ঢাকা ১১:৪১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০২২, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

কার্ডে কেনাকাটায় বাড়তি চার্জ, অস্বস্তি

অনুসন্ধানে দেখা যায়, ক্রেডিট কার্ডের সুদের পাশাপাশি কেনাকাটায় বাড়তি আরও ১ থেকে ২ শতাংশ অর্থ দাবি করছেন বিক্রেতা। এ ক্ষেত্রে ব্যাংক ও কোম্পানির মধ্যে সমঝোতা করে নেয়া হয় বাড়তি অর্থ।

বেসরকারি একটি আইটি ফার্মের হিসাব শাখায় কাজ করেন তাসনুভা চৌধুরী। রাজধানীর একটি মার্কেটে ক্রেডিট কার্ড দিয়ে কিনতে যান শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা এসি, কিন্তু কার্ডের মাধ্যমে মূল্য পরিশোধ করতে চাইলে দামের চেয়ে কেটে রাখা হয় বাড়তি আরও ২ শতাংশ অর্থ, কিন্তু তা দিতে আপত্তি জানালে শুরু হয় ক্রেতা-বিক্রেতার বিতণ্ডা।

তাসনুভার প্রশ্ন, ‘কেনাকাটায় বাড়তি ২ শতাংশ অর্থ গুনতে হবে কেন?’

অনুসন্ধানে দেখা যায়, ক্রেডিট কার্ডের সুদের পাশাপাশি কেনাকাটায় বাড়তি আরও ১ থেকে ২ শতাংশ অর্থ দাবি করছেন বিক্রেতা। এ ক্ষেত্রে ব্যাংক ও কোম্পানির মধ্যে সমঝোতা করে নেয়া হয় বাড়তি অর্থ।

ইলেকট্রনিকস পণ্য, মোবাইল, স্বর্ণালংকারসহ এই ধরনের পণ্য কেনার ক্ষেত্রে প্রকৃত দামের চেয়ে বাড়তি অর্থ নেয়া হয়। নগদ কেনাকাটায় যে দাম, ক্রেডিট অথবা ডেবিট কার্ডে নেয়া হচ্ছে তার চেয়ে বেশি। অনেক ক্ষেত্রে পণ্যের সঙ্গে দুই ধরনের দামই উল্লেখ থাকে।

বিভিন্ন দেশে কার্ডে কেনাকাটায় যে চার্জ আসে, সেটা পরিশোধ করেন বিক্রেতা; ক্রেতাকে কোনো অর্থ পরিশোধ করতে হয় না।

বাংলাদেশে বিশেষ করে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক তার গ্রাহকদেরকে এসএমএস পাঠিয়ে বলছে, যারা এই ধরনের চার্জ আরোপ করে, তাদেরকে এড়িয়ে চলতে। অর্থাৎ এই চার্জ আসলে গ্রাহকের দেয়ার কথাই না।

সম্প্রতি ব্যাংক এক এসএমএসে বলেছে, ‘কার্ডে মূল্য পরিশোধে কোনো বাড়তি চার্জ ব্যাংক আরোপ করে না। কার্ড পেমেন্টে বাড়তি চার্জ দাবি করা বিক্রেতাকে এড়িয়ে চলুন।’

বিদেশি ব্র্যান্ডের একটি এসি কিনে বাড়তি অর্থ দিয়েছেন শেওড়াপাড়ার ক্রেতা আশিক মাহমুদ। তিনি জানান, এক টনের একটি এসির প্রকৃত দাম চাওয়া হয় ৪৭ হাজার টাকা, তবে ছাড় দিয়ে দাম দাঁড়ায় ৪৩ হাজার টাকা। বলা হয় নগদ টাকার ক্ষেত্রে এই দাম প্রযোজ্য, কিন্তু ক্রেডিট কার্ডে ইএমআইয়ের মাধ্যমে নিলে ছয় মাসে অর্থ পরিশোধ করা যাবে। কিন্তু এতে ২ শতাংশ চার্জ প্রযোজ্য হবে।

আশিক জানান, শেষ পর্যন্ত বাড়তি ২ শতাংশ অর্থ দিয়ে পণ্যটি কিনতে হয়েছে। এ ছাড়া ওই ব্র্যান্ডের পণ্য কেনার উপায় ছিল না।

দোকানি জানান, মূলত শীতের সময় ১ অথবা ২ শতাংশ বাড়তি অর্থ নেয়া হয় না, কিন্তু গরমের সময় যখন বেশি চাহিদা থাকে, তখন এ চার্জ প্রযোজ্য হয়। বেশি বিক্রি হলে লাভ কম নিলেও হয়। তখন ২ শতাংশ কোম্পানির লাভের অংশ থেকে সমন্বয় করা হয়।

ব্যাংকগুলো কী বলে

ক্রেডিট কার্ড সেবাকে জনপ্রিয় করে তুলতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো নানা ছাড় দিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রথম বছরে মাশুল ফ্রি ও নির্দিষ্টসংখ্যক লেনদেনে প্রতি বছর মাশুল মওকুফ সুবিধা। এ ছাড়া রয়েছে রিওয়ার্ড পয়েন্ট সুবিধা। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পণ্য কেনাকাটায় ছাড়, হোটেলে থাকা ও খাওয়ায় নানা অফারসহ বিভিন্ন বাড়তি সুযোগও রয়েছে।

এসবের পাশাপাশি গ্রাহকের তাৎক্ষণিক টাকার চাহিদা মেটাচ্ছে ক্রেডিট কার্ড। টাকার প্রয়োজনে কারও কাছে না গেলেও চলে।

সাধারণত কার্ড পেমেন্টে গ্রাহকদের উৎসাহিত করতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে পিওএস মেশিন সরবরাহ করে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

কার্ডে পেমেন্টে মার্চেন্ট ও ব্যাংকের মধ্যে চুক্তি হয়। চুক্তিতে স্পষ্টভাবে বলা থাকে যে, এই সার্ভিস ব্যবহারের জন্য মার্চেন্টদের প্রতিটি ট্রান্সজেকশন বাবদ নির্দিষ্ট হারে সার্ভিস চার্জ দিতে হয়। একে অ্যাকুয়ারিং ফি বলা হয়। এই অর্থ মার্চেন্ট তার মুনাফা থেকেই পরিশোধ করবেন। এই টাকা কোনো অবস্থাতেই গ্রাহকদের থেকে নেয়া যাবে না।

আগে একেক ব্যাংক ইচ্ছামতো অ্যাকুয়ারিং ফি ধার্য করতে পারত, তবে বাংলাদেশ ব্যাংক সার্কুলারের মাধ্যমে সর্বোচ্চ চার্জ ১ দশমিক ৬০ শতাংশ নির্ধারণ করে দিয়েছে। এ জন্য এখন চুক্তির বাইরে বেশি চার্জ নেয়ার সুযোগ নেই।
কার্ডে কেনাকাটায় বাড়তি চার্জ, অস্বস্তি

বেসরকারি এবি ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারিক আফজাল বলেন, ‘মানুষ কার্ডে কেনাকাটায় স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। যেকোনো পণ্য কার্ড পেমেন্টে বিক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রতিটি ব্যাংকের সঙ্গে মার্চেন্টদের চুক্তি করা হয়।

‘মার্চেন্ট ও ব্যাংকগুলোর আলোচনার ভিত্তিতে এখানে মার্চেন্ট কমিশন, মার্চেন্ট ফি, ব্যাংকের লাভ সব বিষয় নির্ধারিত হয়। চুক্তির বাইরে মার্চেন্টের কোনো অতিরিক্ত চার্জ রাখার সুযোগ নেই। কারণ সবসময় ব্যাংকগুলো এসব বিষয় তদারকি করে।’

তিনি বলেন, ‘নগদ পেমেন্টের চেয়ে কার্ডে পেমেন্টে সবসময় টাকা বেশি নেয়া হয়, সেটা নয়। ব্যাংকভেদে বিয়য়টি নির্ধারণ হয়। একটি পণ্য কিস্তিতে কেনার ক্ষেত্রে হয়তো গ্রাহককে কিছু বেশি টাকা গুনতে হয়, কিন্তু এখানে গ্রাহককেও কিন্তু সুবিধা দেয়া হচ্ছে। বড় কোনো ইলেকট্রনিক পণ্য একবারে কিনতে যে টাকা লাগত, সেটা গ্রাহক ছয় মাস বা এক বছরে বা তারও বেশি সময়ে শোধ করার সুবিধা পাচ্ছেন। মার্চেন্ট কিন্তু এখানে টাকাটা একবারে পাচ্ছে না। তার টাকা আটকে থাকছে। সে জন্য হয়তো সামান্য কিছু লাভ তারা রাখে, তবে চুক্তিতে এ বিষয় না থাকলে অতিরিক্ত এ টাকা নেয়ারও সুযোগ নেই।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘শুধু কার্ডে পেমেন্টের জন্য বাড়তি টাকা কেটে রাখার কোনো সুযোগ নেই। গ্রাহক ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ডের বাৎসরিক চার্জ থাকে। সেটা দিতে পারে, কিন্তু কার্ডে কিনলেই তাকে এক্সট্রা টাকা দিতে হবে, যেটা নগদ পেমেন্টে দিতে হবে না। এমন কোনো নিয়ম নেই।’

চার্জ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা

২০২১ সালের ১৮ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেম বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করা হয়।

ওই সার্কুলারে ব্যাংকগুলো থেকে ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশ (এনপিএসবি) এবং ইন্টারন্যাশনাল পেমেন্ট স্কিম (আইপিএস) ও কার্ড স্কিমের মাধ্যমে করা ইলেকট্রনিক লেনদেনের ক্ষেত্রে ফি বা চার্জ নির্ধারণ করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এতে বলা হয়, এক ব্যাংকের গ্রাহক অন্য ব্যাংকের পয়েন্ট অফ সেলস (পিওএস) ব্যবহার করে মার্চেন্ট পেমেন্টের ক্ষেত্রে অ্যাকুয়ারিং ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠান মার্চেন্ট হতে মোট লেনদেনের অন্যূন ১ দশমিক ৬ শতাংশ মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (এমডিআর) বাবদ আদায় করবে। এর মধ্য থেকে আইআরএফ বাবদ ১ দশমিক ১ শতাংশ কার্ড ইস্যুয়িং ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানকে দেবে।

অর্থাৎ ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট ছাড়াই অধিগ্রহণকারী ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠান ব্যবসায়ীর কাছ থেকে মোট লেনদেনের ১ দশমিক ৬ শতাংশ সংগ্রহ করবে। এর মধ্যে ১ দশমিক ১ শতাংশ যাবে কার্ড প্রদানকারী ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানের কাছে।

পিওএস লেনদেনে একেক ব্যাংক ভিন্ন ভিন্ন ধরনের চার্জ কাটত, তাই বাংলাদেশ ব্যাংক গ্রাহকের সুবিধার্থে ১ দশমিক ৬ শতাংশ হার নির্ধারণ করে দিয়েছে।

ইন্টারনেট পেমেন্ট সিস্টেমের (আইপিএস) নেটওয়ার্ক ব্যবহৃত হলে আইআরএফ বাবদ চার্জের অতিরিক্ত দশমিক ২ শতাংশ চার্জ দিতে হবে।

ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টের ক্ষেত্রে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে কার্ড লেনদেন, ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ করলে ব্যবসায়ীর কাছ থেকে মোট লেনদেনের দশমিক ৭ শতাংশ এমডিআর হিসেবে আদায় হবে। এর মধ্যে দশমিক ৪ শতাংশ কার্ড প্রদানকারী ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানে যাবে বিনিময় ফি (আইআরএফ) হিসেবে।

এসব ফি বা চার্জ কোনো অবস্থাতেই গ্রাহকদের থেকে আদায় করা যাবে না। বিষয়টি অ্যাকুয়ারিং ব্যাংক নিশ্চিত করবে।

কার্ডের সংখ্যা ও লেনদেন

গ্রাহকের তাৎক্ষণিক টাকার চাহিদা মেটাচ্ছে ক্রেডিট কার্ড। টাকার প্রয়োজনে কারও কাছে না গিয়ে এই কার্ডে ব্যাংকের বুথ থেকে নগদ টাকা তোলার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের পণ্যের কেনাকাটা ও সেবার মূল্য পরিশোধ করা যাচ্ছে। কোনো সুদ ছাড়া টাকা পরিশোধে ৪৫ দিন পর্যন্ত সময় মিলছে। শুধু দেশের অভ্যন্তরেই নয়, বিদেশে গিয়েও এসব কার্ডে বিদেশি মুদ্রায় লেনদেন করার সুযোগ রয়েছে। এ জন্য এ কার্ডের ব্যবহার ও লেনদেন দিন দিন বাড়ছে।

২০২১ সাল শেষে ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা ছিল ১৮ লাখ ৭৪ হাজার ৩৬২টি। ছয় মাস শেষে জুনে সেটা বেড়ে হয় ১৯ লাখ ৭৮ হাজার ১৯৬টি।

গত বছরের ডিসেম্বরের ক্রেডিট কার্ডে ২ হাজার ২২৯ কোটি টাকার লেনদেন হয়। চলতি বছরের জুনে লেনদেন হয় ২ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা। এটি ক্রেডিট কার্ডের তৃতীয় সর্বোচ্চ লেনদেন।

অন্যদিকে ২০২১ সাল শেষে ডেবিট কার্ড ছিল ২ কোটি ৫২ লাখ ৮৫ হাজার। এ কার্ডে লেনদেন হয় ২৪ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকা।

ছয় মাসে সেটা বেড়ে হয়েছে ২ কোটি ৭৬ লাখ ৩০ হাজার ৩১টি। জুনে এ কার্ডে লেনদেন হয় ৩৪ হাজার ৭৪৪ কোটি টাকা।

Tag :
জনপ্রিয়

ছেলের হত্যাকারীর মৃত্যুদণ্ড নিজ হাতে কার্যকর করলেন বাবা

কার্ডে কেনাকাটায় বাড়তি চার্জ, অস্বস্তি

প্রকাশের সময় : ১১:১৩:১৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২

অনুসন্ধানে দেখা যায়, ক্রেডিট কার্ডের সুদের পাশাপাশি কেনাকাটায় বাড়তি আরও ১ থেকে ২ শতাংশ অর্থ দাবি করছেন বিক্রেতা। এ ক্ষেত্রে ব্যাংক ও কোম্পানির মধ্যে সমঝোতা করে নেয়া হয় বাড়তি অর্থ।

বেসরকারি একটি আইটি ফার্মের হিসাব শাখায় কাজ করেন তাসনুভা চৌধুরী। রাজধানীর একটি মার্কেটে ক্রেডিট কার্ড দিয়ে কিনতে যান শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা এসি, কিন্তু কার্ডের মাধ্যমে মূল্য পরিশোধ করতে চাইলে দামের চেয়ে কেটে রাখা হয় বাড়তি আরও ২ শতাংশ অর্থ, কিন্তু তা দিতে আপত্তি জানালে শুরু হয় ক্রেতা-বিক্রেতার বিতণ্ডা।

তাসনুভার প্রশ্ন, ‘কেনাকাটায় বাড়তি ২ শতাংশ অর্থ গুনতে হবে কেন?’

অনুসন্ধানে দেখা যায়, ক্রেডিট কার্ডের সুদের পাশাপাশি কেনাকাটায় বাড়তি আরও ১ থেকে ২ শতাংশ অর্থ দাবি করছেন বিক্রেতা। এ ক্ষেত্রে ব্যাংক ও কোম্পানির মধ্যে সমঝোতা করে নেয়া হয় বাড়তি অর্থ।

ইলেকট্রনিকস পণ্য, মোবাইল, স্বর্ণালংকারসহ এই ধরনের পণ্য কেনার ক্ষেত্রে প্রকৃত দামের চেয়ে বাড়তি অর্থ নেয়া হয়। নগদ কেনাকাটায় যে দাম, ক্রেডিট অথবা ডেবিট কার্ডে নেয়া হচ্ছে তার চেয়ে বেশি। অনেক ক্ষেত্রে পণ্যের সঙ্গে দুই ধরনের দামই উল্লেখ থাকে।

বিভিন্ন দেশে কার্ডে কেনাকাটায় যে চার্জ আসে, সেটা পরিশোধ করেন বিক্রেতা; ক্রেতাকে কোনো অর্থ পরিশোধ করতে হয় না।

বাংলাদেশে বিশেষ করে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক তার গ্রাহকদেরকে এসএমএস পাঠিয়ে বলছে, যারা এই ধরনের চার্জ আরোপ করে, তাদেরকে এড়িয়ে চলতে। অর্থাৎ এই চার্জ আসলে গ্রাহকের দেয়ার কথাই না।

সম্প্রতি ব্যাংক এক এসএমএসে বলেছে, ‘কার্ডে মূল্য পরিশোধে কোনো বাড়তি চার্জ ব্যাংক আরোপ করে না। কার্ড পেমেন্টে বাড়তি চার্জ দাবি করা বিক্রেতাকে এড়িয়ে চলুন।’

বিদেশি ব্র্যান্ডের একটি এসি কিনে বাড়তি অর্থ দিয়েছেন শেওড়াপাড়ার ক্রেতা আশিক মাহমুদ। তিনি জানান, এক টনের একটি এসির প্রকৃত দাম চাওয়া হয় ৪৭ হাজার টাকা, তবে ছাড় দিয়ে দাম দাঁড়ায় ৪৩ হাজার টাকা। বলা হয় নগদ টাকার ক্ষেত্রে এই দাম প্রযোজ্য, কিন্তু ক্রেডিট কার্ডে ইএমআইয়ের মাধ্যমে নিলে ছয় মাসে অর্থ পরিশোধ করা যাবে। কিন্তু এতে ২ শতাংশ চার্জ প্রযোজ্য হবে।

আশিক জানান, শেষ পর্যন্ত বাড়তি ২ শতাংশ অর্থ দিয়ে পণ্যটি কিনতে হয়েছে। এ ছাড়া ওই ব্র্যান্ডের পণ্য কেনার উপায় ছিল না।

দোকানি জানান, মূলত শীতের সময় ১ অথবা ২ শতাংশ বাড়তি অর্থ নেয়া হয় না, কিন্তু গরমের সময় যখন বেশি চাহিদা থাকে, তখন এ চার্জ প্রযোজ্য হয়। বেশি বিক্রি হলে লাভ কম নিলেও হয়। তখন ২ শতাংশ কোম্পানির লাভের অংশ থেকে সমন্বয় করা হয়।

ব্যাংকগুলো কী বলে

ক্রেডিট কার্ড সেবাকে জনপ্রিয় করে তুলতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো নানা ছাড় দিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রথম বছরে মাশুল ফ্রি ও নির্দিষ্টসংখ্যক লেনদেনে প্রতি বছর মাশুল মওকুফ সুবিধা। এ ছাড়া রয়েছে রিওয়ার্ড পয়েন্ট সুবিধা। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পণ্য কেনাকাটায় ছাড়, হোটেলে থাকা ও খাওয়ায় নানা অফারসহ বিভিন্ন বাড়তি সুযোগও রয়েছে।

এসবের পাশাপাশি গ্রাহকের তাৎক্ষণিক টাকার চাহিদা মেটাচ্ছে ক্রেডিট কার্ড। টাকার প্রয়োজনে কারও কাছে না গেলেও চলে।

সাধারণত কার্ড পেমেন্টে গ্রাহকদের উৎসাহিত করতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে পিওএস মেশিন সরবরাহ করে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

কার্ডে পেমেন্টে মার্চেন্ট ও ব্যাংকের মধ্যে চুক্তি হয়। চুক্তিতে স্পষ্টভাবে বলা থাকে যে, এই সার্ভিস ব্যবহারের জন্য মার্চেন্টদের প্রতিটি ট্রান্সজেকশন বাবদ নির্দিষ্ট হারে সার্ভিস চার্জ দিতে হয়। একে অ্যাকুয়ারিং ফি বলা হয়। এই অর্থ মার্চেন্ট তার মুনাফা থেকেই পরিশোধ করবেন। এই টাকা কোনো অবস্থাতেই গ্রাহকদের থেকে নেয়া যাবে না।

আগে একেক ব্যাংক ইচ্ছামতো অ্যাকুয়ারিং ফি ধার্য করতে পারত, তবে বাংলাদেশ ব্যাংক সার্কুলারের মাধ্যমে সর্বোচ্চ চার্জ ১ দশমিক ৬০ শতাংশ নির্ধারণ করে দিয়েছে। এ জন্য এখন চুক্তির বাইরে বেশি চার্জ নেয়ার সুযোগ নেই।
কার্ডে কেনাকাটায় বাড়তি চার্জ, অস্বস্তি

বেসরকারি এবি ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারিক আফজাল বলেন, ‘মানুষ কার্ডে কেনাকাটায় স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। যেকোনো পণ্য কার্ড পেমেন্টে বিক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রতিটি ব্যাংকের সঙ্গে মার্চেন্টদের চুক্তি করা হয়।

‘মার্চেন্ট ও ব্যাংকগুলোর আলোচনার ভিত্তিতে এখানে মার্চেন্ট কমিশন, মার্চেন্ট ফি, ব্যাংকের লাভ সব বিষয় নির্ধারিত হয়। চুক্তির বাইরে মার্চেন্টের কোনো অতিরিক্ত চার্জ রাখার সুযোগ নেই। কারণ সবসময় ব্যাংকগুলো এসব বিষয় তদারকি করে।’

তিনি বলেন, ‘নগদ পেমেন্টের চেয়ে কার্ডে পেমেন্টে সবসময় টাকা বেশি নেয়া হয়, সেটা নয়। ব্যাংকভেদে বিয়য়টি নির্ধারণ হয়। একটি পণ্য কিস্তিতে কেনার ক্ষেত্রে হয়তো গ্রাহককে কিছু বেশি টাকা গুনতে হয়, কিন্তু এখানে গ্রাহককেও কিন্তু সুবিধা দেয়া হচ্ছে। বড় কোনো ইলেকট্রনিক পণ্য একবারে কিনতে যে টাকা লাগত, সেটা গ্রাহক ছয় মাস বা এক বছরে বা তারও বেশি সময়ে শোধ করার সুবিধা পাচ্ছেন। মার্চেন্ট কিন্তু এখানে টাকাটা একবারে পাচ্ছে না। তার টাকা আটকে থাকছে। সে জন্য হয়তো সামান্য কিছু লাভ তারা রাখে, তবে চুক্তিতে এ বিষয় না থাকলে অতিরিক্ত এ টাকা নেয়ারও সুযোগ নেই।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘শুধু কার্ডে পেমেন্টের জন্য বাড়তি টাকা কেটে রাখার কোনো সুযোগ নেই। গ্রাহক ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ডের বাৎসরিক চার্জ থাকে। সেটা দিতে পারে, কিন্তু কার্ডে কিনলেই তাকে এক্সট্রা টাকা দিতে হবে, যেটা নগদ পেমেন্টে দিতে হবে না। এমন কোনো নিয়ম নেই।’

চার্জ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা

২০২১ সালের ১৮ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেম বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করা হয়।

ওই সার্কুলারে ব্যাংকগুলো থেকে ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশ (এনপিএসবি) এবং ইন্টারন্যাশনাল পেমেন্ট স্কিম (আইপিএস) ও কার্ড স্কিমের মাধ্যমে করা ইলেকট্রনিক লেনদেনের ক্ষেত্রে ফি বা চার্জ নির্ধারণ করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এতে বলা হয়, এক ব্যাংকের গ্রাহক অন্য ব্যাংকের পয়েন্ট অফ সেলস (পিওএস) ব্যবহার করে মার্চেন্ট পেমেন্টের ক্ষেত্রে অ্যাকুয়ারিং ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠান মার্চেন্ট হতে মোট লেনদেনের অন্যূন ১ দশমিক ৬ শতাংশ মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (এমডিআর) বাবদ আদায় করবে। এর মধ্য থেকে আইআরএফ বাবদ ১ দশমিক ১ শতাংশ কার্ড ইস্যুয়িং ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানকে দেবে।

অর্থাৎ ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট ছাড়াই অধিগ্রহণকারী ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠান ব্যবসায়ীর কাছ থেকে মোট লেনদেনের ১ দশমিক ৬ শতাংশ সংগ্রহ করবে। এর মধ্যে ১ দশমিক ১ শতাংশ যাবে কার্ড প্রদানকারী ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানের কাছে।

পিওএস লেনদেনে একেক ব্যাংক ভিন্ন ভিন্ন ধরনের চার্জ কাটত, তাই বাংলাদেশ ব্যাংক গ্রাহকের সুবিধার্থে ১ দশমিক ৬ শতাংশ হার নির্ধারণ করে দিয়েছে।

ইন্টারনেট পেমেন্ট সিস্টেমের (আইপিএস) নেটওয়ার্ক ব্যবহৃত হলে আইআরএফ বাবদ চার্জের অতিরিক্ত দশমিক ২ শতাংশ চার্জ দিতে হবে।

ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টের ক্ষেত্রে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে কার্ড লেনদেন, ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ করলে ব্যবসায়ীর কাছ থেকে মোট লেনদেনের দশমিক ৭ শতাংশ এমডিআর হিসেবে আদায় হবে। এর মধ্যে দশমিক ৪ শতাংশ কার্ড প্রদানকারী ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানে যাবে বিনিময় ফি (আইআরএফ) হিসেবে।

এসব ফি বা চার্জ কোনো অবস্থাতেই গ্রাহকদের থেকে আদায় করা যাবে না। বিষয়টি অ্যাকুয়ারিং ব্যাংক নিশ্চিত করবে।

কার্ডের সংখ্যা ও লেনদেন

গ্রাহকের তাৎক্ষণিক টাকার চাহিদা মেটাচ্ছে ক্রেডিট কার্ড। টাকার প্রয়োজনে কারও কাছে না গিয়ে এই কার্ডে ব্যাংকের বুথ থেকে নগদ টাকা তোলার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের পণ্যের কেনাকাটা ও সেবার মূল্য পরিশোধ করা যাচ্ছে। কোনো সুদ ছাড়া টাকা পরিশোধে ৪৫ দিন পর্যন্ত সময় মিলছে। শুধু দেশের অভ্যন্তরেই নয়, বিদেশে গিয়েও এসব কার্ডে বিদেশি মুদ্রায় লেনদেন করার সুযোগ রয়েছে। এ জন্য এ কার্ডের ব্যবহার ও লেনদেন দিন দিন বাড়ছে।

২০২১ সাল শেষে ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা ছিল ১৮ লাখ ৭৪ হাজার ৩৬২টি। ছয় মাস শেষে জুনে সেটা বেড়ে হয় ১৯ লাখ ৭৮ হাজার ১৯৬টি।

গত বছরের ডিসেম্বরের ক্রেডিট কার্ডে ২ হাজার ২২৯ কোটি টাকার লেনদেন হয়। চলতি বছরের জুনে লেনদেন হয় ২ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা। এটি ক্রেডিট কার্ডের তৃতীয় সর্বোচ্চ লেনদেন।

অন্যদিকে ২০২১ সাল শেষে ডেবিট কার্ড ছিল ২ কোটি ৫২ লাখ ৮৫ হাজার। এ কার্ডে লেনদেন হয় ২৪ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকা।

ছয় মাসে সেটা বেড়ে হয়েছে ২ কোটি ৭৬ লাখ ৩০ হাজার ৩১টি। জুনে এ কার্ডে লেনদেন হয় ৩৪ হাজার ৭৪৪ কোটি টাকা।