ঢাকা ০৯:৫২ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২২, ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ
চাল আটা ময়দা ডিম মুরগি ও টয়লেট্রিজ পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি করায় ৪৪ মামলা

সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর হচ্ছে সরকার

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে অসাধু সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। এবার চাল, আটা, ময়দা, ডিম, মুরগির মাংস ও টয়লেট্রিজ পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি ও কৃত্রিম সঙ্কটের মাধ্যমে অস্থিরতা তৈরির অভিযোগে দেশের শীর্ষ ভোগ্যপণ্য ব্যবসায়ী (ব্যক্তি) ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ৪৪ টি মামলা করেছে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন। শীঘ্রই এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলার শুনানি করতে যাচ্ছে কমিশন। আগামী ২৬-২৭ সেপ্টেম্বর প্রথম পর্যায়ে ১১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শুনানি করা হবে। ইতোমধ্যে মামলার কপি এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

অভিযোগ উঠেছে, দ্রব্যমূল্য বাড়ার পেছনে দেশের বড় বড় কর্পোরেট গ্রুপ এবং সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরাই জড়িত। ইতোমধ্যে কিছু প্রমাণ পেয়েছে কমিশন। সরকারী সংস্থা বাংলাদেশ ট্রেড এ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি), বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউট (বিএফটিআই), ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি), জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখেছে প্রতিযোগিতা কমিশন। এতে ক্রেতাকে ঠকিয়ে অতিরিক্ত মুনাফা করার প্রমাণ পাওয়া গেছে। আর এ কারণেই মামলার মুখোমুখি দেশের ভোগ্য ও নিত্যপণ্যের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলো। অভিযোগ প্রমাণ সাপেক্ষে বার্ষিক টার্নওভারের ১ থেকে ১০ ভাগ পর্যন্ত জরিমানা গুনতে হবে। প্রতিযোগিতা কমিশন আইন অমান্যে ফৌজদারি মামলার মুখোমুখি হবেন ব্যবসায়ীরা। অতি মুনাফাখোর সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়েছে প্রতিযোগিতা কমিশন।

কমিশন সূত্রে জানা গেছে, চালের দাম বেশি নেয়ার অভিযোগে ১৯টি মামলা হয়েছে। মিনিকেট চাল নিয়ে কয়েক দশক ধরে চলছে প্রতারণা। চালের বাজার এখনও অস্থির। চালের জন্য রশিদ এ্যাগ্রো ফুড প্রোডাক্টস, বেলকন গ্রুপ, সিটি গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ, বাংলাদেশ এডিবল অয়েল লিমিটেডকে প্রথম পর্যায়ের শুনানিতে ডাকা হয়েছে, আটা-ময়দার জন্য ৮টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে সিটি গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ অন্যতম। ডিমের জন্য ৬টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে প্যারাগন পোল্ট্রি, ডিম ব্যবসায়ী-আড়তদার বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি আমানউল্লাহ্, কাজী ফার্মস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী জাহেদুল ইসলাম রয়েছেন।

মুরগির বাজার অস্থির করার জন্য ৬টি মামলা করেছে কমিশন। এর মধ্যে প্রথম পর্যায়ে কাজী ফার্মস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী জাহেদুল ইসলাম, প্যারাগন পোল্ট্রি লিমিটেডকে প্রথম পর্যায়ের শুনানিতে ডাকা হয়েছে। এছাড়া সাবান-সোডাসহ টয়লেট্রিজ পণ্যের দাম বেশি নেয়ার অভিযোগে ৫টি মামলা করেছে প্রতিযোগিতা কমিশন। এর মধ্যে ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেড অন্যতম।
জানা গেছে, করোনা মহামারী পরবর্তী ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ডলারের দাম বেশির কারণ দেখিয়ে দেশে নিত্য ও ভোগ্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। ইতোপূর্বে ভোজ্যতেলের আট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করে প্রতিযোগিতা কমিশন। সেই মামলার ওপর শুনানি শুরু হলে ব্যবসায়ীরা সময় চেয়ে আবেদন করেন। এতে আপাতত শুনানি হচ্ছে না। তবে শীঘ্রই শুনানি শুরু হবে বলে জানিয়েছেন প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারম্যান মোঃ মফিজুল ইসলাম। তিনি বলেন, প্রতিযোগিতা কমিশন আইন অনুযায়ী বিচারকার্য পরিচালনা করবে।

অভিযোগ প্রমাণ সাপেক্ষে আইন অনুযায়ী জরিমানা করা হবে। আইন অনুযায়ী বার্ষিক টার্নওভারের ১-১০ ভাগ পর্যন্ত জরিমানা করতে পারবে কমিশন। তিনি জানান, নিত্য ও ভোগ্যপণ্যের দাম বেশি নেয়া হলে সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়ে। দেশের সবাই কোন না কোনভাবে ভোক্তা। এ কারণে দ্র্বমূল্য বাড়িয়ে অতিরিক্ত মুনাফা করার কোন সুযোগ নেই।
এদিকে, দ্রব্যমূল্য বাড়ায় কষ্টে আছেন সাধারণ মানুষ। দেশে এখন রেকর্ড দামে বিক্রি হচ্ছে ১৭টি অত্যাবশ্যকীয় ভোগ্যপণ্য। নিত্যপণ্যের দাম এত বেড়েছে যে, চাল কিনলে ফুরিয়ে যাচ্ছে লবণের পয়সা। একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব, অন্যদিকে নিত্যপণ্যের বাজারে অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি- সবমিলিয়ে ভোক্তার নাভিশ্বাস এখন চরমে।

অত্যাবশ্যকীয় পণ্য হিসেবে খ্যাত পেঁয়াজ, রসুন, মসুর ডাল, ছোলা, শুকনো মরিচ, দারুচিনি, লবঙ্গ, এলাচ, ধনে, জিরা, আদা, হলুদ, তেজপাতা, সয়াবিন তেল, পাম অয়েল, চিনি ও খাবার লবণের মূল্য গরিব মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। এসব পণ্য কিনতে চাপে আছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্তরাও। পাশাপাশি দেশের প্রধান খাদ্যপণ্য চাল, আটা ও ময়দা বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। সর্বশেষ সাবান-সোডার মতো টয়লেট্রিজ পণ্যের দামও বেড়েছে কয়েকগুণ। সম্প্রতি জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরে ইউনিলিভারসহ টয়লেট্রিজ পণ্যের উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

এছাড়া তিনি চাল, ডিম, ভোজ্যতেল এবং অন্যান্য পণ্যের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে সংস্থাটির মহাপরিচালক এএইচএম সফিকুজ্জামান জানান, গত কয়েক মাসে ভোগ্যপণ্য ও টয়লেট্রিজ পণ্যের দাম যেভাবে বাড়ানো হয়েছে তা সঠিক হয়নি। আমদানি মূল্য, এলসি, ব্যাংক ঋণসহ যাবতীয় হিসাব-নিকাশ করে দেখা গেছে, দাম বেশি নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। এ কারণে ভোক্তা অধিকার নিয়মিত অভিযান পরিচালনা ও জরিমানা করছে।

জানা গেছে, দ্রবমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও ভোক্তাস্বার্থে দেশে আটটি আইন ও বিপণন আদেশ থাকলেও তা মানছে না ব্যবসায়ীরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজার নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান আইনেরই যথাযথ প্রয়োগ নেই। আর এ কারণেও দ্রব্যমূল্য বাড়ছে। ভোগ্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারী একাধিক উদ্যোগ থাকলেও বাজারে তেমন প্রভাব পড়েনি। হু হ করে বাড়ছে জিনিসপত্রের দাম। এদিকে দ্রব্যমূল্যের কারণে সবশ্রেণীর মানুষ এখন চাপের মুখে পড়েছেন। তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। এতে করে কষ্ট বেড়েছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের। অথচ ভোগ্যপণ্য নিয়ন্ত্রণে দেশে আটটির বেশি আইন রয়েছে।

এছাড়া দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, বাজার ব্যবস্থাপনা, তদারকির জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দ্রব্যমূল্য পর্যালোচনা ও পূর্বাভাস সেল, বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের দ্রব্যমূল্য মনিটরিং সেল, খাদ্য অধিদফতর, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ পরিষদসহ সরকারের একাধিক বিভাগ ও প্রতিষ্ঠান আছে। কিন্তু মাঝেমধ্যে বাজার পরিদর্শন, শহরাঞ্চলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের কিছু অভিযান-জরিমানার মধ্যেই তাদের কর্মতৎপরতা সীমাবদ্ধ। ফলে ভোগ্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি ফিরে আসছে না।
এদিকে, সরকারী বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যমতে, গত এক বছরে ৭ থেকে প্রায় ৬২ শতাংশ পর্যন্ত দাম বেড়েছে ভোজ্যতেল, ডাল, আদা ও রসুনসহ বিভিন্ন আমদানি করা ভোগ্যপণ্যের। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিটি ভোগ্যপণ্য এখন রেকর্ড দামে বিক্রি হচ্ছে বাজারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজার নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান আইনেরই যথাযথ প্রয়োগ নেই এবং সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীর কারণে জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে। এ প্রসঙ্গে প্রতিযোগিতা কমিশনের সচিব মোঃ আবদুস সবুর বলেন, বিভিন্ন অভিযোগে চাল, আটা, মুরগির মাংস, ডিমসহ বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদন ও বাজারজাতকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।

প্রতিযোগিতা কমিশন আইন-২০১২ অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রতিযোগিতা কমিশন আইনের ১৫ ও ১৬ ধারা অনুযায়ী এ মামলা হয়েছে। ধারা ১৫ তে বলা হয়েছে, বাজারে প্রভাব বিস্তার করে একপক্ষীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি করলে তারা শাস্তির আওতায় আসবে। আর ১৬ ধারাতে বলা হয়েছে, কোন পণ্যের বাজারজাত বা উৎপাদনে শীর্ষে থাকার সুযোগ কাজে লাগিয়ে পণ্যের দামে কারসাজি করলে সেই অপরাধও শাস্তিযোগ্য।

Tag :
জনপ্রিয়

সিলেটে ক্বিন ব্রিজের পাশে হবে আরেকটি ব্রিজ : পররাষ্ট্রমন্ত্রী

চাল আটা ময়দা ডিম মুরগি ও টয়লেট্রিজ পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি করায় ৪৪ মামলা

সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর হচ্ছে সরকার

প্রকাশের সময় : ১০:১৮:১৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে অসাধু সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। এবার চাল, আটা, ময়দা, ডিম, মুরগির মাংস ও টয়লেট্রিজ পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি ও কৃত্রিম সঙ্কটের মাধ্যমে অস্থিরতা তৈরির অভিযোগে দেশের শীর্ষ ভোগ্যপণ্য ব্যবসায়ী (ব্যক্তি) ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ৪৪ টি মামলা করেছে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন। শীঘ্রই এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলার শুনানি করতে যাচ্ছে কমিশন। আগামী ২৬-২৭ সেপ্টেম্বর প্রথম পর্যায়ে ১১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শুনানি করা হবে। ইতোমধ্যে মামলার কপি এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

অভিযোগ উঠেছে, দ্রব্যমূল্য বাড়ার পেছনে দেশের বড় বড় কর্পোরেট গ্রুপ এবং সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরাই জড়িত। ইতোমধ্যে কিছু প্রমাণ পেয়েছে কমিশন। সরকারী সংস্থা বাংলাদেশ ট্রেড এ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি), বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউট (বিএফটিআই), ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি), জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখেছে প্রতিযোগিতা কমিশন। এতে ক্রেতাকে ঠকিয়ে অতিরিক্ত মুনাফা করার প্রমাণ পাওয়া গেছে। আর এ কারণেই মামলার মুখোমুখি দেশের ভোগ্য ও নিত্যপণ্যের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলো। অভিযোগ প্রমাণ সাপেক্ষে বার্ষিক টার্নওভারের ১ থেকে ১০ ভাগ পর্যন্ত জরিমানা গুনতে হবে। প্রতিযোগিতা কমিশন আইন অমান্যে ফৌজদারি মামলার মুখোমুখি হবেন ব্যবসায়ীরা। অতি মুনাফাখোর সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়েছে প্রতিযোগিতা কমিশন।

কমিশন সূত্রে জানা গেছে, চালের দাম বেশি নেয়ার অভিযোগে ১৯টি মামলা হয়েছে। মিনিকেট চাল নিয়ে কয়েক দশক ধরে চলছে প্রতারণা। চালের বাজার এখনও অস্থির। চালের জন্য রশিদ এ্যাগ্রো ফুড প্রোডাক্টস, বেলকন গ্রুপ, সিটি গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ, বাংলাদেশ এডিবল অয়েল লিমিটেডকে প্রথম পর্যায়ের শুনানিতে ডাকা হয়েছে, আটা-ময়দার জন্য ৮টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে সিটি গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ অন্যতম। ডিমের জন্য ৬টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে প্যারাগন পোল্ট্রি, ডিম ব্যবসায়ী-আড়তদার বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি আমানউল্লাহ্, কাজী ফার্মস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী জাহেদুল ইসলাম রয়েছেন।

মুরগির বাজার অস্থির করার জন্য ৬টি মামলা করেছে কমিশন। এর মধ্যে প্রথম পর্যায়ে কাজী ফার্মস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী জাহেদুল ইসলাম, প্যারাগন পোল্ট্রি লিমিটেডকে প্রথম পর্যায়ের শুনানিতে ডাকা হয়েছে। এছাড়া সাবান-সোডাসহ টয়লেট্রিজ পণ্যের দাম বেশি নেয়ার অভিযোগে ৫টি মামলা করেছে প্রতিযোগিতা কমিশন। এর মধ্যে ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেড অন্যতম।
জানা গেছে, করোনা মহামারী পরবর্তী ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ডলারের দাম বেশির কারণ দেখিয়ে দেশে নিত্য ও ভোগ্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। ইতোপূর্বে ভোজ্যতেলের আট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করে প্রতিযোগিতা কমিশন। সেই মামলার ওপর শুনানি শুরু হলে ব্যবসায়ীরা সময় চেয়ে আবেদন করেন। এতে আপাতত শুনানি হচ্ছে না। তবে শীঘ্রই শুনানি শুরু হবে বলে জানিয়েছেন প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারম্যান মোঃ মফিজুল ইসলাম। তিনি বলেন, প্রতিযোগিতা কমিশন আইন অনুযায়ী বিচারকার্য পরিচালনা করবে।

অভিযোগ প্রমাণ সাপেক্ষে আইন অনুযায়ী জরিমানা করা হবে। আইন অনুযায়ী বার্ষিক টার্নওভারের ১-১০ ভাগ পর্যন্ত জরিমানা করতে পারবে কমিশন। তিনি জানান, নিত্য ও ভোগ্যপণ্যের দাম বেশি নেয়া হলে সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়ে। দেশের সবাই কোন না কোনভাবে ভোক্তা। এ কারণে দ্র্বমূল্য বাড়িয়ে অতিরিক্ত মুনাফা করার কোন সুযোগ নেই।
এদিকে, দ্রব্যমূল্য বাড়ায় কষ্টে আছেন সাধারণ মানুষ। দেশে এখন রেকর্ড দামে বিক্রি হচ্ছে ১৭টি অত্যাবশ্যকীয় ভোগ্যপণ্য। নিত্যপণ্যের দাম এত বেড়েছে যে, চাল কিনলে ফুরিয়ে যাচ্ছে লবণের পয়সা। একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব, অন্যদিকে নিত্যপণ্যের বাজারে অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি- সবমিলিয়ে ভোক্তার নাভিশ্বাস এখন চরমে।

অত্যাবশ্যকীয় পণ্য হিসেবে খ্যাত পেঁয়াজ, রসুন, মসুর ডাল, ছোলা, শুকনো মরিচ, দারুচিনি, লবঙ্গ, এলাচ, ধনে, জিরা, আদা, হলুদ, তেজপাতা, সয়াবিন তেল, পাম অয়েল, চিনি ও খাবার লবণের মূল্য গরিব মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। এসব পণ্য কিনতে চাপে আছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্তরাও। পাশাপাশি দেশের প্রধান খাদ্যপণ্য চাল, আটা ও ময়দা বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। সর্বশেষ সাবান-সোডার মতো টয়লেট্রিজ পণ্যের দামও বেড়েছে কয়েকগুণ। সম্প্রতি জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরে ইউনিলিভারসহ টয়লেট্রিজ পণ্যের উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

এছাড়া তিনি চাল, ডিম, ভোজ্যতেল এবং অন্যান্য পণ্যের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে সংস্থাটির মহাপরিচালক এএইচএম সফিকুজ্জামান জানান, গত কয়েক মাসে ভোগ্যপণ্য ও টয়লেট্রিজ পণ্যের দাম যেভাবে বাড়ানো হয়েছে তা সঠিক হয়নি। আমদানি মূল্য, এলসি, ব্যাংক ঋণসহ যাবতীয় হিসাব-নিকাশ করে দেখা গেছে, দাম বেশি নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। এ কারণে ভোক্তা অধিকার নিয়মিত অভিযান পরিচালনা ও জরিমানা করছে।

জানা গেছে, দ্রবমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও ভোক্তাস্বার্থে দেশে আটটি আইন ও বিপণন আদেশ থাকলেও তা মানছে না ব্যবসায়ীরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজার নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান আইনেরই যথাযথ প্রয়োগ নেই। আর এ কারণেও দ্রব্যমূল্য বাড়ছে। ভোগ্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারী একাধিক উদ্যোগ থাকলেও বাজারে তেমন প্রভাব পড়েনি। হু হ করে বাড়ছে জিনিসপত্রের দাম। এদিকে দ্রব্যমূল্যের কারণে সবশ্রেণীর মানুষ এখন চাপের মুখে পড়েছেন। তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। এতে করে কষ্ট বেড়েছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের। অথচ ভোগ্যপণ্য নিয়ন্ত্রণে দেশে আটটির বেশি আইন রয়েছে।

এছাড়া দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, বাজার ব্যবস্থাপনা, তদারকির জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দ্রব্যমূল্য পর্যালোচনা ও পূর্বাভাস সেল, বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের দ্রব্যমূল্য মনিটরিং সেল, খাদ্য অধিদফতর, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ পরিষদসহ সরকারের একাধিক বিভাগ ও প্রতিষ্ঠান আছে। কিন্তু মাঝেমধ্যে বাজার পরিদর্শন, শহরাঞ্চলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের কিছু অভিযান-জরিমানার মধ্যেই তাদের কর্মতৎপরতা সীমাবদ্ধ। ফলে ভোগ্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি ফিরে আসছে না।
এদিকে, সরকারী বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যমতে, গত এক বছরে ৭ থেকে প্রায় ৬২ শতাংশ পর্যন্ত দাম বেড়েছে ভোজ্যতেল, ডাল, আদা ও রসুনসহ বিভিন্ন আমদানি করা ভোগ্যপণ্যের। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিটি ভোগ্যপণ্য এখন রেকর্ড দামে বিক্রি হচ্ছে বাজারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজার নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান আইনেরই যথাযথ প্রয়োগ নেই এবং সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীর কারণে জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে। এ প্রসঙ্গে প্রতিযোগিতা কমিশনের সচিব মোঃ আবদুস সবুর বলেন, বিভিন্ন অভিযোগে চাল, আটা, মুরগির মাংস, ডিমসহ বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদন ও বাজারজাতকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।

প্রতিযোগিতা কমিশন আইন-২০১২ অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রতিযোগিতা কমিশন আইনের ১৫ ও ১৬ ধারা অনুযায়ী এ মামলা হয়েছে। ধারা ১৫ তে বলা হয়েছে, বাজারে প্রভাব বিস্তার করে একপক্ষীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি করলে তারা শাস্তির আওতায় আসবে। আর ১৬ ধারাতে বলা হয়েছে, কোন পণ্যের বাজারজাত বা উৎপাদনে শীর্ষে থাকার সুযোগ কাজে লাগিয়ে পণ্যের দামে কারসাজি করলে সেই অপরাধও শাস্তিযোগ্য।