ঢাকা ০৮:১৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৫ অক্টোবর ২০২২, ২০ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

প্রশ্নফাঁসে জড়িয়ে পড়ছেন শিক্ষকরা

কড়াকড়ির মধ্যেও কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারীর একটি কেন্দ্র থেকে চলমান এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। এ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সরকারের গোটা শিক্ষা বিভাগে। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের ঘটনা এটাই প্রথম। কেন্দ্র সচিবের কক্ষ থেকে এই প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। এ ঘটনায় জড়িত অর্ধশতাধিক শিক্ষকের সিন্ডিকেট। এমন ঘটনা এর আগে তেমন ঘটেনি। তবে এই প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ফাঁস হওয়ায় নড়েচড়ে বসেছে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাবোর্ড। এখন থেকে কেন্দ্রগুলোতে প্রশ্নপত্র আগের নিয়মেই পৌঁছাবে, তবে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পাহারায় থাকবে পুলিশ। এমনটাই জানিয়েছেন দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ড ও শিক্ষা কর্মকর্তারা।

এদিকে প্রশ্নফাঁস চক্রে শিক্ষকরা জড়িয়ে পড়ায় প্রশ্নপত্রের সুরক্ষা নিয়ে দুশ্চিন্তা আরও বেড়ে গেল বলে মনে করেন শিক্ষাবিদরা। তারা বলছেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসরোধে সর্বপ্রথমই প্রয়োজন শিক্ষকদের দৃষ্টিভঙ্গিকে সুশিক্ষামুখী করা। আর মূল্যবোধকে জাগ্রত করতে সাংস্কৃতিক জাগরণও ঘটানো দরকার।

উল্লেখ্য, এর আগে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা তদন্তে বুয়েটের এক শিক্ষকের নাম এসেছিল। তবে শিক্ষকদের সিন্ডিকেট জড়িত থাকার তথ্য এর আগে আর পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে বহু ধাপের নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলার পরও প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার কেন্দ্রসচিবসহ তিন শিক্ষককে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে জেলা পুলিশ এবং শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তারা। গ্রেপ্তারকৃতরা প্রশ্ন কেনাবেচা চক্রের সক্রিয় সদস্য বলে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদে জানতে পেরেছে। বিজ্ঞান বিভাগের চার বিষয়ের প্রশ্নপত্রের ফটোকপি ২০ হাজার টাকা করে বিক্রি করছিলেন তারা। এছাড়া দিনাজপুর শিক্ষাবোর্ডের অধীন কেন্দ্রগুলোতে প্রশ্নপত্র ফাঁস করতে কাজ করছিল অর্ধশতাধিক শিক্ষকের একটি সিন্ডিকেট। যাদের বেশিরভাগই প্রাইভেট পড়ানো ও কোচিং ব্যবসায় জড়িত বলে পুলিশ তথ্য পেয়েছে।

এ বিষয়ে দিনাজপুর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক মো. জহির উদ্দিন সন্ধ্যায় বলেন, ‘প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় চার বিষয়ের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। বিষয়টির তদন্ত চলছে। ঘটনার পুনরাবৃত্তিরোধে কেন্দ্রগুলোকে আরও সতর্ক হতে বলা হয়েছে।’

কুড়িগ্রাম জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শামছুল আলম জানিয়েছেন, ‘প্রশ্নফাঁসে গ্রেপ্তারকৃতরা কোচিং ও প্রাইভেট পড়ানোর সাথে জড়িত। তাদের কোচিংগুলোতে যেন বেশি ছাত্রছাত্রী আসে সেই লোভে এবং ব্যক্তিগতভাবে আর্থিক লাভবান হওয়ার আশায় এই শিক্ষকরা প্রশ্নফাঁসে জড়ায় বলে প্রাথমিকভাবে তথ্য পাওয়া গেছে।’ পরবর্তী পরীক্ষাগুলোর প্রশ্নপত্রের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে জেলা শিক্ষাবিভাগের কর্মকর্তারা এবং পুলিশ সজাগ রয়েছে। আগের চেয়ে আরও সতর্ক হয়েছে বলেও জানান তিনি।

প্রশ্নফাঁসের ঘটনার পর কেন্দ্রে প্রশ্নপত্র পৌঁছানোর বিষয়ে কোন পরিবর্তন আনা হয়েছে কি না জানতে চাইলে ওই শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, ‘আগের সময়েই কেন্দ্রে প্রশ্নপত্র পৌঁছবে। তবে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুলিশের পাহারা থাকবে।’

ভুরুঙ্গামারী নেহাল উদ্দিন বালিকা উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে গত সোমবার প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ওঠে। এরপর বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী ওই কেন্দ্রের সচিব, বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক মো. লুৎফর রহমানকে আটকে রাখেন। খবর পেয়ে প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে এসে কেন্দ্র সচিবের কক্ষ তল্লাশি করে গণিত (আবশ্যিক), উচ্চতর গণিত, কৃষিশিক্ষা, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও জীববিজ্ঞানের প্রশ্নপত্রের প্যাকেট উদ্ধার করে। এর মধ্যে একটি প্যাকেট ছাড়া সবকটি প্যাকেটের মুখ খোলা ছিল। পরে ওই শিক্ষককে গ্রেপ্তার করা হয়। তার কাছ থেকে তথ্য নিয়ে আরও ৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়া আরো দুই শিক্ষককে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

ভুরুঙ্গামারী সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মোরশেদুল হাসান বলেন, ‘তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাদের কাছ থেকে বেশকিছু তথ্য পাওয়া গেছে। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।’

পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত শিক্ষকরা অর্ধশতাধিক শিক্ষকের নাম বলেছেন, যারা এই প্রশ্নফাঁস চক্রে জড়িত। তাদের গ্রেপ্তারে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে। কিন্তু ঘটনা জানতে পেরে জড়িতরা গা-ঢাকা দিয়েছে।

প্রশ্নফাঁসে শিক্ষকরা জড়িত হয়ে পড়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘শিক্ষকদের ভেতরে এসব ঢুকে গেল। তাহলে তো ভরসার শেষ জায়গাটাও শেষ হলো।’ তিনি বলেন, এটি হচ্ছে সামাজিক পুঁজিবাদের চূড়ান্ত রূপ। মোটকথা মূল্যবোধ ভুলে গিয়ে এই শিক্ষকরা এখন টাকা ছাড়া, নিজের স্বার্থ এবং মুনাফা ছাড়া কিছুই বোঝেন না। এ অবস্থায় গোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আমাদের দাঁড়াতে হবে। এই ব্যবস্থা পরিবর্তন করতে হবে। এর জন্য সামাজিক ও রাজনৈতিক মানসিকতার পরিবর্তনও দরকার। মোটকথা, একটি সামাজিক জাগরণ এখন জরুরি।’

পুলিশ জানায়, গত মঙ্গলবার রাতে নেহাল উদ্দিন বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আদম মালিক চৌধুরী বাদী হয়ে এ বিষয়ে ভুরুঙ্গামারী থানায় মামলা করেন। মামলার আসামিরা হলেন- নেহাল উদ্দিন বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও কেন্দ্র সচিব মো. লুৎফর রহমান, একই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. জোবাইর হোসেন, মো. আবু হানিফ ও মো. আমিনুর রহমান। এজাহারে ১০ থেকে ১৫ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, গত মঙ্গলবার কেন্দ্র সচিব ও প্রধান শিক্ষক লুৎফর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে আদম মালিক চৌধুরী ভুরুঙ্গামারী থানা থেকে সীলমোহর অক্ষত অবস্থায় ইংরেজি দ্বিতীয় পত্র প্রশ্নের দুটি প্যাকেট সংগ্রহ করেন। পরে তারা প্রশ্নপত্র নিয়ে নেহাল উদ্দিন বালিকা উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে আসেন। কেন্দ্রে পৌঁছানোর পর লুৎফর রহমান তার নিজ কক্ষের একটি বইয়ের শেলফে প্রশ্নপত্রের প্যাকেট দুটি রাখেন। পরে আনুমানিক সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটের দিকে আদম মালিক চৌধুরী কেন্দ্র সচিবের কক্ষে যান। এ সময় কেন্দ্র সচিব প্যাকেট খুলে প্রশ্নপত্র বের করেন। পরে ১০টা ৫০ মিনিটে প্রশ্নপত্রগুলো কেন্দ্রের কক্ষভিত্তিক দায়িত্বরত শিক্ষকদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

এজাহারে আদম মালিক চৌধুরী উল্লেখ করেন, ওই দিন আনুমানিক বেলা দেড়টার দিকে তিনি ওই কেন্দ্র সচিবের মাধ্যমে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ উঠেছে বলে জানতে পারেন। তাৎক্ষণিকভাবে তিনি বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দীপক কুমার শর্মাকে জানান। পরীক্ষা শেষে ইউএনও দীপক কুমার শর্মার উপস্থিতিতে লুৎফর রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে লুৎফর রহমান কোনো সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেননি। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে লুৎফর স্বীকার করেন, তার কাছে পরের একাধিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র আছে। এরপর লুৎফর রহমানের কক্ষের বইয়ের তাক থেকে একটি কাপড়ের ব্যাগ পাওয়া যায়। ওই ব্যাগের ভেতর থেকে গণিত, উচ্চতর গণিত, কৃষিশিক্ষা, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও জীববিজ্ঞানের প্রশ্নপত্রের প্যাকেট উদ্ধার করা হয়। এ সময় সেখানে উপস্থিত ভুরুঙ্গামারী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সাঈদ মো. আতিক নুর প্রশ্নপত্রগুলো জব্দ করেন। পরে তিনি লুৎফর রহমানকে আটক করেন। এ সময় লুৎফর রহমানকে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি বলেন, পূর্বপরিকল্পিতভাবে বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আবু হানিফের সহায়তায় কৌশলে প্রশ্নপত্রের প্যাকেটগুলো কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়। পরে প্রশ্নপত্রগুলো আবু হানিফ, অন্য দুই শিক্ষক জোবাইর হোসেন, আমিনুর রহমানসহ অজ্ঞাতনামা ১০ থেকে ১৫ জনের মাধ্যমে গোপনে প্রশ্নগুলো ফাঁস করে দেওয়া হয়।

এই মামলায় এখন পর্যন্ত কেন্দ্র সচিবসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ ছাড়া বিদ্যালয়ের দুই শিক্ষক হামিদুর রহমান ও মো. সোহেলকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়েছে পুলিশ।

এসএসসি পরীক্ষা শুরুর আগে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি ও শিক্ষাসচিবসহ সরকারের গোটা শিক্ষা বিভাগ জানিয়েছিল, এ বছর প্রশ্নফাঁসের কোনো সুযোগ নেই। যারা প্রশ্নফাঁসের গুজব ছড়াবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রসঙ্গত, প্রশ্নফাঁসের পর সংশ্লিষ্ট বোর্ডের অধীন কেন্দ্রগুলোতে গণিত (১০৯), পদার্থবিজ্ঞান (১৩৬), কৃষিবিজ্ঞান (১৩৪) এবং রসায়ন (১৩৭) পরীক্ষা স্থগিত করা হয়।

Tag :

কালীগঞ্জে মায়ের শাড়ি গলায় পেঁচিয়ে ছেলের আত্মহত্যা

প্রশ্নফাঁসে জড়িয়ে পড়ছেন শিক্ষকরা

প্রকাশের সময় : ০৯:১৯:৫৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২২

কড়াকড়ির মধ্যেও কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারীর একটি কেন্দ্র থেকে চলমান এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। এ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সরকারের গোটা শিক্ষা বিভাগে। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের ঘটনা এটাই প্রথম। কেন্দ্র সচিবের কক্ষ থেকে এই প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। এ ঘটনায় জড়িত অর্ধশতাধিক শিক্ষকের সিন্ডিকেট। এমন ঘটনা এর আগে তেমন ঘটেনি। তবে এই প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ফাঁস হওয়ায় নড়েচড়ে বসেছে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাবোর্ড। এখন থেকে কেন্দ্রগুলোতে প্রশ্নপত্র আগের নিয়মেই পৌঁছাবে, তবে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পাহারায় থাকবে পুলিশ। এমনটাই জানিয়েছেন দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ড ও শিক্ষা কর্মকর্তারা।

এদিকে প্রশ্নফাঁস চক্রে শিক্ষকরা জড়িয়ে পড়ায় প্রশ্নপত্রের সুরক্ষা নিয়ে দুশ্চিন্তা আরও বেড়ে গেল বলে মনে করেন শিক্ষাবিদরা। তারা বলছেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসরোধে সর্বপ্রথমই প্রয়োজন শিক্ষকদের দৃষ্টিভঙ্গিকে সুশিক্ষামুখী করা। আর মূল্যবোধকে জাগ্রত করতে সাংস্কৃতিক জাগরণও ঘটানো দরকার।

উল্লেখ্য, এর আগে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা তদন্তে বুয়েটের এক শিক্ষকের নাম এসেছিল। তবে শিক্ষকদের সিন্ডিকেট জড়িত থাকার তথ্য এর আগে আর পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে বহু ধাপের নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলার পরও প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার কেন্দ্রসচিবসহ তিন শিক্ষককে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে জেলা পুলিশ এবং শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তারা। গ্রেপ্তারকৃতরা প্রশ্ন কেনাবেচা চক্রের সক্রিয় সদস্য বলে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদে জানতে পেরেছে। বিজ্ঞান বিভাগের চার বিষয়ের প্রশ্নপত্রের ফটোকপি ২০ হাজার টাকা করে বিক্রি করছিলেন তারা। এছাড়া দিনাজপুর শিক্ষাবোর্ডের অধীন কেন্দ্রগুলোতে প্রশ্নপত্র ফাঁস করতে কাজ করছিল অর্ধশতাধিক শিক্ষকের একটি সিন্ডিকেট। যাদের বেশিরভাগই প্রাইভেট পড়ানো ও কোচিং ব্যবসায় জড়িত বলে পুলিশ তথ্য পেয়েছে।

এ বিষয়ে দিনাজপুর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক মো. জহির উদ্দিন সন্ধ্যায় বলেন, ‘প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় চার বিষয়ের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। বিষয়টির তদন্ত চলছে। ঘটনার পুনরাবৃত্তিরোধে কেন্দ্রগুলোকে আরও সতর্ক হতে বলা হয়েছে।’

কুড়িগ্রাম জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শামছুল আলম জানিয়েছেন, ‘প্রশ্নফাঁসে গ্রেপ্তারকৃতরা কোচিং ও প্রাইভেট পড়ানোর সাথে জড়িত। তাদের কোচিংগুলোতে যেন বেশি ছাত্রছাত্রী আসে সেই লোভে এবং ব্যক্তিগতভাবে আর্থিক লাভবান হওয়ার আশায় এই শিক্ষকরা প্রশ্নফাঁসে জড়ায় বলে প্রাথমিকভাবে তথ্য পাওয়া গেছে।’ পরবর্তী পরীক্ষাগুলোর প্রশ্নপত্রের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে জেলা শিক্ষাবিভাগের কর্মকর্তারা এবং পুলিশ সজাগ রয়েছে। আগের চেয়ে আরও সতর্ক হয়েছে বলেও জানান তিনি।

প্রশ্নফাঁসের ঘটনার পর কেন্দ্রে প্রশ্নপত্র পৌঁছানোর বিষয়ে কোন পরিবর্তন আনা হয়েছে কি না জানতে চাইলে ওই শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, ‘আগের সময়েই কেন্দ্রে প্রশ্নপত্র পৌঁছবে। তবে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুলিশের পাহারা থাকবে।’

ভুরুঙ্গামারী নেহাল উদ্দিন বালিকা উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে গত সোমবার প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ওঠে। এরপর বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী ওই কেন্দ্রের সচিব, বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক মো. লুৎফর রহমানকে আটকে রাখেন। খবর পেয়ে প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে এসে কেন্দ্র সচিবের কক্ষ তল্লাশি করে গণিত (আবশ্যিক), উচ্চতর গণিত, কৃষিশিক্ষা, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও জীববিজ্ঞানের প্রশ্নপত্রের প্যাকেট উদ্ধার করে। এর মধ্যে একটি প্যাকেট ছাড়া সবকটি প্যাকেটের মুখ খোলা ছিল। পরে ওই শিক্ষককে গ্রেপ্তার করা হয়। তার কাছ থেকে তথ্য নিয়ে আরও ৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়া আরো দুই শিক্ষককে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

ভুরুঙ্গামারী সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মোরশেদুল হাসান বলেন, ‘তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাদের কাছ থেকে বেশকিছু তথ্য পাওয়া গেছে। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।’

পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত শিক্ষকরা অর্ধশতাধিক শিক্ষকের নাম বলেছেন, যারা এই প্রশ্নফাঁস চক্রে জড়িত। তাদের গ্রেপ্তারে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে। কিন্তু ঘটনা জানতে পেরে জড়িতরা গা-ঢাকা দিয়েছে।

প্রশ্নফাঁসে শিক্ষকরা জড়িত হয়ে পড়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘শিক্ষকদের ভেতরে এসব ঢুকে গেল। তাহলে তো ভরসার শেষ জায়গাটাও শেষ হলো।’ তিনি বলেন, এটি হচ্ছে সামাজিক পুঁজিবাদের চূড়ান্ত রূপ। মোটকথা মূল্যবোধ ভুলে গিয়ে এই শিক্ষকরা এখন টাকা ছাড়া, নিজের স্বার্থ এবং মুনাফা ছাড়া কিছুই বোঝেন না। এ অবস্থায় গোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আমাদের দাঁড়াতে হবে। এই ব্যবস্থা পরিবর্তন করতে হবে। এর জন্য সামাজিক ও রাজনৈতিক মানসিকতার পরিবর্তনও দরকার। মোটকথা, একটি সামাজিক জাগরণ এখন জরুরি।’

পুলিশ জানায়, গত মঙ্গলবার রাতে নেহাল উদ্দিন বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আদম মালিক চৌধুরী বাদী হয়ে এ বিষয়ে ভুরুঙ্গামারী থানায় মামলা করেন। মামলার আসামিরা হলেন- নেহাল উদ্দিন বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও কেন্দ্র সচিব মো. লুৎফর রহমান, একই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. জোবাইর হোসেন, মো. আবু হানিফ ও মো. আমিনুর রহমান। এজাহারে ১০ থেকে ১৫ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, গত মঙ্গলবার কেন্দ্র সচিব ও প্রধান শিক্ষক লুৎফর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে আদম মালিক চৌধুরী ভুরুঙ্গামারী থানা থেকে সীলমোহর অক্ষত অবস্থায় ইংরেজি দ্বিতীয় পত্র প্রশ্নের দুটি প্যাকেট সংগ্রহ করেন। পরে তারা প্রশ্নপত্র নিয়ে নেহাল উদ্দিন বালিকা উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে আসেন। কেন্দ্রে পৌঁছানোর পর লুৎফর রহমান তার নিজ কক্ষের একটি বইয়ের শেলফে প্রশ্নপত্রের প্যাকেট দুটি রাখেন। পরে আনুমানিক সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটের দিকে আদম মালিক চৌধুরী কেন্দ্র সচিবের কক্ষে যান। এ সময় কেন্দ্র সচিব প্যাকেট খুলে প্রশ্নপত্র বের করেন। পরে ১০টা ৫০ মিনিটে প্রশ্নপত্রগুলো কেন্দ্রের কক্ষভিত্তিক দায়িত্বরত শিক্ষকদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

এজাহারে আদম মালিক চৌধুরী উল্লেখ করেন, ওই দিন আনুমানিক বেলা দেড়টার দিকে তিনি ওই কেন্দ্র সচিবের মাধ্যমে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ উঠেছে বলে জানতে পারেন। তাৎক্ষণিকভাবে তিনি বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দীপক কুমার শর্মাকে জানান। পরীক্ষা শেষে ইউএনও দীপক কুমার শর্মার উপস্থিতিতে লুৎফর রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে লুৎফর রহমান কোনো সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেননি। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে লুৎফর স্বীকার করেন, তার কাছে পরের একাধিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র আছে। এরপর লুৎফর রহমানের কক্ষের বইয়ের তাক থেকে একটি কাপড়ের ব্যাগ পাওয়া যায়। ওই ব্যাগের ভেতর থেকে গণিত, উচ্চতর গণিত, কৃষিশিক্ষা, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও জীববিজ্ঞানের প্রশ্নপত্রের প্যাকেট উদ্ধার করা হয়। এ সময় সেখানে উপস্থিত ভুরুঙ্গামারী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সাঈদ মো. আতিক নুর প্রশ্নপত্রগুলো জব্দ করেন। পরে তিনি লুৎফর রহমানকে আটক করেন। এ সময় লুৎফর রহমানকে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি বলেন, পূর্বপরিকল্পিতভাবে বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আবু হানিফের সহায়তায় কৌশলে প্রশ্নপত্রের প্যাকেটগুলো কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়। পরে প্রশ্নপত্রগুলো আবু হানিফ, অন্য দুই শিক্ষক জোবাইর হোসেন, আমিনুর রহমানসহ অজ্ঞাতনামা ১০ থেকে ১৫ জনের মাধ্যমে গোপনে প্রশ্নগুলো ফাঁস করে দেওয়া হয়।

এই মামলায় এখন পর্যন্ত কেন্দ্র সচিবসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ ছাড়া বিদ্যালয়ের দুই শিক্ষক হামিদুর রহমান ও মো. সোহেলকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়েছে পুলিশ।

এসএসসি পরীক্ষা শুরুর আগে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি ও শিক্ষাসচিবসহ সরকারের গোটা শিক্ষা বিভাগ জানিয়েছিল, এ বছর প্রশ্নফাঁসের কোনো সুযোগ নেই। যারা প্রশ্নফাঁসের গুজব ছড়াবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রসঙ্গত, প্রশ্নফাঁসের পর সংশ্লিষ্ট বোর্ডের অধীন কেন্দ্রগুলোতে গণিত (১০৯), পদার্থবিজ্ঞান (১৩৬), কৃষিবিজ্ঞান (১৩৪) এবং রসায়ন (১৩৭) পরীক্ষা স্থগিত করা হয়।