ঢাকা ০৮:৩৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৫ অক্টোবর ২০২২, ২০ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ
কবি নজরুলের বাল্যস্মৃতি

যে বটগাছকে ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম, সেটিই এখন সীমানার বাইরে

যে বটগাছ ঘিরে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম, সেই বটগাছটিই এখন বিশ্ববিদ্যালয় সীমানা প্রাচীরের বাইরে। এটিই সেই বৃক্ষ যেখানে বসে কিশোর দুখু মিয়া বাঁশি বাজাতেন। কবির স্মৃতিবিজড়িত সেই বটগাছ বিশ্বদ্যিালয়ের সীমানার বাইরে অযত্ন, অবহেলায় ও অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে। শতবর্ষী বটগাছটি শুধু বেদিতেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে (দুখু মিয়া) আজ থেকে প্রায় ১০৭ বছর আগে ভারতের আসানসোলের চুরুলিয়া গ্রাম থেকে ময়মনসিংহের ত্রিশালে নিয়ে আসেন রফিজ উল্লাহ দারোগা। নজরুলের প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি করিয়ে দেন স্থানীয় দরিরামপুর হাই স্কুলে (বর্তমান সরকারি নজরুল একাডেমি)।

দারোগা বাড়ি থেকে স্কুলের দূরত্ব বেশি থাকায় যাতায়াতের কষ্ট লাঘবের জন্য দারোগা নজরুলকে ত্রিশালের নামাপাড়ার বিচ্যুতিয়া বেপারি বাড়িতে জায়গির দেন। কবি সেই স্কুলে পড়াশোনা করেন এক বছর। কবি নজরুল ছিলেন চঞ্চল স্বভাবের। স্কুল পালিয়ে বাঁশি বাজাতেন ত্রিশালের নামাপড়া শুকনি বিলের মাঝে বটগাছে বসে। সেই বটগাছই ছিল কবির বাল্যজীবনে একমাত্র সাথী। কবির বাল্যকালের সেই স্মৃতি ধরে রাখতে ত্রিশালে রয়েছে তার নামে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ২০০৬ সালে কবি নজরুলের স্মৃতি বিজড়িত শুকনি বিলের বটগাছকে ঘিরে তার নামে স্থাপিত হয় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।

স্বাধীনচেতা নজরুল স্কুল ফাঁকি দিয়ে শুকনি বিলের পাশে বটবৃক্ষে উঠে বাঁশি বাজাতেন। সেই গাছটিই এখন ‘নজরুল বটবৃক্ষ’ নামে সারা বাংলাদেশে পরিচিত। কবি নেই, কিন্তু বটগাছটি আজও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে ।

জানা যায়, বর্তমান সরকারের সামগ্রিক উন্নয়নের অংশ হিসেবে ৯৩ বছর পর ২০০৬ সালে ১৫ একর জমির ওপর নজরুলের বটবৃক্ষকে ঘিরে স্থাপিত হয় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়। শুরু থেকে বটবৃক্ষের পাশ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটক থাকলেও আস্তে আস্তে ভবন নির্মাণের নামে বৃক্ষটিকে আড়াল করা দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সর্বশেষ ২০২১ সালে সীমানা প্রাচীর নির্মাণের সময় বটগাছটিকে বাইরে রেখেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীর গড়ে তোলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

এতে নজরুলর স্মৃতিধন্য বৃক্ষটি ক্যাম্পাসের বাইরে ও ভবনের আড়ালে থেকে যায়। বটগাছসংলগ্ন চায়ের দোকান আর বটগাছ চত্বর পরিণত হয়েছে চায়ের আড্ডাখানায়, যাকে বেশ বেমানান বলছেন স্থানীয়রা। এতে নজরুল প্রেমীদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের স্বেচ্ছাচারিতায় এমন কাণ্ড ঘটেছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

সত্তরের দশকে তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলার ম্যাজিস্ট্রেট পি এ নাজির নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত বটগাছের গুরুত্ব অনুভব করে প্রথমবারের মতো বটবৃক্ষের চার পাশে পাকা বেদি তৈরি করেন। যা এখন পর্যন্ত শুধু বেদি দ্বারাই সমাপ্ত। ১৫ বছরে পদার্পণ করা বিশ্ববিদ্যালয়টি পিছিয়ে না থাকলেও অনাদর, অবহেলায় বিদ্রোহী কবি নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত বটগাছটি।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে আসা দর্শনার্থী মো. আলামিন ও মেহেদী হাসান জানান, শতবর্ষী বাটগাছ দেখতে এসেছি। কবির সেই শৈশবের স্মৃতির কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বটবৃক্ষটি দেখে আবেগে আপ্লুত হয়েছি। তবে কষ্টও অনুভব করছি এটির অপরিচ্ছন্নতা ও সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ না থাকায়।
স্থানীয় দোকানদার আব্দুল মোতালেব বলেন, ‘নজরুলের ছোটবেলার এই বটগাছ দেখবার লাইগা সারা দিনই অনেক লোক আয়ে। কেউ পরিষ্কার করে না।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন এক শিক্ষার্থী জানান, এটিই নজরুলের নামে প্রতিষ্ঠিত দেশের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠার ১৫ বছর পর যে বৃক্ষটিকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয় জন্ম নিল, সীমানা প্রাচীর নির্মাণের নামে সেই বটবৃক্ষকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে ছুড়ে ফেলেছে প্রশাসন, যা জাতীয় কবির স্মৃতিকে অবমাননার সমতুল্য। তাই নজরুলর স্মৃতিকে ধরে রাখতে বটবৃক্ষটি সংরক্ষণ প্রয়োজন।

কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. সৌমিত্র শেখর বলেন, নানা কারণে বটগাছটি আমাদের ক্যাম্পাসের অন্তর্ভুক্ত নয়। বটগাছটি ক্যাম্পাসে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। এ ব্যাপারে আমরা স্থানীয় জনগণ ও প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগ কামনা করি। বটগাছটিকে ক্যাম্পাসের অন্তর্ভুক্ত করে ভবিষ্যতে দর্শনীয় স্থান হিসেবে সাজাব।

Tag :

কালীগঞ্জে মায়ের শাড়ি গলায় পেঁচিয়ে ছেলের আত্মহত্যা

কবি নজরুলের বাল্যস্মৃতি

যে বটগাছকে ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম, সেটিই এখন সীমানার বাইরে

প্রকাশের সময় : ০৯:১০:০৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২

যে বটগাছ ঘিরে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম, সেই বটগাছটিই এখন বিশ্ববিদ্যালয় সীমানা প্রাচীরের বাইরে। এটিই সেই বৃক্ষ যেখানে বসে কিশোর দুখু মিয়া বাঁশি বাজাতেন। কবির স্মৃতিবিজড়িত সেই বটগাছ বিশ্বদ্যিালয়ের সীমানার বাইরে অযত্ন, অবহেলায় ও অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে। শতবর্ষী বটগাছটি শুধু বেদিতেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে (দুখু মিয়া) আজ থেকে প্রায় ১০৭ বছর আগে ভারতের আসানসোলের চুরুলিয়া গ্রাম থেকে ময়মনসিংহের ত্রিশালে নিয়ে আসেন রফিজ উল্লাহ দারোগা। নজরুলের প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি করিয়ে দেন স্থানীয় দরিরামপুর হাই স্কুলে (বর্তমান সরকারি নজরুল একাডেমি)।

দারোগা বাড়ি থেকে স্কুলের দূরত্ব বেশি থাকায় যাতায়াতের কষ্ট লাঘবের জন্য দারোগা নজরুলকে ত্রিশালের নামাপাড়ার বিচ্যুতিয়া বেপারি বাড়িতে জায়গির দেন। কবি সেই স্কুলে পড়াশোনা করেন এক বছর। কবি নজরুল ছিলেন চঞ্চল স্বভাবের। স্কুল পালিয়ে বাঁশি বাজাতেন ত্রিশালের নামাপড়া শুকনি বিলের মাঝে বটগাছে বসে। সেই বটগাছই ছিল কবির বাল্যজীবনে একমাত্র সাথী। কবির বাল্যকালের সেই স্মৃতি ধরে রাখতে ত্রিশালে রয়েছে তার নামে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ২০০৬ সালে কবি নজরুলের স্মৃতি বিজড়িত শুকনি বিলের বটগাছকে ঘিরে তার নামে স্থাপিত হয় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।

স্বাধীনচেতা নজরুল স্কুল ফাঁকি দিয়ে শুকনি বিলের পাশে বটবৃক্ষে উঠে বাঁশি বাজাতেন। সেই গাছটিই এখন ‘নজরুল বটবৃক্ষ’ নামে সারা বাংলাদেশে পরিচিত। কবি নেই, কিন্তু বটগাছটি আজও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে ।

জানা যায়, বর্তমান সরকারের সামগ্রিক উন্নয়নের অংশ হিসেবে ৯৩ বছর পর ২০০৬ সালে ১৫ একর জমির ওপর নজরুলের বটবৃক্ষকে ঘিরে স্থাপিত হয় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়। শুরু থেকে বটবৃক্ষের পাশ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটক থাকলেও আস্তে আস্তে ভবন নির্মাণের নামে বৃক্ষটিকে আড়াল করা দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সর্বশেষ ২০২১ সালে সীমানা প্রাচীর নির্মাণের সময় বটগাছটিকে বাইরে রেখেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীর গড়ে তোলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

এতে নজরুলর স্মৃতিধন্য বৃক্ষটি ক্যাম্পাসের বাইরে ও ভবনের আড়ালে থেকে যায়। বটগাছসংলগ্ন চায়ের দোকান আর বটগাছ চত্বর পরিণত হয়েছে চায়ের আড্ডাখানায়, যাকে বেশ বেমানান বলছেন স্থানীয়রা। এতে নজরুল প্রেমীদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের স্বেচ্ছাচারিতায় এমন কাণ্ড ঘটেছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

সত্তরের দশকে তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলার ম্যাজিস্ট্রেট পি এ নাজির নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত বটগাছের গুরুত্ব অনুভব করে প্রথমবারের মতো বটবৃক্ষের চার পাশে পাকা বেদি তৈরি করেন। যা এখন পর্যন্ত শুধু বেদি দ্বারাই সমাপ্ত। ১৫ বছরে পদার্পণ করা বিশ্ববিদ্যালয়টি পিছিয়ে না থাকলেও অনাদর, অবহেলায় বিদ্রোহী কবি নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত বটগাছটি।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে আসা দর্শনার্থী মো. আলামিন ও মেহেদী হাসান জানান, শতবর্ষী বাটগাছ দেখতে এসেছি। কবির সেই শৈশবের স্মৃতির কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বটবৃক্ষটি দেখে আবেগে আপ্লুত হয়েছি। তবে কষ্টও অনুভব করছি এটির অপরিচ্ছন্নতা ও সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ না থাকায়।
স্থানীয় দোকানদার আব্দুল মোতালেব বলেন, ‘নজরুলের ছোটবেলার এই বটগাছ দেখবার লাইগা সারা দিনই অনেক লোক আয়ে। কেউ পরিষ্কার করে না।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন এক শিক্ষার্থী জানান, এটিই নজরুলের নামে প্রতিষ্ঠিত দেশের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠার ১৫ বছর পর যে বৃক্ষটিকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয় জন্ম নিল, সীমানা প্রাচীর নির্মাণের নামে সেই বটবৃক্ষকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে ছুড়ে ফেলেছে প্রশাসন, যা জাতীয় কবির স্মৃতিকে অবমাননার সমতুল্য। তাই নজরুলর স্মৃতিকে ধরে রাখতে বটবৃক্ষটি সংরক্ষণ প্রয়োজন।

কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. সৌমিত্র শেখর বলেন, নানা কারণে বটগাছটি আমাদের ক্যাম্পাসের অন্তর্ভুক্ত নয়। বটগাছটি ক্যাম্পাসে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। এ ব্যাপারে আমরা স্থানীয় জনগণ ও প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগ কামনা করি। বটগাছটিকে ক্যাম্পাসের অন্তর্ভুক্ত করে ভবিষ্যতে দর্শনীয় স্থান হিসেবে সাজাব।