ঢাকা ০৩:৩২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০১ অক্টোবর ২০২২, ১৫ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

সড়কে খরচ বেশি টেকে কম

সারাদেশে মূলত দুটি সংস্থাই সড়ক নির্মাণের কাজটি করে থাকে। এর মধ্যে মহাসড়ক ও জেলা পর্যায়ে সড়ক ও সেতু নির্মাণের দায়িত্বে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ)। আর গ্রামীণ পর্যায়ে এ কাজটি করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। তা ছাড়া পৌরসভা, জেলা পরিষদসহ স্থানীয় পর্যায়ে কিছু সড়কের কাজ করে থাকে এলজিইডি। দেশের সড়ক, মহাসড়ক, সেতু ও কালভার্ট নির্মাণের পাশপাাশি রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের দায়িত্বও এ দুটি প্রতিষ্ঠানের। তাদের অধীনে বিপুল অর্থ খরচ করে প্রতিবছরই নেওয়া হয় নানা প্রকল্প। কিন্তু টেকসই সড়কের অভাব সর্বত্র। একটি সড়ক নির্মাণ বা সংস্কারের পর বছর না ঘুরতেই সড়ক ভেঙে যায় এবং একপর্যায়ে চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। এ ছাড়া সড়ক মেরামতেও রয়েছে গাফিলতি। অনেক গুরুত্বপূর্ণ সড়কও বছরের পর বছর ধরে সংস্কার করা হয় না। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনাকে প্রাধান্য দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সড়ক দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রধানত রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ঠিকাদারদের মাধ্যমে নিম্নমানের নির্মাণকাজ ও দুর্নীতিকে দায়ী করেন। এ ছাড়া সড়কের সক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত ওজনের যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে না পারাসহ নানা কারণে সড়ক টিকছে না। এর মধ্যে সাম্প্রতিক বন্যায় এসব সড়ক আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ছে।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) মহাসড়ক উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ (এইচডিএম) বিভাগের চলতি বছরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সওজের অধীনে ২০২১ সালে তিন হাজার পাঁচ কিলোমিটার সড়ক ছিল ভাঙাচোরা। তার আগের বছরে বেহাল ছিল তিন হাজার ৫৯১ কিলোমিটার রাস্তা। বর্তমানে দেশের ৭৬ দশমিক ২৫ ভাগ জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়ক এবং জেলা সড়কের অবস্থা খুব ভালো। গত বছরে প্রায় ৬৫ শতাংশ রাস্তার অবস্থা ভালো ছিল। ২০১৩ সালে দেশে ভালো সড়ক ছিল মাত্র ২০ দশমিক ২৮ শতাংশ। সাত বছরের ব্যবধানে ভালো সড়কের দৈর্ঘ্য বেড়েছে প্রায় চারগুণ। এর মধ্যে ৪৫৭ কিলোমিটার রাস্তার অবস্থা খুবই খারাপ, যা চলাচলের অযোগ্য। ভাঙাচোরা রাস্তা মেরামত ও ভালো সড়ক রক্ষণাবেক্ষণে আগামী পাঁচ বছরে ১৪ হাজার ৯৮৯ কোটি টাকা প্রয়োজন।

সরকারের জাতীয় সড়কব্যবস্থার শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী, দেশের সব উপজেলা সড়ক এবং ইউনিয়ন সড়কের একক দায়িত্ব এলজিইডির। তাদের অধীনে মোট সড়ক ৩ লাখ ৩০ হাজার ৮৩১ কিলোমিটার। এর মধ্যে ৪৫ শতাংশ পাকা, ৫৫ শতাংশ কাঁচা। গ্রামীণ সড়কের ২৫ শতাংশ ব্যবহারের অনুপযোগী। যদিও বিগত তিন অর্থবছরে সড়ক রক্ষণাবেক্ষণে রাজস্ব খাত থেকে এলজিইডি ব্যয় করেছে প্রায় ৬ হাজার ৫২৮ কোটি টাকা। এলজিইডির ৫০ শতাংশ সড়ক সব সময় ভালো থাকে, ২৫ শতাংশের মোটামুটি মেরামত প্রয়োজন। আর ২৫ শতাংশ ব্যবহারের অনুপযোগী থাকে। ব্যবহারের অনুপযোগী এসব সড়কের প্রায় সবটাই গ্রামের।

প্রতিবছর অনেক সড়ক অগ্রাধিকার ভিত্তিতে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। বিপরীতে কাঁচা রাস্তাগুলোতে বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে বছরের পর বছর এই সড়কগুলো ভাঙাচোরা থাকে। আবার অনেক ক্ষেত্রে বরাদ্দ দেওয়া হলেও অন্য গাফিলতিতে কাজ হয় না। সওজ ও এলজিইডির রক্ষণাবেক্ষণ শাখা জানায়, প্রতিবছর যে পরিমাণ সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়, চাহিদা থাকে তার দ্বিগুণ।

এলজিইডি সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে চার ধরনের কাজ করে। সেগুলো হলো যেসব সড়কে গর্ত তৈরি হয়েছে, সেগুলো ভরাট করা (রি-সিল), মোটামুটি অবস্থা থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক মেরামত (ওভার- লে), সড়কের আয়ুষ্কাল কমে গেলে তা পুনর্বাসন করা এবং সড়ক প্রশস্ত করা। তবে রক্ষণাবেক্ষণ কাজের বড় অর্থই ব্যয় হয় মেরামতের কাজে। ২০২০-২১ অর্থবছরে রক্ষণাবেক্ষণের অর্ধেক টাকাই ওভার-লে বা মেরামতে ব্যয় হয়েছে।

এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী সেখ মোহাম্মদ মহসীন বলেন, সারাদেশে এলজিইডির নেটওয়ার্ক। নতুন সড়ক নির্মাণ ও মেরামত সবই করা হচ্ছে। চাহিদার তো শেষ নেই। তবু গুরুত্ব বিবেচনায় দেশের সব সড়ককেই যান চলাচলের উপযোগী করছে এলজিইডি।

সংশ্লিষ্টরা জানান, রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেক অগুরুত্বপূর্ণ সড়কে রক্ষণাবেক্ষণ কাজ করা হয়। কিন্তু জরুরি হলেও অনেক সড়ক সংস্কারের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয় না। আবার সড়কে কাজের মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সাধারণত সড়ক নির্মাণের পাঁচ বছরের মধ্যে সংস্কার করতে হয় না। কিন্তু দেখা যায় নির্মাণের পর বছর ঘুরতে না ঘুরতেই সড়ক ভাঙতে শুরু করে। দু-তিন বছরের মধ্যেই সড়ক বেহাল হয়ে যায়।

সওজ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশের ৪৫৭ কিলোমিটার সড়ক যান চলাচলের অনুপযুক্ত। গত বছর এ ধরনের সড়ক ছিল ৬৯১ কিলোমিটার। তার আগের বছরে ৯৪৩ কিলোমিটার। ২০১৯-২০ সালের জরিপে খুব খারাপ সড়কের দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার।

চলতি বছরে হিসাব অনুযায়ী, জাতীয় মহাসড়কের তিন হাজার ৯২৮ কিলোমিটারে জরিপ করা হয়েছে। এর মধ্যে দুই হাজার ৯৭৯ কিলোমিটার বা ৭৫ দশমিক ৮৩ শতাংশের অবস্থা ভালো। ৬৭৫ কিলোমিটার বা ১৭ দশমিক ১৯ শতাংশের অবস্থা মোটামুটি। বাকি প্রায় ২৭৪ কিলোমিটার ভাঙাচোরা। এর মধ্যে সাড়ে ৪২ কিলোমিটার খুবই খারাপ বা চলাচলের অনুপযোগী।

এলজিইডির অধীনে সারাদেশে সড়ক ও মহাসড়কের দৈর্ঘ্য ২২ হাজার ৪২৭ কিলোমিটার। এর মধ্যে জাতীয় মহাসড়ক তিন হাজার ৯৯০ কিলোমিটার, আঞ্চলিক মহাসড়ক চার হাজার ৮৯৭ কিলোমিটার এবং জেলা সড়ক ১৩ হাজার ৫৮৮ কিলোমিটার। আগের বছরগুলোর মতো এবারের জরিপেও এসেছে, সবচেয়ে খারাপ অবস্থা জেলা সড়কের। জরিপের আওতায় আসা ১১ হাজার ৪৯২ কিলোমিটার জেলা সড়কের মধ্যে আট হাজার ৫৬৪ কিলোমিটারের অবস্থা ভালো। এক হাজার ৪৮২ কিলোমিটারের অবস্থা মোটামুটি। ৩২০ কিলোমিটার গাড়ি চলাচলের অনুপযুক্ত। আগের বছরে এমন সড়ক ছিল ৪৪৮ কিলোমিটার। ৭৭০ কিলোমিটার জেলা সড়কের অবস্থা নাজুক। ৩৫৬ কিলোমিটারের অবস্থা খারাপ। প্রায় এক হাজার ৪৪৬ কিলোমিটার বা ১৩ শতাংশ জেলা সড়ক ভাঙাচোরা।

এ বিষয়ে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী এ কে এম মনির হোসেন পাঠান বলেন, যেসব প্রকল্প চলমান রয়েছে সেগুলো বাস্তবায়ন হলে আগামী তিন বছর পর ভালো সড়কের পরিমাণ দাঁড়াবে ৯৮ শতাংশ। প্রতি বছরই এইচডিএমের মাধ্যমে এ রকম জরিপ করা হয়। এর মাধ্যমে সড়কের বর্তমান অবস্থা যাচাই করা হয়। রাস্তা বর্তমান অবস্থা এখন যা আছে পরে তা নাও থাকতে পারে। এ জন্য কত বাজেট দরকার, কোন রাস্তা কোন অবস্থায় আছে দেখে পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এটি একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। আদর্শ সড়কের ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রক্রিয়া মানাই স্ট্যান্ডার্ড।

এলজিইডির প্রকৌশলীরা বলছেন, গ্রামীণ সড়ক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অন্যতম কারণ অতিরিক্ত পণ্যবোঝাই যানবাহন চলাচল। উপজেলা সড়ক ও ইউনিয়ন সড়কে ৮ দশমিক ২ টন এবং গ্রামীণ সড়কে ৫ টনের বেশি পণ্যবাহী যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ। কিন্তু বাস্তবে এর চেয়ে অধিক ওজনের যানবাহন চলাচল করছে। ফলে সড়ক দ্রুত নষ্ট হচ্ছে। এ ছাড়া অতিবৃষ্টি, সড়কের পাশের পুকুরের পাড় বাঁধানো না থাকা, বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে সড়কের ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে।

চলতি বছর স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা হয় সিলেট বিভাগে। এলজিইডির তথ্য অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও কালভার্টের বড় অংশই বিভাগের চার জেলায়। এখানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেড় হাজার কিলোমিটারের বেশি সড়ক। এর মধ্যে সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলায় ক্ষয়ক্ষতি বেশি। বিভিন্ন জেলার এলজিইডি কার্যালয় থেকে সদর দপ্তরে পাঠানো প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রাথমিক প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করেছে সংস্থাটির রক্ষণাবেক্ষণ শাখা। প্রকল্পে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ময়মনসিংহ, শেরপুর, নেত্রকোনা, জামালপুর ও কুড়িগ্রাম জেলা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত।

সওজের তথ্যমতে, সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, শেরপুর, টাঙ্গাইল, জামালপুর, ফেনী, কুমিল্লা, ব্রাক্ষণবাড়িয়া, নোয়াখালী, কুড়িগ্রাম ও নীলফামারী সড়ক বিভাগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ৪৭টি; মোট দৈর্ঘ্য ৫০৬ কিলোমিটার। বন্যায় সড়কের কিছু অংশ নিমজ্জিত হয়েছে। বিভিন্ন অংশের বাঁধ ধসে পড়ে। হয়েছে ওয়াশআউট মানে সড়ক চলাচলের অনুপযোগী। এ ছাড়া পেভমেন্টের সারফেস ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অসংখ্য পটহোলস (গর্ত) সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে অ্যাপ্রোচ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যার সময় ৩টি জাতীয় মহাসড়কের মধ্যে নিমজ্জিত অংশ ছিল ১০ কিলোমিটার। ৯টি আঞ্চলিক মহাসড়কের ১৯৭ কিলোমিটার এবং ৩৫টি জেলা মহাসড়কের ২৯৯ কিলোমিটার নিমজ্জিত ছিল। বন্যায় এসব সড়ক গাড়ি চলাচল সাময়িক বন্ধ থাকলেও এখন গাড়ি চলাচল করছে।

Tag :
জনপ্রিয়

হোসেনপুর বাজার সনাতন ধর্মাবলম্বী ব্যাবসায়িকদের উদ্যোগে বস্ত্র বিতরণ

সড়কে খরচ বেশি টেকে কম

প্রকাশের সময় : ০৯:৪৩:০২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২২

সারাদেশে মূলত দুটি সংস্থাই সড়ক নির্মাণের কাজটি করে থাকে। এর মধ্যে মহাসড়ক ও জেলা পর্যায়ে সড়ক ও সেতু নির্মাণের দায়িত্বে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ)। আর গ্রামীণ পর্যায়ে এ কাজটি করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। তা ছাড়া পৌরসভা, জেলা পরিষদসহ স্থানীয় পর্যায়ে কিছু সড়কের কাজ করে থাকে এলজিইডি। দেশের সড়ক, মহাসড়ক, সেতু ও কালভার্ট নির্মাণের পাশপাাশি রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের দায়িত্বও এ দুটি প্রতিষ্ঠানের। তাদের অধীনে বিপুল অর্থ খরচ করে প্রতিবছরই নেওয়া হয় নানা প্রকল্প। কিন্তু টেকসই সড়কের অভাব সর্বত্র। একটি সড়ক নির্মাণ বা সংস্কারের পর বছর না ঘুরতেই সড়ক ভেঙে যায় এবং একপর্যায়ে চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। এ ছাড়া সড়ক মেরামতেও রয়েছে গাফিলতি। অনেক গুরুত্বপূর্ণ সড়কও বছরের পর বছর ধরে সংস্কার করা হয় না। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনাকে প্রাধান্য দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সড়ক দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রধানত রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ঠিকাদারদের মাধ্যমে নিম্নমানের নির্মাণকাজ ও দুর্নীতিকে দায়ী করেন। এ ছাড়া সড়কের সক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত ওজনের যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে না পারাসহ নানা কারণে সড়ক টিকছে না। এর মধ্যে সাম্প্রতিক বন্যায় এসব সড়ক আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ছে।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) মহাসড়ক উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ (এইচডিএম) বিভাগের চলতি বছরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সওজের অধীনে ২০২১ সালে তিন হাজার পাঁচ কিলোমিটার সড়ক ছিল ভাঙাচোরা। তার আগের বছরে বেহাল ছিল তিন হাজার ৫৯১ কিলোমিটার রাস্তা। বর্তমানে দেশের ৭৬ দশমিক ২৫ ভাগ জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়ক এবং জেলা সড়কের অবস্থা খুব ভালো। গত বছরে প্রায় ৬৫ শতাংশ রাস্তার অবস্থা ভালো ছিল। ২০১৩ সালে দেশে ভালো সড়ক ছিল মাত্র ২০ দশমিক ২৮ শতাংশ। সাত বছরের ব্যবধানে ভালো সড়কের দৈর্ঘ্য বেড়েছে প্রায় চারগুণ। এর মধ্যে ৪৫৭ কিলোমিটার রাস্তার অবস্থা খুবই খারাপ, যা চলাচলের অযোগ্য। ভাঙাচোরা রাস্তা মেরামত ও ভালো সড়ক রক্ষণাবেক্ষণে আগামী পাঁচ বছরে ১৪ হাজার ৯৮৯ কোটি টাকা প্রয়োজন।

সরকারের জাতীয় সড়কব্যবস্থার শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী, দেশের সব উপজেলা সড়ক এবং ইউনিয়ন সড়কের একক দায়িত্ব এলজিইডির। তাদের অধীনে মোট সড়ক ৩ লাখ ৩০ হাজার ৮৩১ কিলোমিটার। এর মধ্যে ৪৫ শতাংশ পাকা, ৫৫ শতাংশ কাঁচা। গ্রামীণ সড়কের ২৫ শতাংশ ব্যবহারের অনুপযোগী। যদিও বিগত তিন অর্থবছরে সড়ক রক্ষণাবেক্ষণে রাজস্ব খাত থেকে এলজিইডি ব্যয় করেছে প্রায় ৬ হাজার ৫২৮ কোটি টাকা। এলজিইডির ৫০ শতাংশ সড়ক সব সময় ভালো থাকে, ২৫ শতাংশের মোটামুটি মেরামত প্রয়োজন। আর ২৫ শতাংশ ব্যবহারের অনুপযোগী থাকে। ব্যবহারের অনুপযোগী এসব সড়কের প্রায় সবটাই গ্রামের।

প্রতিবছর অনেক সড়ক অগ্রাধিকার ভিত্তিতে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। বিপরীতে কাঁচা রাস্তাগুলোতে বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে বছরের পর বছর এই সড়কগুলো ভাঙাচোরা থাকে। আবার অনেক ক্ষেত্রে বরাদ্দ দেওয়া হলেও অন্য গাফিলতিতে কাজ হয় না। সওজ ও এলজিইডির রক্ষণাবেক্ষণ শাখা জানায়, প্রতিবছর যে পরিমাণ সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়, চাহিদা থাকে তার দ্বিগুণ।

এলজিইডি সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে চার ধরনের কাজ করে। সেগুলো হলো যেসব সড়কে গর্ত তৈরি হয়েছে, সেগুলো ভরাট করা (রি-সিল), মোটামুটি অবস্থা থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক মেরামত (ওভার- লে), সড়কের আয়ুষ্কাল কমে গেলে তা পুনর্বাসন করা এবং সড়ক প্রশস্ত করা। তবে রক্ষণাবেক্ষণ কাজের বড় অর্থই ব্যয় হয় মেরামতের কাজে। ২০২০-২১ অর্থবছরে রক্ষণাবেক্ষণের অর্ধেক টাকাই ওভার-লে বা মেরামতে ব্যয় হয়েছে।

এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী সেখ মোহাম্মদ মহসীন বলেন, সারাদেশে এলজিইডির নেটওয়ার্ক। নতুন সড়ক নির্মাণ ও মেরামত সবই করা হচ্ছে। চাহিদার তো শেষ নেই। তবু গুরুত্ব বিবেচনায় দেশের সব সড়ককেই যান চলাচলের উপযোগী করছে এলজিইডি।

সংশ্লিষ্টরা জানান, রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেক অগুরুত্বপূর্ণ সড়কে রক্ষণাবেক্ষণ কাজ করা হয়। কিন্তু জরুরি হলেও অনেক সড়ক সংস্কারের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয় না। আবার সড়কে কাজের মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সাধারণত সড়ক নির্মাণের পাঁচ বছরের মধ্যে সংস্কার করতে হয় না। কিন্তু দেখা যায় নির্মাণের পর বছর ঘুরতে না ঘুরতেই সড়ক ভাঙতে শুরু করে। দু-তিন বছরের মধ্যেই সড়ক বেহাল হয়ে যায়।

সওজ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশের ৪৫৭ কিলোমিটার সড়ক যান চলাচলের অনুপযুক্ত। গত বছর এ ধরনের সড়ক ছিল ৬৯১ কিলোমিটার। তার আগের বছরে ৯৪৩ কিলোমিটার। ২০১৯-২০ সালের জরিপে খুব খারাপ সড়কের দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার।

চলতি বছরে হিসাব অনুযায়ী, জাতীয় মহাসড়কের তিন হাজার ৯২৮ কিলোমিটারে জরিপ করা হয়েছে। এর মধ্যে দুই হাজার ৯৭৯ কিলোমিটার বা ৭৫ দশমিক ৮৩ শতাংশের অবস্থা ভালো। ৬৭৫ কিলোমিটার বা ১৭ দশমিক ১৯ শতাংশের অবস্থা মোটামুটি। বাকি প্রায় ২৭৪ কিলোমিটার ভাঙাচোরা। এর মধ্যে সাড়ে ৪২ কিলোমিটার খুবই খারাপ বা চলাচলের অনুপযোগী।

এলজিইডির অধীনে সারাদেশে সড়ক ও মহাসড়কের দৈর্ঘ্য ২২ হাজার ৪২৭ কিলোমিটার। এর মধ্যে জাতীয় মহাসড়ক তিন হাজার ৯৯০ কিলোমিটার, আঞ্চলিক মহাসড়ক চার হাজার ৮৯৭ কিলোমিটার এবং জেলা সড়ক ১৩ হাজার ৫৮৮ কিলোমিটার। আগের বছরগুলোর মতো এবারের জরিপেও এসেছে, সবচেয়ে খারাপ অবস্থা জেলা সড়কের। জরিপের আওতায় আসা ১১ হাজার ৪৯২ কিলোমিটার জেলা সড়কের মধ্যে আট হাজার ৫৬৪ কিলোমিটারের অবস্থা ভালো। এক হাজার ৪৮২ কিলোমিটারের অবস্থা মোটামুটি। ৩২০ কিলোমিটার গাড়ি চলাচলের অনুপযুক্ত। আগের বছরে এমন সড়ক ছিল ৪৪৮ কিলোমিটার। ৭৭০ কিলোমিটার জেলা সড়কের অবস্থা নাজুক। ৩৫৬ কিলোমিটারের অবস্থা খারাপ। প্রায় এক হাজার ৪৪৬ কিলোমিটার বা ১৩ শতাংশ জেলা সড়ক ভাঙাচোরা।

এ বিষয়ে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী এ কে এম মনির হোসেন পাঠান বলেন, যেসব প্রকল্প চলমান রয়েছে সেগুলো বাস্তবায়ন হলে আগামী তিন বছর পর ভালো সড়কের পরিমাণ দাঁড়াবে ৯৮ শতাংশ। প্রতি বছরই এইচডিএমের মাধ্যমে এ রকম জরিপ করা হয়। এর মাধ্যমে সড়কের বর্তমান অবস্থা যাচাই করা হয়। রাস্তা বর্তমান অবস্থা এখন যা আছে পরে তা নাও থাকতে পারে। এ জন্য কত বাজেট দরকার, কোন রাস্তা কোন অবস্থায় আছে দেখে পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এটি একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। আদর্শ সড়কের ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রক্রিয়া মানাই স্ট্যান্ডার্ড।

এলজিইডির প্রকৌশলীরা বলছেন, গ্রামীণ সড়ক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অন্যতম কারণ অতিরিক্ত পণ্যবোঝাই যানবাহন চলাচল। উপজেলা সড়ক ও ইউনিয়ন সড়কে ৮ দশমিক ২ টন এবং গ্রামীণ সড়কে ৫ টনের বেশি পণ্যবাহী যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ। কিন্তু বাস্তবে এর চেয়ে অধিক ওজনের যানবাহন চলাচল করছে। ফলে সড়ক দ্রুত নষ্ট হচ্ছে। এ ছাড়া অতিবৃষ্টি, সড়কের পাশের পুকুরের পাড় বাঁধানো না থাকা, বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে সড়কের ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে।

চলতি বছর স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা হয় সিলেট বিভাগে। এলজিইডির তথ্য অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও কালভার্টের বড় অংশই বিভাগের চার জেলায়। এখানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেড় হাজার কিলোমিটারের বেশি সড়ক। এর মধ্যে সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলায় ক্ষয়ক্ষতি বেশি। বিভিন্ন জেলার এলজিইডি কার্যালয় থেকে সদর দপ্তরে পাঠানো প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রাথমিক প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করেছে সংস্থাটির রক্ষণাবেক্ষণ শাখা। প্রকল্পে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ময়মনসিংহ, শেরপুর, নেত্রকোনা, জামালপুর ও কুড়িগ্রাম জেলা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত।

সওজের তথ্যমতে, সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, শেরপুর, টাঙ্গাইল, জামালপুর, ফেনী, কুমিল্লা, ব্রাক্ষণবাড়িয়া, নোয়াখালী, কুড়িগ্রাম ও নীলফামারী সড়ক বিভাগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ৪৭টি; মোট দৈর্ঘ্য ৫০৬ কিলোমিটার। বন্যায় সড়কের কিছু অংশ নিমজ্জিত হয়েছে। বিভিন্ন অংশের বাঁধ ধসে পড়ে। হয়েছে ওয়াশআউট মানে সড়ক চলাচলের অনুপযোগী। এ ছাড়া পেভমেন্টের সারফেস ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অসংখ্য পটহোলস (গর্ত) সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে অ্যাপ্রোচ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যার সময় ৩টি জাতীয় মহাসড়কের মধ্যে নিমজ্জিত অংশ ছিল ১০ কিলোমিটার। ৯টি আঞ্চলিক মহাসড়কের ১৯৭ কিলোমিটার এবং ৩৫টি জেলা মহাসড়কের ২৯৯ কিলোমিটার নিমজ্জিত ছিল। বন্যায় এসব সড়ক গাড়ি চলাচল সাময়িক বন্ধ থাকলেও এখন গাড়ি চলাচল করছে।