ঢাকা ০৮:২৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৫ অক্টোবর ২০২২, ২০ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

সাশ্রয়ী কর্মসূচির সুফল অধরা!

‘সরকারের সাশ্রয় নীতিতে প্রতিদিন বিদ্যুৎ ব্যবহার সাশ্রয় হচ্ছে ২ হাজার মেগাওয়াট। এর মধ্যে মাত্র ৫০০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করে এবং বাকিটা সম্ভব হচ্ছে এসির ব্যবহার কমানো ও অফিস সময়সূচি পরিবর্তনসহ নানা উদ্যোগের মাধ্যমে।’ -বিদ্যুৎ বিভাগ এ দাবি করলেও শিল্প-কারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক-কর্মকর্তা এবং অর্থনীতিবিদরা ভিন্ন কথা বলছেন। তাদের ভাষ্য, সরকারের কৌশলী ছকে কিছুটা বিদ্যুৎ সাশ্রয় হলেও এর কাঙ্ক্ষিত সুফল অধরাই রয়ে গেছে। উল্টো দেশের সাধারণ মানুষ নতুন ভোগান্তিতে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের নেওয়া ব্যয় সংকোচন নীতির ফলে সরকারের ওপর চাপ কমলেও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। রপ্তানিমুখী শিল্পে উৎপাদন কমে গেছে। এতে একদিকে সংসার খরচ চালাতে নিম্ন মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস উঠেছে, অন্যদিকে দেশের অর্থনীতিতে মন্দাভাব দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সরকারের উচিত হবে, সঠিক নীতিমালার মাধ্যমে অর্থনীতিকে আবার গতিশীল করা।

বিপিডিবি সূত্রে জানা যায়, জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ থেকে আগস্টের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত গত ১ মাস ডিজেলচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ রাখা ও লোডশেডিংয়ের ফলে ৮৫৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয়েছে। কিন্তু ঘাটতি হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের।

শিল্প খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, উৎপাদনমুখী শিল্পগুলো বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। মোট বিদ্যুতের ২৮ দশমিক ৫ ভাগ এ খাতে ব্যবহৃত হয়। সংকটের ফলে শিল্প খাতে উৎপাদন খরচ বেড়েছে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ। পোশাকশিল্পে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে ১১ শতাংশ। ইস্পাত খাতে ৩০ শতাংশ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। সিরামিক কারখানায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে ৩০ শতাংশ।

শিল্প মালিকদের ভাষ্য, অধিক বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে জেনারেটরের ওপর চাপ বাড়ছে। ওয়েস্টেজ বেশি হচ্ছে। প্রতিদিন খরচ বাড়ছে। উৎপাদনের পরিমাণ কমে আসছে। এছাড়া গ্যাস সংকট শিল্প-কারখানার গতি অনেকখানি কমিয়ে দিয়েছে। ফলে নির্ধারিত সময়ে পর্যাপ্ত পরিমাণ পণ্য উৎপাদন করা যাচ্ছে না।

ইনডেট গ্রম্নপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আল শাহরিয়ার আহমেদ জানান, চলমান লোডশেডিং উৎপাদন শিল্পকে কোণঠাসা করে ফেলেছে। তার প্রতিষ্ঠানের জেনারেটর চালানোর মাসিক ডিজেল খরচ বেড়ে ১৮ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। অথচ ২০২১ সালে পুরো এক বছরে এই খরচ হয়েছিল ৩০ লাখ টাকা।

এছাড়া চলমান গ্যাস সংকটও প্রস্তুতকারক শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে চরম অস্বস্তিতে ফেলেছে। গ্যাস সংকটে ভোগা গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের কিছু কিছু টেক্সটাইল ও পোশাক শিল্প কারখানায় উৎপাদন স্থবির হয়ে পড়েছে বলেও জানা গেছে।

ভার্টিক্যাল ওভেন টেক্সটাইল উৎপাদক এন জেড টেক্স গ্রম্নপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সালেউধ জামান জিতু জানান, উৎপাদন বন্ধ থাকলেও মাসে তার প্রতিষ্ঠানের পরিচালন খরচ দাঁড়ায় অন্তত ৩০ কোটি টাকা। অথচ ভয়াবহ গ্যাস সংকটের কারণে তার মাসিক আয় ৬ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।

গ্যাস সংকটের কথা স্বীকার করে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মো. হারুনুর রশিদ জানান, তারা যদি জাতীয় গ্রিড থেকে উচ্চমাত্রায় গ্যাস সরবরাহ পান, কেবল তাহলেই পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। এছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস ব্যবহার কমলেও সংকট কাটবে, যা শুধু শীতকাল আসলেই সম্ভব।

অন্যদিকে কৃষকদের অভিযোগ, আমনের মৌসুমে সেচ সুবিধার জন্য ১৫ দিন মধ্যরাত থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত গ্রামে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের কথা থাকলেও অনেক এলাকাতেই তা মানা হচ্ছে না। দিনে কয়েক দফা লোডশেডিং দেওয়া হলেও মধ্যরাতের পরও একই ঘটনা ঘটছে। এতে আমনের সেচ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়ে কৃষি খাতে বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সরকারের গৃহীত ব্যয় সংকোচন নীতির ফলে জনগণের সুফল সম্পর্কে জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ সেলিম রায়হান বলেন, এতে জনগণের সুফলের চেয়ে ভোগান্তিই বেশি। সরকার লোডশেডিং বা ব্যয় সংকোচন নীতি গ্রহণ করেছে অর্থনীতিকে চাপের মুখ থেকে বাঁচাতে। তবে এতে সরকারের চাপ কমলেও জনগণের ওপর চাপ বেড়ে গেছে।

দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতি বেড়ে গেছে উলেস্নখ করে তিনি আরও বলেন, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান কমে গেছে। লোডশেডিংয়ের ফলে রপ্তানিমুখী শিল্প কমে গেছে, যা অর্থনীতির একটি বড় চালিকাশক্তি।

এদিকে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে দেশের সব সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও আধাস্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের সময়সূচি পরিবর্তন এবং কর্মসময় এক ঘণ্টা কমিয়ে আনা হলেও এ ব্যাপারে তদারকি না থাকায় উলেস্নখযোগ্য সুফল যে পাওয়া যায়নি এ চিত্র অনেকটাই স্পষ্ট। উল্টো এ ক্ষেত্রে লোকসানের পালস্না আরও ভারী হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অফিস-আদালত একই সময় শুরু হওয়ায় পরিবহণ খরচ ও যানজট বৃদ্ধিসহ নানা ভোগান্তি বেড়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত অফিস সকাল আটটায় শুরুর সরকারি নির্দেশনা থাকলেও অনেক প্রতিষ্ঠানেই বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে আসছেন না। কর্মকর্তারা অফিসে না থাকলেও সকাল ৮টা থেকেই বেশিরভাগ কক্ষেই চলছে এসি, জ্বলছে বাতি, ঘুরছে ফ্যানও। একাধিক ইলেক্ট্রনিক্স ও প্রিন্ট মিডিয়া সরেজমিন বিভিন্ন অফিস ঘুরে এ ব্যাপারে সংবাদ প্রচার-প্রকাশ করলেও অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের এ ব্যাপারে গৃহীত পদক্ষেপও অনেকটা দায়সারা গোছের।

সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশনের সরেজমিন প্রতিবেদনে দেখানো হয়, ৬ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৮টাতেও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কার্যালয়ের অধিকাংশ কর্মকর্তা কর্মস্থলে অনুপস্থিত। প্রধান প্রকৌশলীর চেয়ার ফাঁকা থাকলেও চলছে এসি, জ্বলছে বাতি। তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ছুটিতে থাকলেও তার কক্ষেও একই অবস্থা। সময়মতো অফিসে না আসলেও প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তার কক্ষের এসি-লাইট-ফ্যান সবই ছিল চালু।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অবস্থাও একই রকম। সেখানেও অধিকাংশ কর্মকর্তা নির্ধারিত সময়ে অফিসে আসছেন না। অথচ বিভিন্ন রুমে বাতিসহ বৈদ্যুতিক অন্যান্য সরঞ্জাম ঠিকই সকাল ৮টা থেকেই চালু রাখা হচ্ছে। এ নিয়ে প্রশ্ন করলে অফিসে উপস্থিত পিওন-ক্লিনারসহ নিম্নস্তরের কর্মচারীরা জানান, রুম সারারাত বন্ধ থাকায় ভেতরে গুমটভাব তৈরি হয়েছে। এ জন্যই আগে থেকেই ফ্যান-এসি চালু রাখা হয়েছে।

তবে সরকারি সিদ্ধান্ত না মানা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মন্ত্রিপরিষদ সচিব কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেন, আটটার মধ্যে অফিসে আসতে হবে এবং তিনটার আগে কেউ অফিস থেকে বের হতে পারবেন না। নির্ধারিত সময়ে অফিসে আসা ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে একযোগে কাজ করার আহ্বানও জানান তিনি।

এদিকে শুধু সরকারি-আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও আধাস্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানেই নয়, ব্যক্তি মালিকানাধীন অফিসেও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। মার্কেট-শপিং মল-বিপণি বিতানসহ পাড়া-মহলস্নার দোকানপাটে আগের মতোই দিনে-রাতে ডজন ডজন বাতি জ্বলছে। বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে এসির ব্যবহারও কমেনি। রাত ৮টায় দোকানপাট বন্ধের সরকারি নির্দেশনা মানছে না অনেকেই। অথচ এসবের তদারকি আগের মতোই দায়সারাভাবে চলছে।

যদিও বিদ্যুৎ বিভাগ এসব ব্যাপারে গুরুত্ব না দিয়ে ২০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের হিসাব দেখিয়ে আত্মতুষ্টিতে ভুগছে। সংশ্লিষ্ট খাতের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দাবি, গত জুলাইয়ে যখন লোডশেডিং কার্যক্রম শুরু হয়, তখন দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল প্রতিদিন সাড়ে ১৫ হাজার মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ বিভাগের পরিকল্পনা ছিল, প্রতিদিন ২ হাজার মেগাওয়াট করে বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা হবে। অর্থাৎ প্রতিদিন ১৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে বাকি ২ হাজার মেগাওয়াট সাশ্রয় করা হবে। এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে প্রতিদিন দেশব্যাপী ১ থেকে ২ ঘণ্টা করে লোডশেডিং, এসির ব্যবহার কমানো, দিনের আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে অফিস সময় কমানো ও এগিয়ে আনা হয়।

বিদ্যুৎ বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১১ সেপ্টেম্বর সারা দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ১২৭ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে উৎপাদন করা হয়েছে ১৩ হাজার ৮শ’ মেগাওয়াট। সে হিসেবে ওইদিন সারা দেশে লোডশেডিং হয়েছে মাত্র ৩২৭ মেগাওয়াট। বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের (পিডিবি) হিসেবে শুধু এদিনই নয়, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিনই ১ হাজার ৭শ’ থেকে কম বেশি ২ হাজার মেগাওয়াট করে সাশ্রয় হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও উৎপাদনের সঙ্গে চাহিদার ২ হাজার মেগাওয়াট গ্যাপ রাখা হচ্ছে। প্রাথমিক পর্যায়ে পরিকল্পনা ছিল ১ হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং এবং ১ হাজার মেগাওয়াট সাশ্রয় করা। তবে শুরুর দিকে তা সম্ভব হয়নি। কেননা, সাশ্রয়ী কর্মসূচি ঘোষণার পরপরই গ্রাহকরা সচেতনতার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেনি। এজন্য ওই কর্মসূচিতে মাত্র ৫০০ মেগাওয়াট সাশ্রয় হচ্ছে। ফলে লোডশেডিং করে ১ হাজারের বদলে ১৫০০ মেগাওয়াট বা তার বেশি সাশ্রয় করা হচ্ছে।

এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু এসি-ফ্যান-লাইটের ব্যবহার কমিয়েই বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে আশানুরূপ সাফল্য পাওয়া যাবে না। এ জন্য সাশ্রয়ী বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদিও ব্যবহার করতে হবে। টিউব লাইটে ভালো মানের ইলেক্ট্রনিক্স ব্যালেস্ট, ফ্যানে ইলেক্ট্রনিক্স রেগুলেটর ব্যবহার করলে বিদ্যুৎ কম খরচ হবে। এনার্জি সেভার বাল্ব ব্যবহারে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করা জরুরি। এছাড়া দেশে নিম্নমানের ফ্যান, চার্জার লাইট, সুইচ, ফ্যানের ক্যাপাসিটর, গিজার ও আয়রনসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম উৎপাদন এবং আমদানি করা হচ্ছে। যা বিদ্যুতের খরচ বাড়াচ্ছে। এ ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে।

Tag :

কালীগঞ্জে মায়ের শাড়ি গলায় পেঁচিয়ে ছেলের আত্মহত্যা

সাশ্রয়ী কর্মসূচির সুফল অধরা!

প্রকাশের সময় : ০৯:৫৮:১৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২২

‘সরকারের সাশ্রয় নীতিতে প্রতিদিন বিদ্যুৎ ব্যবহার সাশ্রয় হচ্ছে ২ হাজার মেগাওয়াট। এর মধ্যে মাত্র ৫০০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করে এবং বাকিটা সম্ভব হচ্ছে এসির ব্যবহার কমানো ও অফিস সময়সূচি পরিবর্তনসহ নানা উদ্যোগের মাধ্যমে।’ -বিদ্যুৎ বিভাগ এ দাবি করলেও শিল্প-কারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক-কর্মকর্তা এবং অর্থনীতিবিদরা ভিন্ন কথা বলছেন। তাদের ভাষ্য, সরকারের কৌশলী ছকে কিছুটা বিদ্যুৎ সাশ্রয় হলেও এর কাঙ্ক্ষিত সুফল অধরাই রয়ে গেছে। উল্টো দেশের সাধারণ মানুষ নতুন ভোগান্তিতে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের নেওয়া ব্যয় সংকোচন নীতির ফলে সরকারের ওপর চাপ কমলেও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। রপ্তানিমুখী শিল্পে উৎপাদন কমে গেছে। এতে একদিকে সংসার খরচ চালাতে নিম্ন মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস উঠেছে, অন্যদিকে দেশের অর্থনীতিতে মন্দাভাব দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সরকারের উচিত হবে, সঠিক নীতিমালার মাধ্যমে অর্থনীতিকে আবার গতিশীল করা।

বিপিডিবি সূত্রে জানা যায়, জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ থেকে আগস্টের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত গত ১ মাস ডিজেলচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ রাখা ও লোডশেডিংয়ের ফলে ৮৫৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয়েছে। কিন্তু ঘাটতি হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের।

শিল্প খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, উৎপাদনমুখী শিল্পগুলো বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। মোট বিদ্যুতের ২৮ দশমিক ৫ ভাগ এ খাতে ব্যবহৃত হয়। সংকটের ফলে শিল্প খাতে উৎপাদন খরচ বেড়েছে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ। পোশাকশিল্পে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে ১১ শতাংশ। ইস্পাত খাতে ৩০ শতাংশ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। সিরামিক কারখানায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে ৩০ শতাংশ।

শিল্প মালিকদের ভাষ্য, অধিক বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে জেনারেটরের ওপর চাপ বাড়ছে। ওয়েস্টেজ বেশি হচ্ছে। প্রতিদিন খরচ বাড়ছে। উৎপাদনের পরিমাণ কমে আসছে। এছাড়া গ্যাস সংকট শিল্প-কারখানার গতি অনেকখানি কমিয়ে দিয়েছে। ফলে নির্ধারিত সময়ে পর্যাপ্ত পরিমাণ পণ্য উৎপাদন করা যাচ্ছে না।

ইনডেট গ্রম্নপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আল শাহরিয়ার আহমেদ জানান, চলমান লোডশেডিং উৎপাদন শিল্পকে কোণঠাসা করে ফেলেছে। তার প্রতিষ্ঠানের জেনারেটর চালানোর মাসিক ডিজেল খরচ বেড়ে ১৮ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। অথচ ২০২১ সালে পুরো এক বছরে এই খরচ হয়েছিল ৩০ লাখ টাকা।

এছাড়া চলমান গ্যাস সংকটও প্রস্তুতকারক শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে চরম অস্বস্তিতে ফেলেছে। গ্যাস সংকটে ভোগা গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের কিছু কিছু টেক্সটাইল ও পোশাক শিল্প কারখানায় উৎপাদন স্থবির হয়ে পড়েছে বলেও জানা গেছে।

ভার্টিক্যাল ওভেন টেক্সটাইল উৎপাদক এন জেড টেক্স গ্রম্নপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সালেউধ জামান জিতু জানান, উৎপাদন বন্ধ থাকলেও মাসে তার প্রতিষ্ঠানের পরিচালন খরচ দাঁড়ায় অন্তত ৩০ কোটি টাকা। অথচ ভয়াবহ গ্যাস সংকটের কারণে তার মাসিক আয় ৬ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।

গ্যাস সংকটের কথা স্বীকার করে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মো. হারুনুর রশিদ জানান, তারা যদি জাতীয় গ্রিড থেকে উচ্চমাত্রায় গ্যাস সরবরাহ পান, কেবল তাহলেই পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। এছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস ব্যবহার কমলেও সংকট কাটবে, যা শুধু শীতকাল আসলেই সম্ভব।

অন্যদিকে কৃষকদের অভিযোগ, আমনের মৌসুমে সেচ সুবিধার জন্য ১৫ দিন মধ্যরাত থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত গ্রামে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের কথা থাকলেও অনেক এলাকাতেই তা মানা হচ্ছে না। দিনে কয়েক দফা লোডশেডিং দেওয়া হলেও মধ্যরাতের পরও একই ঘটনা ঘটছে। এতে আমনের সেচ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়ে কৃষি খাতে বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সরকারের গৃহীত ব্যয় সংকোচন নীতির ফলে জনগণের সুফল সম্পর্কে জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ সেলিম রায়হান বলেন, এতে জনগণের সুফলের চেয়ে ভোগান্তিই বেশি। সরকার লোডশেডিং বা ব্যয় সংকোচন নীতি গ্রহণ করেছে অর্থনীতিকে চাপের মুখ থেকে বাঁচাতে। তবে এতে সরকারের চাপ কমলেও জনগণের ওপর চাপ বেড়ে গেছে।

দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতি বেড়ে গেছে উলেস্নখ করে তিনি আরও বলেন, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান কমে গেছে। লোডশেডিংয়ের ফলে রপ্তানিমুখী শিল্প কমে গেছে, যা অর্থনীতির একটি বড় চালিকাশক্তি।

এদিকে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে দেশের সব সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও আধাস্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের সময়সূচি পরিবর্তন এবং কর্মসময় এক ঘণ্টা কমিয়ে আনা হলেও এ ব্যাপারে তদারকি না থাকায় উলেস্নখযোগ্য সুফল যে পাওয়া যায়নি এ চিত্র অনেকটাই স্পষ্ট। উল্টো এ ক্ষেত্রে লোকসানের পালস্না আরও ভারী হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অফিস-আদালত একই সময় শুরু হওয়ায় পরিবহণ খরচ ও যানজট বৃদ্ধিসহ নানা ভোগান্তি বেড়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত অফিস সকাল আটটায় শুরুর সরকারি নির্দেশনা থাকলেও অনেক প্রতিষ্ঠানেই বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে আসছেন না। কর্মকর্তারা অফিসে না থাকলেও সকাল ৮টা থেকেই বেশিরভাগ কক্ষেই চলছে এসি, জ্বলছে বাতি, ঘুরছে ফ্যানও। একাধিক ইলেক্ট্রনিক্স ও প্রিন্ট মিডিয়া সরেজমিন বিভিন্ন অফিস ঘুরে এ ব্যাপারে সংবাদ প্রচার-প্রকাশ করলেও অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের এ ব্যাপারে গৃহীত পদক্ষেপও অনেকটা দায়সারা গোছের।

সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশনের সরেজমিন প্রতিবেদনে দেখানো হয়, ৬ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৮টাতেও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কার্যালয়ের অধিকাংশ কর্মকর্তা কর্মস্থলে অনুপস্থিত। প্রধান প্রকৌশলীর চেয়ার ফাঁকা থাকলেও চলছে এসি, জ্বলছে বাতি। তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ছুটিতে থাকলেও তার কক্ষেও একই অবস্থা। সময়মতো অফিসে না আসলেও প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তার কক্ষের এসি-লাইট-ফ্যান সবই ছিল চালু।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অবস্থাও একই রকম। সেখানেও অধিকাংশ কর্মকর্তা নির্ধারিত সময়ে অফিসে আসছেন না। অথচ বিভিন্ন রুমে বাতিসহ বৈদ্যুতিক অন্যান্য সরঞ্জাম ঠিকই সকাল ৮টা থেকেই চালু রাখা হচ্ছে। এ নিয়ে প্রশ্ন করলে অফিসে উপস্থিত পিওন-ক্লিনারসহ নিম্নস্তরের কর্মচারীরা জানান, রুম সারারাত বন্ধ থাকায় ভেতরে গুমটভাব তৈরি হয়েছে। এ জন্যই আগে থেকেই ফ্যান-এসি চালু রাখা হয়েছে।

তবে সরকারি সিদ্ধান্ত না মানা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মন্ত্রিপরিষদ সচিব কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেন, আটটার মধ্যে অফিসে আসতে হবে এবং তিনটার আগে কেউ অফিস থেকে বের হতে পারবেন না। নির্ধারিত সময়ে অফিসে আসা ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে একযোগে কাজ করার আহ্বানও জানান তিনি।

এদিকে শুধু সরকারি-আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও আধাস্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানেই নয়, ব্যক্তি মালিকানাধীন অফিসেও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। মার্কেট-শপিং মল-বিপণি বিতানসহ পাড়া-মহলস্নার দোকানপাটে আগের মতোই দিনে-রাতে ডজন ডজন বাতি জ্বলছে। বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে এসির ব্যবহারও কমেনি। রাত ৮টায় দোকানপাট বন্ধের সরকারি নির্দেশনা মানছে না অনেকেই। অথচ এসবের তদারকি আগের মতোই দায়সারাভাবে চলছে।

যদিও বিদ্যুৎ বিভাগ এসব ব্যাপারে গুরুত্ব না দিয়ে ২০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের হিসাব দেখিয়ে আত্মতুষ্টিতে ভুগছে। সংশ্লিষ্ট খাতের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দাবি, গত জুলাইয়ে যখন লোডশেডিং কার্যক্রম শুরু হয়, তখন দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল প্রতিদিন সাড়ে ১৫ হাজার মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ বিভাগের পরিকল্পনা ছিল, প্রতিদিন ২ হাজার মেগাওয়াট করে বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা হবে। অর্থাৎ প্রতিদিন ১৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে বাকি ২ হাজার মেগাওয়াট সাশ্রয় করা হবে। এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে প্রতিদিন দেশব্যাপী ১ থেকে ২ ঘণ্টা করে লোডশেডিং, এসির ব্যবহার কমানো, দিনের আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে অফিস সময় কমানো ও এগিয়ে আনা হয়।

বিদ্যুৎ বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১১ সেপ্টেম্বর সারা দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ১২৭ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে উৎপাদন করা হয়েছে ১৩ হাজার ৮শ’ মেগাওয়াট। সে হিসেবে ওইদিন সারা দেশে লোডশেডিং হয়েছে মাত্র ৩২৭ মেগাওয়াট। বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের (পিডিবি) হিসেবে শুধু এদিনই নয়, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিনই ১ হাজার ৭শ’ থেকে কম বেশি ২ হাজার মেগাওয়াট করে সাশ্রয় হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও উৎপাদনের সঙ্গে চাহিদার ২ হাজার মেগাওয়াট গ্যাপ রাখা হচ্ছে। প্রাথমিক পর্যায়ে পরিকল্পনা ছিল ১ হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং এবং ১ হাজার মেগাওয়াট সাশ্রয় করা। তবে শুরুর দিকে তা সম্ভব হয়নি। কেননা, সাশ্রয়ী কর্মসূচি ঘোষণার পরপরই গ্রাহকরা সচেতনতার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেনি। এজন্য ওই কর্মসূচিতে মাত্র ৫০০ মেগাওয়াট সাশ্রয় হচ্ছে। ফলে লোডশেডিং করে ১ হাজারের বদলে ১৫০০ মেগাওয়াট বা তার বেশি সাশ্রয় করা হচ্ছে।

এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু এসি-ফ্যান-লাইটের ব্যবহার কমিয়েই বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে আশানুরূপ সাফল্য পাওয়া যাবে না। এ জন্য সাশ্রয়ী বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদিও ব্যবহার করতে হবে। টিউব লাইটে ভালো মানের ইলেক্ট্রনিক্স ব্যালেস্ট, ফ্যানে ইলেক্ট্রনিক্স রেগুলেটর ব্যবহার করলে বিদ্যুৎ কম খরচ হবে। এনার্জি সেভার বাল্ব ব্যবহারে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করা জরুরি। এছাড়া দেশে নিম্নমানের ফ্যান, চার্জার লাইট, সুইচ, ফ্যানের ক্যাপাসিটর, গিজার ও আয়রনসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম উৎপাদন এবং আমদানি করা হচ্ছে। যা বিদ্যুতের খরচ বাড়াচ্ছে। এ ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে।