ঢাকা ১০:১৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৫ অক্টোবর ২০২২, ২০ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

ধলেশ্বরীর বুকে বেলায়েত মাঝির ‘দেশি ফেরি’

এপারে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার মোল্লারহাট। অপর পারে মুন্সীগঞ্জ জেলার সিরাজদিখানের বক্তারচর। সেখান থেকে আড়াআড়িভাবে নদী পারি দিয়ে ভটভট শব্দ করে মোল্লারহাটের তীরে এসে থামল ‘দেশি ফেরি’। সামনে ফুটবল মাঠের গোলপোস্টের মতো স্টিলের চৌকোণ ফ্রেম। তার সঙ্গে লাগানো কপিকল।

পাশে বসা চালকের সহকারী কপিকলের হাতল ঘুরিয়ে দিতেই সামনের ডালাটি ধীরে ধীরে নেমে স্পর্শ করল কচুরিপানা জমে থাকা পারের ভেজা মাটি। ঘাটের দিকে মুখ করা যাত্রী আর যানবাহনগুলো নেমে এলো একে একে।

আগে নদী পারাপারের জন্য দুই পারের মানুষের ভরসা ছিল ইঞ্জিনের ট্রলার আর বৈঠার কোশা নৌকা। তাতে শুধু মানুষজন অল্প কিছু মালামাল নিয়ে পারাপার হতে পারতেন। মোটরসাইকেল, সিএনজি, স্কুটার, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার মতো ছোট যানবাহন পারাপারের ব্যবস্থা ছিল না। তাই বাধ্য হয়ে বহু পথ ঘুরে চলাচল করতে হতো তাদের। তবে এ বছরের শুরুতে মোল্লারহাটের এই ‘দেশি ফেরি’ চালু হওয়ার পর থেকে পারাপারে কিছুটা স্বস্তি খুঁজে পেয়েছেন এখানকার মানুষ। মোল্লারহাট ঘাটের আধা মাইল ভাটিতে সেতু নির্মাণের উদ্যোগ চলছে প্রায় বছরচারেক ধরে। নদীতে সেতুর পিলারগুলো স্থাপন করেই থমকে আছে সেই কাজ। কবে শেষ হবে কেউ জানে না।

প্রয়োজনের তাগিদ থেকেই মানুষ চাহিদা পূরণের ব্যবস্থা করে নেয়। ধলেশ্বরীর বেলায়েত মাঝিও তাই করেছেন। নিজের উদ্যোগে তৈরি করিয়ে নিয়েছেন তার ‘দেশি ফেরি’। তাতে লোকজনের পাশাপাশি দিব্যি পারাপার হচ্ছে ছোট আকারের মোটর বা ব্যাটারিচালিত যানবাহনগুলো।

মোল্লারহাট ঘাটে কথা হলো বেলায়েত মাঝির সঙ্গে। তার বাড়ি দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে। বেশ কয়েক বছর থেকেই এই ঘাটের ইজারাদার তিনি। এবার ডাক নিয়েছেন ১০ লাখ টাকায়। আগে দুটো ট্রলার (ইঞ্জিনের নৌকা) দিয়ে শুধু যাত্রী পারাপার করতেন। তাতে ছোট যানবাহন পারাপার করা যেত না। লোকজনের অসুবিধা হতো।

শুধু লোক পারাপার করায় তার আয়ও কম হতো। এসব নানা বিষয় ভেবে প্রথমে তিনি দুটো ট্রলার জোড়া দিয়ে একটি বড় ট্রলার তৈরির কথা ভেবেছিলেন। যেই ভাবনা, সেই কাজ। যোগাযোগ করেন কেরানীগঞ্জের জাজিরা ডকইয়ার্ডে। সেখানে কারিগরদের সঙ্গে পরামর্শ করে পরিকল্পনায় একটু অদলবদল এনে তৈরি করিয়েছেন এই ‘দেশি ফেরি’। এটিও চলছে ট্রলার চালানো শ্যালো ইঞ্জিন দিয়েই। ফেরিটি লম্বায় ৬০ ফুট, চওড়া ১২ ফুট। নির্মাণে খরচ পড়েছে প্রায় ৮ লাখ টাকা। একসঙ্গে দুটি সিএনজি স্কুটি ও পাঁচ থেকে ছয়টি মোটরসাইকেল এবং বেশকিছু বাইসাইকেলও তোলা যায় এই ফেরিতে। যাত্রী উঠতে পারে প্রায় জনাপঞ্চাশেক। সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত রোজ ১২ ঘণ্টা চলে বেলায়েত মাঝির ‘দেশি ফেরি’ সার্ভিস।

বেলায়েত মাঝির দেশি ফেরিতে যাত্রীর টোল জনপ্রতি পাঁচ টাকা। আগে নৌকাতেও তাই ছিল। বাইসাইকেলের টোল ১০ টাকা, মোটরসাইকেলের ২০ টাকা আর স্কুটার-অটোরিকশার টোল যাত্রীসহ ১০০ টাকা। মাঝি বললেন, ‘টোল নিয়ে যানবাহনের চালক ও যাত্রীদের কোনো আপত্তি নেই। ফেরি চালু করায় তাদের নিজেদের যেমন আয় বেড়েছে, লোকজনের সময়ও সাশ্রয় হচ্ছে, সুবিধাও হচ্ছে।’

বক্তারচর থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে এসে মোল্লারহাট ঘাটে নামলেন আরাফ আহমেদ। তিনি বললেন, মাত্র ৮ মিনিটের মতো লাগে নদী পারাপার হতে। এই ‘দেশি ফেরি’ চালু হওয়ায় অনেক সুবিধা হয়েছে। অসুস্থ জরুরি রোগীদের স্কুটার বা অটোরিকশাতে করে দ্রুত ঢাকায় আনা যায়।

ফেরি থেকে মালামাল নিয়ে নেমে এলেন ইয়াসিন মিয়া। তার সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, বক্তারচর সিরাজদিখানের একেবারে প্রান্তবর্তী এলাকা। এখানে নদী পারাপারের জন্য একটি সেতুর নির্মাণকাজ প্রায় চার বছর যাবৎ চলছে। কবে এর কাজ শেষ হবে আর কবে মানুষ সুফল পাবে তা আমাদের কাছে অজানা। এখানকার মানুষের নদী পারাপারে অনেক কষ্ট। আগে প্রায় সাত কিলোমিটার ঘুরে কেরানীগঞ্জ আসতে হতো। তবে এই দেশি ফেরি চালু হওয়ায় অনেক সুবিধা হয়েছে। এখন মানুষের পাশাপাশি মালামাল ও ছোট যানবাহন পারাপার করা যাচ্ছে।

মোল্লারহাট ঘাটে ইমিটেশনের দোকান সাজিয়ে বসেছেন লিয়াকত আলী নামে এক ব্যবসায়ী। তিনি জানান, দেশি ফেরি চালু হওয়ায় এখানে মানুষের যাতায়াত বেড়েছে। আগে অনের দূর ঘুরে কেরানীগঞ্জে আসতে হতো। কিন্তু এখন সবাই দেশি ফেরিতেই পারাপার হচ্ছে।

Tag :

পঞ্চগড়ে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হলো দূর্গা পূজা

ধলেশ্বরীর বুকে বেলায়েত মাঝির ‘দেশি ফেরি’

প্রকাশের সময় : ০৯:০৯:৫৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২

এপারে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার মোল্লারহাট। অপর পারে মুন্সীগঞ্জ জেলার সিরাজদিখানের বক্তারচর। সেখান থেকে আড়াআড়িভাবে নদী পারি দিয়ে ভটভট শব্দ করে মোল্লারহাটের তীরে এসে থামল ‘দেশি ফেরি’। সামনে ফুটবল মাঠের গোলপোস্টের মতো স্টিলের চৌকোণ ফ্রেম। তার সঙ্গে লাগানো কপিকল।

পাশে বসা চালকের সহকারী কপিকলের হাতল ঘুরিয়ে দিতেই সামনের ডালাটি ধীরে ধীরে নেমে স্পর্শ করল কচুরিপানা জমে থাকা পারের ভেজা মাটি। ঘাটের দিকে মুখ করা যাত্রী আর যানবাহনগুলো নেমে এলো একে একে।

আগে নদী পারাপারের জন্য দুই পারের মানুষের ভরসা ছিল ইঞ্জিনের ট্রলার আর বৈঠার কোশা নৌকা। তাতে শুধু মানুষজন অল্প কিছু মালামাল নিয়ে পারাপার হতে পারতেন। মোটরসাইকেল, সিএনজি, স্কুটার, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার মতো ছোট যানবাহন পারাপারের ব্যবস্থা ছিল না। তাই বাধ্য হয়ে বহু পথ ঘুরে চলাচল করতে হতো তাদের। তবে এ বছরের শুরুতে মোল্লারহাটের এই ‘দেশি ফেরি’ চালু হওয়ার পর থেকে পারাপারে কিছুটা স্বস্তি খুঁজে পেয়েছেন এখানকার মানুষ। মোল্লারহাট ঘাটের আধা মাইল ভাটিতে সেতু নির্মাণের উদ্যোগ চলছে প্রায় বছরচারেক ধরে। নদীতে সেতুর পিলারগুলো স্থাপন করেই থমকে আছে সেই কাজ। কবে শেষ হবে কেউ জানে না।

প্রয়োজনের তাগিদ থেকেই মানুষ চাহিদা পূরণের ব্যবস্থা করে নেয়। ধলেশ্বরীর বেলায়েত মাঝিও তাই করেছেন। নিজের উদ্যোগে তৈরি করিয়ে নিয়েছেন তার ‘দেশি ফেরি’। তাতে লোকজনের পাশাপাশি দিব্যি পারাপার হচ্ছে ছোট আকারের মোটর বা ব্যাটারিচালিত যানবাহনগুলো।

মোল্লারহাট ঘাটে কথা হলো বেলায়েত মাঝির সঙ্গে। তার বাড়ি দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে। বেশ কয়েক বছর থেকেই এই ঘাটের ইজারাদার তিনি। এবার ডাক নিয়েছেন ১০ লাখ টাকায়। আগে দুটো ট্রলার (ইঞ্জিনের নৌকা) দিয়ে শুধু যাত্রী পারাপার করতেন। তাতে ছোট যানবাহন পারাপার করা যেত না। লোকজনের অসুবিধা হতো।

শুধু লোক পারাপার করায় তার আয়ও কম হতো। এসব নানা বিষয় ভেবে প্রথমে তিনি দুটো ট্রলার জোড়া দিয়ে একটি বড় ট্রলার তৈরির কথা ভেবেছিলেন। যেই ভাবনা, সেই কাজ। যোগাযোগ করেন কেরানীগঞ্জের জাজিরা ডকইয়ার্ডে। সেখানে কারিগরদের সঙ্গে পরামর্শ করে পরিকল্পনায় একটু অদলবদল এনে তৈরি করিয়েছেন এই ‘দেশি ফেরি’। এটিও চলছে ট্রলার চালানো শ্যালো ইঞ্জিন দিয়েই। ফেরিটি লম্বায় ৬০ ফুট, চওড়া ১২ ফুট। নির্মাণে খরচ পড়েছে প্রায় ৮ লাখ টাকা। একসঙ্গে দুটি সিএনজি স্কুটি ও পাঁচ থেকে ছয়টি মোটরসাইকেল এবং বেশকিছু বাইসাইকেলও তোলা যায় এই ফেরিতে। যাত্রী উঠতে পারে প্রায় জনাপঞ্চাশেক। সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত রোজ ১২ ঘণ্টা চলে বেলায়েত মাঝির ‘দেশি ফেরি’ সার্ভিস।

বেলায়েত মাঝির দেশি ফেরিতে যাত্রীর টোল জনপ্রতি পাঁচ টাকা। আগে নৌকাতেও তাই ছিল। বাইসাইকেলের টোল ১০ টাকা, মোটরসাইকেলের ২০ টাকা আর স্কুটার-অটোরিকশার টোল যাত্রীসহ ১০০ টাকা। মাঝি বললেন, ‘টোল নিয়ে যানবাহনের চালক ও যাত্রীদের কোনো আপত্তি নেই। ফেরি চালু করায় তাদের নিজেদের যেমন আয় বেড়েছে, লোকজনের সময়ও সাশ্রয় হচ্ছে, সুবিধাও হচ্ছে।’

বক্তারচর থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে এসে মোল্লারহাট ঘাটে নামলেন আরাফ আহমেদ। তিনি বললেন, মাত্র ৮ মিনিটের মতো লাগে নদী পারাপার হতে। এই ‘দেশি ফেরি’ চালু হওয়ায় অনেক সুবিধা হয়েছে। অসুস্থ জরুরি রোগীদের স্কুটার বা অটোরিকশাতে করে দ্রুত ঢাকায় আনা যায়।

ফেরি থেকে মালামাল নিয়ে নেমে এলেন ইয়াসিন মিয়া। তার সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, বক্তারচর সিরাজদিখানের একেবারে প্রান্তবর্তী এলাকা। এখানে নদী পারাপারের জন্য একটি সেতুর নির্মাণকাজ প্রায় চার বছর যাবৎ চলছে। কবে এর কাজ শেষ হবে আর কবে মানুষ সুফল পাবে তা আমাদের কাছে অজানা। এখানকার মানুষের নদী পারাপারে অনেক কষ্ট। আগে প্রায় সাত কিলোমিটার ঘুরে কেরানীগঞ্জ আসতে হতো। তবে এই দেশি ফেরি চালু হওয়ায় অনেক সুবিধা হয়েছে। এখন মানুষের পাশাপাশি মালামাল ও ছোট যানবাহন পারাপার করা যাচ্ছে।

মোল্লারহাট ঘাটে ইমিটেশনের দোকান সাজিয়ে বসেছেন লিয়াকত আলী নামে এক ব্যবসায়ী। তিনি জানান, দেশি ফেরি চালু হওয়ায় এখানে মানুষের যাতায়াত বেড়েছে। আগে অনের দূর ঘুরে কেরানীগঞ্জে আসতে হতো। কিন্তু এখন সবাই দেশি ফেরিতেই পারাপার হচ্ছে।