ঢাকা ০৮:২৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ নভেম্বর ২০২২, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

পাম্পে ডিভাইস বসিয়ে তেল চুরি

অনেক ফিলিং স্টেশনেই ডিজিটাল ডিভাইস বসিয়ে তেল চুরি করা হয়। আর এ চৌর্যবৃত্তি ক্রেতাদের পক্ষে ধরা সম্ভব নয়। ক্রেতা তার অজান্তেই প্রতারিত হন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, আগে এনালগ মিটারে তেল বিক্রি করা হতো। এখন সব পাম্পে তেল বিক্রির জন্য বিএসটিআই অনুমোদিত ডিজিটাল মিটার ব্যবহার করা হয়। বিএসটিআই, ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদফতর ও র‌্যাব প্রায়ই অভিযান চালিয়ে তেল কম দেওয়ার অভিযোগে জরিমানা ও পেট্রোল পাম্পের সংশ্লিষ্ট ইউনিট সিলগালা করে দেয়। সাধারণত তেল মাপে কম দিলে তা অভিযানকারীরা ধরতে পারেন। কিন্তু এখন তেল মাপে কম দেওয়ার জন্য অভিনব পন্থা বের করেছে সংশ্লিষ্টরা। সেটা হচ্ছে ডিজিটাল ডিভাইস। ডিভাইসটি পাম্পের ভেতরে লাগানো হয়। এটা লাগিয়ে দিলে নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল স্বয়ংক্রিয়ভাবে কম বের হবে। কেউ বুঝতে পারবে না।

দেশে ফিলিং স্টেশন রয়েছে মোট দুই হাজার ২৭১টি। এর মধ্যে মাপে কম দেওয়ার অভিযোগে গত এক (জুন-২১ থেকে জুলাই-২২) বছরে ৪৯৯টি ফিলিং স্টেশন সিলগালা, ১৩শ মামলা ও দুই কোটি ৪৮ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করেছে বিএসটিআই। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, দেশের অধিকাংশ পাম্প তেল চুরিতে জড়িত এবং তেল চুরি থেমে নেই। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ডিজিটাল ডিভাইস বসিয়ে তেল চুরি। যার সঙ্গে পরিচিত নন বিএসটিআইর কর্মকর্তারা। আর ক্রেতারা জানেন না সঠিক মাপে তেল দেওয়া হচ্ছে কি না। কারণ কোনো ফিলিং স্টেশনেই আলাদাভাবে তেল পরিমাপের সুযোগ নেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পাম্প কর্মচারী জানান, ডিজিটাল মিটারে তেল চুরি করা আরও সহজ। একটি ডিভাইস লাগিয়ে দিলেই হয়। কেউ ধরতে পারবে না। আমাদের এখানে ৬ থেকে ৭ বছর আগে লাগানো হয়েছে। এখন ডিভাইসটির দাম পড়তে পারে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। এর জন্য আলাদা টেকনিশিয়ান আছে। সে এসে নিজেই ডিভাইস লাগিয়ে দেয়। এই ডিভাইসের সঙ্গে আবার সুইচ রয়েছে। ইচ্ছামতো সুইচ অন-অফ করা যায়। সুইচটি অফিস রুমে থাকে। বিএসটিআই সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত অভিযান চালায়। এই সময়ের মধ্যে ডিভাইস অফ করে রাখা হয়। তারপর চালু করা হয়। সাধারণত প্রতি লিটারে ৩০ থেকে ৪০ এমএল কম দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, ‘ডিভাইসটি এমনভাবে বসানো হয়, যা দেখা যায় না। বিএসটিআইর লোকজন উপস্থিত হলে মুহূর্তের মধ্যে সবার অলক্ষ্যে ডিভাইসটি অফ করে দেওয়া সম্ভব। তাহলে আর কারচুপি ধরা পড়বে না। বিএসটিআই সাধারণত তেল পরিমাপ করে। তারা তাৎক্ষণিকভাবে মেশিন চেক করে না। ফলে বেশিরভাগ পাম্প তেল চুরি করলেও ধরা পড়ে না। অথচ অভিনব ডিজিটাল ডিভাইসটি সম্পর্কে কিছুই জানে না বিএসটিআই।’

এ ছাড়া মাপে কম দেওয়ার জন্য ডিজিটাল মিটারে আগে থেকেই সেটআপ করে তেল চুরি করা সম্ভব। বিএসটিআইয়ের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ আমিমুল এহসান বলেন, এখন অনেক পাম্পে অভিযান চালিয়ে দেখা যাচ্ছে গ্রাহককে মাপে তেল কম দেওয়া হচ্ছে। আমরা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি। ১০ লিটারে ৩০ মিলি লিটার কম-বেশি হতে পারে। এর কম হলে এক লাখ টাকা জরিমানা ও পাম্পের ডিসপেনসিং ইউনিট (যা দিয়ে তেল সরবরাহ করা হয়) সিল গালা করা হয়।

তিনি বলেন, ‘ডিজিটাল মেশিনে মাপে তেল কম দিলে তা রিডিংয়ে বোঝা যায়। কিন্তু ডিসপেনসিং ইউনিটে ডিভাইস বসিয়ে মাপে কম দেওয়া হচ্ছে, রিডিংও ঠিক আসছে, আমাদের অভিযানে এমনটা এখনও পাইনি।’

বিএসটিআইর উপ-পরিচালক মো. রিয়াজুল হক বলেন, ‘গত এক বছরে পাম্প সিলগালা, জরিমানা ও মামলার পরিসংখ্যানই বলে দেয় আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করি। আগের চেয়ে তেল মাপে কম দেওয়া কমেছে। আমাদের স্ট্যান্ডার্ড ওয়েট পরিমাপক যন্ত্র আছে। সেটা দিয়ে তেল মেপে দেখি কম দিয়েছে কি না। ডিসপেন্সিং ইউনিট (যা দিয়ে তেল সরবরাহ করা হয়) পরীক্ষা করে যদি দেখা যায় মাপে কম দেওয়া হচ্ছে, তাহলে জরিমানাসহ সিলগালা করা হয়। সেটা ঠিক করার পর পরীক্ষা করে তা খুলে দেওয়া হয়। ডিজিটাল মিটারে চাইলে কারচুপি করা যায়।’

বিএসটিআইর এই উপ-পরিচালক বলেন, নীতিমালা অনুযায়ী, বিকাল ৫টার পর বিএসটিআই অভিযান চালাতে পারে না। তবে মাঝেমধ্যে র‌্যাবকে সঙ্গে নিয়ে সন্ধ্যার পর অভিযান চালানো হয়। সিএনজি পাম্পে বিএসটিআই অভিযান চালায় না।’

সরেজমিনে রাজধানীর কয়েকটি ফিলিং স্টেশনে গিয়ে জানা গেছে, কোনো স্টেশনেই তেল মাপে কম দেওয়া হচ্ছে কি না তা ক্রেতার জানার কোনো সুযোগ নেই। শুধু বিএসটিআই বা অন্য কোনো সংস্থা অভিযান চালিয়ে তাদের কাছে থাকা ক্যান (জার) দিয়ে মাপের সত্যতা যাচাই করতে পারে।

রাজধানীর মৎস্য ভবন মোড়ের রমনা ফিলিং স্টেশন থেকে প্রায়ই তেল কেনেন হামিদ। কিন্তু কখনও তেল কম দেওয়া হয়েছে কি না তা জানেন না তিনি। তিনি বলেন, ‘শুনেছি পাম্পগুলো তেল মাপে কম দেয়। কিন্তু ক্রেতার পক্ষে তা বোঝার সুযোগ নেই। এ জন্যই নির্বিঘ্নে তারা চুরি করতে পারছে।’

রমনা পেট্রোল পাম্পের এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘গ্রাহকের তেল মেপে দেখার কোনো সুযোগ নেই। তেল নেওয়ার আগে মিটারে সবগুলো রিডিং শূন্য আছে কি না এবং তেল দেওয়ার পর নির্ধারিত রিডিং উঠেছে কি না এটা ক্রেতারা লক্ষ্য করলে ৯০ শতাংশ পাম্পে তেল চুরি কমে যাবে। যেসব পাম্পে তেল বেশি বিক্রি হয় সেসব পাম্পে তেল চুরি কম হয়। ঢাকার বাইরের পাম্পগুলোতে তেল মাপে কম দেওয়ার সংখ্যা বেশি।’

সম্প্রতি ওজনে কম দেওয়া এবং ভেজাল তেল বিক্রি বন্ধ না হওয়ায় সংশ্লিষ্টদের মনিটরিং বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে জ্বালানি মন্ত্রণালয়। বিএসটিআই ও ভোক্তা অধিকারের দাবি, ভেজাল তেল বিক্রি ও ওজনে কম দেওয়া ঠেকাতে তারা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছেন। তা নিয়ন্ত্রণে আছে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্যানুযায়ী, দেশে জ্বালানি তেল বিক্রি করার অনুমোদিত ফিলিং স্টেশনের সংখ্যা ২২৭১টি, এজেন্ট ডিস্ট্রিবিউটর ২৯১৯টি, প্যাকড পয়েন্ট ডিলারের সংখ্যা ৬৬৩টি। রাষ্ট্রায়ত্ত পদ্মা অয়েল কোম্পানি (পিওসিএল), যমুনা অয়েল কোম্পানি (জেওসিএল) এবং মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের (এমপিএল) মাধ্যমে এসব পাম্পে তেল সরবরাহ করা হয়। জেলা প্রশাসন, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি), বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউটের (বিএসটিআই) ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের প্রতিনিধিরা এসব জায়গায় ভেজাল তেল বিক্রি, ওজনে কম দেওয়া এবং অবৈধ তেল কেনাবেচা ঠেকাতে প্রায়ই অভিযান পরিচালনা করেন। তবে জ্বালানি তেলে ভেজাল প্রতিরোধে নিয়মিত মনিটরিং করার দায়িত্ব তেল বিপণন কোম্পানিগুলোর। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা মনিটরিং করেন না।

বিএসটিআই জানিয়েছে, ভেজাল তেল বিক্রি ও ওজনে কম দেওয়া মনিটরিং করতে সপ্তাহে পাঁচ দিন রাজধানীতে দুটি মোবাইল কোর্ট এবং সারা দেশে অবস্থিত ১২টি অফিসের মাধ্যমে সপ্তাহে পাঁচ দিন একটি করে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। এসব অভিযানে সাধারণত ওজনে কম দেওয়ার বিষয়টি প্রমাণ হলে তাৎক্ষণিকভাবে জরিমানা করা হয়। তবে তেলে ভেজাল দেওয়া হচ্ছে কি না সেটা নির্ণয় করতে ১০ থেকে ১৫ দিন সময় লাগে। শুধু বিএসটিআই তা করে থাকে।

বিএসটিআইর উপ-পরিচালক মো. রিয়াজুল হক বলেন, ‘আইন অনুযায়ী, ভেজাল তেল বিক্রি করলে বা মাপে কম দিলে মোবাইল কোর্ট সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা জরিমানা বা এক বছর কারাদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করতে পারে। এ ছাড়া ভেজাল পণ্য বিক্রি প্রমাণ হলে আমরা আদালতে মামলা করার পর আদালত সর্বোচ্চ চার বছর কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করতে পারে। আমরা নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করি।’

জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সর্বশেষ মে মাসের হিসাবে দেশব্যাপী ২৭টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। যার মধ্যে পদ্মা অয়েল কোম্পানি ১৪টি, মেঘনা পেট্রোলিয়াম কোম্পানি ৬টি ও যমুনা অয়েল কোম্পানি ৭টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেছে। যার মধ্যে ভেজাল তেল বিক্রি, ওজনে কম দেওয়ার প্রমাণ মিলেছে পদ্মা অয়েল কোম্পানির ১৪টি পেট্রোল পাম্পে, মেঘনা অয়েল কোম্পানির ৪টি এবং যমুনা অয়েল কোম্পানির চারটিতে। অর্থাৎ ২৭টি পেট্রোল পাম্পে অভিযান চালিয়ে ১৮টিতেই ভেজাল তেল বিক্রির অভিযোগ প্রমাণ হয়েছে। এই পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যায় অধিকাংশ পাম্প ওজনে কম দিচ্ছে এবং ভেজাল তেল বিক্রি করছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমনিতেই উচ্চমূল্যে জনসাধারণকে জ্বালানি তেল কিনতে হচ্ছে। তার ওপর মাপে কম দেওয়ায় আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে তাদের। পাশাপাশি বেশি লাভের জন্য ভেজাল মেশানোর ফলে যানবাহনের ইঞ্জিনের ক্ষতি হচ্ছে। বর্তমানে পাম্পগুলোতে ডিজিটাল মেশিনে তেল বিক্রি করার ফলে গ্রাহকের পক্ষে চুরি ধরা প্রায় অসম্ভব। এ জন্য সরকারের সংশ্লিষ্টদের নিয়মিত মনিটরিং করতে হবে। মাপে কম দেওয়া রোধে বিএসটিআইর অভিযান বাড়ানো প্রয়োজন। একই অপরাধ বারবার করলে পাম্প সিলগালা করে দেওয়ার মতো শক্ত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। তেল সরবরাহ বন্ধ ও লাইসেন্স বাতিল করা, অর্থদণ্ডের পাশাপাশি জেলে দেওয়া হলে এই ধরনের অপরাধ কমে আসত।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের মহাপরিচালক এএইচএম সফিকুজ্জামান বলেন, ‘গত ৩ আগস্ট আমরা সারা দেশের ৪১টি পেট্রোল পাম্পে অভিযান চালিয়ে ১৭ লাখ টাকা জরিমানা করেছি। ২ আগস্ট প্রায় আড়াই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। ভোক্তা অধিকারের একার পক্ষে এটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। আমাদের লোকবল কম, তারপরও সাধ্যের মধ্যে আমরা নিয়মিত মনিটরিং করি। তার সুফলও পাচ্ছি। তেলে ভেজাল দিচ্ছে কি না সেটা দেখার দায়িত্ব বিএসটিআইর। তবে লিখিত অভিযোগ পেলে আমরা ব্যবস্থা নিই।’

এ বিষয়ে পাম্প মালিক সমিতির সভাপতি মো. নাজমুল হক বলেন, ‘বহুদিন ধরেই এটা হচ্ছে। ভালো-মন্দ সব জায়গায়ই আছে। কিছু অসাধু লোকের জন্য আমরা যারা সততার সঙ্গে ব্যবসা করি তাদের বদনাম হয়। আমরাও চাই, ভেজাল তেল বিক্রি ও ওজনে কম দেওয়া বন্ধ হোক।’

তিনি বলেন, ‘এটা রোধ করার জন্য ২০১৩ সালে বিপিসি, বিএসটিআই, মন্ত্রণালয় ও পাম্প মালিক সমিতির সমন্বয়ে একটি মনিটরিং সেল গঠন করা হয়। বলা হয়েছিল, এই সেল সারা দেশে অভিযান চালাবে। আমরাও সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব। কিন্তু আজ পর্যন্ত সেই কমিটি কোনো অভিযান পরিচালনা করেনি।’

তিনি বলেন, ‘তেলে ভেজাল ও ওজন কম দেওয়া প্রতিরোধে পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন সরকারের কাছে তিনটি দাবি জানিয়েছিল। এর মধ্যে রয়েছে কেউ প্রথমবার কারসাজি করলে তাকে সতর্ক করা, দ্বিতীয়বার একই কাজ করলে তার তেলের সরবরাহ কিছুদিনের জন্য বন্ধ রাখা এবং তৃতীয়বার ধরা পড়লে তার লাইসেন্স বাতিল করে দিতে হবে। কিন্তু এগুলো বাস্তবায়ন করা হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘কেউ চাইলে পাম্পের ডিজিটাল মেশিনে আগে থেকেই তেল মাপে কম দেওয়ার সেটআপ করতে পারে। সে ধরাও পড়বে। তেল মাপে কম দেওয়া হচ্ছে কি না তা ক্রেতা যেন যাচাই করতে পারে সেই সুযোগ প্রতিটি পাম্পে রাখা উচিত।’ তবে ডিভাইস স্থাপন করে তেল মাপে কম দেওয়ার বিষয়ে অবগত নন বলেও জানান তিনি।

Tag :
জনপ্রিয়

সংবাদ প্রকাশের জেরে তিন সাংবাদিকসহ ৫জনের নামে চোরাকারবারির মামলা

পাম্পে ডিভাইস বসিয়ে তেল চুরি

প্রকাশের সময় : ০৯:৫৪:২১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২

অনেক ফিলিং স্টেশনেই ডিজিটাল ডিভাইস বসিয়ে তেল চুরি করা হয়। আর এ চৌর্যবৃত্তি ক্রেতাদের পক্ষে ধরা সম্ভব নয়। ক্রেতা তার অজান্তেই প্রতারিত হন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, আগে এনালগ মিটারে তেল বিক্রি করা হতো। এখন সব পাম্পে তেল বিক্রির জন্য বিএসটিআই অনুমোদিত ডিজিটাল মিটার ব্যবহার করা হয়। বিএসটিআই, ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদফতর ও র‌্যাব প্রায়ই অভিযান চালিয়ে তেল কম দেওয়ার অভিযোগে জরিমানা ও পেট্রোল পাম্পের সংশ্লিষ্ট ইউনিট সিলগালা করে দেয়। সাধারণত তেল মাপে কম দিলে তা অভিযানকারীরা ধরতে পারেন। কিন্তু এখন তেল মাপে কম দেওয়ার জন্য অভিনব পন্থা বের করেছে সংশ্লিষ্টরা। সেটা হচ্ছে ডিজিটাল ডিভাইস। ডিভাইসটি পাম্পের ভেতরে লাগানো হয়। এটা লাগিয়ে দিলে নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল স্বয়ংক্রিয়ভাবে কম বের হবে। কেউ বুঝতে পারবে না।

দেশে ফিলিং স্টেশন রয়েছে মোট দুই হাজার ২৭১টি। এর মধ্যে মাপে কম দেওয়ার অভিযোগে গত এক (জুন-২১ থেকে জুলাই-২২) বছরে ৪৯৯টি ফিলিং স্টেশন সিলগালা, ১৩শ মামলা ও দুই কোটি ৪৮ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করেছে বিএসটিআই। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, দেশের অধিকাংশ পাম্প তেল চুরিতে জড়িত এবং তেল চুরি থেমে নেই। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ডিজিটাল ডিভাইস বসিয়ে তেল চুরি। যার সঙ্গে পরিচিত নন বিএসটিআইর কর্মকর্তারা। আর ক্রেতারা জানেন না সঠিক মাপে তেল দেওয়া হচ্ছে কি না। কারণ কোনো ফিলিং স্টেশনেই আলাদাভাবে তেল পরিমাপের সুযোগ নেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পাম্প কর্মচারী জানান, ডিজিটাল মিটারে তেল চুরি করা আরও সহজ। একটি ডিভাইস লাগিয়ে দিলেই হয়। কেউ ধরতে পারবে না। আমাদের এখানে ৬ থেকে ৭ বছর আগে লাগানো হয়েছে। এখন ডিভাইসটির দাম পড়তে পারে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। এর জন্য আলাদা টেকনিশিয়ান আছে। সে এসে নিজেই ডিভাইস লাগিয়ে দেয়। এই ডিভাইসের সঙ্গে আবার সুইচ রয়েছে। ইচ্ছামতো সুইচ অন-অফ করা যায়। সুইচটি অফিস রুমে থাকে। বিএসটিআই সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত অভিযান চালায়। এই সময়ের মধ্যে ডিভাইস অফ করে রাখা হয়। তারপর চালু করা হয়। সাধারণত প্রতি লিটারে ৩০ থেকে ৪০ এমএল কম দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, ‘ডিভাইসটি এমনভাবে বসানো হয়, যা দেখা যায় না। বিএসটিআইর লোকজন উপস্থিত হলে মুহূর্তের মধ্যে সবার অলক্ষ্যে ডিভাইসটি অফ করে দেওয়া সম্ভব। তাহলে আর কারচুপি ধরা পড়বে না। বিএসটিআই সাধারণত তেল পরিমাপ করে। তারা তাৎক্ষণিকভাবে মেশিন চেক করে না। ফলে বেশিরভাগ পাম্প তেল চুরি করলেও ধরা পড়ে না। অথচ অভিনব ডিজিটাল ডিভাইসটি সম্পর্কে কিছুই জানে না বিএসটিআই।’

এ ছাড়া মাপে কম দেওয়ার জন্য ডিজিটাল মিটারে আগে থেকেই সেটআপ করে তেল চুরি করা সম্ভব। বিএসটিআইয়ের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ আমিমুল এহসান বলেন, এখন অনেক পাম্পে অভিযান চালিয়ে দেখা যাচ্ছে গ্রাহককে মাপে তেল কম দেওয়া হচ্ছে। আমরা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি। ১০ লিটারে ৩০ মিলি লিটার কম-বেশি হতে পারে। এর কম হলে এক লাখ টাকা জরিমানা ও পাম্পের ডিসপেনসিং ইউনিট (যা দিয়ে তেল সরবরাহ করা হয়) সিল গালা করা হয়।

তিনি বলেন, ‘ডিজিটাল মেশিনে মাপে তেল কম দিলে তা রিডিংয়ে বোঝা যায়। কিন্তু ডিসপেনসিং ইউনিটে ডিভাইস বসিয়ে মাপে কম দেওয়া হচ্ছে, রিডিংও ঠিক আসছে, আমাদের অভিযানে এমনটা এখনও পাইনি।’

বিএসটিআইর উপ-পরিচালক মো. রিয়াজুল হক বলেন, ‘গত এক বছরে পাম্প সিলগালা, জরিমানা ও মামলার পরিসংখ্যানই বলে দেয় আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করি। আগের চেয়ে তেল মাপে কম দেওয়া কমেছে। আমাদের স্ট্যান্ডার্ড ওয়েট পরিমাপক যন্ত্র আছে। সেটা দিয়ে তেল মেপে দেখি কম দিয়েছে কি না। ডিসপেন্সিং ইউনিট (যা দিয়ে তেল সরবরাহ করা হয়) পরীক্ষা করে যদি দেখা যায় মাপে কম দেওয়া হচ্ছে, তাহলে জরিমানাসহ সিলগালা করা হয়। সেটা ঠিক করার পর পরীক্ষা করে তা খুলে দেওয়া হয়। ডিজিটাল মিটারে চাইলে কারচুপি করা যায়।’

বিএসটিআইর এই উপ-পরিচালক বলেন, নীতিমালা অনুযায়ী, বিকাল ৫টার পর বিএসটিআই অভিযান চালাতে পারে না। তবে মাঝেমধ্যে র‌্যাবকে সঙ্গে নিয়ে সন্ধ্যার পর অভিযান চালানো হয়। সিএনজি পাম্পে বিএসটিআই অভিযান চালায় না।’

সরেজমিনে রাজধানীর কয়েকটি ফিলিং স্টেশনে গিয়ে জানা গেছে, কোনো স্টেশনেই তেল মাপে কম দেওয়া হচ্ছে কি না তা ক্রেতার জানার কোনো সুযোগ নেই। শুধু বিএসটিআই বা অন্য কোনো সংস্থা অভিযান চালিয়ে তাদের কাছে থাকা ক্যান (জার) দিয়ে মাপের সত্যতা যাচাই করতে পারে।

রাজধানীর মৎস্য ভবন মোড়ের রমনা ফিলিং স্টেশন থেকে প্রায়ই তেল কেনেন হামিদ। কিন্তু কখনও তেল কম দেওয়া হয়েছে কি না তা জানেন না তিনি। তিনি বলেন, ‘শুনেছি পাম্পগুলো তেল মাপে কম দেয়। কিন্তু ক্রেতার পক্ষে তা বোঝার সুযোগ নেই। এ জন্যই নির্বিঘ্নে তারা চুরি করতে পারছে।’

রমনা পেট্রোল পাম্পের এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘গ্রাহকের তেল মেপে দেখার কোনো সুযোগ নেই। তেল নেওয়ার আগে মিটারে সবগুলো রিডিং শূন্য আছে কি না এবং তেল দেওয়ার পর নির্ধারিত রিডিং উঠেছে কি না এটা ক্রেতারা লক্ষ্য করলে ৯০ শতাংশ পাম্পে তেল চুরি কমে যাবে। যেসব পাম্পে তেল বেশি বিক্রি হয় সেসব পাম্পে তেল চুরি কম হয়। ঢাকার বাইরের পাম্পগুলোতে তেল মাপে কম দেওয়ার সংখ্যা বেশি।’

সম্প্রতি ওজনে কম দেওয়া এবং ভেজাল তেল বিক্রি বন্ধ না হওয়ায় সংশ্লিষ্টদের মনিটরিং বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে জ্বালানি মন্ত্রণালয়। বিএসটিআই ও ভোক্তা অধিকারের দাবি, ভেজাল তেল বিক্রি ও ওজনে কম দেওয়া ঠেকাতে তারা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছেন। তা নিয়ন্ত্রণে আছে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্যানুযায়ী, দেশে জ্বালানি তেল বিক্রি করার অনুমোদিত ফিলিং স্টেশনের সংখ্যা ২২৭১টি, এজেন্ট ডিস্ট্রিবিউটর ২৯১৯টি, প্যাকড পয়েন্ট ডিলারের সংখ্যা ৬৬৩টি। রাষ্ট্রায়ত্ত পদ্মা অয়েল কোম্পানি (পিওসিএল), যমুনা অয়েল কোম্পানি (জেওসিএল) এবং মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের (এমপিএল) মাধ্যমে এসব পাম্পে তেল সরবরাহ করা হয়। জেলা প্রশাসন, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি), বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউটের (বিএসটিআই) ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের প্রতিনিধিরা এসব জায়গায় ভেজাল তেল বিক্রি, ওজনে কম দেওয়া এবং অবৈধ তেল কেনাবেচা ঠেকাতে প্রায়ই অভিযান পরিচালনা করেন। তবে জ্বালানি তেলে ভেজাল প্রতিরোধে নিয়মিত মনিটরিং করার দায়িত্ব তেল বিপণন কোম্পানিগুলোর। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা মনিটরিং করেন না।

বিএসটিআই জানিয়েছে, ভেজাল তেল বিক্রি ও ওজনে কম দেওয়া মনিটরিং করতে সপ্তাহে পাঁচ দিন রাজধানীতে দুটি মোবাইল কোর্ট এবং সারা দেশে অবস্থিত ১২টি অফিসের মাধ্যমে সপ্তাহে পাঁচ দিন একটি করে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। এসব অভিযানে সাধারণত ওজনে কম দেওয়ার বিষয়টি প্রমাণ হলে তাৎক্ষণিকভাবে জরিমানা করা হয়। তবে তেলে ভেজাল দেওয়া হচ্ছে কি না সেটা নির্ণয় করতে ১০ থেকে ১৫ দিন সময় লাগে। শুধু বিএসটিআই তা করে থাকে।

বিএসটিআইর উপ-পরিচালক মো. রিয়াজুল হক বলেন, ‘আইন অনুযায়ী, ভেজাল তেল বিক্রি করলে বা মাপে কম দিলে মোবাইল কোর্ট সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা জরিমানা বা এক বছর কারাদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করতে পারে। এ ছাড়া ভেজাল পণ্য বিক্রি প্রমাণ হলে আমরা আদালতে মামলা করার পর আদালত সর্বোচ্চ চার বছর কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করতে পারে। আমরা নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করি।’

জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সর্বশেষ মে মাসের হিসাবে দেশব্যাপী ২৭টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। যার মধ্যে পদ্মা অয়েল কোম্পানি ১৪টি, মেঘনা পেট্রোলিয়াম কোম্পানি ৬টি ও যমুনা অয়েল কোম্পানি ৭টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেছে। যার মধ্যে ভেজাল তেল বিক্রি, ওজনে কম দেওয়ার প্রমাণ মিলেছে পদ্মা অয়েল কোম্পানির ১৪টি পেট্রোল পাম্পে, মেঘনা অয়েল কোম্পানির ৪টি এবং যমুনা অয়েল কোম্পানির চারটিতে। অর্থাৎ ২৭টি পেট্রোল পাম্পে অভিযান চালিয়ে ১৮টিতেই ভেজাল তেল বিক্রির অভিযোগ প্রমাণ হয়েছে। এই পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যায় অধিকাংশ পাম্প ওজনে কম দিচ্ছে এবং ভেজাল তেল বিক্রি করছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমনিতেই উচ্চমূল্যে জনসাধারণকে জ্বালানি তেল কিনতে হচ্ছে। তার ওপর মাপে কম দেওয়ায় আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে তাদের। পাশাপাশি বেশি লাভের জন্য ভেজাল মেশানোর ফলে যানবাহনের ইঞ্জিনের ক্ষতি হচ্ছে। বর্তমানে পাম্পগুলোতে ডিজিটাল মেশিনে তেল বিক্রি করার ফলে গ্রাহকের পক্ষে চুরি ধরা প্রায় অসম্ভব। এ জন্য সরকারের সংশ্লিষ্টদের নিয়মিত মনিটরিং করতে হবে। মাপে কম দেওয়া রোধে বিএসটিআইর অভিযান বাড়ানো প্রয়োজন। একই অপরাধ বারবার করলে পাম্প সিলগালা করে দেওয়ার মতো শক্ত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। তেল সরবরাহ বন্ধ ও লাইসেন্স বাতিল করা, অর্থদণ্ডের পাশাপাশি জেলে দেওয়া হলে এই ধরনের অপরাধ কমে আসত।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের মহাপরিচালক এএইচএম সফিকুজ্জামান বলেন, ‘গত ৩ আগস্ট আমরা সারা দেশের ৪১টি পেট্রোল পাম্পে অভিযান চালিয়ে ১৭ লাখ টাকা জরিমানা করেছি। ২ আগস্ট প্রায় আড়াই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। ভোক্তা অধিকারের একার পক্ষে এটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। আমাদের লোকবল কম, তারপরও সাধ্যের মধ্যে আমরা নিয়মিত মনিটরিং করি। তার সুফলও পাচ্ছি। তেলে ভেজাল দিচ্ছে কি না সেটা দেখার দায়িত্ব বিএসটিআইর। তবে লিখিত অভিযোগ পেলে আমরা ব্যবস্থা নিই।’

এ বিষয়ে পাম্প মালিক সমিতির সভাপতি মো. নাজমুল হক বলেন, ‘বহুদিন ধরেই এটা হচ্ছে। ভালো-মন্দ সব জায়গায়ই আছে। কিছু অসাধু লোকের জন্য আমরা যারা সততার সঙ্গে ব্যবসা করি তাদের বদনাম হয়। আমরাও চাই, ভেজাল তেল বিক্রি ও ওজনে কম দেওয়া বন্ধ হোক।’

তিনি বলেন, ‘এটা রোধ করার জন্য ২০১৩ সালে বিপিসি, বিএসটিআই, মন্ত্রণালয় ও পাম্প মালিক সমিতির সমন্বয়ে একটি মনিটরিং সেল গঠন করা হয়। বলা হয়েছিল, এই সেল সারা দেশে অভিযান চালাবে। আমরাও সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব। কিন্তু আজ পর্যন্ত সেই কমিটি কোনো অভিযান পরিচালনা করেনি।’

তিনি বলেন, ‘তেলে ভেজাল ও ওজন কম দেওয়া প্রতিরোধে পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন সরকারের কাছে তিনটি দাবি জানিয়েছিল। এর মধ্যে রয়েছে কেউ প্রথমবার কারসাজি করলে তাকে সতর্ক করা, দ্বিতীয়বার একই কাজ করলে তার তেলের সরবরাহ কিছুদিনের জন্য বন্ধ রাখা এবং তৃতীয়বার ধরা পড়লে তার লাইসেন্স বাতিল করে দিতে হবে। কিন্তু এগুলো বাস্তবায়ন করা হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘কেউ চাইলে পাম্পের ডিজিটাল মেশিনে আগে থেকেই তেল মাপে কম দেওয়ার সেটআপ করতে পারে। সে ধরাও পড়বে। তেল মাপে কম দেওয়া হচ্ছে কি না তা ক্রেতা যেন যাচাই করতে পারে সেই সুযোগ প্রতিটি পাম্পে রাখা উচিত।’ তবে ডিভাইস স্থাপন করে তেল মাপে কম দেওয়ার বিষয়ে অবগত নন বলেও জানান তিনি।