ঢাকা ০৯:৪৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২২, ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

বিদেশি ঋণ পৌনে ১০ লাখ কোটি টাকা

বিদেশি ঋণের ওপর ক্রমান্বয়ে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে বাংলাদেশ। অভ্যন্তরীণ ঋণের তুলনায় বিদেশি ঋণ বেড়েছে গত বছর। এক বছরের ব্যবধানে গত জুন মাস শেষে দেশের মোট বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে ১২ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ এক লাখ ২৪ হাজার ১২৮ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ৯৬ টাকা হিসাবে)। এ ছাড়া সার্বিকভাবে বিদেশি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৪ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার। টাকার হিসাবে যার পরিমাণ ৯ লাখ ৭২ হাজার কোটি। বিশাল অঙ্কের এ ঋণকে বিদেশি ঋণের ওপর দেশের অতিনির্ভরশীলতা মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে বৈদেশিক উৎস থেকে দেশের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ৮১ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার। অথচ পাঁচ বছর আগেও এর অর্ধেকেরও কম ছিল বিদেশি ঋণ। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল মাত্র ৪৫ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলার।

২০২১-২২ অর্থবছরের জুন শেষে মাত্র ৩ মাসের ব্যবধানে বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে ১ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ডলার। চলতি বছরের মার্চ শেষে বৈদেশিক ঋণ ৯৩ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলার থেকে জুনে এসে দাঁড়িয়েছে ৯৪ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার।

বিদেশি ঋণকে একটি দেশের বাহ্যিক ঋণ হিসেবে অভিহিত করা হয় বলে জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের সরকারি ও বেসরকারি খাতে সাধারণত ঋণ দিয়ে থাকে বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এবং বিদেশি বৃহৎ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো।’ এ ছাড়া বিদেশের বেশকিছু প্রতিষ্ঠানসহ বহুপক্ষীয় ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠান থেকেও ঋণ নেওয়া হয় বলে জানান তিনি।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশের আয়ের একটি বড় অংশই চলে যাচ্ছে বিদেশি ঋণ পরিশোধে। এতে সার্বিকভাবে দেশের অর্থনীতির ভিত্তি দৃঢ় হচ্ছে না। ফলে অনেকেই দেশের পরিস্থিতি শ্রীলঙ্কার মতো হওয়ার আশঙ্কা করেন। তবে বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে পরিস্থিতি শ্রীলঙ্কার মতো হওয়ার অবস্থায় নেই বলেও জানান বিশেষজ্ঞরা।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, সঙ্কটময় পরিস্থিতি এড়াতে যাচাই-বাছাই করে ঋণ নেওয়া উচিত। গণহারে ঋণ নেওয়া কমাতে হবে। বিদেশি ঋণ কাজে লাগাতে হবে লাভজনক প্রকল্পে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে বৈদেশিক উৎস থেকে সরকারের নেওয়া ঋণের পরিমাণ ৬৮ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন। এর মধ্যে বিভিন্ন ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান থেকে দীর্ঘমেয়াদে সরাসরি সরকার ঋণ নিয়েছিল প্রায় ৫৬ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলার। বাকি ১২ বিলিয়ন ডলার নিয়েছে দেশের বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান। চলতি বছর বৈদেশিক উৎস থেকে বেসরকারি খাতের গৃহীত ঋণের পরিমাণ মার্চ মাসে ছিল ২৪ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলার, যা জুন শেষে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলারে।

এদিকে মাত্র ছয় বছরে বিদেশি উৎস থেকে বাংলাদেশের ঋণ দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে বলে জানা যায়। এ অল্প সময়ের মধ্যে বিদেশি ঋণের এমন বাড়বাড়ন্ত দেশের জন্য হুমকি হতে পারে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।

সম্প্রতি মার্কিন ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়নের সঙ্গে লড়াই করছে বাংলাদেশ, যা পরিস্থিতিকে আরও বিপদে ফেলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। ডলারের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে ঋণের বোঝা আরও খারাপ হবে বলে জানান তারা।

ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘যে সময়ে ঋণ নেওয়া হয়েছে তখন এক দাম ছিল ডলারের। পরিশোধের সময় দাম বেড়ে যাচ্ছে ডলারপ্রতি ১০-১২ টাকা। এর পুরোটাই অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করবে। ফলে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতও চাপের মুখে পড়বে।’

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘দেশের বৈদেশিক ঋণ এখনো নিয়ন্ত্রণযোগ্য পর্যায়ে রয়েছে। তবে সম্প্রতি ঋণের পরিমাণ নাটকীয়ভাবে বেড়ে যাওয়ায় কিছুটা শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। সরকারকে বিদেশি ঋণ গ্রহণ এবং ব্যবহারে সতর্ক হতে হবে, যাতে বিনিয়োগ থেকে ভালো রিটার্ন আসে।’

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ও ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘বিদেশি ঋণের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণে সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে। বিপুল পরিমাণে এ ঋণ নেওয়ার পরিবর্তে বাজেট ঘাটতি পূরণে রাজস্ব সংগ্রহের ওপর বেশি জোর দিতে হবে। বেসরকারি খাতে পাওয়া বিদেশি ঋণের পরিমাণও দিন দিন বাড়ছে, যা সরকারের জন্য উদ্বেগের বিষয়ও হতে পারে। কারণ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতাও দেশের সুনাম ক্ষুণ্ন করবে।’

এদিকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্য অনুযায়ী, বেশ কয়েকটি বড় বিদেশি ঋণের পরিপক্বতা ও গ্রেস পিরিয়ড শিগগিরই শেষ হবে। তাই ঋণ পরিশোধের চাপও বাড়বে। ২০২১-২২ অর্থবছরে ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার সুদ ও আসল পরিশোধ করা হয়। এর পরিমাণ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গিয়ে দাঁড়াবে ৪ দশমিক ০২ বিলিয়ন ডলারে।

সম্প্রতি বাজেট প্রস্তুতি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আগামী তিন অর্থবছরের জন্য বিদেশি ঋণ পরিশোধের পরিমাণ হিসাব করেছে ইআরডি। হিসাব অনুযায়ী, আসন্ন ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সামগ্রিক ঋণ পরিশোধের পরিমাণ দাঁড়াবে ২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার ব্যবহার হবে মূল ঋণ পরিশোধে এবং অবশিষ্ট পরিমাণ যাবে সুদ পরিশোধে। এ ছাড়া ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সামগ্রিকভাবে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ হবে প্রায় ৩ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে মূল ঋণ পরিশোধে যাবে ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার এবং বাকি ৯৮০ মিলিয়ন ডলার খরচ হবে সুদ বাবদ।

এদিকে চীন থেকে নেওয়া ঋণের প্রথম কিস্তি ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে পরিশোধ করতে হবে বাংলাদেশকে। কারণ আগামী বছরই শেষ হচ্ছে পাঁচ বছরের গ্রেস পিরিয়ড। পটুয়াখালীর পায়রায় এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের কয়লা তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পটিও চীনের এক্সিম ব্যাংক থেকে প্রায় দুই বিলিয়ন ডলারের ঋণ নিয়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে। পায়রা পাওয়ার প্লান্টের প্রকল্প পরিচালক শাহ আব্দুল মওলা বলেন, ‘চীনের দেওয়া ঋণের বিপরীতে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হবে।’

এ ছাড়া সম্প্রতি বৈদেশিক বাণিজ্যে ভারসাম্যহীনতার কারণে দেশের মুদ্রাবাজারে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ২০২১ সালের জুলাই মাসে দেশে প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল ৮৪ টাকা ৮০ পয়সা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফ্লোটিং রেট অনুমোদনের পর আন্তঃব্যাংক ডলারের দর বেড়ে ১০১ টাকা ৯০ পয়সায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২১ সালের আগস্টে রেকর্ড সর্বোচ্চ ৪৮ দশমিক ০৬ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ নেমে এসেছে ৩৭ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলারে। ঠিক একই সময়ে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি ২০২১-২২ অর্থবছরে রেকর্ড ৩৩ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এর আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ২৩ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার।

Tag :
জনপ্রিয়

সিলেটে ক্বিন ব্রিজের পাশে হবে আরেকটি ব্রিজ : পররাষ্ট্রমন্ত্রী

বিদেশি ঋণ পৌনে ১০ লাখ কোটি টাকা

প্রকাশের সময় : ০৯:৫৪:২০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২২

বিদেশি ঋণের ওপর ক্রমান্বয়ে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে বাংলাদেশ। অভ্যন্তরীণ ঋণের তুলনায় বিদেশি ঋণ বেড়েছে গত বছর। এক বছরের ব্যবধানে গত জুন মাস শেষে দেশের মোট বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে ১২ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ এক লাখ ২৪ হাজার ১২৮ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ৯৬ টাকা হিসাবে)। এ ছাড়া সার্বিকভাবে বিদেশি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৪ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার। টাকার হিসাবে যার পরিমাণ ৯ লাখ ৭২ হাজার কোটি। বিশাল অঙ্কের এ ঋণকে বিদেশি ঋণের ওপর দেশের অতিনির্ভরশীলতা মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে বৈদেশিক উৎস থেকে দেশের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ৮১ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার। অথচ পাঁচ বছর আগেও এর অর্ধেকেরও কম ছিল বিদেশি ঋণ। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল মাত্র ৪৫ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলার।

২০২১-২২ অর্থবছরের জুন শেষে মাত্র ৩ মাসের ব্যবধানে বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে ১ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ডলার। চলতি বছরের মার্চ শেষে বৈদেশিক ঋণ ৯৩ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলার থেকে জুনে এসে দাঁড়িয়েছে ৯৪ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার।

বিদেশি ঋণকে একটি দেশের বাহ্যিক ঋণ হিসেবে অভিহিত করা হয় বলে জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের সরকারি ও বেসরকারি খাতে সাধারণত ঋণ দিয়ে থাকে বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এবং বিদেশি বৃহৎ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো।’ এ ছাড়া বিদেশের বেশকিছু প্রতিষ্ঠানসহ বহুপক্ষীয় ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠান থেকেও ঋণ নেওয়া হয় বলে জানান তিনি।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশের আয়ের একটি বড় অংশই চলে যাচ্ছে বিদেশি ঋণ পরিশোধে। এতে সার্বিকভাবে দেশের অর্থনীতির ভিত্তি দৃঢ় হচ্ছে না। ফলে অনেকেই দেশের পরিস্থিতি শ্রীলঙ্কার মতো হওয়ার আশঙ্কা করেন। তবে বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে পরিস্থিতি শ্রীলঙ্কার মতো হওয়ার অবস্থায় নেই বলেও জানান বিশেষজ্ঞরা।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, সঙ্কটময় পরিস্থিতি এড়াতে যাচাই-বাছাই করে ঋণ নেওয়া উচিত। গণহারে ঋণ নেওয়া কমাতে হবে। বিদেশি ঋণ কাজে লাগাতে হবে লাভজনক প্রকল্পে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে বৈদেশিক উৎস থেকে সরকারের নেওয়া ঋণের পরিমাণ ৬৮ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন। এর মধ্যে বিভিন্ন ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান থেকে দীর্ঘমেয়াদে সরাসরি সরকার ঋণ নিয়েছিল প্রায় ৫৬ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলার। বাকি ১২ বিলিয়ন ডলার নিয়েছে দেশের বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান। চলতি বছর বৈদেশিক উৎস থেকে বেসরকারি খাতের গৃহীত ঋণের পরিমাণ মার্চ মাসে ছিল ২৪ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলার, যা জুন শেষে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলারে।

এদিকে মাত্র ছয় বছরে বিদেশি উৎস থেকে বাংলাদেশের ঋণ দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে বলে জানা যায়। এ অল্প সময়ের মধ্যে বিদেশি ঋণের এমন বাড়বাড়ন্ত দেশের জন্য হুমকি হতে পারে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।

সম্প্রতি মার্কিন ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়নের সঙ্গে লড়াই করছে বাংলাদেশ, যা পরিস্থিতিকে আরও বিপদে ফেলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। ডলারের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে ঋণের বোঝা আরও খারাপ হবে বলে জানান তারা।

ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘যে সময়ে ঋণ নেওয়া হয়েছে তখন এক দাম ছিল ডলারের। পরিশোধের সময় দাম বেড়ে যাচ্ছে ডলারপ্রতি ১০-১২ টাকা। এর পুরোটাই অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করবে। ফলে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতও চাপের মুখে পড়বে।’

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘দেশের বৈদেশিক ঋণ এখনো নিয়ন্ত্রণযোগ্য পর্যায়ে রয়েছে। তবে সম্প্রতি ঋণের পরিমাণ নাটকীয়ভাবে বেড়ে যাওয়ায় কিছুটা শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। সরকারকে বিদেশি ঋণ গ্রহণ এবং ব্যবহারে সতর্ক হতে হবে, যাতে বিনিয়োগ থেকে ভালো রিটার্ন আসে।’

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ও ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘বিদেশি ঋণের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণে সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে। বিপুল পরিমাণে এ ঋণ নেওয়ার পরিবর্তে বাজেট ঘাটতি পূরণে রাজস্ব সংগ্রহের ওপর বেশি জোর দিতে হবে। বেসরকারি খাতে পাওয়া বিদেশি ঋণের পরিমাণও দিন দিন বাড়ছে, যা সরকারের জন্য উদ্বেগের বিষয়ও হতে পারে। কারণ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতাও দেশের সুনাম ক্ষুণ্ন করবে।’

এদিকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্য অনুযায়ী, বেশ কয়েকটি বড় বিদেশি ঋণের পরিপক্বতা ও গ্রেস পিরিয়ড শিগগিরই শেষ হবে। তাই ঋণ পরিশোধের চাপও বাড়বে। ২০২১-২২ অর্থবছরে ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার সুদ ও আসল পরিশোধ করা হয়। এর পরিমাণ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গিয়ে দাঁড়াবে ৪ দশমিক ০২ বিলিয়ন ডলারে।

সম্প্রতি বাজেট প্রস্তুতি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আগামী তিন অর্থবছরের জন্য বিদেশি ঋণ পরিশোধের পরিমাণ হিসাব করেছে ইআরডি। হিসাব অনুযায়ী, আসন্ন ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সামগ্রিক ঋণ পরিশোধের পরিমাণ দাঁড়াবে ২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার ব্যবহার হবে মূল ঋণ পরিশোধে এবং অবশিষ্ট পরিমাণ যাবে সুদ পরিশোধে। এ ছাড়া ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সামগ্রিকভাবে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ হবে প্রায় ৩ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে মূল ঋণ পরিশোধে যাবে ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার এবং বাকি ৯৮০ মিলিয়ন ডলার খরচ হবে সুদ বাবদ।

এদিকে চীন থেকে নেওয়া ঋণের প্রথম কিস্তি ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে পরিশোধ করতে হবে বাংলাদেশকে। কারণ আগামী বছরই শেষ হচ্ছে পাঁচ বছরের গ্রেস পিরিয়ড। পটুয়াখালীর পায়রায় এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের কয়লা তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পটিও চীনের এক্সিম ব্যাংক থেকে প্রায় দুই বিলিয়ন ডলারের ঋণ নিয়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে। পায়রা পাওয়ার প্লান্টের প্রকল্প পরিচালক শাহ আব্দুল মওলা বলেন, ‘চীনের দেওয়া ঋণের বিপরীতে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হবে।’

এ ছাড়া সম্প্রতি বৈদেশিক বাণিজ্যে ভারসাম্যহীনতার কারণে দেশের মুদ্রাবাজারে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ২০২১ সালের জুলাই মাসে দেশে প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল ৮৪ টাকা ৮০ পয়সা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফ্লোটিং রেট অনুমোদনের পর আন্তঃব্যাংক ডলারের দর বেড়ে ১০১ টাকা ৯০ পয়সায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২১ সালের আগস্টে রেকর্ড সর্বোচ্চ ৪৮ দশমিক ০৬ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ নেমে এসেছে ৩৭ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলারে। ঠিক একই সময়ে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি ২০২১-২২ অর্থবছরে রেকর্ড ৩৩ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এর আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ২৩ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার।