ঢাকা ১০:১৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২২, ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

ঋণভাগ ও সুদ মাফে আঁতাত

নিজেদের মধ্যে আঁতাত করে ব্যাংকের পরিচালকরা মিলেমিশে একে অন্যের ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিচ্ছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত জুন শেষে পরিচালকদের নেওয়া ব্যাংকঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা। বেসরকারি মিডল্যান্ড, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ও যমুনা ব্যাংকের পরিচালকরা অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ায় শীর্ষে রয়েছেন। আর অন্য ব্যাংকের পরিচালকদের ঋণ দেওয়ায় শীর্ষে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, জনতা ব্যাংক ও দি সিটি ব্যাংক।

শুধু পরিচালকই নন, ব্যাংক থেকে তাদের আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবও ক্ষমতার জোরে নিয়মবহির্ভূত ঋণ নিয়েছেন। এসব ঋণের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খেলাপি হলেও বছরের পর বছর তা ‘নিয়মিত’ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। আবার ঋণ ফেরত না দিয়ে পরিচালকদের মধ্যে অনৈতিকভাবে সুদ মওকুফ করে নেওয়ার প্রবণতাও বাড়ছে।

সর্বশেষ তিন মাসে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের আড়াই হাজার কোটি টাকার বেশি সুদ মওকুফ করেছে, যার সিংহভাগই পরিচালকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বলে জানা গেছে।

অর্থনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংক পরিচালকদের ঋণ ভাগাভাগির কারণে সাধারণ ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা পর্যাপ্ত ঋণ পাচ্ছেন না। এ ছাড়া পরিচালকদের কাছে বিপুল অঙ্কের ঋণ কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ায় ঝুঁকি বাড়ছে ব্যাংক খাতেও।

বর্তমানে একটি ব্যাংকের পরিচালক রয়েছেন সর্বোচ্চ ২০ জন। এ হিসাবে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর পরিচালকের সংখ্যা এক হাজারেরও কম। তবে তাদের সবাই ঋণগ্রহীতা নন। এ তালিকায় আছেন কয়েকশ পরিচালক। তুলনামূলক বিচারে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে তারাই শীর্ষে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালকদের বেশিরভাগই দেশের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী। কয়েক কোটি টাকা পুঁজি নিয়ে ব্যাংকের পরিচালক হয়েছিলেন এমন অনেকেই এখন শত শত কোটি টাকার মালিক। আর তা সম্ভব হয়েছে ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে ঋণ বের করে নেওয়ার কারণেই। প্রভাব বিস্তার করে নেওয়া এসব ঋণ তারা ঠিকমতো ফেরতও দিচ্ছেন না। পুনঃতফসিল ওপুনর্গঠন করে বছরের পর বছর নিয়মিত রাখতে বাধ্য করেন।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, নিজের ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার সুযোগ কম থাকায় অন্য ব্যাংক থেকে ভাগাভাগি করে ঋণ নিচ্ছেন পরিচালকরা। এ ঘটনা সবারই জানা। বেশ কিছু দিন আগে এক ব্যাংকের পরিচালক ঋণের জন্য অন্য একটি ব্যাংকের এমডিকে পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করল। এটি কীসের আলামত। নিশ্চয়ই এটি ব্যাংকিং খাতের জন্য খারাপ দৃষ্টান্ত এবং সুশাসনের পরিপন্থী। আসলে ব্যবসায়ীদের ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়াই ঠিক হয়নি। তারা ব্যবসার জন্যই ব্যাংকের সম্পদ ব্যবহার করবে। এটিকে বন্ধ করার কোনো পদক্ষেপও লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। নতুন গভর্নর এসে উল্টো ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠন এবং সুদ মওকুফের ক্ষমতা ব্যাংকগুলোর পর্ষদের হাতে তুলে দিলেন। এতে ব্যাংক পরিচালকরা আরও উৎসাহিত হবেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, যারা ব্যাংকের মালিক তারাই ব্যবসায়ী। ফলে ব্যাংক খাতে সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ব্যবসায়ীদের ব্যাংকের পরিচালক পদে না রাখা এবং নতুন করে পরিচালক হওয়ার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করে আইন সংশোধন করতে পারলে এই প্রবণতা রোধ করা সম্ভব হবে।

গত কয়েক বছরে ব্যাংক পরিচালকদের হস্তক্ষেপে বেশ কিছু জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে কিছু পরিচালকের স্বার্থসংশ্লিষ্টতায় সোনালী ব্যাংকে ঘটেছে হলমার্ক কেলেঙ্কারি। বেসিক ব্যাংকে হয়েছে নজিরবিহীন লুটপাট। কয়েকটি ব্যাংকের পরিচালকদের সংশ্লিষ্টতায় ঘটেছে বিসমিল্লাহ গ্রুপের জালিয়াতি। পরিচালকদের হস্তক্ষেপে সরকারি ব্যাংকের সিএসআরের টাকা নিয়ে নয়ছয় হয়েছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) এক গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যাংকিং খাতে সংঘটিত ৯০ শতাংশ অনিয়ম-অপরাধে ব্যাংকের নিজস্ব লোকজন জড়িত থাকেন।

ব্যাংক কোম্পানি আইনের ১৭ (২) ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যাংক পরিচালক অন্য কোনো ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পরিশোধ না করলে যে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন, ওই ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে ওই খেলাপি পরিচালককে নোটিশ দেবে। নোটিশ দেওয়ার দুই মাসের মধ্যে ঋণ পরিশোধ না করলে খেলাপি ব্যক্তি তার ব্যাংকে পরিচালকের পদ হারাবেন। কিন্তু পরিচালকদের ঋণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সম্পর্ক, যোগসাজশ ও প্রভাব-প্রতিপত্তি খাটিয়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

জানা যায়, আগে পরিচালকরা নিজ ব্যাংক থেকেই বেশিমাত্রায় ঋণ নিতেন এবং পরিশোধ করতেন না। যখন খেলাপি হয়ে যেতেন, তখন বেনামি ঋণ সৃষ্টি করে ওই ঋণ পরিশোধ দেখাতেন। পরিচালকদের এ ধরনের অনৈতিক কার্যক্রম ঠেকাতে নিজের ব্যাংক থেকে কী পরিমাণ ঋণ নেওয়া যাবে, তার একটি সীমা বেঁধে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রচলিত নিয়মে ব্যাংক পরিচালকরা নিজ ব্যাংক থেকে তাদের মোট শেয়ারের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ নিতে পারেন। তবে এক ব্যাংকের পরিচালকের অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে এ রকম কোনো সীমা টানা নেই। যে কারণে নিজেদের মধ্যে আঁতাত করে এক ব্যাংকের পরিচালক অন্য ব্যাংক থেকে ইচ্ছামতো ঋণ নিচ্ছেন।

ব্যাংক পরিচালকদের যত ঋণ

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে গত জুন শেষে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিতরণ করা ঋণের স্থিতি ছিল ১৩ কোটি ৯৮ হাজার ৫১২ কোটি টাকা। এসব ঋণের মধ্যে এক ব্যাংকের পরিচালকদের অন্য ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৯ হাজার ৭৫৯ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ১১ দশমিক ৪২ শতাংশ। তিন মাস আগে পরিচালকদের এ ধরনের ঋণের স্থিতি ছিল আরও বেশি, প্রায় ১ লাখ ৬১ হাজার ৯৩৪ কোটি টাকা বা ১২ দশমিক ৩৪ শতাংশ। তবে নিজ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে পরিচালকরা কী পরিমাণ ঋণ নিয়েছেন, সে তথ্য পাওয়া যায়নি।

জানা যায়, ২০২০ সালের জানুয়ারিতে জাতীয় সংসদে প্রথমবার ব্যাংক পরিচালকদের ঋণের তথ্য প্রকাশ করেছিলেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। ২০১৯ সালের সেপ্টম্বরভিত্তিক তথ্য নিয়ে সে সময় প্রকাশিত তথ্যানুয়ায়ী, ওই সময় ব্যাংক পরিচালকদের ঋণের পরিমাণ ছিল এক লাখ ৭৩ হাজার ২৩১ কোটি টাকা বা ১১ দশমিক ২১ শতাংশ। এর মধ্যে অন্য ব্যাংক থেকে পরিচালকদের নেওয়া ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৭১ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা। এর মানে গত তিন বছরে পরিচালকদের ঋণ পরিমাণের দিক থেকে সামান্য কমলেও শতাংশ হিসেবে বেড়েছে।

ঋণ দেওয়া-নেওয়ায় শীর্ষ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান

অন্য ব্যাংকের পরিচালকদের অনুকূলে সবচেয়ে বেশি ঋণ দিয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। ব্যাংকটির ঋণ বিতরণের পরিমাণ ২৩ হাজার ৯১০ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। এর পরেই আছে জনতা ব্যাংক; ১৩ হাজার ৪২৫ কোটি ৭১ লাখ টাকা। সিটি ব্যাংক দিয়েছে ৯ হাজার ১২ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। তবে ঋণ বিতরণে শতাংশ হিসেবে শীর্ষ রয়েছে সিটি ব্যাংক; ২৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ। এ ছাড়া জনতা ব্যাংক ১৯ দশমিক ৩৭ শতাংশ ও ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ ১৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ। অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণে শীর্ষ রয়েছেন মিডল্যান্ড, ফার্স্ট সিকিউরিটি ও যমুনা ব্যাংকের পরিচালকরা। এর মধ্যে অন্য ব্যাংক থেকে মিডল্যান্ড ব্যাংকের পরিচালকরা নিয়েছেন ১১ হাজার ৪৯২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের পরিচালকরা নিয়েছেন ১০ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা। আর যমুনা ব্যাংকের পরিচালকরা নিয়েছেন ৯ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা। অন্যদিকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালকদের ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে শীর্ষ থাকা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- ইউনিয়ন ক্যাপিটাল (৭৫২ কোটি), উত্তরা ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টস (৪৯১ কোটি) ও প্রাইম ফাইন্যান্স (২৮১ কোটি টাকা)।

চলছে সুদ মওকুফের প্রতিযোগিতা

হঠাৎ করেই বেসরকারি ব্যাংকগুলোয় ঋণের সুদ মওকুফের প্রবণতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন- এই তিন মাসে বেসরকারি ব্যাংকগুলো ঋণের সুদ মওকুফ করেছে ২ হাজার ৫৫৭ কোটি টাকা। যা আগের (জানুয়ারি-মার্চ) প্রান্তিকে ছিল মাত্র ১৯১ কোটি টাকা। সূত্রগুলো বলছে, গত ২৪ মে ব্যাংকের পরিচালক, পরিবারের সদস্য বা তাদের স্বার্থসংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সুদ মওকুফে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদনের যে বাধ্যবাধকতা দেওয়া ছিল, তা তুলে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এই শর্ত শিথিলের পরই ব্যাংক ও পরিচালকরা কৌশলে নিজেদের ঋণের সুদ মওকুফ করে নিচ্ছেন। যদিও এই শর্ত শিথিলের আগেও বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তি সাপেক্ষে দেশের শীর্ষ দুই ব্যবসায়ী গ্রুপ একে অপরের ব্যাংক থেকে প্রায় চার হাজার কোটি টাকার সুদ মওকুফ সুবিধা নেয়।

Tag :
জনপ্রিয়

দেশের ব্যাংকিং খাতের আসল চিত্র জানানোর জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর।

ঋণভাগ ও সুদ মাফে আঁতাত

প্রকাশের সময় : ০৯:৩৬:০০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২

নিজেদের মধ্যে আঁতাত করে ব্যাংকের পরিচালকরা মিলেমিশে একে অন্যের ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিচ্ছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত জুন শেষে পরিচালকদের নেওয়া ব্যাংকঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা। বেসরকারি মিডল্যান্ড, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ও যমুনা ব্যাংকের পরিচালকরা অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ায় শীর্ষে রয়েছেন। আর অন্য ব্যাংকের পরিচালকদের ঋণ দেওয়ায় শীর্ষে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, জনতা ব্যাংক ও দি সিটি ব্যাংক।

শুধু পরিচালকই নন, ব্যাংক থেকে তাদের আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবও ক্ষমতার জোরে নিয়মবহির্ভূত ঋণ নিয়েছেন। এসব ঋণের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খেলাপি হলেও বছরের পর বছর তা ‘নিয়মিত’ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। আবার ঋণ ফেরত না দিয়ে পরিচালকদের মধ্যে অনৈতিকভাবে সুদ মওকুফ করে নেওয়ার প্রবণতাও বাড়ছে।

সর্বশেষ তিন মাসে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের আড়াই হাজার কোটি টাকার বেশি সুদ মওকুফ করেছে, যার সিংহভাগই পরিচালকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বলে জানা গেছে।

অর্থনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংক পরিচালকদের ঋণ ভাগাভাগির কারণে সাধারণ ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা পর্যাপ্ত ঋণ পাচ্ছেন না। এ ছাড়া পরিচালকদের কাছে বিপুল অঙ্কের ঋণ কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ায় ঝুঁকি বাড়ছে ব্যাংক খাতেও।

বর্তমানে একটি ব্যাংকের পরিচালক রয়েছেন সর্বোচ্চ ২০ জন। এ হিসাবে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর পরিচালকের সংখ্যা এক হাজারেরও কম। তবে তাদের সবাই ঋণগ্রহীতা নন। এ তালিকায় আছেন কয়েকশ পরিচালক। তুলনামূলক বিচারে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে তারাই শীর্ষে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালকদের বেশিরভাগই দেশের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী। কয়েক কোটি টাকা পুঁজি নিয়ে ব্যাংকের পরিচালক হয়েছিলেন এমন অনেকেই এখন শত শত কোটি টাকার মালিক। আর তা সম্ভব হয়েছে ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে ঋণ বের করে নেওয়ার কারণেই। প্রভাব বিস্তার করে নেওয়া এসব ঋণ তারা ঠিকমতো ফেরতও দিচ্ছেন না। পুনঃতফসিল ওপুনর্গঠন করে বছরের পর বছর নিয়মিত রাখতে বাধ্য করেন।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, নিজের ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার সুযোগ কম থাকায় অন্য ব্যাংক থেকে ভাগাভাগি করে ঋণ নিচ্ছেন পরিচালকরা। এ ঘটনা সবারই জানা। বেশ কিছু দিন আগে এক ব্যাংকের পরিচালক ঋণের জন্য অন্য একটি ব্যাংকের এমডিকে পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করল। এটি কীসের আলামত। নিশ্চয়ই এটি ব্যাংকিং খাতের জন্য খারাপ দৃষ্টান্ত এবং সুশাসনের পরিপন্থী। আসলে ব্যবসায়ীদের ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়াই ঠিক হয়নি। তারা ব্যবসার জন্যই ব্যাংকের সম্পদ ব্যবহার করবে। এটিকে বন্ধ করার কোনো পদক্ষেপও লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। নতুন গভর্নর এসে উল্টো ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠন এবং সুদ মওকুফের ক্ষমতা ব্যাংকগুলোর পর্ষদের হাতে তুলে দিলেন। এতে ব্যাংক পরিচালকরা আরও উৎসাহিত হবেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, যারা ব্যাংকের মালিক তারাই ব্যবসায়ী। ফলে ব্যাংক খাতে সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ব্যবসায়ীদের ব্যাংকের পরিচালক পদে না রাখা এবং নতুন করে পরিচালক হওয়ার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করে আইন সংশোধন করতে পারলে এই প্রবণতা রোধ করা সম্ভব হবে।

গত কয়েক বছরে ব্যাংক পরিচালকদের হস্তক্ষেপে বেশ কিছু জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে কিছু পরিচালকের স্বার্থসংশ্লিষ্টতায় সোনালী ব্যাংকে ঘটেছে হলমার্ক কেলেঙ্কারি। বেসিক ব্যাংকে হয়েছে নজিরবিহীন লুটপাট। কয়েকটি ব্যাংকের পরিচালকদের সংশ্লিষ্টতায় ঘটেছে বিসমিল্লাহ গ্রুপের জালিয়াতি। পরিচালকদের হস্তক্ষেপে সরকারি ব্যাংকের সিএসআরের টাকা নিয়ে নয়ছয় হয়েছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) এক গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যাংকিং খাতে সংঘটিত ৯০ শতাংশ অনিয়ম-অপরাধে ব্যাংকের নিজস্ব লোকজন জড়িত থাকেন।

ব্যাংক কোম্পানি আইনের ১৭ (২) ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যাংক পরিচালক অন্য কোনো ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পরিশোধ না করলে যে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন, ওই ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে ওই খেলাপি পরিচালককে নোটিশ দেবে। নোটিশ দেওয়ার দুই মাসের মধ্যে ঋণ পরিশোধ না করলে খেলাপি ব্যক্তি তার ব্যাংকে পরিচালকের পদ হারাবেন। কিন্তু পরিচালকদের ঋণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সম্পর্ক, যোগসাজশ ও প্রভাব-প্রতিপত্তি খাটিয়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

জানা যায়, আগে পরিচালকরা নিজ ব্যাংক থেকেই বেশিমাত্রায় ঋণ নিতেন এবং পরিশোধ করতেন না। যখন খেলাপি হয়ে যেতেন, তখন বেনামি ঋণ সৃষ্টি করে ওই ঋণ পরিশোধ দেখাতেন। পরিচালকদের এ ধরনের অনৈতিক কার্যক্রম ঠেকাতে নিজের ব্যাংক থেকে কী পরিমাণ ঋণ নেওয়া যাবে, তার একটি সীমা বেঁধে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রচলিত নিয়মে ব্যাংক পরিচালকরা নিজ ব্যাংক থেকে তাদের মোট শেয়ারের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ নিতে পারেন। তবে এক ব্যাংকের পরিচালকের অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে এ রকম কোনো সীমা টানা নেই। যে কারণে নিজেদের মধ্যে আঁতাত করে এক ব্যাংকের পরিচালক অন্য ব্যাংক থেকে ইচ্ছামতো ঋণ নিচ্ছেন।

ব্যাংক পরিচালকদের যত ঋণ

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে গত জুন শেষে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিতরণ করা ঋণের স্থিতি ছিল ১৩ কোটি ৯৮ হাজার ৫১২ কোটি টাকা। এসব ঋণের মধ্যে এক ব্যাংকের পরিচালকদের অন্য ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৯ হাজার ৭৫৯ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ১১ দশমিক ৪২ শতাংশ। তিন মাস আগে পরিচালকদের এ ধরনের ঋণের স্থিতি ছিল আরও বেশি, প্রায় ১ লাখ ৬১ হাজার ৯৩৪ কোটি টাকা বা ১২ দশমিক ৩৪ শতাংশ। তবে নিজ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে পরিচালকরা কী পরিমাণ ঋণ নিয়েছেন, সে তথ্য পাওয়া যায়নি।

জানা যায়, ২০২০ সালের জানুয়ারিতে জাতীয় সংসদে প্রথমবার ব্যাংক পরিচালকদের ঋণের তথ্য প্রকাশ করেছিলেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। ২০১৯ সালের সেপ্টম্বরভিত্তিক তথ্য নিয়ে সে সময় প্রকাশিত তথ্যানুয়ায়ী, ওই সময় ব্যাংক পরিচালকদের ঋণের পরিমাণ ছিল এক লাখ ৭৩ হাজার ২৩১ কোটি টাকা বা ১১ দশমিক ২১ শতাংশ। এর মধ্যে অন্য ব্যাংক থেকে পরিচালকদের নেওয়া ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৭১ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা। এর মানে গত তিন বছরে পরিচালকদের ঋণ পরিমাণের দিক থেকে সামান্য কমলেও শতাংশ হিসেবে বেড়েছে।

ঋণ দেওয়া-নেওয়ায় শীর্ষ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান

অন্য ব্যাংকের পরিচালকদের অনুকূলে সবচেয়ে বেশি ঋণ দিয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। ব্যাংকটির ঋণ বিতরণের পরিমাণ ২৩ হাজার ৯১০ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। এর পরেই আছে জনতা ব্যাংক; ১৩ হাজার ৪২৫ কোটি ৭১ লাখ টাকা। সিটি ব্যাংক দিয়েছে ৯ হাজার ১২ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। তবে ঋণ বিতরণে শতাংশ হিসেবে শীর্ষ রয়েছে সিটি ব্যাংক; ২৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ। এ ছাড়া জনতা ব্যাংক ১৯ দশমিক ৩৭ শতাংশ ও ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ ১৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ। অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণে শীর্ষ রয়েছেন মিডল্যান্ড, ফার্স্ট সিকিউরিটি ও যমুনা ব্যাংকের পরিচালকরা। এর মধ্যে অন্য ব্যাংক থেকে মিডল্যান্ড ব্যাংকের পরিচালকরা নিয়েছেন ১১ হাজার ৪৯২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের পরিচালকরা নিয়েছেন ১০ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা। আর যমুনা ব্যাংকের পরিচালকরা নিয়েছেন ৯ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা। অন্যদিকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালকদের ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে শীর্ষ থাকা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- ইউনিয়ন ক্যাপিটাল (৭৫২ কোটি), উত্তরা ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টস (৪৯১ কোটি) ও প্রাইম ফাইন্যান্স (২৮১ কোটি টাকা)।

চলছে সুদ মওকুফের প্রতিযোগিতা

হঠাৎ করেই বেসরকারি ব্যাংকগুলোয় ঋণের সুদ মওকুফের প্রবণতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন- এই তিন মাসে বেসরকারি ব্যাংকগুলো ঋণের সুদ মওকুফ করেছে ২ হাজার ৫৫৭ কোটি টাকা। যা আগের (জানুয়ারি-মার্চ) প্রান্তিকে ছিল মাত্র ১৯১ কোটি টাকা। সূত্রগুলো বলছে, গত ২৪ মে ব্যাংকের পরিচালক, পরিবারের সদস্য বা তাদের স্বার্থসংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সুদ মওকুফে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদনের যে বাধ্যবাধকতা দেওয়া ছিল, তা তুলে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এই শর্ত শিথিলের পরই ব্যাংক ও পরিচালকরা কৌশলে নিজেদের ঋণের সুদ মওকুফ করে নিচ্ছেন। যদিও এই শর্ত শিথিলের আগেও বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তি সাপেক্ষে দেশের শীর্ষ দুই ব্যবসায়ী গ্রুপ একে অপরের ব্যাংক থেকে প্রায় চার হাজার কোটি টাকার সুদ মওকুফ সুবিধা নেয়।