্গে যেকোনো অসদাচারণ শাস্তিযোগ্য অপরাধ হবে এমন বিধান আছে সরকারি কর্মচারী(শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালায়। সেখানে অসদাচরণ বলতে বোঝানো হয়েছে-অসঙ্গত আচরণ বা চাকরি শৃঙ্খলার জন্য হানিকর আচরণ অথবা সরকারি কর্মচারীদের আচরণসংক্রান্ত বিদ্যমান বিধিমালার কোনো বিধানের পরিপন্থি কোনো কার্য অথবা কোনো সরকারি কর্মচারীর পক্ষে শিষ্টাচার বহির্ভূত কোনো আচরণকে।

এ ছাড়া বলা হয়েছে সরকারি কর্মচারীরা উপদলীয় ধর্মীয় মতবাদের পক্ষপাতিত্ব এবং স্বজনপ্রীতিকে প্রশ্রয় দিতে পারবেন না, যা প্রশাসনকে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ফেলতে পারে বা সাধারণ জনগণের মধ্যে অসন্তোষ বা অপ্রীতিকর মনোভাবের সৃষ্টি করতে পারে। এই আচরণবিধি এবং সরকারি কর্মচারী বিধির প্রশিক্ষণ নিয়েই কর্মকর্তারা চাকরিতে যোগ দিয়ে থাকেন। কর্মকর্তারা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে ইউএনওসহ প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের কিছু কর্মকর্তার চাকরির আচরণবিধি লঙ্ঘন ও অকর্মকর্তাসুলভ আচরণে সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

সূত্র জানায়, গত তিন বছরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ১০৫টি অভিযোগ আমলে নিয়ে তদন্ত করেছে। এর মধ্যে ৯ জনকে বরখাস্ত ও বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো ও তিনজনকে নিম্ন্ন পদে নামানো এবং ৪৭ জনকে তিরস্কারসহ লঘুদণ্ড দেওয়া হয়। আর অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় অব্যাহতি দেওয়া হয় ৪৬ জনকে। তিন বছরে প্রশাসন ক্যাডারের ৫৯ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অসদাচরণ প্রমাণিত হলেও ৪৭ জনকে শুধু লঘুদণ্ড দিয়েই দায় সেরেছে মন্ত্রণালয়। আর বরখাস্ত ও বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে মাত্র ৯ জনকে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী যথাক্রমে অসদাচরণ এবং দুর্নীতির অভিযোগে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। ব্যক্তিগত শুনানি ও লিখিত বক্তব্য সন্তোষজনক বিবেচিত না হলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার সিদ্ধান্ত নিয়ে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণ হলে চাকরি থেকে বরখাস্ত করারও বিধান রয়েছে। কিন্তু বতর্মানে দেখা যাচ্ছে, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রমাণ হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই লঘুদণ্ড দেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে নেওয়া অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হচ্ছে গুচ্ছগ্রাম। এখানে গৃহহীন মানুষের ঘরসহ বিভিন্ন ধরনের কর্ম সৃষ্টির মাধ্যমে গরিবদের সহায়তা করে সরকার। সিনিয়র সহকারী সচিব শফিকুর রহমান ২০১৮ সালের এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত গাইবান্ধা সদর উপজেলায় ইউএনও’র দায়িত্ব পালন করার সময় গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পের ৪৩ লাখ টাকার বেশি আত্মসাৎ করার অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হয়। মাটির কাজ না হওয়া সত্ত্বেও ঘরের জন্য বরাদ্দ করা টাকা উত্তোলন করেন তিনি। সম্প্রতি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, তার বিরুদ্ধে অদক্ষতা, অসদাচরণ ও দুর্নীতিপরায়ণতার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ হয়েছে।

কিন্তু দুর্নীতি প্রমাণ হওয়ার পরও এই কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত না করে লঘুদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া মধ্যরাতে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় কুড়িগ্রামের আলোচিত সাবেক জেলা প্রশাসক (ডিসি) সুলতানা পারভীনকে দুই বছরের বেতন বৃদ্ধি স্থগিত করে ‘লঘুদণ্ড’ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সেই দণ্ড বাতিল করে তাকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। একইভাবে মধ্যরাতে কুড়িগ্রামে মোবাইল কোর্ট বসিয়ে সাংবাদিক নির্যাতন করে পদাবনতির সাজা পাওয়া আলোচিত সিনিয়র সহকারী সচিব নাজিম উদ্দিনের সাজাও পরবর্তী সময়ে মওকুফ করা হয়।

দুর্নীতি ও অসদাচরণ প্রমাণ হওয়ার পরও চাকরিচ্যুত না করে লঘুদণ্ড দেওয়ার ঘটনায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা আরও বাড়াচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। প্রচলিত আইনে সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে প্রশাসনিক ও ফৌজদারি মামলা করার মতো কঠোর বিধান রয়েছে। অপরাধীর যথাযথ শাস্তি না হওয়ায় ইউএনওসহ মাঠ প্রশাসনে কর্মরত কর্মকর্তাদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা বেড়েই চলেছে। যার দৃষ্টান্ত সম্প্রতি বান্দরবানের আলীকদমের ইউএনও মেহরুবা ইসলাম ও বগুড়া সদরের ইউএনও সমর পালের অসদাচরণের ঘটনা। এ ছাড়া ইউএনওদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিজ ক্যাডারের সিনিয়র কর্মকর্তারা তদন্ত করায় নানা কৌশলে অভিযুক্ত জুনিয়র কর্মকর্তাদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়। কিছু ঘটনা গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রকাশিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে লোক দেখানো ওএসডি করা হলেও পরবর্তী সময়ে বিভাগীয় মামলায় গুরুদণ্ডের মতো অভিযোগ প্রমাণ হলেও দেওয়া হচ্ছে লঘুদণ্ড।

সাবেক সিনিয়র সচিব আবু আলম মো. শহীদ খান বলেন, দেশের সব নাগরিককে সংবিধান মানতে হবে। সংবিধান লঙ্ঘন করলে কী হবে সেই শাস্তির বিধান সংবিধানে নেই, তবে সংবিধানের আলোকে অন্যান্য আইনে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য চাকরির আচরণবিধি রয়েছে। কেউ সেই আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে তার বিভাগীয় মামলাসহ কী কী শাস্তি হবে তা বলা আছে। আবার যদি কেউ ফৌজদারি অপরাধ করে তাহলে ফৌজদারি আইনে তার বিচার হবে। এটা সব নাগরিকের জন্য যে নিয়ম সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম।

তিনি বলেন, একজন সরকারি কর্মচারীর মানসিকতা হওয়া উচিত দেশের সংবিধান, আইন ও বিধি মেনে জনগণের সেবা করা। কিন্তু এই মানসিকতা কারও কারও মধ্যে নেই। মানসিকতা কতটুকু পজিটিভ সেটা দেখতে হবে। কেউ আইন ভঙ্গ করলে তার বিচার হতে হবে। কিন্তু বিচার না হলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি অনেককে আইন লঙ্ঘঘনে উৎসাহিত করে।

হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের(এইচআরপিবি) সভাপতি অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদে পরিষ্কার বলা আছে সব সময়ে জনগণের সেবা করিবার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য। কিন্তু মাঠ ইউএনওসহ মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রায়ই সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসাদচরণের ঘটনা ঘটছে। বিভিন্ন সময় প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা অসাদচরণ করলেও তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় এটা বন্ধ করা যাচ্ছে না।’

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব(প্রশাসন অনুবিভাগ) মো. আবুল হাছানাত হুমায়ুন কবীর বলেন, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি তিনজন ইউএনও’র বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠার সঙ্গে সঙ্গে তদন্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পেলেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’

তিনি বলেন, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হলে তা নিষ্পত্তি করতে শৃঙ্খলা ও তদন্ত অনুবিভাগ টিম গঠন করে কাজ করছে। অভিযোগ প্রমাণ হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে লঘুদণ্ড দেওয়া হয় এমন অভিযোগ ঠিক নয় বলে দাবি করে তিনি বলেন, প্রত্যেক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সঙ্গে সঙ্গেই তদন্ত কমিটি গঠন করে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি এমন কোনো নজির কিন্তু নেই। সূত্র সময়ের ‍আলো