ঢাকা ১১:৩৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০২২, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ
আস্ত কেনার নেই সামর্থ্য

গরিবের ভরসা এখন ভাগার মাছ-মাংস

সব ধরনের পণ্যমূল্য অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় তিন বেলার আহার জোটাতে বিভিন্ন পন্থা বেছে নিচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষ। কেউ খাওয়া কমিয়েছে, কেউ অর্ধেক পণ্য কিনছে, কেউ আবার মাছ-মাংস কেনা বাদ দিয়ে ডাল-ভাত, সবজি দিয়েই পেট ভরছে। তবুও সপ্তাহে অন্তত একটি দিন পরিবারের সদস্যদের মুখে মাছ কিংবা মাংস তো দিতে হয়; কিন্তু যে দাম তাতে সামর্থ্যে কুলায় না। এখানেও বিকল্প উপায় বের করেছে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। আস্ত মাছ কিংবা মুরগি কেনার সামর্থ্য নেই, তাই গরিব মানুষগুলো এখন ভাগায় বিক্রি করা মাছ-মাংস কিনে সন্তানের মুখে কিছুটা আমিষ তুলে দেওয়ার চেষ্টা করছে।

রাজধানীর ভোগ্যপণ্যের বাজারগুলোতে গেলেই এখন চোখে পড়ছে ভাগায় মাছ কিংবা মুরগি বিক্রির চিত্র। দেশের মানুষ এত দিন পাশের দেশের পশ্চিমবঙ্গের গল্প শুনেছে, সেখানে একটি ইলিশ চার-পাঁচজনে ভাগ করে কেনে। শুধু ইলিশ নয়, সেখানে ভাগায় আরও অনেক পণ্য কেনার গল্প শোনা যায়। এখন আর পশ্চিমবঙ্গের গল্প নয়, খোদ রাজধানী ঢাকার প্রায় প্রতিটি বাজারেই এ চিত্র দেখা যাচ্ছে।

একটি মুরগি কয়েক খণ্ড করে বিক্রি করা হচ্ছে। সেখান থেকে একজন ক্রেতা তার সামর্থ্য অনুযায়ী মুরগির মাংস কিনছেন। কেউ ৩০০ গ্রাম, কেউ ৫০০ গ্রাম আবার কেউ ৭০০ গ্রাম মুরগির মাংস কিনছেন। গরিব মানুষ সাধারণত মাছের বাজারে গেলে পাঙাশ কিংবা তেলাপিয়া মাছ বেশি কেনেন। গত বছরও এসব মাছ ১০০ থেকে ১২০ টাকায় কিনতে পেরেছেন তারা। এখন এসব মাছের কেজিও ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। বাজারে সাধারণত এক থেকে দেড় কেজি ওজনের পাঙাশই বেশি বিক্রি হয়। দাম বেড়ে যাওয়ায় নিম্ন আয়ের মানুষের পক্ষে আর আস্ত একটি পাঙাশ কেনার সামর্থ্য নেই। ফলে পাঙাশ মাছ এখন তারা ভাগায় কিনছেন। এভাবে ভাগায় বা অল্প পরিমাণে মাছ-মাংস কেনার ক্রেতার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরাও চাহিদামতো ব্যবস্থা করছেন। তারাও এখন দোকানে মাছ ও মুরগি কেটে রেখে দিচ্ছেন।

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনা আগে কখনো দেখা যায়নি। দেশের মানুষের জন্য এগুলো নতুন অভিজ্ঞতা। এ বিষয়ে কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সহ-সভাপতি এসএম নাজের হোসেন বলেন, ‘আমরা এত দিন গল্প শুনতাম, পশ্চিমবঙ্গে ভাগায় মাছ-মাংস কেনাবেচা হয়, কিন্তু আমাদের দেশের জন্য এটি নতুন অভিজ্ঞতা। আসলে একদিকে মানুষের আয় কমে গেছে, অন্যদিকে সব ধরনের ভোগ্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিক বেড়েছে। সরকার স্বীকার করুক বা না করুক-দেশের একটি শ্রেণির মানুষ খুব কষ্টে আছে। তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে কয়েকগুণ, কিন্তু আয় বাড়েনি। তাই নিতান্ত বেঁচে থাকার তাগিদে ভাগায় মাছ-মাংস কিনছে সাধারণ মানুষ। শুধু গরিব মানুষ নয়, অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারও এ পন্থা বেছে নিয়েছে। আমাদের কাছেও তথ্য আছেÑশুধু মাছ মাংস নয়, সবজিও ভাগায় কিনছে। এতেই বোঝা যায়, দেশের একটি শ্রেণির মানুষ খুব কষ্টে আছে। আমাদের দেশে এভাবে ভাগায় মাছ-মাংস কেনার মতো পরিস্থিতি তৈরি হবে সেটি আমরা ভাবতেও পারিনি।’

ভাগায় মাছ-মাংস বেচা-কেনার পরিস্থিতি সরেজমিন দেখতে গত কয়েক দিন ঢাকার কারওয়ান বাজার, মিরপুর শাহআলী মার্কেট, কল্যাণপুর নতুন বাজার, পশ্চিম শেওড়াপাড়া খালপাড় বাজার, শেওড়াপাড়া বাসস্ট্যান্ড বাজার, যাত্রাবাড়ী বাজার, নয়াবাজার, বেগমগঞ্জের বউবাজার, রায় সাহেব বাজারসহ আরও কয়েকটি বাজার ঘুরেই কেটে কেটে ভাগায় মাছ-মাংস বিক্রি করতে দেখা যায়।

পশ্চিম শেওড়াপাড়া বাজারে একেবারে রাস্তার সঙ্গেই সিরাজুল ইসলামের মুরগির দোকান। ১০ বছর ধরে তিনি এ বাজারে মুরগির ব্যবসা করছেন। তার দোকানে বাঁকানো রডে ঝুঁলিয়ে রাখা হয়েছে মুরগির রান-সিনার পিস। মুরগির মাংস এভাবে ঝুলিয়ে রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘এখন আস্ত মুরগি কেনা কাস্টমারের চেয়ে ২০০, ৩০০ বা ৫০০ গ্রাম করে কাটা মুরগির মাংস কেনার ক্রেতা বেশি। এ জন্য মুরগি কেটে গরুর মাংসের মতো ঝুলিয়ে রেখেছি। এখন আমার দোকানে আস্ত মুরগির চেয়ে কাটা মুরগির মাংসই বেশি বিক্রি হয়।’ এর আগে কখনো এভাবে মুরগির মাংস বিক্রি করেছেন কি নাÑএর জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার ১০ বছরের ব্যবসায়ী জীবনে কখনো এভাবে কেটে মুরগির মাংস বিক্রি করিনি। গত ৬ থেকে ৮ মাস ধরে এভাবে বিক্রি করছি।’

সিরাজুলের সঙ্গে কথা বলার সময়ই মাঝ বয়সি শরিফা খাতুন নামের এক ক্রেতা দোকানটিতে আসেন মুরগির মাংস নিতে। প্রথমেই তিনি কেজিপ্রতি দাম জানতে চান। দোকানদার জানালেন ৩২০ টাকা কেজি। শরিফা মুরগির রান থেকে ৫০০ গ্রাম মাংস কেটে দিতে বলেন। দোকানদার সেভাবেই কেটে দেন।

আস্ত মুরগি না কিনে কাটা মাংস কেনার বিষয়ে জানতে চাইলে শরিফা খাতুন বলেন, ‘আস্ত মুরগি কেনার সামর্থ্য নেই, তাই কাটা মাংস কিনলাম। আগে ১৫০ টাকায় এক কেজি ব্রয়লার অথবা একটি ছোট আকারের সোনালি মুরগি কিনতে পারতাম। এখন সে সুযোগ নেই। সপ্তাহের প্রায় ছয় দিনই ডাল, আলু ভর্তা কিংবা সবজি দিয়ে ভাত খাচ্ছি। ঘরে তিনটি সন্তান। তারা প্রতিদিন এসব খেতে চায় না। অন্তত সপ্তাহে একটা দিন যাতে এক টুকরো হলেও তাদের মুখে মাংস দিতে পারি সে জন্য এভাবে কিনলাম। আমার স্বামী একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের গাড়িচালক। মাসে বেতন পায় ২০ হাজার টাকা। ঘরভাড়া ও বড় দুই সন্তানের লেখাপড়ার খরচেই তা প্রায় শেষ হয়ে যায়। এর পর যা থাকে তা দিয়েই পুরো মাসের বাজারসহ সংসারের অন্যান্য ব্যয় মেটাতে হয়। সুতরাং আস্ত মুরগি কেনার টাকা কোথায় পাব। আমাদের তো বাড়তি কোনো আয় নেই।

শুধু শরিফা খাতুন নন, রাজধানীর বিভিন্ন বাজারের মুরগির দোকানে এখন কাটা মুরগির প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন ক্রেতারা।

মিরপুর এক নম্বর এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আবুল কালাম। শাহআলী বাজারে লেয়ার মুরগি কিনতে এসে কাটা ব্রয়লার কেনেন। তিনি বলেন, ‘সাদা লেয়ার ২৪০ আর লাল লেয়ার মুরগি কিনতাম ২৫০ টাকার মধ্যে। সেই মুরগির দাম এখন চাওয়া হচ্ছে ৩০০ থেকে ৩২০ টাকা। উপায় না পেয়ে কাটা ব্রয়লারের মাংস কিনছি আধা কেজি ১০০ টাকায়।’

একই বাজারের আরেক ক্রেতা ভ্যানচালক জয়নাল মণ্ডল বলেন, ‘কাম বন্ধ করার সুযোগ নাই। দিন আনি, দিন খাই। বাজারের অবস্থা আগের মতো নাই। সপ্তাহে অন্তত একটি দিন বউ-বাচ্চা ভালো খাওনের আশা করে। নিজেরও মন চায়। গরু-খাসির মাংসের যে দাম কেনার কথা তো চিন্তাই করি না। দেশি মুরগিও খাই না অনেক দিন। লেয়ার, কক মুরগির দামও বাড়ছে। ব্রয়লার গত মাসখানেক আগেও কিনছিলাম ১৬০ টাকা, আজ ২০০ টাকায়। এভাবে দাম বাড়লে আস্ত মুরগি কীভাবে কিনব। আস্ত মুরগি কেনার সামর্থ্য এখন আমাদের নেই।’

রাজধানীর কারওয়ান বাজারেই রাস্তার ধারে বসে সবজি বিক্রি করেন ইয়াকুব আলী। পণ্য বিক্রির এক ফাঁকে সন্তানকে দোকানে রেখে বাজারে এসেছিলেন মাছ কিনতে। অন্য কোনো দামি মাছ নয়, পাঙাশ মাছ কিনতে এসেছেন তিনি। তিনি বলেন, ‘এ পাঙাশ কয়েক মাস আগেও ছিল ১০০ থেকে ১২০ টাকা। এখন দ্বিগুণ দাম বেড়ে হয়েছে ২০০ থেকে ২২০ টাকা। একেকটি পাঙাশ মাছ কম করে হলেও দুই কেজি থেকে চার-পাঁচ কেজি পর্যন্ত হয়। দুই কেজি ওজনের একটি পাঙাশ কিনতে গেলেও এখন ৪০০ থেকে ৪৪০ টাকা লাগবে। মাছ কিনতেই যদি এত টাকা ব্যয় করি, চাল, ডাল, তেল, সবজিসহ অন্যান্য পণ্য কিনব কীভাবে। তাই আধা কেজি পাঙাশ মাছ কিনলাম ১১০ টাকা দিয়ে। কী করব আমরা গরিব মানুষ। আয় বেশি না, তাই এভাবেই খেয়ে বেঁচে আছি।’

অর্থনীতিবিদ এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের মতে, সমাজের আয় বৈষম্যের কারণেই এক শ্রেণির মানুষের এখন বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, ‘এই সঙ্কটকালেও একটি গ্রুপ অর্থ-বিত্তে আরও ফুলে-ফেঁপে উঠছে। আরেকটি গ্রুপের তিন বেলার আহার জোগাড় করাই কঠিন হয়ে পড়ছে। সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হচ্ছে-এসব নিম্ন আয়ের পরিবারের সন্তানরা পুষ্টিহীনতার শিকার হচ্ছে। কারণ তাদের বাবা-মা প্রতিদিন যেটুকু আমিষ দরকার সেটি দিতে পারছেন না সামর্থ্যরে অভাবে। হয়তো এখনই এর প্রভাব চোখে পড়বে না, কিন্তু এক-দুই বছর পর নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর সন্তানের পুষ্টিহীনতার চিত্রটা প্রকট আকারে ফুটে উঠবে।’

Tag :
জনপ্রিয়

রসিক নির্বাচন ; আ’লীগের মেয়র প্রার্থী ডালিয়ার গণসংযোগ অনুষ্ঠিত

আস্ত কেনার নেই সামর্থ্য

গরিবের ভরসা এখন ভাগার মাছ-মাংস

প্রকাশের সময় : ০৯:২৯:২৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২

সব ধরনের পণ্যমূল্য অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় তিন বেলার আহার জোটাতে বিভিন্ন পন্থা বেছে নিচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষ। কেউ খাওয়া কমিয়েছে, কেউ অর্ধেক পণ্য কিনছে, কেউ আবার মাছ-মাংস কেনা বাদ দিয়ে ডাল-ভাত, সবজি দিয়েই পেট ভরছে। তবুও সপ্তাহে অন্তত একটি দিন পরিবারের সদস্যদের মুখে মাছ কিংবা মাংস তো দিতে হয়; কিন্তু যে দাম তাতে সামর্থ্যে কুলায় না। এখানেও বিকল্প উপায় বের করেছে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। আস্ত মাছ কিংবা মুরগি কেনার সামর্থ্য নেই, তাই গরিব মানুষগুলো এখন ভাগায় বিক্রি করা মাছ-মাংস কিনে সন্তানের মুখে কিছুটা আমিষ তুলে দেওয়ার চেষ্টা করছে।

রাজধানীর ভোগ্যপণ্যের বাজারগুলোতে গেলেই এখন চোখে পড়ছে ভাগায় মাছ কিংবা মুরগি বিক্রির চিত্র। দেশের মানুষ এত দিন পাশের দেশের পশ্চিমবঙ্গের গল্প শুনেছে, সেখানে একটি ইলিশ চার-পাঁচজনে ভাগ করে কেনে। শুধু ইলিশ নয়, সেখানে ভাগায় আরও অনেক পণ্য কেনার গল্প শোনা যায়। এখন আর পশ্চিমবঙ্গের গল্প নয়, খোদ রাজধানী ঢাকার প্রায় প্রতিটি বাজারেই এ চিত্র দেখা যাচ্ছে।

একটি মুরগি কয়েক খণ্ড করে বিক্রি করা হচ্ছে। সেখান থেকে একজন ক্রেতা তার সামর্থ্য অনুযায়ী মুরগির মাংস কিনছেন। কেউ ৩০০ গ্রাম, কেউ ৫০০ গ্রাম আবার কেউ ৭০০ গ্রাম মুরগির মাংস কিনছেন। গরিব মানুষ সাধারণত মাছের বাজারে গেলে পাঙাশ কিংবা তেলাপিয়া মাছ বেশি কেনেন। গত বছরও এসব মাছ ১০০ থেকে ১২০ টাকায় কিনতে পেরেছেন তারা। এখন এসব মাছের কেজিও ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। বাজারে সাধারণত এক থেকে দেড় কেজি ওজনের পাঙাশই বেশি বিক্রি হয়। দাম বেড়ে যাওয়ায় নিম্ন আয়ের মানুষের পক্ষে আর আস্ত একটি পাঙাশ কেনার সামর্থ্য নেই। ফলে পাঙাশ মাছ এখন তারা ভাগায় কিনছেন। এভাবে ভাগায় বা অল্প পরিমাণে মাছ-মাংস কেনার ক্রেতার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরাও চাহিদামতো ব্যবস্থা করছেন। তারাও এখন দোকানে মাছ ও মুরগি কেটে রেখে দিচ্ছেন।

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনা আগে কখনো দেখা যায়নি। দেশের মানুষের জন্য এগুলো নতুন অভিজ্ঞতা। এ বিষয়ে কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সহ-সভাপতি এসএম নাজের হোসেন বলেন, ‘আমরা এত দিন গল্প শুনতাম, পশ্চিমবঙ্গে ভাগায় মাছ-মাংস কেনাবেচা হয়, কিন্তু আমাদের দেশের জন্য এটি নতুন অভিজ্ঞতা। আসলে একদিকে মানুষের আয় কমে গেছে, অন্যদিকে সব ধরনের ভোগ্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিক বেড়েছে। সরকার স্বীকার করুক বা না করুক-দেশের একটি শ্রেণির মানুষ খুব কষ্টে আছে। তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে কয়েকগুণ, কিন্তু আয় বাড়েনি। তাই নিতান্ত বেঁচে থাকার তাগিদে ভাগায় মাছ-মাংস কিনছে সাধারণ মানুষ। শুধু গরিব মানুষ নয়, অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারও এ পন্থা বেছে নিয়েছে। আমাদের কাছেও তথ্য আছেÑশুধু মাছ মাংস নয়, সবজিও ভাগায় কিনছে। এতেই বোঝা যায়, দেশের একটি শ্রেণির মানুষ খুব কষ্টে আছে। আমাদের দেশে এভাবে ভাগায় মাছ-মাংস কেনার মতো পরিস্থিতি তৈরি হবে সেটি আমরা ভাবতেও পারিনি।’

ভাগায় মাছ-মাংস বেচা-কেনার পরিস্থিতি সরেজমিন দেখতে গত কয়েক দিন ঢাকার কারওয়ান বাজার, মিরপুর শাহআলী মার্কেট, কল্যাণপুর নতুন বাজার, পশ্চিম শেওড়াপাড়া খালপাড় বাজার, শেওড়াপাড়া বাসস্ট্যান্ড বাজার, যাত্রাবাড়ী বাজার, নয়াবাজার, বেগমগঞ্জের বউবাজার, রায় সাহেব বাজারসহ আরও কয়েকটি বাজার ঘুরেই কেটে কেটে ভাগায় মাছ-মাংস বিক্রি করতে দেখা যায়।

পশ্চিম শেওড়াপাড়া বাজারে একেবারে রাস্তার সঙ্গেই সিরাজুল ইসলামের মুরগির দোকান। ১০ বছর ধরে তিনি এ বাজারে মুরগির ব্যবসা করছেন। তার দোকানে বাঁকানো রডে ঝুঁলিয়ে রাখা হয়েছে মুরগির রান-সিনার পিস। মুরগির মাংস এভাবে ঝুলিয়ে রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘এখন আস্ত মুরগি কেনা কাস্টমারের চেয়ে ২০০, ৩০০ বা ৫০০ গ্রাম করে কাটা মুরগির মাংস কেনার ক্রেতা বেশি। এ জন্য মুরগি কেটে গরুর মাংসের মতো ঝুলিয়ে রেখেছি। এখন আমার দোকানে আস্ত মুরগির চেয়ে কাটা মুরগির মাংসই বেশি বিক্রি হয়।’ এর আগে কখনো এভাবে মুরগির মাংস বিক্রি করেছেন কি নাÑএর জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার ১০ বছরের ব্যবসায়ী জীবনে কখনো এভাবে কেটে মুরগির মাংস বিক্রি করিনি। গত ৬ থেকে ৮ মাস ধরে এভাবে বিক্রি করছি।’

সিরাজুলের সঙ্গে কথা বলার সময়ই মাঝ বয়সি শরিফা খাতুন নামের এক ক্রেতা দোকানটিতে আসেন মুরগির মাংস নিতে। প্রথমেই তিনি কেজিপ্রতি দাম জানতে চান। দোকানদার জানালেন ৩২০ টাকা কেজি। শরিফা মুরগির রান থেকে ৫০০ গ্রাম মাংস কেটে দিতে বলেন। দোকানদার সেভাবেই কেটে দেন।

আস্ত মুরগি না কিনে কাটা মাংস কেনার বিষয়ে জানতে চাইলে শরিফা খাতুন বলেন, ‘আস্ত মুরগি কেনার সামর্থ্য নেই, তাই কাটা মাংস কিনলাম। আগে ১৫০ টাকায় এক কেজি ব্রয়লার অথবা একটি ছোট আকারের সোনালি মুরগি কিনতে পারতাম। এখন সে সুযোগ নেই। সপ্তাহের প্রায় ছয় দিনই ডাল, আলু ভর্তা কিংবা সবজি দিয়ে ভাত খাচ্ছি। ঘরে তিনটি সন্তান। তারা প্রতিদিন এসব খেতে চায় না। অন্তত সপ্তাহে একটা দিন যাতে এক টুকরো হলেও তাদের মুখে মাংস দিতে পারি সে জন্য এভাবে কিনলাম। আমার স্বামী একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের গাড়িচালক। মাসে বেতন পায় ২০ হাজার টাকা। ঘরভাড়া ও বড় দুই সন্তানের লেখাপড়ার খরচেই তা প্রায় শেষ হয়ে যায়। এর পর যা থাকে তা দিয়েই পুরো মাসের বাজারসহ সংসারের অন্যান্য ব্যয় মেটাতে হয়। সুতরাং আস্ত মুরগি কেনার টাকা কোথায় পাব। আমাদের তো বাড়তি কোনো আয় নেই।

শুধু শরিফা খাতুন নন, রাজধানীর বিভিন্ন বাজারের মুরগির দোকানে এখন কাটা মুরগির প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন ক্রেতারা।

মিরপুর এক নম্বর এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আবুল কালাম। শাহআলী বাজারে লেয়ার মুরগি কিনতে এসে কাটা ব্রয়লার কেনেন। তিনি বলেন, ‘সাদা লেয়ার ২৪০ আর লাল লেয়ার মুরগি কিনতাম ২৫০ টাকার মধ্যে। সেই মুরগির দাম এখন চাওয়া হচ্ছে ৩০০ থেকে ৩২০ টাকা। উপায় না পেয়ে কাটা ব্রয়লারের মাংস কিনছি আধা কেজি ১০০ টাকায়।’

একই বাজারের আরেক ক্রেতা ভ্যানচালক জয়নাল মণ্ডল বলেন, ‘কাম বন্ধ করার সুযোগ নাই। দিন আনি, দিন খাই। বাজারের অবস্থা আগের মতো নাই। সপ্তাহে অন্তত একটি দিন বউ-বাচ্চা ভালো খাওনের আশা করে। নিজেরও মন চায়। গরু-খাসির মাংসের যে দাম কেনার কথা তো চিন্তাই করি না। দেশি মুরগিও খাই না অনেক দিন। লেয়ার, কক মুরগির দামও বাড়ছে। ব্রয়লার গত মাসখানেক আগেও কিনছিলাম ১৬০ টাকা, আজ ২০০ টাকায়। এভাবে দাম বাড়লে আস্ত মুরগি কীভাবে কিনব। আস্ত মুরগি কেনার সামর্থ্য এখন আমাদের নেই।’

রাজধানীর কারওয়ান বাজারেই রাস্তার ধারে বসে সবজি বিক্রি করেন ইয়াকুব আলী। পণ্য বিক্রির এক ফাঁকে সন্তানকে দোকানে রেখে বাজারে এসেছিলেন মাছ কিনতে। অন্য কোনো দামি মাছ নয়, পাঙাশ মাছ কিনতে এসেছেন তিনি। তিনি বলেন, ‘এ পাঙাশ কয়েক মাস আগেও ছিল ১০০ থেকে ১২০ টাকা। এখন দ্বিগুণ দাম বেড়ে হয়েছে ২০০ থেকে ২২০ টাকা। একেকটি পাঙাশ মাছ কম করে হলেও দুই কেজি থেকে চার-পাঁচ কেজি পর্যন্ত হয়। দুই কেজি ওজনের একটি পাঙাশ কিনতে গেলেও এখন ৪০০ থেকে ৪৪০ টাকা লাগবে। মাছ কিনতেই যদি এত টাকা ব্যয় করি, চাল, ডাল, তেল, সবজিসহ অন্যান্য পণ্য কিনব কীভাবে। তাই আধা কেজি পাঙাশ মাছ কিনলাম ১১০ টাকা দিয়ে। কী করব আমরা গরিব মানুষ। আয় বেশি না, তাই এভাবেই খেয়ে বেঁচে আছি।’

অর্থনীতিবিদ এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের মতে, সমাজের আয় বৈষম্যের কারণেই এক শ্রেণির মানুষের এখন বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, ‘এই সঙ্কটকালেও একটি গ্রুপ অর্থ-বিত্তে আরও ফুলে-ফেঁপে উঠছে। আরেকটি গ্রুপের তিন বেলার আহার জোগাড় করাই কঠিন হয়ে পড়ছে। সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হচ্ছে-এসব নিম্ন আয়ের পরিবারের সন্তানরা পুষ্টিহীনতার শিকার হচ্ছে। কারণ তাদের বাবা-মা প্রতিদিন যেটুকু আমিষ দরকার সেটি দিতে পারছেন না সামর্থ্যরে অভাবে। হয়তো এখনই এর প্রভাব চোখে পড়বে না, কিন্তু এক-দুই বছর পর নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর সন্তানের পুষ্টিহীনতার চিত্রটা প্রকট আকারে ফুটে উঠবে।’