ঢাকা ০৫:২৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০২২, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

অচল ডাকসুতে সচল ফি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-ডাকসুর সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছিল ২০১৯ সালের ১১ মার্চ। বর্তমানে সেই ডাকসু মেয়াদোত্তীর্ণ। পরবর্তী নির্বাচন কবে হবেÍ তা স্পষ্ট করে বলতে পারছেন না কেউই। তবে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ডাকসুর জন্য নির্ধারিত ফি নেওয়া হচ্ছে। জানা গেছে, অচল ডাকসুতে নিয়মিতভাবে হল সংসদের জন্য ৬০ টাকা ও বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের ৬০ টাকা করে মোট ১২০ টাকা আদায় করা হচ্ছে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ অনুযায়ী, ডাকসুর মনোনীত পাঁচ জন শিক্ষার্থী-প্রতিনিধি বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিনেটের সদস্য হয়ে থাকেন। এই আনুষ্ঠানিক ফোরামে তারা শিক্ষার্থীদের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরার সুযোগ পান।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুর দিকে ১৯২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ-ডাকসুর সৃষ্টি হয়। এরপর থেকে মোট ৩৭ বার ডাকসুর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এরমধ্যে স্বাধীনতার ৫১ বছরে নির্বাচন হয়েছে ৮ বার, সবশেষ নির্বাচনটি হয়েছে ২০১৯ সালের ১১ মার্চ।

সর্বশেষ ডাকসুর মনোনয়নে সিনেটের সদস্য হন তৎকালীন ভিপি নুরুল হক নুরু, জিএস গোলাম রাব্বানী ও এজিএস সাদ্দাম হোসেনসহ পাঁচ জন। তারা সিনেটে প্রতিনিধিত্ব করেন। তবে ডাকসু নির্বাচনের ধারাবাহিকতা না থাকায় সিনেটে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বও এখন বন্ধ হওয়ার পথে।

২০১৯ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে সচল হয় ডাকসু ও ১৮টি হল সংসদ। ওই নির্বাচনে ছাত্র অধিকার পরিষদের প্যানেল থেকে ভিপি পদে নুরুল হক নুরু এবং সমাজসেবা সম্পাদক পদে আখতার হোসেন নির্বাচিত হন। ডাকসুর বাকি ২৩টি পদে জেতেন ছাত্রলীগের প্রার্থীরা। তাদের মধ্যে জিএস পদে গোলাম রাব্বানী ও এজিএস পদে সাদ্দাম হোসেন নির্বাচিত হন। এছাড়া ১৮টি হল সংসদের মধ্যে ১২টিতে ভিপি ও ১৪টিতে জিএস পদে জেতে ছাত্রলীগ। অন্য পদগুলোতে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয় পান। ডাকসুর ওই কমিটি ও হল সংসদের মেয়াদ শেষ হয় ২০২০ সালে।

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদের কমিটিগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ। তারপরও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রতি বছর ডাকসু ও হল সংসদের জন্য ১২০ টাকা করে ফি আদায় করা হচ্ছে। ছাত্র সংসদটির কর্মকর্তা–কর্মচারীদের বেতন– ভাতা বাবদ ব্যয়ও চলছে নিয়মিত। শুধু নির্বাচনই এখনও অনিয়মিত।

নিয়মিত ডাকসু নির্বাচন না হলেও নিয়মিত ফি আদায় করাকে অযৌক্তিক, অন্যায় ও অগণতান্ত্রিকÍ বলছেন সাধারণ শিক্ষার্থী ও ছাত্র নেতারা।

ঢাবি ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা যেহেতু ফি দেই, সেহেতু ছাত্র সংসদ থাকা উচিত। দেখা গেছে যে, দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন হয়নি। কিন্তু তখনও শিক্ষার্থীদেরকে ফি দিতে হয়েছে এবং সেটি নিয়ে এক ধরনের ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। আমি মনে করি, এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের রূপরেখা ও সুস্পষ্ট বক্তব্য থাকা উচিত। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নিশ্চিত করা উচিত। এটির সমাধান হচ্ছে নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন।’

সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট (মার্কসবাদী) এর সাবেক সভাপতি সালমান সিদ্দিকী বলেন, ‘হল সংসদ ও বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের নির্বাচন দীর্ঘদিন যাবত বন্ধ করে রাখা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং অগণতান্ত্রিক। ইতোমধ্যে একবার নির্বাচন চালু হওয়ার পর আবারও বন্ধ করে রাখা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ছাত্রদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে অবশ্যই শিগগিরই ডাকসু নির্বাচন দেওয়া উচিত।’ তিনি বলেন, ‘তারপর শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে যে ১২০ টাকা করে ফি নেওয়া হচ্ছে, সেটা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। ডাকসু নির্বাচন তারা চালু রাখছে না অথচ ফি নিচ্ছে। আমি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে নির্বাচন দেওয়ার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান করবোÍ তারা যেন ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলেন।’

সালমান সিদ্দিকী আরও বলেন, ‘আগের যে নির্বাচন হয়েছেÍ কৃত্রিম লাইন তৈরি করে, বাক্স দখল করে, সেটি যেন না হয়। গণতান্ত্রিক পরিবেশে যেন নির্বাচন নিশ্চিত করা হয়।’

ঢাবি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আনাস ইবনে মনির বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচন শিক্ষার্থীদের দাবি। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে ডাকসু না দিয়েও টাকা নিচ্ছে। ডাকসু না থাকায় শিক্ষার্থীরা তাদের দাবি উত্থাপনের প্ল্যাটফর্ম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। একইসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশও শিক্ষার্থীবান্ধব থাকছে না। শিক্ষার্থীরা বিভিন্নভাবে অন্যায় ও হেনস্থার শিকার হলেও ডাকসুর অভাবে কিছুই করতে পারছেন না। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অন্যায়ভাবে ঠিকই টাকা আদায় করছে। ডাকসুও দিচ্ছে না, আবার অন্যায়ভাবে ফি আদায় করছে।’

আইন বিভাগের শিক্ষার্থী সালেহ উদ্দিন সিফাত বলেন, ‘হাইকোর্টের আদেশের কারণে ডাকসু নির্বাচন দিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ডাকসু নির্বাচনের ফলে ক্যাম্পাসে একটা আপাত স্থিতিশীলতা ও রাজনৈতিক সহাবস্থানের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল। শিক্ষার্থীদের ওপর ক্ষমতাসীন সংগঠনের নির্যাতনের মাত্রাও কমেছিল। এখন ডাকসু নির্বাচন না দিয়েও ছাত্র সংসদের জন্য ফি নেওয়াটা তো অন্যায় বটেই, ফি’র সঙ্গে সঙ্গে আরেকটা বিষয় হলো অবকাঠামোগত অপচয়। ডাকসু’র জন্য একটি আলাদা ভবন রয়েছে। প্রত্যেকটি হলে ছাত্র সংসদের রুম রয়েছে। এগুলো এখন কারা ব্যবহার করছে এটা জানাও জরুরি।’

স্বাধীনতার ৫১ বছরে ডাকসু নির্বাচন হয়েছে ৮ বার। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী, নির্বাচন হওয়ার কথা ছিলো ৫১ বার। কেন এই অনিয়মিত নির্বাচন এবং এর দায়ভার কার জানতে চাইলে ছাত্রনেতা ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের স্বদিচ্ছার অভাবকে দায়ী করেন। একইসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনগত বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী নিয়মিত ডাকসু নির্বাচনেরও দাবি জানান তারা।

ছাত্রলীগ নেতা সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘অবশ্যই এখানে অনেক স্টক হোল্ডার রয়েছেন। তবে সার্বিক বিষয়ে সমন্বয় করতে হবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে। স্পষ্ট করে বললে ডাকসু নির্বাচন হচ্ছে শিক্ষার্থীদের অধিকার। দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছেÍ এটির বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তৃতীয় বিষয় হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ছাত্রদের অংশীদ্বারিত্ব থাকা উচিত। শিক্ষার্থীদের মাঝ থেকে নেতৃত্ব তৈরি করা, অ্যাকাডেমিক পরিবেশ সমুন্নত রাখা, শুধু মাত্র রাজনৈতিক নেতৃত্ব কিন্তু নয়, অ্যাকাডেমিক নেতৃত্ব, পেশাগত নেতৃত্ব, দক্ষ তরুণ হওয়ার জন্যেও ডাকসু নির্বাচন জরুরি।’

তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকেই সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করতে হবে।’

সালমান সিদ্দিকী বলেন, ‘২০১৯ সালে সর্বশেষ যে নির্বাচনটা হয়, সেটি কিন্তু শিক্ষার্থীদের আন্দোলনেরই ফসল। প্রশাসন তার স্বার্থে নির্বাচন বন্ধ রাখতে চায়। নির্বাচন হলে তাদের সমস্যা। কারণ, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা ছাত্রদের পক্ষে কথা বলবে। যার ফলে এই অগণতান্ত্রিক প্রশাসন নির্বাচনটাকে বন্ধ করে রাখতেই বেশি উৎসাহী থাকে। সেজন্যই তারা ডাকসুর নির্বাচন নিয়মিত দেয় না।’

সালেহ উদ্দিন সিফাত বলেন, ‘অনিয়মিত ডাকসু নির্বাচনের দায় অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের। এছাড়া, ছাত্রসংগঠনগুলোর দিক থেকেও ডাকসুর দাবি তেমন জোরালো হতে দেখা যাচ্ছে না। যদিও দাবি জানানো বা না জানানো কোনোভাবেই প্রশাসনের গাফিলতিকে লঘু করে না।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপাচার্য ও ডাকসুর সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ‘আদায়কৃত ফি অন্য কোনও খাতে ব্যয় করা হয় না। এগুলো জমা থাকে। যখন নির্বাচন হয়, তখন এখান থেকে বাজেট বরাদ্দ দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।’

জানা গেছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটে ডাকসুর নির্বাচন (যদি হয়) বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫০ লাখ টাকা। চলতি মেয়াদে নির্বাচন হওয়ার কোনও সম্ভবনা আছে কিনা জানতে চাইলে উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ‘না এ মুহূর্তে কোনও চিন্তা ভাবনা নেই। অনেকগুলো বিষয় বিবেচনায় নিয়ে, যাতে করে কোনও ধরনের ঝামেলা না হয় সেই পরিস্থিতি নিশ্চিত করে নির্বাচন দেওয়া হবে।’

Tag :
জনপ্রিয়

রসিক নির্বাচন ; আ’লীগের মেয়র প্রার্থী ডালিয়ার গণসংযোগ অনুষ্ঠিত

অচল ডাকসুতে সচল ফি

প্রকাশের সময় : ০৯:৫২:১৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-ডাকসুর সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছিল ২০১৯ সালের ১১ মার্চ। বর্তমানে সেই ডাকসু মেয়াদোত্তীর্ণ। পরবর্তী নির্বাচন কবে হবেÍ তা স্পষ্ট করে বলতে পারছেন না কেউই। তবে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ডাকসুর জন্য নির্ধারিত ফি নেওয়া হচ্ছে। জানা গেছে, অচল ডাকসুতে নিয়মিতভাবে হল সংসদের জন্য ৬০ টাকা ও বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের ৬০ টাকা করে মোট ১২০ টাকা আদায় করা হচ্ছে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ অনুযায়ী, ডাকসুর মনোনীত পাঁচ জন শিক্ষার্থী-প্রতিনিধি বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিনেটের সদস্য হয়ে থাকেন। এই আনুষ্ঠানিক ফোরামে তারা শিক্ষার্থীদের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরার সুযোগ পান।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুর দিকে ১৯২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ-ডাকসুর সৃষ্টি হয়। এরপর থেকে মোট ৩৭ বার ডাকসুর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এরমধ্যে স্বাধীনতার ৫১ বছরে নির্বাচন হয়েছে ৮ বার, সবশেষ নির্বাচনটি হয়েছে ২০১৯ সালের ১১ মার্চ।

সর্বশেষ ডাকসুর মনোনয়নে সিনেটের সদস্য হন তৎকালীন ভিপি নুরুল হক নুরু, জিএস গোলাম রাব্বানী ও এজিএস সাদ্দাম হোসেনসহ পাঁচ জন। তারা সিনেটে প্রতিনিধিত্ব করেন। তবে ডাকসু নির্বাচনের ধারাবাহিকতা না থাকায় সিনেটে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বও এখন বন্ধ হওয়ার পথে।

২০১৯ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে সচল হয় ডাকসু ও ১৮টি হল সংসদ। ওই নির্বাচনে ছাত্র অধিকার পরিষদের প্যানেল থেকে ভিপি পদে নুরুল হক নুরু এবং সমাজসেবা সম্পাদক পদে আখতার হোসেন নির্বাচিত হন। ডাকসুর বাকি ২৩টি পদে জেতেন ছাত্রলীগের প্রার্থীরা। তাদের মধ্যে জিএস পদে গোলাম রাব্বানী ও এজিএস পদে সাদ্দাম হোসেন নির্বাচিত হন। এছাড়া ১৮টি হল সংসদের মধ্যে ১২টিতে ভিপি ও ১৪টিতে জিএস পদে জেতে ছাত্রলীগ। অন্য পদগুলোতে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয় পান। ডাকসুর ওই কমিটি ও হল সংসদের মেয়াদ শেষ হয় ২০২০ সালে।

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদের কমিটিগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ। তারপরও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রতি বছর ডাকসু ও হল সংসদের জন্য ১২০ টাকা করে ফি আদায় করা হচ্ছে। ছাত্র সংসদটির কর্মকর্তা–কর্মচারীদের বেতন– ভাতা বাবদ ব্যয়ও চলছে নিয়মিত। শুধু নির্বাচনই এখনও অনিয়মিত।

নিয়মিত ডাকসু নির্বাচন না হলেও নিয়মিত ফি আদায় করাকে অযৌক্তিক, অন্যায় ও অগণতান্ত্রিকÍ বলছেন সাধারণ শিক্ষার্থী ও ছাত্র নেতারা।

ঢাবি ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা যেহেতু ফি দেই, সেহেতু ছাত্র সংসদ থাকা উচিত। দেখা গেছে যে, দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন হয়নি। কিন্তু তখনও শিক্ষার্থীদেরকে ফি দিতে হয়েছে এবং সেটি নিয়ে এক ধরনের ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। আমি মনে করি, এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের রূপরেখা ও সুস্পষ্ট বক্তব্য থাকা উচিত। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নিশ্চিত করা উচিত। এটির সমাধান হচ্ছে নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন।’

সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট (মার্কসবাদী) এর সাবেক সভাপতি সালমান সিদ্দিকী বলেন, ‘হল সংসদ ও বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের নির্বাচন দীর্ঘদিন যাবত বন্ধ করে রাখা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং অগণতান্ত্রিক। ইতোমধ্যে একবার নির্বাচন চালু হওয়ার পর আবারও বন্ধ করে রাখা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ছাত্রদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে অবশ্যই শিগগিরই ডাকসু নির্বাচন দেওয়া উচিত।’ তিনি বলেন, ‘তারপর শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে যে ১২০ টাকা করে ফি নেওয়া হচ্ছে, সেটা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। ডাকসু নির্বাচন তারা চালু রাখছে না অথচ ফি নিচ্ছে। আমি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে নির্বাচন দেওয়ার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান করবোÍ তারা যেন ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলেন।’

সালমান সিদ্দিকী আরও বলেন, ‘আগের যে নির্বাচন হয়েছেÍ কৃত্রিম লাইন তৈরি করে, বাক্স দখল করে, সেটি যেন না হয়। গণতান্ত্রিক পরিবেশে যেন নির্বাচন নিশ্চিত করা হয়।’

ঢাবি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আনাস ইবনে মনির বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচন শিক্ষার্থীদের দাবি। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে ডাকসু না দিয়েও টাকা নিচ্ছে। ডাকসু না থাকায় শিক্ষার্থীরা তাদের দাবি উত্থাপনের প্ল্যাটফর্ম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। একইসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশও শিক্ষার্থীবান্ধব থাকছে না। শিক্ষার্থীরা বিভিন্নভাবে অন্যায় ও হেনস্থার শিকার হলেও ডাকসুর অভাবে কিছুই করতে পারছেন না। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অন্যায়ভাবে ঠিকই টাকা আদায় করছে। ডাকসুও দিচ্ছে না, আবার অন্যায়ভাবে ফি আদায় করছে।’

আইন বিভাগের শিক্ষার্থী সালেহ উদ্দিন সিফাত বলেন, ‘হাইকোর্টের আদেশের কারণে ডাকসু নির্বাচন দিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ডাকসু নির্বাচনের ফলে ক্যাম্পাসে একটা আপাত স্থিতিশীলতা ও রাজনৈতিক সহাবস্থানের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল। শিক্ষার্থীদের ওপর ক্ষমতাসীন সংগঠনের নির্যাতনের মাত্রাও কমেছিল। এখন ডাকসু নির্বাচন না দিয়েও ছাত্র সংসদের জন্য ফি নেওয়াটা তো অন্যায় বটেই, ফি’র সঙ্গে সঙ্গে আরেকটা বিষয় হলো অবকাঠামোগত অপচয়। ডাকসু’র জন্য একটি আলাদা ভবন রয়েছে। প্রত্যেকটি হলে ছাত্র সংসদের রুম রয়েছে। এগুলো এখন কারা ব্যবহার করছে এটা জানাও জরুরি।’

স্বাধীনতার ৫১ বছরে ডাকসু নির্বাচন হয়েছে ৮ বার। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী, নির্বাচন হওয়ার কথা ছিলো ৫১ বার। কেন এই অনিয়মিত নির্বাচন এবং এর দায়ভার কার জানতে চাইলে ছাত্রনেতা ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের স্বদিচ্ছার অভাবকে দায়ী করেন। একইসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনগত বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী নিয়মিত ডাকসু নির্বাচনেরও দাবি জানান তারা।

ছাত্রলীগ নেতা সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘অবশ্যই এখানে অনেক স্টক হোল্ডার রয়েছেন। তবে সার্বিক বিষয়ে সমন্বয় করতে হবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে। স্পষ্ট করে বললে ডাকসু নির্বাচন হচ্ছে শিক্ষার্থীদের অধিকার। দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছেÍ এটির বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তৃতীয় বিষয় হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ছাত্রদের অংশীদ্বারিত্ব থাকা উচিত। শিক্ষার্থীদের মাঝ থেকে নেতৃত্ব তৈরি করা, অ্যাকাডেমিক পরিবেশ সমুন্নত রাখা, শুধু মাত্র রাজনৈতিক নেতৃত্ব কিন্তু নয়, অ্যাকাডেমিক নেতৃত্ব, পেশাগত নেতৃত্ব, দক্ষ তরুণ হওয়ার জন্যেও ডাকসু নির্বাচন জরুরি।’

তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকেই সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করতে হবে।’

সালমান সিদ্দিকী বলেন, ‘২০১৯ সালে সর্বশেষ যে নির্বাচনটা হয়, সেটি কিন্তু শিক্ষার্থীদের আন্দোলনেরই ফসল। প্রশাসন তার স্বার্থে নির্বাচন বন্ধ রাখতে চায়। নির্বাচন হলে তাদের সমস্যা। কারণ, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা ছাত্রদের পক্ষে কথা বলবে। যার ফলে এই অগণতান্ত্রিক প্রশাসন নির্বাচনটাকে বন্ধ করে রাখতেই বেশি উৎসাহী থাকে। সেজন্যই তারা ডাকসুর নির্বাচন নিয়মিত দেয় না।’

সালেহ উদ্দিন সিফাত বলেন, ‘অনিয়মিত ডাকসু নির্বাচনের দায় অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের। এছাড়া, ছাত্রসংগঠনগুলোর দিক থেকেও ডাকসুর দাবি তেমন জোরালো হতে দেখা যাচ্ছে না। যদিও দাবি জানানো বা না জানানো কোনোভাবেই প্রশাসনের গাফিলতিকে লঘু করে না।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপাচার্য ও ডাকসুর সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ‘আদায়কৃত ফি অন্য কোনও খাতে ব্যয় করা হয় না। এগুলো জমা থাকে। যখন নির্বাচন হয়, তখন এখান থেকে বাজেট বরাদ্দ দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।’

জানা গেছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটে ডাকসুর নির্বাচন (যদি হয়) বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫০ লাখ টাকা। চলতি মেয়াদে নির্বাচন হওয়ার কোনও সম্ভবনা আছে কিনা জানতে চাইলে উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ‘না এ মুহূর্তে কোনও চিন্তা ভাবনা নেই। অনেকগুলো বিষয় বিবেচনায় নিয়ে, যাতে করে কোনও ধরনের ঝামেলা না হয় সেই পরিস্থিতি নিশ্চিত করে নির্বাচন দেওয়া হবে।’