ঢাকা ০৯:৪৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৫ অক্টোবর ২০২২, ২০ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

ছিনতাইকারী থেকে অছাত্র, কে নেই ছাত্রদলের কমিটিতে!

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান পাওয়াদের মধ্যে ছিনতাইকারী, অপহরণ মামলার আসামি, বিবাহিত, চাকরিজীবী, রাজনীতিতে নিস্ক্রিয়, অছাত্র, ব্যবসায়ী, ইভটিজিংয়ের দায়ে বহিস্কৃত সাবেক ছাত্রলীগ নেতা থেকে শুরু করে বয়স্কদের স্থান দেওয়া হয়েছে। সংগঠনের গঠনতন্ত্রকে আমলে না নিয়ে ১৯৯৮, ১৯৯৯ সালে এসএসসি পাসদেরকেও স্থান দেওয়া হয়েছে কমিটিতে।

ছাত্রদলের এই কমিটি নিয়ে এখন চলছে তুমুল বিতর্ক। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পদ বঞ্চিতরা যেমন স্ট্যাটাস দিচ্ছেন, তেমনি পদ পাওয়া অনেকে স্ট্যাটাস দিয়ে বলছেন তারা এখন রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। এই বিতর্কের মধ্যেই কমিটির কয়েকজনের পদ স্থগিত করা হয়েছে। ছাত্রদলের ৩০২ সদস্যের এই কমিটি নিয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারাও এখন বিব্রত।

বিএনপি নেতারা বলছেন, ছাত্রদলের রাজনীতিতে মূল সমস্যা হচ্ছে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটিতে ছাত্র বিষয়ক পদে কাউকে রাখা হয়নি। ছাত্রদলের সাবেক ছাত্র নেতারা তাদের নিজস্ব বলয় ধরে রাখতে ছাত্রদলের নেতৃত্বের উপর চাপ সৃষ্টি করে। তাই তথ্য উপাত্ত যাচাই-বাছাই না করেই কমিটিতে অনেককে স্থান দিয়েছে। এতে সংগঠনের ত্যাগী নেতাকর্মীরা বাদ পড়েছে। আবার অনেক সময় ছাত্রদলের নেতৃত্বে যারা থাকেন তারা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নির্দেশনা রয়েছে এই মর্মে সাবেক ছাত্রনেতাদের এড়িয়ে চলে। আর এই সুযোগে তারা তাদের পছন্দের অনুসারীদের বিভিন্ন পদে পদায়ন করছে। কিন্তু এতে করে সংগঠন সাংগঠনিকভাবে আরও দুর্বল হচ্ছে।

জানা গেছে, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে নবগঠিত ছাত্রদলের কমিটিতে পদায়ন পাওয়া এমন ৫৭ জনের একটি তালিকা ইতোমধ্যে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বরাবর প্রেরণ করেছেন পদ বঞ্চিত ত্যাগী নেতাকর্মীরা। প্রাথমিক অবস্থায় অভিযোগ আমলে নিয়ে ৩৩ জনের পদ সাময়িকভাবে স্থগিতও করা হয়েছে।

ছাত্রদল সূত্রে জানা গেছে, গত ১৭ এপ্রিল সংগঠনের সাংগঠনিক অভিভাবক, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সুপার ফাইভ কমিটি ঘোষণা করেন। এতে আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে জড়িত পরিবারের সন্তান কাজী রওনাকুল ইসলাম শ্রাবণকে সভাপতি, সাইফ মাহমুদ জুয়েলকে সাধারণ সম্পাদক এবং সিনিয়র সহ-সভাপতি রাশেদ ইকবাল খান, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও আবু আফসান মোহাম্মদ ইয়াহিয়াকে সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়। পরবর্তীতে তাদের নেতৃত্বে ছাত্রদলের পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। গত ১১ সেপ্টেম্বর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ৩০২ সদস্য বিশিষ্ট এই কমিটির অনুমোদন দেন।

কমিটিতে স্থান পাওয়াদের বিষয়ে খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেছে, আর্থিক লেনদেনকে প্রাধান্য দিতে গিয়েই ছাত্রদলের নতুন কমিটিতে বিবাহিত, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ীর সংখ্যাটাই বেশি। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নিজস্ব বলয়ে রাজনীতি করে বিবাহিত, অপহরণ ও মোটরসাইকেল ছিনতাই মামলার আসামিরা কমিটিতে ঠাঁই পেয়েছেন। প্রাধান্য পেয়েছেন বরিশাল ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের নেতাকর্মীরা।

৩০২ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটিতে ৪৫ জনের বেশি আছেন বিবাহিত। ছাত্রজীবন শেষ করে অনেকেই চাকরি করছেন। অছাত্র, বিবাহিত, জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনসহ অসংখ্য অসামঞ্জস্য দিয়েই গঠিত হয়েছে ছাত্রদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি।

অভিযোগ রয়েছে, যুগ্ম সম্পাদকের পদ পাওয়া মো. রাকিবুল হাসান রকি ও খোরশেদ আলম লোকমান চাকরিজীবী। ২০১০, ’১১ ও ’১২ সালে এসএসসি পাস করেও সহ-সাধারণ সম্পাদক, সম্পাদক, সহ-সম্পাদক হয়েছেন কয়েকজন। কোনো ইউনিটে রাজনীতি করা ছাড়াই শুধু ফেসবুকে সাধারণ সম্পাদকের প্রচারণা চালিয়ে বরিশালের মাজরুক নামের একজন যুগ্ম-সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়েছেন। যুগ্ম-সম্পাদক শাখাওয়াত হোসেন সুহান একসময় সূর্যসেন হলে ছাত্রলীগ করতেন। ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সভাপতি আবিদ আল হাসানের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। তিনিও সাধারণ সম্পাদক জুয়েলের অনুসারী।

জানা যায়, সহ-সাধারণ সম্পাদক মিথুন মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। আরেক সহ-সাধারণ সম্পাদক জিয়ন বিবাহিত ও সন্তান আছে। সভাপতির ক্যাশিয়ার খ্যাত ছাত্রদলের বিগত কমিটির সহ-সভাপতি মোক্তাদির হোসেন তরুর মোটরসাইকেল চালিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-সাধারণ সম্পাদক থেকে কেন্দ্রের অর্থ সম্পাদক হয়েছেন রিয়াজ হোসেন।

সহ-সাধারণ সম্পাদক আরিবা নীতীশ এসএসসি পাস করতে না পারলেও সাধারণ সম্পাদকের আস্থাভাজন হওয়ায় কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন। এ ছাড়া সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নিজস্ব বলয় বাড়াতে ক্রাইটেরিয়া ২০০৩-এর নিয়ম ভেঙে ১৯৯৮, ২০০২ সালে এসএসি পাস করা অনেককেই কমিটিতে স্থান দিয়েছেন। ঢাকা মহানগর থেকে কাজী ইলিয়াস ও বাছিরুল রানা মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে কেন্দ্রের পদ বাগিয়ে নিয়েছেন বলেও অভিযোগে উঠেছে।

এ ছাড়া সহ-সভাপতি মো. কামরুজ্জামান আসাদ বিবাহিত, রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয়। তানজিল হাসান বিবাহিত। সাইফুল ইসলাম সিয়াম সন্তানের পিতা। আরেক সহ-সভাপতি শেখ আল ফয়সাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ড্রপ আউট। সহ-সভাপতি ঝলক মিয়া দীর্ঘদিন দেশের বাইরে ছিলেন এবং বিশ্ববিদ্যালয় ড্রপ আউট। সহ-সভাপতি আশরাফুল ইসলাম আনিক পাঁচ বছর চীনে ছিলেন। যুগ্ম-সম্পাদক আকন মামুন বিবাহিত, আরেক যুগ্ম-সম্পাদক খায়রুল আলম সুজন বিবাহিত, ছিনতাই ও অপহরণ মামলার আসামি। মারজুক আহমেদ আল আমিনের কোনো সার্টিফিকেট নেই। জুয়েল মৃধা বিবাহিত, তার স্ত্রী সন্তানসম্ভবা। আরেক যুগ্ম-সম্পাদক লিটন এ আর খানও বিবাহিত। ৫৯ নম্বর যুগ্ম-সম্পাদক সালেহ মো. আদনান ঢাবির ‘ভুয়া’ ছাত্র বলে অভিযোগ রয়েছে।

সহ-সাধারণ সম্পাদক মো. নুরে আলম ও রুহুল আমিন বিবাহিত। ছাত্রদল সভাপতির ঘনিষ্ঠ সহ-সাধারণ সম্পাদক পদ পাওয়া মোহাম্মদ মিথুন হোসাইন মোহাম্মদপুর থানায় ৭০ বোতল ফেনসিডিলসহ গ্রেফতার হয়েছিলেন। আরেক সহ-সাধারণ সম্পাদক আজিজুল হক জিয়ন দুই সন্তানের জনক। মিনহাজুল আবেদীন নান্নুও বিবাহিত। সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ ফয়সাল হোসেন আগে কোনো পদে না থাকলেও ছাত্রদল সভাপতির বেয়াই হওয়ার সুবাদে স্থান পেয়েছেন। সহ-সাহিত্য সম্পাদক সাজিদ হাসান ঢাবির ‘ভুয়া’ ছাত্র। সদস্য পদ পাওয়া মাকসুদা মনির কোনো সার্টিফিকেট নেই।

কমিটির বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল বলেন, ‘কেউ জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে নয়। কমিটি গঠন প্রক্রিয়ার শুরুতেই আমরা তথ্য উপাত্ত জমা দেওয়া এবং জমাকৃতদের বিষয়ে কোনো প্রকার অভিযোগ ও পরামর্শ জানতে চেয়ে একটি সেল গঠন করেছি। কিন্তু তখন তেমন কেউ পরামর্শ কিংবা কোনো অভিযোগ করেননি।

তিনি বলেন, এখন কিছু অভিযোগ উঠায় তদন্ত করার স্বার্থে আমরা বেশ কিছু পদ স্থগিত রেখেছি। কিন্তু এখন যেভাবে অভিযোগ করা হচ্ছে সেটা আসলে প্রতিহিংসা থেকে একটি মহল ইচ্ছেকৃতভাবে ছাত্রদলকে গণতান্ত্রিক আন্দোলন থেকে দূরে রাখতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তারপরও যদি কোনো গুরুতর অভিযোগ উঠে আসে আমরা সাংগঠনিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে সব সময় প্রস্তুত আছি।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা হাবিব ভাইয়ের মেয়ে যদি বলে আমি ছাত্রদলের রাজনীতি করি না তখন আর কাকে কী বলার থাকে। অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিটি কর্মসূচিতে সে সক্রিয় থাকে সব সময়।’

ছাত্রদল সভাপতি কাজী রওনাকুল ইসলাম শ্রাবণ বলেন, ‘সব পক্ষের সবাইকে নিয়ে কমিটি গঠনের চেষ্টা করেছি। যেসব অভিযোগ উঠেছে তা সত্য নয়। কমিটিকে বিতর্কিত করার জন্য এ সব অভিযোগ তোলা হচ্ছে। কেউ যদি তথ্য গোগন করে থাকেন আমরা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেব। আমরা কেউই জবাবদিহির বাইরে নই।’

Tag :

জাতীয় গ্রিডে বিপর্যয়ের ঘটনা বিদ্যুৎ খাতসহ সরকারের সার্বিক ব্যর্থতা: মির্জা ফখরুল।

ছিনতাইকারী থেকে অছাত্র, কে নেই ছাত্রদলের কমিটিতে!

প্রকাশের সময় : ০৯:৩৮:৪৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২২

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান পাওয়াদের মধ্যে ছিনতাইকারী, অপহরণ মামলার আসামি, বিবাহিত, চাকরিজীবী, রাজনীতিতে নিস্ক্রিয়, অছাত্র, ব্যবসায়ী, ইভটিজিংয়ের দায়ে বহিস্কৃত সাবেক ছাত্রলীগ নেতা থেকে শুরু করে বয়স্কদের স্থান দেওয়া হয়েছে। সংগঠনের গঠনতন্ত্রকে আমলে না নিয়ে ১৯৯৮, ১৯৯৯ সালে এসএসসি পাসদেরকেও স্থান দেওয়া হয়েছে কমিটিতে।

ছাত্রদলের এই কমিটি নিয়ে এখন চলছে তুমুল বিতর্ক। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পদ বঞ্চিতরা যেমন স্ট্যাটাস দিচ্ছেন, তেমনি পদ পাওয়া অনেকে স্ট্যাটাস দিয়ে বলছেন তারা এখন রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। এই বিতর্কের মধ্যেই কমিটির কয়েকজনের পদ স্থগিত করা হয়েছে। ছাত্রদলের ৩০২ সদস্যের এই কমিটি নিয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারাও এখন বিব্রত।

বিএনপি নেতারা বলছেন, ছাত্রদলের রাজনীতিতে মূল সমস্যা হচ্ছে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটিতে ছাত্র বিষয়ক পদে কাউকে রাখা হয়নি। ছাত্রদলের সাবেক ছাত্র নেতারা তাদের নিজস্ব বলয় ধরে রাখতে ছাত্রদলের নেতৃত্বের উপর চাপ সৃষ্টি করে। তাই তথ্য উপাত্ত যাচাই-বাছাই না করেই কমিটিতে অনেককে স্থান দিয়েছে। এতে সংগঠনের ত্যাগী নেতাকর্মীরা বাদ পড়েছে। আবার অনেক সময় ছাত্রদলের নেতৃত্বে যারা থাকেন তারা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নির্দেশনা রয়েছে এই মর্মে সাবেক ছাত্রনেতাদের এড়িয়ে চলে। আর এই সুযোগে তারা তাদের পছন্দের অনুসারীদের বিভিন্ন পদে পদায়ন করছে। কিন্তু এতে করে সংগঠন সাংগঠনিকভাবে আরও দুর্বল হচ্ছে।

জানা গেছে, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে নবগঠিত ছাত্রদলের কমিটিতে পদায়ন পাওয়া এমন ৫৭ জনের একটি তালিকা ইতোমধ্যে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বরাবর প্রেরণ করেছেন পদ বঞ্চিত ত্যাগী নেতাকর্মীরা। প্রাথমিক অবস্থায় অভিযোগ আমলে নিয়ে ৩৩ জনের পদ সাময়িকভাবে স্থগিতও করা হয়েছে।

ছাত্রদল সূত্রে জানা গেছে, গত ১৭ এপ্রিল সংগঠনের সাংগঠনিক অভিভাবক, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সুপার ফাইভ কমিটি ঘোষণা করেন। এতে আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে জড়িত পরিবারের সন্তান কাজী রওনাকুল ইসলাম শ্রাবণকে সভাপতি, সাইফ মাহমুদ জুয়েলকে সাধারণ সম্পাদক এবং সিনিয়র সহ-সভাপতি রাশেদ ইকবাল খান, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও আবু আফসান মোহাম্মদ ইয়াহিয়াকে সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়। পরবর্তীতে তাদের নেতৃত্বে ছাত্রদলের পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। গত ১১ সেপ্টেম্বর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ৩০২ সদস্য বিশিষ্ট এই কমিটির অনুমোদন দেন।

কমিটিতে স্থান পাওয়াদের বিষয়ে খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেছে, আর্থিক লেনদেনকে প্রাধান্য দিতে গিয়েই ছাত্রদলের নতুন কমিটিতে বিবাহিত, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ীর সংখ্যাটাই বেশি। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নিজস্ব বলয়ে রাজনীতি করে বিবাহিত, অপহরণ ও মোটরসাইকেল ছিনতাই মামলার আসামিরা কমিটিতে ঠাঁই পেয়েছেন। প্রাধান্য পেয়েছেন বরিশাল ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের নেতাকর্মীরা।

৩০২ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটিতে ৪৫ জনের বেশি আছেন বিবাহিত। ছাত্রজীবন শেষ করে অনেকেই চাকরি করছেন। অছাত্র, বিবাহিত, জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনসহ অসংখ্য অসামঞ্জস্য দিয়েই গঠিত হয়েছে ছাত্রদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি।

অভিযোগ রয়েছে, যুগ্ম সম্পাদকের পদ পাওয়া মো. রাকিবুল হাসান রকি ও খোরশেদ আলম লোকমান চাকরিজীবী। ২০১০, ’১১ ও ’১২ সালে এসএসসি পাস করেও সহ-সাধারণ সম্পাদক, সম্পাদক, সহ-সম্পাদক হয়েছেন কয়েকজন। কোনো ইউনিটে রাজনীতি করা ছাড়াই শুধু ফেসবুকে সাধারণ সম্পাদকের প্রচারণা চালিয়ে বরিশালের মাজরুক নামের একজন যুগ্ম-সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়েছেন। যুগ্ম-সম্পাদক শাখাওয়াত হোসেন সুহান একসময় সূর্যসেন হলে ছাত্রলীগ করতেন। ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সভাপতি আবিদ আল হাসানের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। তিনিও সাধারণ সম্পাদক জুয়েলের অনুসারী।

জানা যায়, সহ-সাধারণ সম্পাদক মিথুন মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। আরেক সহ-সাধারণ সম্পাদক জিয়ন বিবাহিত ও সন্তান আছে। সভাপতির ক্যাশিয়ার খ্যাত ছাত্রদলের বিগত কমিটির সহ-সভাপতি মোক্তাদির হোসেন তরুর মোটরসাইকেল চালিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-সাধারণ সম্পাদক থেকে কেন্দ্রের অর্থ সম্পাদক হয়েছেন রিয়াজ হোসেন।

সহ-সাধারণ সম্পাদক আরিবা নীতীশ এসএসসি পাস করতে না পারলেও সাধারণ সম্পাদকের আস্থাভাজন হওয়ায় কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন। এ ছাড়া সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নিজস্ব বলয় বাড়াতে ক্রাইটেরিয়া ২০০৩-এর নিয়ম ভেঙে ১৯৯৮, ২০০২ সালে এসএসি পাস করা অনেককেই কমিটিতে স্থান দিয়েছেন। ঢাকা মহানগর থেকে কাজী ইলিয়াস ও বাছিরুল রানা মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে কেন্দ্রের পদ বাগিয়ে নিয়েছেন বলেও অভিযোগে উঠেছে।

এ ছাড়া সহ-সভাপতি মো. কামরুজ্জামান আসাদ বিবাহিত, রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয়। তানজিল হাসান বিবাহিত। সাইফুল ইসলাম সিয়াম সন্তানের পিতা। আরেক সহ-সভাপতি শেখ আল ফয়সাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ড্রপ আউট। সহ-সভাপতি ঝলক মিয়া দীর্ঘদিন দেশের বাইরে ছিলেন এবং বিশ্ববিদ্যালয় ড্রপ আউট। সহ-সভাপতি আশরাফুল ইসলাম আনিক পাঁচ বছর চীনে ছিলেন। যুগ্ম-সম্পাদক আকন মামুন বিবাহিত, আরেক যুগ্ম-সম্পাদক খায়রুল আলম সুজন বিবাহিত, ছিনতাই ও অপহরণ মামলার আসামি। মারজুক আহমেদ আল আমিনের কোনো সার্টিফিকেট নেই। জুয়েল মৃধা বিবাহিত, তার স্ত্রী সন্তানসম্ভবা। আরেক যুগ্ম-সম্পাদক লিটন এ আর খানও বিবাহিত। ৫৯ নম্বর যুগ্ম-সম্পাদক সালেহ মো. আদনান ঢাবির ‘ভুয়া’ ছাত্র বলে অভিযোগ রয়েছে।

সহ-সাধারণ সম্পাদক মো. নুরে আলম ও রুহুল আমিন বিবাহিত। ছাত্রদল সভাপতির ঘনিষ্ঠ সহ-সাধারণ সম্পাদক পদ পাওয়া মোহাম্মদ মিথুন হোসাইন মোহাম্মদপুর থানায় ৭০ বোতল ফেনসিডিলসহ গ্রেফতার হয়েছিলেন। আরেক সহ-সাধারণ সম্পাদক আজিজুল হক জিয়ন দুই সন্তানের জনক। মিনহাজুল আবেদীন নান্নুও বিবাহিত। সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ ফয়সাল হোসেন আগে কোনো পদে না থাকলেও ছাত্রদল সভাপতির বেয়াই হওয়ার সুবাদে স্থান পেয়েছেন। সহ-সাহিত্য সম্পাদক সাজিদ হাসান ঢাবির ‘ভুয়া’ ছাত্র। সদস্য পদ পাওয়া মাকসুদা মনির কোনো সার্টিফিকেট নেই।

কমিটির বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল বলেন, ‘কেউ জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে নয়। কমিটি গঠন প্রক্রিয়ার শুরুতেই আমরা তথ্য উপাত্ত জমা দেওয়া এবং জমাকৃতদের বিষয়ে কোনো প্রকার অভিযোগ ও পরামর্শ জানতে চেয়ে একটি সেল গঠন করেছি। কিন্তু তখন তেমন কেউ পরামর্শ কিংবা কোনো অভিযোগ করেননি।

তিনি বলেন, এখন কিছু অভিযোগ উঠায় তদন্ত করার স্বার্থে আমরা বেশ কিছু পদ স্থগিত রেখেছি। কিন্তু এখন যেভাবে অভিযোগ করা হচ্ছে সেটা আসলে প্রতিহিংসা থেকে একটি মহল ইচ্ছেকৃতভাবে ছাত্রদলকে গণতান্ত্রিক আন্দোলন থেকে দূরে রাখতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তারপরও যদি কোনো গুরুতর অভিযোগ উঠে আসে আমরা সাংগঠনিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে সব সময় প্রস্তুত আছি।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা হাবিব ভাইয়ের মেয়ে যদি বলে আমি ছাত্রদলের রাজনীতি করি না তখন আর কাকে কী বলার থাকে। অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিটি কর্মসূচিতে সে সক্রিয় থাকে সব সময়।’

ছাত্রদল সভাপতি কাজী রওনাকুল ইসলাম শ্রাবণ বলেন, ‘সব পক্ষের সবাইকে নিয়ে কমিটি গঠনের চেষ্টা করেছি। যেসব অভিযোগ উঠেছে তা সত্য নয়। কমিটিকে বিতর্কিত করার জন্য এ সব অভিযোগ তোলা হচ্ছে। কেউ যদি তথ্য গোগন করে থাকেন আমরা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেব। আমরা কেউই জবাবদিহির বাইরে নই।’