ঢাকা ০৮:০১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ নভেম্বর ২০২২, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

দু’বছরেও চালু হয়নি ডোপ টেস্ট

সরকারী চাকরিজীবী ও গণপরিবহনের চালকদের মধ্যে ডোপ টেস্ট নেয়ার সিদ্ধান্ত এখনও কার্যকর করা যাচ্ছে না। প্রয়োজনীয় জনবল ও সরঞ্জামাদি না থাকায় এটা এখনও ঘোষণার মাঝেই সীমিত রয়েছে। তবে গণপরিবহনে চালকদের লাইসেন্স নেয়ার ক্ষেত্রে ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করা হলেও সরকারী চাকরিতে সেটা চালুই করা সম্ভব হয়নি।

প্রধানমন্ত্রী বছর দুয়েক আগে সরকারী চাকরিজীবী ও পেশাদার চালকদের ডোপ টেস্ট করার নির্দেশ দেয়ার পর সেটা সংক্ষিপ্তাকারে শুরু করা হয়। কিন্তু ঘোষণার দু’বছর পেরিয়ে গেলেও এটা পুরোদমে শুরু করা সম্ভব হয়নি। সরকারী চাকরির ক্ষেত্রে কয়েকটি নমুনা কেস হিসেবে শুরু করা হলেও এখনও তার ব্যাপ্তি ঘটেনি। একইভাবে পেশাদার চালকদের লাইসেন্স দেয়ার সময় ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করা হলেও ভ্রাম্যমাণ চালকদের বেলায় সেটা সম্ভব হচ্ছে না। এ অবস্থায় সর্বশেষ বৃহস্পতিবারও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে ডোপ টেস্ট করার নির্দেশ কার্যকর করা হচ্ছে। এটা আরও জোরদার করা হবে।

অভিযোগ রয়েছে গণপরিবহনের চালকদের মধ্যে মাদক গ্রহণের অভিযোগ বেশ পুরনো। বছর দুয়েক আগে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের অনুষ্ঠানে মাদকাসক্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো বন্ধে চালকদের ডোপ টেস্ট করার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। চালক শ্রমিকদের মাদকাসক্তিকে সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ উল্লেখ করে যাত্রী অধিকার সংগঠনগুলো ডোপ টেস্ট চালুর দাবি জানায়। তারপরই চালকদের ডোপ টেস্ট শুরু করে বিআরটিএ। ডোপ টেস্ট চালু করার কর্মকৌশল ঠিক করতে গঠন করা হয় ৯ সদস্যের একটি কমিটি। ওই কমিটি র্কার্যকর ঘোষণা দিয়েই শুরু করে পেশাদার চালকদের ডোপ টেস্ট।

রাজধানীসহ দেশের প্রতিটি জেলায় বিআরটিএ অফিসে পেশাদার লাইসেন্স নেবার সময় ডোপ টেস্ট করা হয়। এখন এটা ছাড়া কোন পেশাদার চালক নতুন লাইসেন্স নেয়া ও নবায়ন করতে পারছে না। তবে যারা ডোপ টেস্ট করে লাইসেন্স নেয়ার পর নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গাড়িতে ওঠেন তাদের টেস্ট করা যাচ্ছে না। এরা এখনও থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। মূলত প্রয়োজনীয় জনবল ও ভ্রাম্যমাণ ল্যাব না থাকায় তাদের গাড়ি চালানো অবস্থায় টেস্ট করা যাচ্ছে না।

গণপরিবহনে ডোপ টেস্ট সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ মজুমদার বলেন, ডোপ টেস্ট চালু করা হয়েছে পেশাদার চালকদের লাইসেন্স গ্রহণ ও নবায়নের বেলায়। এখন স্বাস্থ্য অধিদফতরের সহযোগিতায় বিআরটিএ-এর প্রতিটি অফিসেই চালকদের ডোপ টেস্ট করা হচ্ছে। কিন্তু ডোপ টেস্ট দিয়ে লাইসেন্স নেয়ার পর তারা নেশা করে গাড়ি চালায় কিনা সেটার ধরার জন্য কোন ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না। একদিকে নেই পর্যাপ্ত জনবল, অন্যদিকে নেই ভ্রাম্যমাণ ল্যাব। একজন চালককে গাড়ি চালানো অবস্থায় ডোপ টেস্ট করতে হলে প্রথমেই তার মুখের শ্বাস ও ইউরিন টেস্ট করার জন্য নমুনা নিতে হয়। সেজন্য ভ্রাম্যমাণ ল্যাব দরকার। যা এখনও চালু করা সম্ভব না হলেও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

পরিবহন মালিক, শ্রমিক ও পুলিশের সমন্বয়ে বিভিন্ন টার্মিনালগুলোতে পরিবহন চালকদের সন্দেহ হলেই তাদের ডোপ টেস্ট করানোর নির্দেশনা রয়েছে। সেটা কার্যকর করার জন্য অনেক আগেই বেশ কিছু প্রস্তাবনাও দেয়া হয়েছে মন্ত্রণালয়ে।

জানা গেছে, এখন চালকদের লাইসেন্স প্রদান ও নবায়নের সময় তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। কিন্তু এর মধ্যে চালকদের মাদকাসক্তি দেখার কোন ব্যবস্থা নেই। বর্তমানে যারা লাইসেন্স নিতে এসে বা নবায়ন করতে এসে ডোপ টেস্ট করাচ্ছেন তাদের বেশিরভাগই নেগেটিভ হিসেবে ধরা পড়ছে। আনুমানিক শতকরা ৮/১০ জনের শরীরে মাদকের উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে। তবে এ সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট কোন পরিসংখ্যান বিআরটিএর কাছে নেই।

লাইসেন্স নিতে এসে চালকের মাদকাসক্তি প্রমাণিত হলে তার লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুরুতে বিআরটিএ’র পক্ষ থেকে বলা হয়েছিলো ডোপ টেস্টের খরচ পরিবহন মালিক এবং শ্রমিক সবাইকে মিলে দিতে। তাতে মালিকপক্ষ রাজি হয়নি। ফলে এখন সরকারী খরচেই ডোপ টেস্ট করানো হচ্ছে। এখন চালকদের লালা ও ইউরিন সংগ্রহ করে পাঠানো হয় স্বাস্থ্য অধিদফতরে। সেখান থেকে বিভিন্ন হাসপাতালের মাধ্যমে রিপোর্ট সংগ্রহ করেই লাইসেন্স দেয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে নূর মোহাম্মদ মজুমদার বলেন, লাইসেন্স প্রদানের বেলায় ডোপ টেস্ট নেয়া হলেও নেশা খেয়ে তারা গাড়িতে ওঠেন কিনা সেটা ধরার জন্য দরকার ভ্রাম্যমাণ আদালত যার অধীনে থাকবে একটি ভ্রাম্যমাণ ল্যাবও। চলন্ত গাড়ি থামিয়ে চালকের মুখের লালা ও ইউরিন নিয়ে সেটা তাৎক্ষণিক টেস্ট করা গেলেই সত্যিকার অর্থে এর সুফল মিলবে। অন্যথায় একটা ফাঁক ফোকর থেকে যায়। যেমন- মাদক গ্রহণের পর সেটা একটি নির্দিষ্ট সময় যেমন ২৪ ঘণ্টা বা ২/৩ দিন পর্যন্ত ক্রিয়াশীল থাকে। এ সময়ের মধ্যে ডোপ টেস্ট করানো হলে ধরা পড়ে। কিন্তু তারপর সেটা টেস্ট করলেও ধরা পড়ে না। এখন যিনি লাইসেন্স নিতে বা নবায়ন করতে আসবেন- তিনি যদি মাদক গ্রহণের পর বিরতি দেন- তাহলেই তো উৎরে যায়। এ জন্যই দেখা যাচ্ছে লাইসেন্সের বেলায় খুব একটা ধরা পড়ছে না মাদকের উপস্থিতি। প্রায় সবারই টেস্টে নেগেটিভ হয়ে যাচ্ছে। এজন্য প্রয়োজন হচ্ছে ব্যাপক হারে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ডোপ টেস্টের অভিযান চালানো। যা অনেক ব্যয় ও সময় সাপেক্ষ।

ডোপ টেস্ট সম্পর্কে যাত্রী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোও বলছে, মূলত পরিবহন চালকদের মাদক সেবনের কারণেই বেশিরভাগ দুর্ঘটনা ঘটছে। বেসরকারী সংস্থা ব্র্যাকের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশে ভারি মোটরযানের চালকদের প্রায় ৬৯ শতাংশই মাদকাসক্ত। বিশেষ করে মহাসড়কে দীর্ঘ রুটে গাড়ি চালানোর সময় অনেক চালকই মাদক গ্রহণ করে থাকে। যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোঃ মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, দুর্ঘটনার বড় অংশ চালকদের মাদকাসক্তির কারণে ঘটে। আমরা প্রকাশ্যে দেখছি রাজধানীর সিটি সার্ভিসের যেসব বাসগুলো রয়েছে সেসব বাসের চালকরাও কিন্তু মাদক গ্রহণ করে। যা মালিকরাও প্রকাশ্যে বিষয়টি স্বীকার করেছেন।

আমরা অবজারভেশন করে দেখেছি, পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন কারণে পরিবহনের চালকরা এই মাদকাসক্তিতে জড়াচ্ছেন। ভয়ঙ্কর বিষয় হচ্ছে পরিবহনের চালকরা মাদকাসক্ত হয়েই গাড়ি চালাচ্ছেন। এজন্যই চালকদের ডোপ টেস্ট সার্বজনীন করতে হবে। সাময়িক লাইসেন্সের বেলায় ডোপ টেস্ট করলেই এ সঙ্কটের নিরসন হবে না। বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে বর্তমানে দেশে ৪০ লাখ ৭২ হাজার ৬১৬টি লাইসেন্স আছে। এর মধ্যে ভারি যান চালানোর লাইসেন্স ১ লাখ ২ হাজার, মাঝারি মানের ১৫ হাজার ৪৭১টি ও হাল্কা যানের লাইসেন্স রয়েছে ১২ লাখ ১ হাজার ৫৬টি। এর মধ্যে অপেশাদার ১০ লাখ। এছাড়া মোটরসাইকেল, থ্রি হুইলার ও অন্যান্য ক্যাটাগরির লাইসেন্স রয়েছে। তাদের মধ্যে কতভাগ মাদকাসক্ত সেটার কোন পরিসংখ্যান নেই সরকারের কোন সংস্থার কাছেই।

এদিকে সরকারী চাকরিজীবীদের বেলায়ও মাদকসক্তি রোধে ডোপ টেস্টের ঘোষণা দেয়া হলেও সেটার বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছে না। বছরখানেক আগে পুলিশের কজনকে ডোপ টেস্ট করার পর একজনের শরীরে মাদক ধরা পড়ার ঘটনায় তোলপাড় দেখা দেয়। তখন সিদ্ধান্ত হয়েছিল পুলিশের প্রতিটি ইউনিটেই চালানো হবে এ টেস্ট। কিন্তুু সেটারও আর কোন অগ্রগতি নেই। অবশ্য সরকারী চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা হয় তাতে মাদক শনাক্ত করার উপায় থাকে। এখন পর্যন্ত নবাগত চাকরিজীবীদের শরীরে মাদকের উপস্থিতি শূন্যের কোঠায় বলে জানা গেছে।

Tag :
জনপ্রিয়

সংবাদ প্রকাশের জেরে তিন সাংবাদিকসহ ৫জনের নামে চোরাকারবারির মামলা

দু’বছরেও চালু হয়নি ডোপ টেস্ট

প্রকাশের সময় : ১০:৩২:৫৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২২

সরকারী চাকরিজীবী ও গণপরিবহনের চালকদের মধ্যে ডোপ টেস্ট নেয়ার সিদ্ধান্ত এখনও কার্যকর করা যাচ্ছে না। প্রয়োজনীয় জনবল ও সরঞ্জামাদি না থাকায় এটা এখনও ঘোষণার মাঝেই সীমিত রয়েছে। তবে গণপরিবহনে চালকদের লাইসেন্স নেয়ার ক্ষেত্রে ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করা হলেও সরকারী চাকরিতে সেটা চালুই করা সম্ভব হয়নি।

প্রধানমন্ত্রী বছর দুয়েক আগে সরকারী চাকরিজীবী ও পেশাদার চালকদের ডোপ টেস্ট করার নির্দেশ দেয়ার পর সেটা সংক্ষিপ্তাকারে শুরু করা হয়। কিন্তু ঘোষণার দু’বছর পেরিয়ে গেলেও এটা পুরোদমে শুরু করা সম্ভব হয়নি। সরকারী চাকরির ক্ষেত্রে কয়েকটি নমুনা কেস হিসেবে শুরু করা হলেও এখনও তার ব্যাপ্তি ঘটেনি। একইভাবে পেশাদার চালকদের লাইসেন্স দেয়ার সময় ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করা হলেও ভ্রাম্যমাণ চালকদের বেলায় সেটা সম্ভব হচ্ছে না। এ অবস্থায় সর্বশেষ বৃহস্পতিবারও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে ডোপ টেস্ট করার নির্দেশ কার্যকর করা হচ্ছে। এটা আরও জোরদার করা হবে।

অভিযোগ রয়েছে গণপরিবহনের চালকদের মধ্যে মাদক গ্রহণের অভিযোগ বেশ পুরনো। বছর দুয়েক আগে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের অনুষ্ঠানে মাদকাসক্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো বন্ধে চালকদের ডোপ টেস্ট করার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। চালক শ্রমিকদের মাদকাসক্তিকে সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ উল্লেখ করে যাত্রী অধিকার সংগঠনগুলো ডোপ টেস্ট চালুর দাবি জানায়। তারপরই চালকদের ডোপ টেস্ট শুরু করে বিআরটিএ। ডোপ টেস্ট চালু করার কর্মকৌশল ঠিক করতে গঠন করা হয় ৯ সদস্যের একটি কমিটি। ওই কমিটি র্কার্যকর ঘোষণা দিয়েই শুরু করে পেশাদার চালকদের ডোপ টেস্ট।

রাজধানীসহ দেশের প্রতিটি জেলায় বিআরটিএ অফিসে পেশাদার লাইসেন্স নেবার সময় ডোপ টেস্ট করা হয়। এখন এটা ছাড়া কোন পেশাদার চালক নতুন লাইসেন্স নেয়া ও নবায়ন করতে পারছে না। তবে যারা ডোপ টেস্ট করে লাইসেন্স নেয়ার পর নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গাড়িতে ওঠেন তাদের টেস্ট করা যাচ্ছে না। এরা এখনও থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। মূলত প্রয়োজনীয় জনবল ও ভ্রাম্যমাণ ল্যাব না থাকায় তাদের গাড়ি চালানো অবস্থায় টেস্ট করা যাচ্ছে না।

গণপরিবহনে ডোপ টেস্ট সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ মজুমদার বলেন, ডোপ টেস্ট চালু করা হয়েছে পেশাদার চালকদের লাইসেন্স গ্রহণ ও নবায়নের বেলায়। এখন স্বাস্থ্য অধিদফতরের সহযোগিতায় বিআরটিএ-এর প্রতিটি অফিসেই চালকদের ডোপ টেস্ট করা হচ্ছে। কিন্তু ডোপ টেস্ট দিয়ে লাইসেন্স নেয়ার পর তারা নেশা করে গাড়ি চালায় কিনা সেটার ধরার জন্য কোন ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না। একদিকে নেই পর্যাপ্ত জনবল, অন্যদিকে নেই ভ্রাম্যমাণ ল্যাব। একজন চালককে গাড়ি চালানো অবস্থায় ডোপ টেস্ট করতে হলে প্রথমেই তার মুখের শ্বাস ও ইউরিন টেস্ট করার জন্য নমুনা নিতে হয়। সেজন্য ভ্রাম্যমাণ ল্যাব দরকার। যা এখনও চালু করা সম্ভব না হলেও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

পরিবহন মালিক, শ্রমিক ও পুলিশের সমন্বয়ে বিভিন্ন টার্মিনালগুলোতে পরিবহন চালকদের সন্দেহ হলেই তাদের ডোপ টেস্ট করানোর নির্দেশনা রয়েছে। সেটা কার্যকর করার জন্য অনেক আগেই বেশ কিছু প্রস্তাবনাও দেয়া হয়েছে মন্ত্রণালয়ে।

জানা গেছে, এখন চালকদের লাইসেন্স প্রদান ও নবায়নের সময় তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। কিন্তু এর মধ্যে চালকদের মাদকাসক্তি দেখার কোন ব্যবস্থা নেই। বর্তমানে যারা লাইসেন্স নিতে এসে বা নবায়ন করতে এসে ডোপ টেস্ট করাচ্ছেন তাদের বেশিরভাগই নেগেটিভ হিসেবে ধরা পড়ছে। আনুমানিক শতকরা ৮/১০ জনের শরীরে মাদকের উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে। তবে এ সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট কোন পরিসংখ্যান বিআরটিএর কাছে নেই।

লাইসেন্স নিতে এসে চালকের মাদকাসক্তি প্রমাণিত হলে তার লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুরুতে বিআরটিএ’র পক্ষ থেকে বলা হয়েছিলো ডোপ টেস্টের খরচ পরিবহন মালিক এবং শ্রমিক সবাইকে মিলে দিতে। তাতে মালিকপক্ষ রাজি হয়নি। ফলে এখন সরকারী খরচেই ডোপ টেস্ট করানো হচ্ছে। এখন চালকদের লালা ও ইউরিন সংগ্রহ করে পাঠানো হয় স্বাস্থ্য অধিদফতরে। সেখান থেকে বিভিন্ন হাসপাতালের মাধ্যমে রিপোর্ট সংগ্রহ করেই লাইসেন্স দেয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে নূর মোহাম্মদ মজুমদার বলেন, লাইসেন্স প্রদানের বেলায় ডোপ টেস্ট নেয়া হলেও নেশা খেয়ে তারা গাড়িতে ওঠেন কিনা সেটা ধরার জন্য দরকার ভ্রাম্যমাণ আদালত যার অধীনে থাকবে একটি ভ্রাম্যমাণ ল্যাবও। চলন্ত গাড়ি থামিয়ে চালকের মুখের লালা ও ইউরিন নিয়ে সেটা তাৎক্ষণিক টেস্ট করা গেলেই সত্যিকার অর্থে এর সুফল মিলবে। অন্যথায় একটা ফাঁক ফোকর থেকে যায়। যেমন- মাদক গ্রহণের পর সেটা একটি নির্দিষ্ট সময় যেমন ২৪ ঘণ্টা বা ২/৩ দিন পর্যন্ত ক্রিয়াশীল থাকে। এ সময়ের মধ্যে ডোপ টেস্ট করানো হলে ধরা পড়ে। কিন্তু তারপর সেটা টেস্ট করলেও ধরা পড়ে না। এখন যিনি লাইসেন্স নিতে বা নবায়ন করতে আসবেন- তিনি যদি মাদক গ্রহণের পর বিরতি দেন- তাহলেই তো উৎরে যায়। এ জন্যই দেখা যাচ্ছে লাইসেন্সের বেলায় খুব একটা ধরা পড়ছে না মাদকের উপস্থিতি। প্রায় সবারই টেস্টে নেগেটিভ হয়ে যাচ্ছে। এজন্য প্রয়োজন হচ্ছে ব্যাপক হারে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ডোপ টেস্টের অভিযান চালানো। যা অনেক ব্যয় ও সময় সাপেক্ষ।

ডোপ টেস্ট সম্পর্কে যাত্রী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোও বলছে, মূলত পরিবহন চালকদের মাদক সেবনের কারণেই বেশিরভাগ দুর্ঘটনা ঘটছে। বেসরকারী সংস্থা ব্র্যাকের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশে ভারি মোটরযানের চালকদের প্রায় ৬৯ শতাংশই মাদকাসক্ত। বিশেষ করে মহাসড়কে দীর্ঘ রুটে গাড়ি চালানোর সময় অনেক চালকই মাদক গ্রহণ করে থাকে। যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোঃ মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, দুর্ঘটনার বড় অংশ চালকদের মাদকাসক্তির কারণে ঘটে। আমরা প্রকাশ্যে দেখছি রাজধানীর সিটি সার্ভিসের যেসব বাসগুলো রয়েছে সেসব বাসের চালকরাও কিন্তু মাদক গ্রহণ করে। যা মালিকরাও প্রকাশ্যে বিষয়টি স্বীকার করেছেন।

আমরা অবজারভেশন করে দেখেছি, পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন কারণে পরিবহনের চালকরা এই মাদকাসক্তিতে জড়াচ্ছেন। ভয়ঙ্কর বিষয় হচ্ছে পরিবহনের চালকরা মাদকাসক্ত হয়েই গাড়ি চালাচ্ছেন। এজন্যই চালকদের ডোপ টেস্ট সার্বজনীন করতে হবে। সাময়িক লাইসেন্সের বেলায় ডোপ টেস্ট করলেই এ সঙ্কটের নিরসন হবে না। বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে বর্তমানে দেশে ৪০ লাখ ৭২ হাজার ৬১৬টি লাইসেন্স আছে। এর মধ্যে ভারি যান চালানোর লাইসেন্স ১ লাখ ২ হাজার, মাঝারি মানের ১৫ হাজার ৪৭১টি ও হাল্কা যানের লাইসেন্স রয়েছে ১২ লাখ ১ হাজার ৫৬টি। এর মধ্যে অপেশাদার ১০ লাখ। এছাড়া মোটরসাইকেল, থ্রি হুইলার ও অন্যান্য ক্যাটাগরির লাইসেন্স রয়েছে। তাদের মধ্যে কতভাগ মাদকাসক্ত সেটার কোন পরিসংখ্যান নেই সরকারের কোন সংস্থার কাছেই।

এদিকে সরকারী চাকরিজীবীদের বেলায়ও মাদকসক্তি রোধে ডোপ টেস্টের ঘোষণা দেয়া হলেও সেটার বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছে না। বছরখানেক আগে পুলিশের কজনকে ডোপ টেস্ট করার পর একজনের শরীরে মাদক ধরা পড়ার ঘটনায় তোলপাড় দেখা দেয়। তখন সিদ্ধান্ত হয়েছিল পুলিশের প্রতিটি ইউনিটেই চালানো হবে এ টেস্ট। কিন্তুু সেটারও আর কোন অগ্রগতি নেই। অবশ্য সরকারী চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা হয় তাতে মাদক শনাক্ত করার উপায় থাকে। এখন পর্যন্ত নবাগত চাকরিজীবীদের শরীরে মাদকের উপস্থিতি শূন্যের কোঠায় বলে জানা গেছে।