ঢাকা ০৫:০৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০১ অক্টোবর ২০২২, ১৫ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

বছরে ১০ হাজার টন দেশি মাল্টার উৎপাদন

মাগুরা সদর উপজেলার শিবরামপুর এলাকায় প্রায় পৌনে দুই একর জায়গাজুড়ে ওবায়দুল ইসলামের মাল্টাবাগান। বাগানে সব মিলিয়ে ৫০০টির বেশি গাছ আছে। দুই বছর আগে লাগানো গাছে এবারই মাল্টা ধরেছে। প্রতি গাছ থেকে ১২০ থেকে ১৫০টি মাল্টা পাওয়ার আশা করছেন ওবায়দুল।

মাগুরার পাইকারি বাজারে এখন প্রতি কেজি মাল্টা ৮০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ভালো দাম পেলে চলতি মৌসুমে প্রতি একর জমি থেকে দুই লাখ টাকা মুনাফার প্রত্যাশা করছেন ওবায়দুল।

দেশে কয়েক বছর ধরেই বাড়ছে মাল্টার উৎপাদন। সবচেয়ে বেশি মাল্টা উৎপাদনকারী জেলা মাগুরা। ২০২০-২১ অর্থবছরে উৎপাদন হয় ছয় হাজার ৫০১ টন। মাগুরায় উৎপাদন হয়েছিল এক হাজার ৫৪৩ টন।

মাগুরা সদরের রাউতড়া গ্রামের নাসির হোসেন বলেন, তাঁর চার একর জমিতে বারি মাল্টা-১ গাছ আছে ৪০০টি। প্রথমে ১০০ গাছ রোপণ করেন তিনি। পরে গ্রাফটিং কলম পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন করে দুই বছরে তিনি এ ফলবাগান করেছেন। এ বাগান থেকে তিনি পরিপূর্ণভাবে ফল পাবেন তৃতীয় বছর থেকে। এরপর কমপক্ষে ১০ বছর মাল্টা পাবেন তিনি।

কৃষি অর্থনীতিবিদরা জানিয়েছেন, এক দশক আগেও বছরে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার সাইট্রাসজাতীয়, বিশেষ করে লেবু, কমলা, মাল্টা ফল আমদানি করা হতো। গত কয়েক বছর তা দেড় হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে। আমদানিনির্ভরতা কমাচ্ছে দেশে উৎপাদিত কমলা ও মাল্টার উৎপাদন। দেশে মাল্টার উৎপাদন এখন প্রায় সাত হাজার টন। সেপ্টেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত পাঁচ মাসে ফলের উৎপাদন বা সরবরাহ ছিল কম। তাই এই সময়টাতে মানুষকে বাধ্য হয়ে বিদেশি ফল কিনতে হয়। তবে সময় পাল্টেছে। বিদেশি ফল বেচাকেনার ভরা মৌসুমেও এখন পাওয়া যাচ্ছে দেশি ফল। সেখানে বিশেষ স্থান করে নিচ্ছে দেশি মাল্টা।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য মতে, ২০২০-২১ অর্থবছরে মাল্টা উৎপাদনে দ্বিতীয় শীর্ষ জেলা ছিল রাজশাহী। এখানে ৬৭৭ টন মাল্টা উৎপাদন হয়েছিল। এরপর ছিল টাঙ্গাইল (৪৫৬ টন), রাঙামাটি (৪০৮ টন), বান্দরবান (৩৩১ টন) ও যশোর (৩০২ টন)। এ ছাড়া দিনাজপুরে ২৮৩ টন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২৫৮ টন, খাগড়াছড়িতে ২৬৬ টন এবং পিরোজপুরে ২০৮ টন। তবে গত ২০২১-২২ অর্থবছরে মাল্টার উৎপাদন (ফসল-উত্তর ক্ষতি বাদে) ১০ হাজার টন ছাড়িয়েছে বলে প্রাথমিক তথ্যে উঠে এসেছে। ফলে প্রতি কেজি মাল্টার গড় দাম ১০০ টাকা হিসাবে ফলটির বাজার ১০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

তবে প্রতিবছর দেশে উৎপাদিত ফলের মৌসুমে আমদানি অবারিত থাকার কারণে কৃষক দাম পান না বলে অভিযোগ রয়েছে। ভারত ও ভুটান থেকে সাইট্রাসজাতীয় ফলের আমদানি বেশি হয়। এ ছাড়া চীন, মিসর, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা থেকেও আমদানি হয়।

এ বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিশেষজ্ঞ পুলের সদস্য ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) সাবেক মহাপরিচালক কৃষিবিদ হামিদুর রহমান বলেন, দেশে লেবুজাতীয় ফসলের উৎপাদন দিনে দিনে বাড়ছে, তবে চাহিদার তুলনায় অনেক কম। কিছু লেবু রপ্তানি হচ্ছে। দেশে মাল্টার উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকারের নানা উদ্যোগের কারণে ফলটির সম্ভাবনা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, ‘কৃষিপণ্যের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে সারা বিশ্বেই উৎপাদন মৌসুমে আমদানি শুল্ক আরোপ করা হয়। আমাদের দেশেও এটি প্রয়োগ করতে হবে। কৃষক ভালো দাম পেলে উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। ’

তবে অভিযোগ রয়েছে, ভালো ও পরিপক্ব মাল্টা সহজেই সব সময় ভোক্তা পাচ্ছে না। অপরিপক্ব মাল্টা কিনে প্রতারিত হওয়ার ঘটনাও ঘটছে। সাধারণত ভালো দামের আশায় অপরিপক্ব মাল্টা তুলে বাজারে নেওয়া হয়। পাহাড়ের জেলাগুলোতে আগস্ট মাসে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোয় সেপ্টেম্বর এবং উত্তরবঙ্গে অক্টোবরের শেষ থেকে নভেম্বর পর্যন্ত মাল্টা তোলার উপযুক্ত সময়। পরিপক্ব মাল্টা পেতে হলে বোঁটার দিকে নজর রাখতে হবে।

এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো. মেহেদী মাসুদ বলেন, সাইট্রাস বা লেবুজাতীয় ফলের মধ্যে দেশে মাল্টা ও কমলা লেবুর চাষের প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। বৃষ্টিবহুল ও উঁচু পাহাড়ি অঞ্চলে এ ফল ভালো হয়। আগামী দিনে অন্ততপক্ষে মাল্টা যেন আমদানি না করতে হয় তার জন্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে কাজ করা হচ্ছে। মাল্টা তোলার ক্ষেত্রে গাছ থেকে আম নামানোর মতো সময় নির্ধারণ করতে হবে।

Tag :
জনপ্রিয়

হোসেনপুর বাজার সনাতন ধর্মাবলম্বী ব্যাবসায়িকদের উদ্যোগে বস্ত্র বিতরণ

বছরে ১০ হাজার টন দেশি মাল্টার উৎপাদন

প্রকাশের সময় : ১০:১৭:৪০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২

মাগুরা সদর উপজেলার শিবরামপুর এলাকায় প্রায় পৌনে দুই একর জায়গাজুড়ে ওবায়দুল ইসলামের মাল্টাবাগান। বাগানে সব মিলিয়ে ৫০০টির বেশি গাছ আছে। দুই বছর আগে লাগানো গাছে এবারই মাল্টা ধরেছে। প্রতি গাছ থেকে ১২০ থেকে ১৫০টি মাল্টা পাওয়ার আশা করছেন ওবায়দুল।

মাগুরার পাইকারি বাজারে এখন প্রতি কেজি মাল্টা ৮০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ভালো দাম পেলে চলতি মৌসুমে প্রতি একর জমি থেকে দুই লাখ টাকা মুনাফার প্রত্যাশা করছেন ওবায়দুল।

দেশে কয়েক বছর ধরেই বাড়ছে মাল্টার উৎপাদন। সবচেয়ে বেশি মাল্টা উৎপাদনকারী জেলা মাগুরা। ২০২০-২১ অর্থবছরে উৎপাদন হয় ছয় হাজার ৫০১ টন। মাগুরায় উৎপাদন হয়েছিল এক হাজার ৫৪৩ টন।

মাগুরা সদরের রাউতড়া গ্রামের নাসির হোসেন বলেন, তাঁর চার একর জমিতে বারি মাল্টা-১ গাছ আছে ৪০০টি। প্রথমে ১০০ গাছ রোপণ করেন তিনি। পরে গ্রাফটিং কলম পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন করে দুই বছরে তিনি এ ফলবাগান করেছেন। এ বাগান থেকে তিনি পরিপূর্ণভাবে ফল পাবেন তৃতীয় বছর থেকে। এরপর কমপক্ষে ১০ বছর মাল্টা পাবেন তিনি।

কৃষি অর্থনীতিবিদরা জানিয়েছেন, এক দশক আগেও বছরে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার সাইট্রাসজাতীয়, বিশেষ করে লেবু, কমলা, মাল্টা ফল আমদানি করা হতো। গত কয়েক বছর তা দেড় হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে। আমদানিনির্ভরতা কমাচ্ছে দেশে উৎপাদিত কমলা ও মাল্টার উৎপাদন। দেশে মাল্টার উৎপাদন এখন প্রায় সাত হাজার টন। সেপ্টেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত পাঁচ মাসে ফলের উৎপাদন বা সরবরাহ ছিল কম। তাই এই সময়টাতে মানুষকে বাধ্য হয়ে বিদেশি ফল কিনতে হয়। তবে সময় পাল্টেছে। বিদেশি ফল বেচাকেনার ভরা মৌসুমেও এখন পাওয়া যাচ্ছে দেশি ফল। সেখানে বিশেষ স্থান করে নিচ্ছে দেশি মাল্টা।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য মতে, ২০২০-২১ অর্থবছরে মাল্টা উৎপাদনে দ্বিতীয় শীর্ষ জেলা ছিল রাজশাহী। এখানে ৬৭৭ টন মাল্টা উৎপাদন হয়েছিল। এরপর ছিল টাঙ্গাইল (৪৫৬ টন), রাঙামাটি (৪০৮ টন), বান্দরবান (৩৩১ টন) ও যশোর (৩০২ টন)। এ ছাড়া দিনাজপুরে ২৮৩ টন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২৫৮ টন, খাগড়াছড়িতে ২৬৬ টন এবং পিরোজপুরে ২০৮ টন। তবে গত ২০২১-২২ অর্থবছরে মাল্টার উৎপাদন (ফসল-উত্তর ক্ষতি বাদে) ১০ হাজার টন ছাড়িয়েছে বলে প্রাথমিক তথ্যে উঠে এসেছে। ফলে প্রতি কেজি মাল্টার গড় দাম ১০০ টাকা হিসাবে ফলটির বাজার ১০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

তবে প্রতিবছর দেশে উৎপাদিত ফলের মৌসুমে আমদানি অবারিত থাকার কারণে কৃষক দাম পান না বলে অভিযোগ রয়েছে। ভারত ও ভুটান থেকে সাইট্রাসজাতীয় ফলের আমদানি বেশি হয়। এ ছাড়া চীন, মিসর, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা থেকেও আমদানি হয়।

এ বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিশেষজ্ঞ পুলের সদস্য ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) সাবেক মহাপরিচালক কৃষিবিদ হামিদুর রহমান বলেন, দেশে লেবুজাতীয় ফসলের উৎপাদন দিনে দিনে বাড়ছে, তবে চাহিদার তুলনায় অনেক কম। কিছু লেবু রপ্তানি হচ্ছে। দেশে মাল্টার উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকারের নানা উদ্যোগের কারণে ফলটির সম্ভাবনা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, ‘কৃষিপণ্যের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে সারা বিশ্বেই উৎপাদন মৌসুমে আমদানি শুল্ক আরোপ করা হয়। আমাদের দেশেও এটি প্রয়োগ করতে হবে। কৃষক ভালো দাম পেলে উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। ’

তবে অভিযোগ রয়েছে, ভালো ও পরিপক্ব মাল্টা সহজেই সব সময় ভোক্তা পাচ্ছে না। অপরিপক্ব মাল্টা কিনে প্রতারিত হওয়ার ঘটনাও ঘটছে। সাধারণত ভালো দামের আশায় অপরিপক্ব মাল্টা তুলে বাজারে নেওয়া হয়। পাহাড়ের জেলাগুলোতে আগস্ট মাসে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোয় সেপ্টেম্বর এবং উত্তরবঙ্গে অক্টোবরের শেষ থেকে নভেম্বর পর্যন্ত মাল্টা তোলার উপযুক্ত সময়। পরিপক্ব মাল্টা পেতে হলে বোঁটার দিকে নজর রাখতে হবে।

এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো. মেহেদী মাসুদ বলেন, সাইট্রাস বা লেবুজাতীয় ফলের মধ্যে দেশে মাল্টা ও কমলা লেবুর চাষের প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। বৃষ্টিবহুল ও উঁচু পাহাড়ি অঞ্চলে এ ফল ভালো হয়। আগামী দিনে অন্ততপক্ষে মাল্টা যেন আমদানি না করতে হয় তার জন্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে কাজ করা হচ্ছে। মাল্টা তোলার ক্ষেত্রে গাছ থেকে আম নামানোর মতো সময় নির্ধারণ করতে হবে।