ঢাকা ০৩:৩৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০১ অক্টোবর ২০২২, ১৫ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

রাত হলে ভয় বাড়ে তমব্রু সীমান্তে

বান্দরবান নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুমের তমব্রু সীমান্তের পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। মিয়ানমার রাষ্ট্রদূতকে ডেকে কড়া প্রতিবাদ জানানোর পরদিন মুহুর্মুহু গোলার শব্দে আতঙ্কেই দিন কেটেছে সীমান্তলাগোয়া তুমব্রুবাসীর। কখন যেন গোলা এসে পড়ে, রাতে সেই ভয় আরও বাড়ে। রাত হলে ঘুমের বদলে তাদের চোখে ভর করে ভীতি। গভীর রাতেও গোলার শব্দে আঁৎকে ওঠে ঘুমন্ত শিশুরা। ভয়ে জরুরি কাজ ছাড়া বাইরে বের হচ্ছেন না বাসিন্দারা। শঙ্কার মধ্যেই দিন কাটছে তাদের।

মোবাইল ফোনে আলাপকালে তমব্রু সীমান্তের পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে এসব কথা বলেন ঘুমধুম ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক নুরহোছন। তার বাড়ি তুমব্রুতে। শূন্যরেখা থেকে ৫০০-৬০০ ফুট দূরে।

তিনি বলেন, ‘অবস্থা খারাপের দিকেই যাচ্ছে। গোলাগুলি বেড়েছে। কিছু সময় আগেও (বিকালে) মিয়ানমার থেকে শেল এসে পড়েছে শূন্যরেখায়। রাত হলে গোলাগুলি আরও বাড়ে। ভয়-চিন্তাও বাড়ে। শিশুরা মধ্যরাতে আঁতকে ওঠে মর্টারশেলের শব্দে। গভীর রাতেও থেমে থেমে চলে গোলাগুলি। ভয়ে ফজরের নামাজ পড়তেও বের হয় না কেউ। যদি গোলা এসে পড়ে।’

এ অবস্থায় ঝুঁকিতে থাকা শূন্যরেখা সংলগ্ন গ্রামের ৩০০ পরিবারকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জেলা প্রশাসন।

বান্দরবান জেলা প্রশাসক ইয়াছমিন পারভীন তিবরীজি বলেন, ‘ওই ৩০০ পরিবারের জন্য বিকল্প আশ্রয়স্থল দেখা হচ্ছে। তাদের কাছে জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে মতামত চাওয়া হয়েছে। তারা মত দিলে সরিয়ে নেওয়া হবে। এর জন্য কয়েকটি স্থানও দেখা হয়েছে।’

জেলা প্রশাসক বলেন, ‘আজও সীমান্ত এলাকা পরিদর্শন করেছি। বিকল্প আশ্রয়স্থল ঠিক করা হচ্ছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে অন্যদের বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা সীমান্তের ৬টি স্কুলে ছুটি দেওয়া হতে পারে। আর স্কুলগুলো বন্ধ থাকা অবস্থায় সেগুলোকে প্রাথমিকভাবে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের বিষয়ে ভাবছে জেলা প্রশাসন। এদিকে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা এবং জনপ্রতিনিধিরা সাহস জোগালেও, বিশেষ কাউন্সিলিং ক্লাস করালেও মনোবল ভেঙে পড়ছে সীমান্তবর্তী এসএসসি পরীক্ষার্থীদের। ওই এলাকার ঘুমধুম উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের (যে কেন্দ্রটি উখিয়ায় সরানো হয়েছে) ৪৩৬ পরীক্ষার্থীর মধ্যে অনুপস্থিত ছিলেন ৩ জন। স্থানীয়রা বলছেন, এই অবস্থার মধ্যে পরীক্ষার্থীরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। তাদের অনেকেই পরীক্ষা কেন্দ্রে যেতে অনীহা প্রকাশ করলেও পরিবারের চাওয়ায় পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে।

নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা আকতার উদ্দিন রাতে বলেন, ‘শূন্যরেখার কাছাকাছি ঘুমধুম উচ্চ বিদ্যালয় এবং ৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১২শ শিক্ষার্থী উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। তাদের এবং অভিভাবকদের সচেতন করা হয়েছে। সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।’

সোমবার এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিতি তুলনামূলক কম ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, ‘স্কুলগুলো খোলা থাকবে কি না সে বিষয়ে জেলা প্রশাসন বা শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে এখনও কোনো নির্দেশনা পাইনি। পরিস্থিতি সম্পর্কে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে। নির্দেশনা আসলে আমরা প্রতিপালন করব।’

এ বিষয়ে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা ত্রিরতন চাকমা বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসন থেকে যেসব সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে তা প্রতিপালন করতে শিক্ষকদের বলা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘স্কুলগুলোতে যদি আশ্রয় কেন্দ্র করার সিদ্ধান্ত হয়, সেক্ষেত্রে উপজেলা শিক্ষা বিভাগ তার ব্যবস্থা করে দেবে।’

স্থানীয় আরও পাঁচজন বাসিন্দার সাথে কথা বলে জানা গেছে, তমব্রু সীমান্ত সংলগ্ন ভাজবানিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দূরত্ব শূন্যরেখা থেকে মাত্র ৩০০ ফুট। শিক্ষকরা স্কুলে আসলেও শিক্ষার্থী ছিল না বললেই চলে। ভয়ে স্কুলে আসেনি কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীরা। এখানকার সবচেয়ে বড় বাজার তমব্রু বাজার। সেখানে সোমবার হাতেগোনা কয়েকটি দোকান খোলা ছিল। কিন্তু সন্ধ্যার আগে তাও বন্ধ করে দেন দোকানিরা। তারা বলছেন, ‘শঙ্কার কথা আর কি বলবো, প্রতিটি সেকেন্ডই কাটছে মৃত্যুঝুঁকি সাথে নিয়ে। এই অবস্থা কবে স্বাভাবিক হবে জানি না।’

আলাপকালে তুমব্রু সীমান্তের উদ্বেগজনক পরিস্থিতির কথা জানিয়ে ঘুমধুম ইউনিয়নের চেয়ারম্যান একেএম জাহাঙ্গীর আজিজ বলেন, তুমব্রু ইউনিয়নে মোট ৩২০৪টি পরিবারের মধ্যে উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ৩০০ পরিবার সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাদের জন্য বিকল্প থাকার জায়গা দেখার কাজ চলছে। তবে নিজ ঘরবাড়ি ছেড়ে যেতে অমত করছেন অনেকেই। জেলা প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে বাসিন্দাদের মতামত নেওয়া হচ্ছে। তারা মত দিলে সব বাসিন্দা সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে ৩০০ পরিবারকে সরিয়ে নিতে স্থান নির্বাচন করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসক নিজেও কয়েকটি স্থান পরিদর্শন করেছেন।

গত এক মাসের বেশি সময় ধরেই মিয়ানমারের ছোঁড়া আর্টিলারি, মর্টারশেল ও গোলার বিকট শব্দে কাঁপছে সীমান্ত সংলগ্ন ৬৪.৭৫ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের ঘুমধুম ইউনিয়ন। নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার সর্ব-দক্ষিণে অবস্থিত এ ইউনিয়নের দূরত্ব উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার। এ ইউনিয়নের দক্ষিণে ও পূর্বে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশ। সেখানেই মূলত মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে বিদ্রোহী আরাকান আমির যুদ্ধ হচ্ছে। এর গোলাই এসে পড়ছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সীমান্ত সংলগ্ন জনবসতিতে, যা আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন, বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

সীমান্তবর্তী এই ঘুমধুম ইউনিয়নে কচুবনিয়া, তুমব্রু, দক্ষিণ ঘুমধুম, ফাত্রাঝিরি, বরইতলী পাড়া, বাইশপারী, ভাজবানিয়া, রেজু গর্জনবনিয়া, রেজু বৈদ্যরছড়া, রেজু মগপাড়া, রেজু হেডম্যানপাড়া- এই ১২টি গ্রাম রয়েছে। জনসংখ্যা ১৬ হাজার ৪৭৯ জন। সম্প্রতি মিয়ানমার থেকে গোলা এসে এ ইউনিয়েনের তমব্রু কোনারপাড়া, মধ্যমপাড়া ও চাকপাড়াসহ শূন্যরেখার কাছাকাছি অবস্থিত জনবসতিতে পড়েছে। এখানকার তমব্রু, বাইশপারী ও হেডম্যান গ্রাম অতিরিক্ত ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানা গেছে। এই এলাকায় একটি কলেজ, একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, একটি দাখিল মাদ্রাসা ও ১৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। সীমান্তে সাম্প্রতিক উত্তেজনায় আতঙ্কের মধ্যেই রয়েছে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। তাদের নিয়ে অভিভাবকদের উদ্বেগের সীমা নেই।

স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের সীমান্ত ২৮০ কিলোমিটার। এর মধ্যে নাফ নদী বিভক্ত করে দিয়েছে ৬০ কিলোমিটারের বেশি সীমান্ত এলাকা। বাকি সীমান্তের মধ্যে কয়েকটি পয়েন্ট দুর্গম হওয়ায় সেখানে কাঁটাতারের বেড়া নেই। সেখানে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড- বিজিবি সদস্যরা সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। সীমান্তে উত্তেজনা শুরু হওয়ার পর প্রায় ২০০ কিলোমিটার সীমান্ত সিল করে দেওয়া হয়েছে। আর অনুপ্রবেশ ঠেকাতে নাফ নদীতেও সতর্ক পাহারায় আছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড।

জনপ্রিয়

হোসেনপুর বাজার সনাতন ধর্মাবলম্বী ব্যাবসায়িকদের উদ্যোগে বস্ত্র বিতরণ

রাত হলে ভয় বাড়ে তমব্রু সীমান্তে

প্রকাশের সময় : ০৯:২৩:৩৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২

বান্দরবান নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুমের তমব্রু সীমান্তের পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। মিয়ানমার রাষ্ট্রদূতকে ডেকে কড়া প্রতিবাদ জানানোর পরদিন মুহুর্মুহু গোলার শব্দে আতঙ্কেই দিন কেটেছে সীমান্তলাগোয়া তুমব্রুবাসীর। কখন যেন গোলা এসে পড়ে, রাতে সেই ভয় আরও বাড়ে। রাত হলে ঘুমের বদলে তাদের চোখে ভর করে ভীতি। গভীর রাতেও গোলার শব্দে আঁৎকে ওঠে ঘুমন্ত শিশুরা। ভয়ে জরুরি কাজ ছাড়া বাইরে বের হচ্ছেন না বাসিন্দারা। শঙ্কার মধ্যেই দিন কাটছে তাদের।

মোবাইল ফোনে আলাপকালে তমব্রু সীমান্তের পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে এসব কথা বলেন ঘুমধুম ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক নুরহোছন। তার বাড়ি তুমব্রুতে। শূন্যরেখা থেকে ৫০০-৬০০ ফুট দূরে।

তিনি বলেন, ‘অবস্থা খারাপের দিকেই যাচ্ছে। গোলাগুলি বেড়েছে। কিছু সময় আগেও (বিকালে) মিয়ানমার থেকে শেল এসে পড়েছে শূন্যরেখায়। রাত হলে গোলাগুলি আরও বাড়ে। ভয়-চিন্তাও বাড়ে। শিশুরা মধ্যরাতে আঁতকে ওঠে মর্টারশেলের শব্দে। গভীর রাতেও থেমে থেমে চলে গোলাগুলি। ভয়ে ফজরের নামাজ পড়তেও বের হয় না কেউ। যদি গোলা এসে পড়ে।’

এ অবস্থায় ঝুঁকিতে থাকা শূন্যরেখা সংলগ্ন গ্রামের ৩০০ পরিবারকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জেলা প্রশাসন।

বান্দরবান জেলা প্রশাসক ইয়াছমিন পারভীন তিবরীজি বলেন, ‘ওই ৩০০ পরিবারের জন্য বিকল্প আশ্রয়স্থল দেখা হচ্ছে। তাদের কাছে জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে মতামত চাওয়া হয়েছে। তারা মত দিলে সরিয়ে নেওয়া হবে। এর জন্য কয়েকটি স্থানও দেখা হয়েছে।’

জেলা প্রশাসক বলেন, ‘আজও সীমান্ত এলাকা পরিদর্শন করেছি। বিকল্প আশ্রয়স্থল ঠিক করা হচ্ছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে অন্যদের বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা সীমান্তের ৬টি স্কুলে ছুটি দেওয়া হতে পারে। আর স্কুলগুলো বন্ধ থাকা অবস্থায় সেগুলোকে প্রাথমিকভাবে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের বিষয়ে ভাবছে জেলা প্রশাসন। এদিকে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা এবং জনপ্রতিনিধিরা সাহস জোগালেও, বিশেষ কাউন্সিলিং ক্লাস করালেও মনোবল ভেঙে পড়ছে সীমান্তবর্তী এসএসসি পরীক্ষার্থীদের। ওই এলাকার ঘুমধুম উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের (যে কেন্দ্রটি উখিয়ায় সরানো হয়েছে) ৪৩৬ পরীক্ষার্থীর মধ্যে অনুপস্থিত ছিলেন ৩ জন। স্থানীয়রা বলছেন, এই অবস্থার মধ্যে পরীক্ষার্থীরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। তাদের অনেকেই পরীক্ষা কেন্দ্রে যেতে অনীহা প্রকাশ করলেও পরিবারের চাওয়ায় পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে।

নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা আকতার উদ্দিন রাতে বলেন, ‘শূন্যরেখার কাছাকাছি ঘুমধুম উচ্চ বিদ্যালয় এবং ৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১২শ শিক্ষার্থী উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। তাদের এবং অভিভাবকদের সচেতন করা হয়েছে। সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।’

সোমবার এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিতি তুলনামূলক কম ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, ‘স্কুলগুলো খোলা থাকবে কি না সে বিষয়ে জেলা প্রশাসন বা শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে এখনও কোনো নির্দেশনা পাইনি। পরিস্থিতি সম্পর্কে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে। নির্দেশনা আসলে আমরা প্রতিপালন করব।’

এ বিষয়ে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা ত্রিরতন চাকমা বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসন থেকে যেসব সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে তা প্রতিপালন করতে শিক্ষকদের বলা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘স্কুলগুলোতে যদি আশ্রয় কেন্দ্র করার সিদ্ধান্ত হয়, সেক্ষেত্রে উপজেলা শিক্ষা বিভাগ তার ব্যবস্থা করে দেবে।’

স্থানীয় আরও পাঁচজন বাসিন্দার সাথে কথা বলে জানা গেছে, তমব্রু সীমান্ত সংলগ্ন ভাজবানিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দূরত্ব শূন্যরেখা থেকে মাত্র ৩০০ ফুট। শিক্ষকরা স্কুলে আসলেও শিক্ষার্থী ছিল না বললেই চলে। ভয়ে স্কুলে আসেনি কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীরা। এখানকার সবচেয়ে বড় বাজার তমব্রু বাজার। সেখানে সোমবার হাতেগোনা কয়েকটি দোকান খোলা ছিল। কিন্তু সন্ধ্যার আগে তাও বন্ধ করে দেন দোকানিরা। তারা বলছেন, ‘শঙ্কার কথা আর কি বলবো, প্রতিটি সেকেন্ডই কাটছে মৃত্যুঝুঁকি সাথে নিয়ে। এই অবস্থা কবে স্বাভাবিক হবে জানি না।’

আলাপকালে তুমব্রু সীমান্তের উদ্বেগজনক পরিস্থিতির কথা জানিয়ে ঘুমধুম ইউনিয়নের চেয়ারম্যান একেএম জাহাঙ্গীর আজিজ বলেন, তুমব্রু ইউনিয়নে মোট ৩২০৪টি পরিবারের মধ্যে উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ৩০০ পরিবার সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাদের জন্য বিকল্প থাকার জায়গা দেখার কাজ চলছে। তবে নিজ ঘরবাড়ি ছেড়ে যেতে অমত করছেন অনেকেই। জেলা প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে বাসিন্দাদের মতামত নেওয়া হচ্ছে। তারা মত দিলে সব বাসিন্দা সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে ৩০০ পরিবারকে সরিয়ে নিতে স্থান নির্বাচন করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসক নিজেও কয়েকটি স্থান পরিদর্শন করেছেন।

গত এক মাসের বেশি সময় ধরেই মিয়ানমারের ছোঁড়া আর্টিলারি, মর্টারশেল ও গোলার বিকট শব্দে কাঁপছে সীমান্ত সংলগ্ন ৬৪.৭৫ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের ঘুমধুম ইউনিয়ন। নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার সর্ব-দক্ষিণে অবস্থিত এ ইউনিয়নের দূরত্ব উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার। এ ইউনিয়নের দক্ষিণে ও পূর্বে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশ। সেখানেই মূলত মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে বিদ্রোহী আরাকান আমির যুদ্ধ হচ্ছে। এর গোলাই এসে পড়ছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সীমান্ত সংলগ্ন জনবসতিতে, যা আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন, বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

সীমান্তবর্তী এই ঘুমধুম ইউনিয়নে কচুবনিয়া, তুমব্রু, দক্ষিণ ঘুমধুম, ফাত্রাঝিরি, বরইতলী পাড়া, বাইশপারী, ভাজবানিয়া, রেজু গর্জনবনিয়া, রেজু বৈদ্যরছড়া, রেজু মগপাড়া, রেজু হেডম্যানপাড়া- এই ১২টি গ্রাম রয়েছে। জনসংখ্যা ১৬ হাজার ৪৭৯ জন। সম্প্রতি মিয়ানমার থেকে গোলা এসে এ ইউনিয়েনের তমব্রু কোনারপাড়া, মধ্যমপাড়া ও চাকপাড়াসহ শূন্যরেখার কাছাকাছি অবস্থিত জনবসতিতে পড়েছে। এখানকার তমব্রু, বাইশপারী ও হেডম্যান গ্রাম অতিরিক্ত ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানা গেছে। এই এলাকায় একটি কলেজ, একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, একটি দাখিল মাদ্রাসা ও ১৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। সীমান্তে সাম্প্রতিক উত্তেজনায় আতঙ্কের মধ্যেই রয়েছে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। তাদের নিয়ে অভিভাবকদের উদ্বেগের সীমা নেই।

স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের সীমান্ত ২৮০ কিলোমিটার। এর মধ্যে নাফ নদী বিভক্ত করে দিয়েছে ৬০ কিলোমিটারের বেশি সীমান্ত এলাকা। বাকি সীমান্তের মধ্যে কয়েকটি পয়েন্ট দুর্গম হওয়ায় সেখানে কাঁটাতারের বেড়া নেই। সেখানে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড- বিজিবি সদস্যরা সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। সীমান্তে উত্তেজনা শুরু হওয়ার পর প্রায় ২০০ কিলোমিটার সীমান্ত সিল করে দেওয়া হয়েছে। আর অনুপ্রবেশ ঠেকাতে নাফ নদীতেও সতর্ক পাহারায় আছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড।