ঢাকা ০৮:৪১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৪ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

পূজার প্রস্তুতি: উচ্ছ্বাস-শঙ্কা দুটোই আছে

আর কিছু দিন পরই সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান শারদীয় দুর্গাপূজা। এজন্য ব্যস্ত সময় পার করছেন রাজধানীর পুরান ঢাকার প্রতিমা শিল্পীরা। প্রতিমা তৈরির কাজ প্রায় শেষ। এখন চলছে রঙ ও প্রতিমা সাজানোর কাজ। রঙ তুলির আঁচড়ে প্রতিমা সাজাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রতিমা শিল্পীরা। আশ্বিন মাসের দশ দিন ধরেই দুর্গাপূজার উৎসব পালন করেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। যদিও উৎসব শুরু হয় ষষ্ঠী থেকে।

দুর্গাপূজার পাঁচ দিন মহাষষ্ঠী, মহাসপ্তমী, মহাঅষ্টমী, মহানবমী এবং বিজয়া দশমী হিসেবে পরিচিত। রাজধানীজুড়েই পূজা হয়। তবে সবচেয়ে জমজমাট পূজা উদযাপন করা হয় রাজধানীর পুরান ঢাকাকে কেন্দ্র করে। সরেজমিন দেখা যায়, পুরান ঢাকার শাঁখারিবাজার, নর্থব্রুক হল রোড, শ্রী শ্রী কালী মন্দিরসহ বেশ কয়েকটি জায়গায় একমাস ধরে নিরলসভাবে প্রতিমা তৈরি করে চলেছেন শিল্পীরা।

শাঁখারি বাজারের প্রবীণ মৃৎশিল্পী রাখাল পাল বলেন, বংশপরম্পরায় শৈশব থেকেই প্রতিমা তৈরি করে আসছি। প্রতিমা তৈরি করেই আমার জীবিকা চলে। সারা বছর টুকটাক অন্যান্য প্রতিমা তৈরি করলেও মূলত দুর্গাপূজাকে ঘিরেই চলে আমাদের সারা বছর। বয়স হয়েছে, তাই আগের মতো কাজ করতে পারি না। অসুস্থতার কারণে এবছর কম কাজ হাতে নিয়েছি। যা কাজ হাতে নিয়েছে তা প্রায় শেষ। আগের তুলনায় সবকিছুর দাম বেড়েছে। তাই প্রতিমাপ্রতি ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা বাড়তি খরচ হচ্ছে।

নর্থব্রুক হল রোডের দুর্গা মন্দিরে প্রতিমা তৈরির কাজে ভীষণ ব্যস্ত সময় পার করছেন মৃৎশিল্পী বলাই পাল। তিনি জানান, গত বছরের তুলনায় এ বছর অর্ডার একটু বেশি পেয়েছি। কাজ প্রায় শেষ। এখন রঙ ও সাজের কাজ চলছে। আগে রঙ তুলি দিয়ে কাজ করতাম। অনেক সময় লাগতো। এখন তুলির কাজ কম। স্প্রে মেশিনে রঙ করলে সময় কম লাগে। একজন মৃৎশিল্পী হিসেবে দুর্গাসহ অন্যান্য দেব-দেবীকে নিজ হাতে সুন্দর করে ফুটিয়ে তোলার চেয়ে বড় আনন্দ আর কিছু হতে পারে না।

প্রতিমা তৈরির ধাপ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয় আরেক প্রতিমা শিল্পী পল্টন পালের কাছে। তিনি জানান, প্রথমত মূর্তির আকার আকৃতি অনুযায়ী লাঠি বা বাঁশ নেওয়া হয়। পরে সেটার ওপর মাটি ও গো-মূত্রের সংমিশ্রণে খড়ের আস্তর দেওয়া হয়। পরে পরিমাণ অনুযায়ী পানি দিয়ে মূর্তির আদল দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে রঙ তুলি দিয়ে এঁকে প্রতিমা সাজানো হয়। প্রতিমা তৈরির জন্য বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে খড় ও মাটি সংগ্রহ করা হয়। এরমধ্যে ময়মনসিংহ, রাজশাহী, বগুড়া ও নোয়াখালী অন্যতম। প্রতিমা তৈরির মূল উপাদান মাটি, খড়, লাঠি অথবা বাঁশ। সঙ্গে বিপুল পরিমাণ পানিও লাগে।

এদিকে পূজাকে কেন্দ্র করে জমজমাট শাঁখারিবাজার। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রয়োজনীয় সবকিছুই পাওয়া যায় এখানে। পূজা উপলক্ষে শাঁখা, সিঁদুর ও শাড়ি কিনতে আসা গৃহিণী অনিমা বলেন, আমাদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান দুর্গাপূজা। এই সময়টায় পরিবার পরিজন নিয়ে আনন্দঘন মুহূর্ত কাটে। কিন্তু গতবার পূজার সময় নোয়াখালীতে আমার আত্মীয়-স্বজনদের ওপর হামলা হয়েছে। একজন মারাও গেছেন। তাই এ বছর মনের ভেতর একটু ভয় কাজ করছে আবার না জানি কী হয়।

কবি নজরুল সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী রজত পাল বলেন, পূজা এলে মনে যেমন আনন্দ ও উচ্ছ্বাস কাজ করে তেমনি গত বছরের ঘটে যাওয়া কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় শঙ্কাও জাগে। গ্রামাঞ্চলে আমাদের আত্মীয়-স্বজন যারা আছেন তারা নিরাপদে সুষ্ঠুভাবে উৎসব করতে পারবে কিনা সেটা নিয়েও সন্দিহান। তবে গত বছরের তুলনায় এ বছর সরকার পূজামণ্ডপে যে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার কথা বলেছেন তা যদি বাস্তবায়ন করা হয়, তাহলে আশা করি সনাতন ধর্মাবলম্বীরা সুন্দরভাবে পূজা উদযাপন করতে পারবে।

Tag :

মধ্যনগরে দুর্গোৎসব উপলক্ষে ৩৩টি পূজামন্ডপে নগদ অর্থ প্রদান করেন, এমপি রতন

পূজার প্রস্তুতি: উচ্ছ্বাস-শঙ্কা দুটোই আছে

প্রকাশের সময় : ০৯:৩৯:২৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২২

আর কিছু দিন পরই সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান শারদীয় দুর্গাপূজা। এজন্য ব্যস্ত সময় পার করছেন রাজধানীর পুরান ঢাকার প্রতিমা শিল্পীরা। প্রতিমা তৈরির কাজ প্রায় শেষ। এখন চলছে রঙ ও প্রতিমা সাজানোর কাজ। রঙ তুলির আঁচড়ে প্রতিমা সাজাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রতিমা শিল্পীরা। আশ্বিন মাসের দশ দিন ধরেই দুর্গাপূজার উৎসব পালন করেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। যদিও উৎসব শুরু হয় ষষ্ঠী থেকে।

দুর্গাপূজার পাঁচ দিন মহাষষ্ঠী, মহাসপ্তমী, মহাঅষ্টমী, মহানবমী এবং বিজয়া দশমী হিসেবে পরিচিত। রাজধানীজুড়েই পূজা হয়। তবে সবচেয়ে জমজমাট পূজা উদযাপন করা হয় রাজধানীর পুরান ঢাকাকে কেন্দ্র করে। সরেজমিন দেখা যায়, পুরান ঢাকার শাঁখারিবাজার, নর্থব্রুক হল রোড, শ্রী শ্রী কালী মন্দিরসহ বেশ কয়েকটি জায়গায় একমাস ধরে নিরলসভাবে প্রতিমা তৈরি করে চলেছেন শিল্পীরা।

শাঁখারি বাজারের প্রবীণ মৃৎশিল্পী রাখাল পাল বলেন, বংশপরম্পরায় শৈশব থেকেই প্রতিমা তৈরি করে আসছি। প্রতিমা তৈরি করেই আমার জীবিকা চলে। সারা বছর টুকটাক অন্যান্য প্রতিমা তৈরি করলেও মূলত দুর্গাপূজাকে ঘিরেই চলে আমাদের সারা বছর। বয়স হয়েছে, তাই আগের মতো কাজ করতে পারি না। অসুস্থতার কারণে এবছর কম কাজ হাতে নিয়েছি। যা কাজ হাতে নিয়েছে তা প্রায় শেষ। আগের তুলনায় সবকিছুর দাম বেড়েছে। তাই প্রতিমাপ্রতি ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা বাড়তি খরচ হচ্ছে।

নর্থব্রুক হল রোডের দুর্গা মন্দিরে প্রতিমা তৈরির কাজে ভীষণ ব্যস্ত সময় পার করছেন মৃৎশিল্পী বলাই পাল। তিনি জানান, গত বছরের তুলনায় এ বছর অর্ডার একটু বেশি পেয়েছি। কাজ প্রায় শেষ। এখন রঙ ও সাজের কাজ চলছে। আগে রঙ তুলি দিয়ে কাজ করতাম। অনেক সময় লাগতো। এখন তুলির কাজ কম। স্প্রে মেশিনে রঙ করলে সময় কম লাগে। একজন মৃৎশিল্পী হিসেবে দুর্গাসহ অন্যান্য দেব-দেবীকে নিজ হাতে সুন্দর করে ফুটিয়ে তোলার চেয়ে বড় আনন্দ আর কিছু হতে পারে না।

প্রতিমা তৈরির ধাপ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয় আরেক প্রতিমা শিল্পী পল্টন পালের কাছে। তিনি জানান, প্রথমত মূর্তির আকার আকৃতি অনুযায়ী লাঠি বা বাঁশ নেওয়া হয়। পরে সেটার ওপর মাটি ও গো-মূত্রের সংমিশ্রণে খড়ের আস্তর দেওয়া হয়। পরে পরিমাণ অনুযায়ী পানি দিয়ে মূর্তির আদল দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে রঙ তুলি দিয়ে এঁকে প্রতিমা সাজানো হয়। প্রতিমা তৈরির জন্য বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে খড় ও মাটি সংগ্রহ করা হয়। এরমধ্যে ময়মনসিংহ, রাজশাহী, বগুড়া ও নোয়াখালী অন্যতম। প্রতিমা তৈরির মূল উপাদান মাটি, খড়, লাঠি অথবা বাঁশ। সঙ্গে বিপুল পরিমাণ পানিও লাগে।

এদিকে পূজাকে কেন্দ্র করে জমজমাট শাঁখারিবাজার। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রয়োজনীয় সবকিছুই পাওয়া যায় এখানে। পূজা উপলক্ষে শাঁখা, সিঁদুর ও শাড়ি কিনতে আসা গৃহিণী অনিমা বলেন, আমাদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান দুর্গাপূজা। এই সময়টায় পরিবার পরিজন নিয়ে আনন্দঘন মুহূর্ত কাটে। কিন্তু গতবার পূজার সময় নোয়াখালীতে আমার আত্মীয়-স্বজনদের ওপর হামলা হয়েছে। একজন মারাও গেছেন। তাই এ বছর মনের ভেতর একটু ভয় কাজ করছে আবার না জানি কী হয়।

কবি নজরুল সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী রজত পাল বলেন, পূজা এলে মনে যেমন আনন্দ ও উচ্ছ্বাস কাজ করে তেমনি গত বছরের ঘটে যাওয়া কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় শঙ্কাও জাগে। গ্রামাঞ্চলে আমাদের আত্মীয়-স্বজন যারা আছেন তারা নিরাপদে সুষ্ঠুভাবে উৎসব করতে পারবে কিনা সেটা নিয়েও সন্দিহান। তবে গত বছরের তুলনায় এ বছর সরকার পূজামণ্ডপে যে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার কথা বলেছেন তা যদি বাস্তবায়ন করা হয়, তাহলে আশা করি সনাতন ধর্মাবলম্বীরা সুন্দরভাবে পূজা উদযাপন করতে পারবে।