ঢাকা ০৭:১৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০২২, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

বেড়েই চলেছে বিক্ষোভ, মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখে ইরান

হিজাব না পরায় গ্রেফতার ও পরে পুলিশের হেফাজতে ২২ বছরের তরুণী মাশা আমিনির মৃত্যু ঘিরে উত্তাল হয়ে উঠেছে ইরান। বিক্ষোভ ক্রমে বেড়েই চলেছে। সংঘর্ষও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। মৃত্যু হয়েছে অন্তত ৫০ জনের। বহু বছর পর ইরান এমন বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে বিবিসি।

গত ১৩ সেপ্টেম্বর গ্রেফতার করা হয় ২২ বছরের মাশা আমিনিকে। ১৬ সেপ্টেম্বর পুলিশ হেফাজতেই মারা যান তিনি। ওই তরুণীর পরিবার ও বহু ইরানি নাগরিকের বিশ্বাস যে হেফাজতে মারাত্মক প্রহারের কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে।

তবে পুলিশ তার সাথে দুর্ব্যবহারের কথা অস্বীকার করেছে এবং বলেছে যে ‘হঠাৎ করে তার হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া’ বন্ধ হয়ে যায়।

বিক্ষোভকারীরা বলছেন তারা যদি এখনই এর বিরুদ্ধে রুখে না দাঁড়ান তাহলে একদিন তাদেরও একই ভাগ্য বরণ করতে হতে পারে।

এ ঘটনাটি এমন সময় ঘটেছে যখন ইরানের মানুষ এমনিতেই ক্ষুব্ধ। রাজনীতিকদের দুর্নীতি, ৫০ শতাংশের বেশি মুদ্রাস্ফীতির কারণে দারিদ্র বেড়ে গিয়েছে ইরানে। পারমাণবিক আলোচনায় অচলাবস্থা, সামাজিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার অভাব এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা দেশটির বিরাট একটি জনগোষ্ঠীকে হতাশ করে তুলেছে।

ইরানের সোশ্যাল সিকিউরিটি অর্গানাইজেশন রিসার্চ ইন্সটিটিউটের মতে, দেশটির অন্তত আড়াই কোটি মানুষ দারিদ্র সীমার নীচে এবং ক্রমশ এই সংখ্যা বাড়ছে। ইরানে এটিই বিক্ষোভের নতুন কোন ঘটনা নয়। কিন্তু অনেক পর্যবেক্ষকের মতে আগের যেকোনো ঘটনার তুলনায় এবারের বিক্ষোভে ভিন্নতা আছে।

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর নারীদের হিজাবকে বাধ্যতামূলক করে ইরান। তবে এটি মানতে চায়নি প্রগতীশীল মতবাদীরা। অনেক পুরুষ নারীদের এই বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছেন। এটিকে সমাজ পরিবর্তনের অংশ হিসেবে মানছেন সুইডেন ভিত্তিক ইরানি সমাজবিজ্ঞানী মেহরদাদ দারভিশপোর।

এবারের বিক্ষোভের প্রধান শ্লোগান হলো- ‘নারী, জীবন, মুক্তি’, যা মূলত ধর্মীয় রীতির বিরুদ্ধে অবস্থান। এছাড়া এবারের বিক্ষোভে আগের চেয়ে অনেক বেশি অংশগ্রহণমূলক।

এর আগে ২০০৯ সালে কথিত গ্রিন মুভমেন্টের সময় নির্বাচনে কারচুপির প্রতিবাদে হওয়া আন্দোলনে মধ্যবিত্তরাই অংশ নিয়েছিল। তখন বড় আন্দোলন হলেও সেটি বড় শহরগুলোতেই সীমাবদ্ধ ছিলো। আবার ২০১৭ ও ২০১৯ সালের আন্দোলন সীমাবদ্ধ ছিলো দরিদ্রদের মধ্যে। কিন্তু এবারের আন্দোলনে মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী-উভয় শ্রেণীর মানুষের অংশ নেয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।

কর্তৃপক্ষ একটি কঠিন পরিস্থিতিতে আছে। মাশা আমিনির মৃত্যু সরকারের সমর্থকদের একটি অংশকেও ঝাঁকুনি দিয়েছে। এদের অনেকের মধ্যে কিছু ধর্মীয় পণ্ডিত আছেন। তারা নারীদের বিরুদ্ধে নৈতিক পুলিশ ব্যবহারের কৌশল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

ইরানে প্রচলিত শরিয়া আইন অনুযায়ী নারীদের হিজাব পরা বা চাদর দিয়ে মাথা ঢাকা বাধ্যতামূলক। এছাড়াও নারীদের শরীর সম্পূর্ণ ঢেকে রাখতে পা পর্যন্ত লম্বা ও ঢিলা পোশাক পরার বিধান রয়েছে।

সুতরাং এখন সরকারের হাতে দুটো বিকল্প আছে: একটি হলো হিজাব সম্পর্কিত নিয়ম কানুন পরিবর্তন করা। সেটি অনেক বিক্ষোভকারীকে সরকার পরিবর্তনের দাবি আদায়ের দিকে উৎসাহিত করে তুলতে পারে।

অথবা কোন কিছুই পরিবর্তন না করা এবং সহিংস দমন বা বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা। এগুলো সাময়িকভাবে পরিস্থিতিকে শান্ত করতে পারে কিন্তু সেটি আসলে কেবল ক্রমবর্ধমান ক্ষোভকেই উস্কে দেবে।

পুলিশ বাহিনীর যেসব সদস্য এখন দমন পীড়ন করছে তাদের অনেকেও চরম অর্থনৈতিক সংকটে আছে। চলমান বিক্ষোভ দীর্ঘায়িত হলে তারাও হয়তো অবস্থান পরিবর্তন করতে পারেন।

দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার বয়স এখন ৮৩ বছর। তার অসুস্থতার বিষয়টিও বহু ইরানি নাগরিকের চিন্তায় আছে।তার অবর্তমানে কে এই দায়িত্ব পাবেন এবং তিনি সরকারের কট্টর সমর্থকদের সমর্থন পাবেন কিনা তা পরিষ্কার নয়। তাই এটাই হয়তো শেষ অধ্যায় নয় কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।

Tag :
জনপ্রিয়

রসিক নির্বাচন ; আ’লীগের মেয়র প্রার্থী ডালিয়ার গণসংযোগ অনুষ্ঠিত

বেড়েই চলেছে বিক্ষোভ, মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখে ইরান

প্রকাশের সময় : ০৮:৩০:২৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২

হিজাব না পরায় গ্রেফতার ও পরে পুলিশের হেফাজতে ২২ বছরের তরুণী মাশা আমিনির মৃত্যু ঘিরে উত্তাল হয়ে উঠেছে ইরান। বিক্ষোভ ক্রমে বেড়েই চলেছে। সংঘর্ষও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। মৃত্যু হয়েছে অন্তত ৫০ জনের। বহু বছর পর ইরান এমন বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে বিবিসি।

গত ১৩ সেপ্টেম্বর গ্রেফতার করা হয় ২২ বছরের মাশা আমিনিকে। ১৬ সেপ্টেম্বর পুলিশ হেফাজতেই মারা যান তিনি। ওই তরুণীর পরিবার ও বহু ইরানি নাগরিকের বিশ্বাস যে হেফাজতে মারাত্মক প্রহারের কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে।

তবে পুলিশ তার সাথে দুর্ব্যবহারের কথা অস্বীকার করেছে এবং বলেছে যে ‘হঠাৎ করে তার হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া’ বন্ধ হয়ে যায়।

বিক্ষোভকারীরা বলছেন তারা যদি এখনই এর বিরুদ্ধে রুখে না দাঁড়ান তাহলে একদিন তাদেরও একই ভাগ্য বরণ করতে হতে পারে।

এ ঘটনাটি এমন সময় ঘটেছে যখন ইরানের মানুষ এমনিতেই ক্ষুব্ধ। রাজনীতিকদের দুর্নীতি, ৫০ শতাংশের বেশি মুদ্রাস্ফীতির কারণে দারিদ্র বেড়ে গিয়েছে ইরানে। পারমাণবিক আলোচনায় অচলাবস্থা, সামাজিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার অভাব এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা দেশটির বিরাট একটি জনগোষ্ঠীকে হতাশ করে তুলেছে।

ইরানের সোশ্যাল সিকিউরিটি অর্গানাইজেশন রিসার্চ ইন্সটিটিউটের মতে, দেশটির অন্তত আড়াই কোটি মানুষ দারিদ্র সীমার নীচে এবং ক্রমশ এই সংখ্যা বাড়ছে। ইরানে এটিই বিক্ষোভের নতুন কোন ঘটনা নয়। কিন্তু অনেক পর্যবেক্ষকের মতে আগের যেকোনো ঘটনার তুলনায় এবারের বিক্ষোভে ভিন্নতা আছে।

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর নারীদের হিজাবকে বাধ্যতামূলক করে ইরান। তবে এটি মানতে চায়নি প্রগতীশীল মতবাদীরা। অনেক পুরুষ নারীদের এই বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছেন। এটিকে সমাজ পরিবর্তনের অংশ হিসেবে মানছেন সুইডেন ভিত্তিক ইরানি সমাজবিজ্ঞানী মেহরদাদ দারভিশপোর।

এবারের বিক্ষোভের প্রধান শ্লোগান হলো- ‘নারী, জীবন, মুক্তি’, যা মূলত ধর্মীয় রীতির বিরুদ্ধে অবস্থান। এছাড়া এবারের বিক্ষোভে আগের চেয়ে অনেক বেশি অংশগ্রহণমূলক।

এর আগে ২০০৯ সালে কথিত গ্রিন মুভমেন্টের সময় নির্বাচনে কারচুপির প্রতিবাদে হওয়া আন্দোলনে মধ্যবিত্তরাই অংশ নিয়েছিল। তখন বড় আন্দোলন হলেও সেটি বড় শহরগুলোতেই সীমাবদ্ধ ছিলো। আবার ২০১৭ ও ২০১৯ সালের আন্দোলন সীমাবদ্ধ ছিলো দরিদ্রদের মধ্যে। কিন্তু এবারের আন্দোলনে মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী-উভয় শ্রেণীর মানুষের অংশ নেয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।

কর্তৃপক্ষ একটি কঠিন পরিস্থিতিতে আছে। মাশা আমিনির মৃত্যু সরকারের সমর্থকদের একটি অংশকেও ঝাঁকুনি দিয়েছে। এদের অনেকের মধ্যে কিছু ধর্মীয় পণ্ডিত আছেন। তারা নারীদের বিরুদ্ধে নৈতিক পুলিশ ব্যবহারের কৌশল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

ইরানে প্রচলিত শরিয়া আইন অনুযায়ী নারীদের হিজাব পরা বা চাদর দিয়ে মাথা ঢাকা বাধ্যতামূলক। এছাড়াও নারীদের শরীর সম্পূর্ণ ঢেকে রাখতে পা পর্যন্ত লম্বা ও ঢিলা পোশাক পরার বিধান রয়েছে।

সুতরাং এখন সরকারের হাতে দুটো বিকল্প আছে: একটি হলো হিজাব সম্পর্কিত নিয়ম কানুন পরিবর্তন করা। সেটি অনেক বিক্ষোভকারীকে সরকার পরিবর্তনের দাবি আদায়ের দিকে উৎসাহিত করে তুলতে পারে।

অথবা কোন কিছুই পরিবর্তন না করা এবং সহিংস দমন বা বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা। এগুলো সাময়িকভাবে পরিস্থিতিকে শান্ত করতে পারে কিন্তু সেটি আসলে কেবল ক্রমবর্ধমান ক্ষোভকেই উস্কে দেবে।

পুলিশ বাহিনীর যেসব সদস্য এখন দমন পীড়ন করছে তাদের অনেকেও চরম অর্থনৈতিক সংকটে আছে। চলমান বিক্ষোভ দীর্ঘায়িত হলে তারাও হয়তো অবস্থান পরিবর্তন করতে পারেন।

দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার বয়স এখন ৮৩ বছর। তার অসুস্থতার বিষয়টিও বহু ইরানি নাগরিকের চিন্তায় আছে।তার অবর্তমানে কে এই দায়িত্ব পাবেন এবং তিনি সরকারের কট্টর সমর্থকদের সমর্থন পাবেন কিনা তা পরিষ্কার নয়। তাই এটাই হয়তো শেষ অধ্যায় নয় কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।