ঢাকা ০১:২২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৭ অক্টোবর ২০২২, ২২ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

দুর্ঘটনা কমেছে ভয়াবহতা কমেনি

শিল্প-কারখানায় দুর্ঘটনার সংখ্যা কমেছে পরিসংখ্যান এই সাক্ষ্য দিচ্ছে। কিন্তু দুর্ঘটনার ভয়াবহতার কথা পরিসংখ্যান বলছে না। দুর্ঘটনার ভয়াবহতার গভীর ছাপ পাওয়া যায় বেঁচে যাওয়া শ্রমিকের জীবনে, কখনো কারখানা-মালিকের দেউলিয়া হয়ে পড়ার উপাখ্যানে।

হাসেম ফুডের কারখানায় অগ্নিকান্ড সরকারি পরিসংখ্যানে নেহাত একটি ঘটনা মাত্র। কিন্তু ৫২ শ্রমিকের মৃত্যু এবং শত শত শ্রমিকের আহত হওয়ার তথ্যে বোঝা যায়, এই ঘটনার গভীরতা কতখানি। সরকারের পরিসংখ্যান বলছে, গত চার বছরে শিল্প-কারখানায় দুর্ঘটনা কমেছে। আহত ও নিহতের সংখ্যা একেক সময় একেক রকম কখনো বাড়ে আবার কখনো কমে। ২০১৮-১৯ সালে দুর্ঘটনা ঘটেছে ৮৮টি। পরের বছর ৫৯টি। এর পরের বছর ৫৪টি। গত বছর এই সংখ্যা কমে হয়েছে ৪৫টি। ২০২১ সালে বেসরকারি সংস্থা সেইফটি অ্যান্ড রাইটস জানায়, গত ১০ বছরে পোশাক খাতের বাইরে শিল্প-কারখানায় ৪৫৩টি অগ্নিকা- এবং দুর্ঘটনায় অন্তত ৬৯৭ শ্রমিক মারা গেছেন।

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক মো. নাসির উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমরা নানা উদ্যোগ নিচ্ছি। এতে কারখানা-মালিক ও শ্রমিক উভয়ের সচেতনতা বাড়ছে। পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট চালু হলে পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে।’

মৃত্যুর হিসাবে গত এক দশকে তাজরীন ফ্যাশনসের পর সবচেয়ে বড় শিল্প-দুর্ঘটনা হলো হাসেম ফুডস লিমিটেডের কারখানার অগ্নিকান্ড। ক্রেতাদের চাপে সরকারের নানা উদ্যোগ দেখা যায় ২০১২ সালে তাজরীন ফ্যাশনসের আগুন এবং পরের বছর রানা প্লাজা ধসের পর থেকে। এসব উদ্যোগে রপ্তানিমুখী কারখানাগুলোর মালিকদের সঙ্গে অ্যাকর্ড অ্যালায়েন্স এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর একত্রে কাজ করেছে।

রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর পোশাক-কারখানার পরিবেশ ও ভবনের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ হলেও শিল্প-কারখানার নিরাপত্তা নিয়ে খুব একটা কাজ হয়নি বলে অভিযোগ শ্রমিক অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ও অধিকারকর্মীদের।

সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সভাপতি রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, ‘দুর্ঘটনা কমার সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই। অনেক দুর্ঘটনার খবর সরকারের রেকর্ড বইয়ে স্থান পায় না বা দপ্তরে পৌঁছায় না। তবে এটা ঠিক, গার্মেন্ট-কারখানায় দুর্ঘটনার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কমেছে। এর কারণ হচ্ছে অ্যাকর্ড অ্যালায়েন্সের উদ্যোগ। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্য ক্রেতাদের চাপে গার্মেন্ট-কারখানায় কম্পøায়েন্স করায় দুর্ঘটনা কিছু কমেছে। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের আওতা শুধু গার্মেন্ট-কারখানায় নয়। প্রায় দুই লাখ ছোট বড় প্রতিষ্ঠান আছে, সেসব অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণের আওতায় নেই। লেদ মেশিন, রি-রোলিং মেশিন, কেমিক্যাল কারখানা, কেমিক্যাল গোডাউন, শিপব্রেকিং শিল্প এসবে দুর্ঘটনার পরিমাণ ও ভয়াবহতা দুটোই বাড়ছে।’

রাজেকুজ্জামান রতন আরও বলেন, ‘বিএম কন্টেইনার থেকে শুরু করে নারায়ণগঞ্জের হাসেম ফুডের অগ্নিকা- দেখিয়ে দিল, কতটা ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে শ্রমিকরা কাজ করছে। যারা তদারকির দায়িত্বে, অর্থাৎ কলকারখানা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর গৎবাঁধা অজুহাত দেখায়। জনবল বা প্রশিক্ষণ নেই একই কথা বলে তারা।’

শিল্প ও শ্রম সেক্টরের সরকারি নীতিনির্ধারক কর্মকর্তারা মনে করেন, পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি মাল্টি সেক্টরাল ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। কর্মস্থলে দুর্ঘটনায় শ্রমিক-পরিবারে দুর্ভোগ নেমে আসে। অন্যদিকে দুর্ঘটনার কারণে শ্রমিক কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকে ও প্রতিষ্ঠানের ব্যয় বাড়ে। নতুন শ্রমিক-নিয়োগের ফলে প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ক্ষমতা কমে। কাজেই নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও শ্রমিকের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা সব পক্ষের জন্যই কল্যাণকর। অধিকাংশ পেশাগত দুর্ঘটনা ও মৃত্যু এড়ানো সম্ভব, যদি নিয়োগকর্তা ও শ্রমিকরা পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেইফটি ঝুঁকি সম্পর্কে সজাগ থাকে।

আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকতে হলে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সঙ্গে কর্মস্থলের নিরাপত্তা জড়িত। শ্রমিকের অসুস্থতা, দুর্ঘটনায় শ্রমিকের মৃত্যু বা জখম হওয়ার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হয়। এর প্রভাব পড়ে পুরো অর্থনীতির ওপর।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা পুরনো বিষয় হলেও আমাদের দেশে নতুন। তবে এটি এদেশের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে শিল্পক্ষেত্রে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন খাতে শ্রমিক প্রতিনিয়ত বাড়ছে। অগ্নিকান্ড, ভবনধসসহ বিভিন্ন দুর্ঘটনাও ঘটছে পাল্লা দিয়ে। পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও দেশে এ বিষয়ে গবেষণা ও প্রশিক্ষণের জন্য কোনো বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান বা একাডেমি নেই।

সরকারি কোনো প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নেই যেখান থেকে শ্রমিক বা কারখানা-মালিক নিরাপত্তার বিষয়টি জানতে পারেন। এ নিয়ে গবেষণাও নেই। বেসরকারি কিছু সংস্থা এ নিয়ে কাজ করলেও সরকারের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। এখন একটি প্রকল্পের আওতায় সরকার জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষণা এবং প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট স্থাপন করছে। এই সংস্থা পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা কাজের তত্ত্বাবধান করবে। কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তাসংক্রান্ত মান নির্ধারণ, দুর্ঘটনার ওপর গবেষণা এবং তা রোধে সুপারিশ করা হবে এই সংস্থার প্রধান কাজ। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেবে এ সংস্থা। ডিপ্লোমা ও সার্টিফিকেট কোর্স পরিচালনা করবে সংস্থাটি।

এ ধরনের গবেষণা এবং প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট কেন একটি অধিদপ্তরের অধীনে করা হচ্ছে জানতে চাইলে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর বা শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কোনো কর্মকর্তা আনুষ্ঠানিকভাবে মন্তব্য করতে চাননি। তবে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের এই সংক্রান্ত প্রকল্পের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের আইনানুগ অধিকার ও পেশাগত নিরাপত্তা নিয়ে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর কাজ করে। তাই এই অধিদপ্তরের অধীনেই পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা যুক্তিসংগত।

পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট স্থাপন প্রকল্পের পরিচালক ফরিদ আহাম্মদ জানান, ‘রাজশাহীতে ৫ একর জায়গার ওপর একটি একাডেমিক ভবন, ছয়তলা দুটি হোস্টেল, একটি করে টিচার্স স্টাফ ডরমিটরি এবং ইনস্টিটিউট প্রধানের বাংলোর নির্মাণকাজ চলছে। প্রকল্পের জন্য প্রথমে বরাদ্দ ছিল ১৬৫ কোটি টাকা। পরে কমিয়ে ১৪১ কোটি টাকা করা হয়েছে। সরকারের সাশ্রয়নীতির কারণে আমরা প্রকল্পের খরচ ১১১ কোটি টাকার মধ্যে রাখতে চাই।’

পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষণা এবং প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট বিশেষায়িত হতে হবে কেন জানতে চাইলে শ্রমিক নেতারা বলেন, ‘কেমিক্যাল কারখানার পেশাগত সমস্যা বা পোশাক-কারখানায় অতি উজ্জ্বল আলোতে কাজের সমস্যা, কারখানার অতিশব্দে কাজ করলে কী হয় বা শিপব্রেকিং শিল্পে কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়, পরিবহন শ্রমিকদের ধুলাবালিতে কাজ করার ঝুঁকি কীএসব বিষয়ে গবেষণা হওয়া উচিত। কারখানা নির্মাণের ক্ষেত্রে আলো, আর্দ্রতা, তাপের প্রভাব কী, দীর্ঘ সময় একই ধরনের কাজ করতে গিয়ে সমস্যা কী হয়, টানা বসে থাকার বা টানা দাঁড়িয়ে থাকার কাজ করলে কী হয় এসব নিয়ে গবেষণার বিকল্প নেই। একেকটা পেশার কাজের একেকটা ধরন আছে। শরীরে বিশেষ ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে। এসব নিয়ে গবেষণা হওয়া দরকার। বিষয়গুলো আমলে নিতে হবে। দুই ধরনের ব্যবস্থা নিতে হবে। এক. প্রিভেনশন বা প্রতিরোধ এবং দুই. চিকিৎসা বা পুনর্বাসন। দুর্ঘটনা ঘটলে শ্রমিক আনকিউরেবল কন্ডিশনে চলে গেলে তখন ক্ষতিপূরণ কী হবে এবং কীভাবে পাবেতার স্পষ্ট গাইডলাইন থাকতে হবে। উচ্চতর গবেষণা ও দায়িত্বসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান হওয়ায় অবয়বের দিক থেকেও এটিকে বড় করা দরকার। সংস্থাটির স্বাধীনভাবে কাজের এখতিয়ার না থাকলে এসব কাজ করা সম্ভব নয়।’

রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, ‘সরকারের ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিলেশন ইনস্টিটিউট (আইআরআই) বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে। করার সময় বলা হলো এটা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান হবে। তারা পেশাগত স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করবে। আইআরআইয়ের মতো পেশাগত স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট করা হচ্ছে। অথচ হওয়া উচিত বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান। স্বাধীন প্রতিষ্ঠান না হলে তা ফরমায়েশি কাজ করবে।

Tag :

বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

দুর্ঘটনা কমেছে ভয়াবহতা কমেনি

প্রকাশের সময় : ০৯:৫৮:১৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২২

শিল্প-কারখানায় দুর্ঘটনার সংখ্যা কমেছে পরিসংখ্যান এই সাক্ষ্য দিচ্ছে। কিন্তু দুর্ঘটনার ভয়াবহতার কথা পরিসংখ্যান বলছে না। দুর্ঘটনার ভয়াবহতার গভীর ছাপ পাওয়া যায় বেঁচে যাওয়া শ্রমিকের জীবনে, কখনো কারখানা-মালিকের দেউলিয়া হয়ে পড়ার উপাখ্যানে।

হাসেম ফুডের কারখানায় অগ্নিকান্ড সরকারি পরিসংখ্যানে নেহাত একটি ঘটনা মাত্র। কিন্তু ৫২ শ্রমিকের মৃত্যু এবং শত শত শ্রমিকের আহত হওয়ার তথ্যে বোঝা যায়, এই ঘটনার গভীরতা কতখানি। সরকারের পরিসংখ্যান বলছে, গত চার বছরে শিল্প-কারখানায় দুর্ঘটনা কমেছে। আহত ও নিহতের সংখ্যা একেক সময় একেক রকম কখনো বাড়ে আবার কখনো কমে। ২০১৮-১৯ সালে দুর্ঘটনা ঘটেছে ৮৮টি। পরের বছর ৫৯টি। এর পরের বছর ৫৪টি। গত বছর এই সংখ্যা কমে হয়েছে ৪৫টি। ২০২১ সালে বেসরকারি সংস্থা সেইফটি অ্যান্ড রাইটস জানায়, গত ১০ বছরে পোশাক খাতের বাইরে শিল্প-কারখানায় ৪৫৩টি অগ্নিকা- এবং দুর্ঘটনায় অন্তত ৬৯৭ শ্রমিক মারা গেছেন।

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক মো. নাসির উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমরা নানা উদ্যোগ নিচ্ছি। এতে কারখানা-মালিক ও শ্রমিক উভয়ের সচেতনতা বাড়ছে। পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট চালু হলে পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে।’

মৃত্যুর হিসাবে গত এক দশকে তাজরীন ফ্যাশনসের পর সবচেয়ে বড় শিল্প-দুর্ঘটনা হলো হাসেম ফুডস লিমিটেডের কারখানার অগ্নিকান্ড। ক্রেতাদের চাপে সরকারের নানা উদ্যোগ দেখা যায় ২০১২ সালে তাজরীন ফ্যাশনসের আগুন এবং পরের বছর রানা প্লাজা ধসের পর থেকে। এসব উদ্যোগে রপ্তানিমুখী কারখানাগুলোর মালিকদের সঙ্গে অ্যাকর্ড অ্যালায়েন্স এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর একত্রে কাজ করেছে।

রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর পোশাক-কারখানার পরিবেশ ও ভবনের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ হলেও শিল্প-কারখানার নিরাপত্তা নিয়ে খুব একটা কাজ হয়নি বলে অভিযোগ শ্রমিক অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ও অধিকারকর্মীদের।

সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সভাপতি রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, ‘দুর্ঘটনা কমার সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই। অনেক দুর্ঘটনার খবর সরকারের রেকর্ড বইয়ে স্থান পায় না বা দপ্তরে পৌঁছায় না। তবে এটা ঠিক, গার্মেন্ট-কারখানায় দুর্ঘটনার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কমেছে। এর কারণ হচ্ছে অ্যাকর্ড অ্যালায়েন্সের উদ্যোগ। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্য ক্রেতাদের চাপে গার্মেন্ট-কারখানায় কম্পøায়েন্স করায় দুর্ঘটনা কিছু কমেছে। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের আওতা শুধু গার্মেন্ট-কারখানায় নয়। প্রায় দুই লাখ ছোট বড় প্রতিষ্ঠান আছে, সেসব অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণের আওতায় নেই। লেদ মেশিন, রি-রোলিং মেশিন, কেমিক্যাল কারখানা, কেমিক্যাল গোডাউন, শিপব্রেকিং শিল্প এসবে দুর্ঘটনার পরিমাণ ও ভয়াবহতা দুটোই বাড়ছে।’

রাজেকুজ্জামান রতন আরও বলেন, ‘বিএম কন্টেইনার থেকে শুরু করে নারায়ণগঞ্জের হাসেম ফুডের অগ্নিকা- দেখিয়ে দিল, কতটা ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে শ্রমিকরা কাজ করছে। যারা তদারকির দায়িত্বে, অর্থাৎ কলকারখানা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর গৎবাঁধা অজুহাত দেখায়। জনবল বা প্রশিক্ষণ নেই একই কথা বলে তারা।’

শিল্প ও শ্রম সেক্টরের সরকারি নীতিনির্ধারক কর্মকর্তারা মনে করেন, পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি মাল্টি সেক্টরাল ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। কর্মস্থলে দুর্ঘটনায় শ্রমিক-পরিবারে দুর্ভোগ নেমে আসে। অন্যদিকে দুর্ঘটনার কারণে শ্রমিক কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকে ও প্রতিষ্ঠানের ব্যয় বাড়ে। নতুন শ্রমিক-নিয়োগের ফলে প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ক্ষমতা কমে। কাজেই নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও শ্রমিকের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা সব পক্ষের জন্যই কল্যাণকর। অধিকাংশ পেশাগত দুর্ঘটনা ও মৃত্যু এড়ানো সম্ভব, যদি নিয়োগকর্তা ও শ্রমিকরা পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেইফটি ঝুঁকি সম্পর্কে সজাগ থাকে।

আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকতে হলে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সঙ্গে কর্মস্থলের নিরাপত্তা জড়িত। শ্রমিকের অসুস্থতা, দুর্ঘটনায় শ্রমিকের মৃত্যু বা জখম হওয়ার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হয়। এর প্রভাব পড়ে পুরো অর্থনীতির ওপর।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা পুরনো বিষয় হলেও আমাদের দেশে নতুন। তবে এটি এদেশের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে শিল্পক্ষেত্রে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন খাতে শ্রমিক প্রতিনিয়ত বাড়ছে। অগ্নিকান্ড, ভবনধসসহ বিভিন্ন দুর্ঘটনাও ঘটছে পাল্লা দিয়ে। পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও দেশে এ বিষয়ে গবেষণা ও প্রশিক্ষণের জন্য কোনো বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান বা একাডেমি নেই।

সরকারি কোনো প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নেই যেখান থেকে শ্রমিক বা কারখানা-মালিক নিরাপত্তার বিষয়টি জানতে পারেন। এ নিয়ে গবেষণাও নেই। বেসরকারি কিছু সংস্থা এ নিয়ে কাজ করলেও সরকারের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। এখন একটি প্রকল্পের আওতায় সরকার জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষণা এবং প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট স্থাপন করছে। এই সংস্থা পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা কাজের তত্ত্বাবধান করবে। কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তাসংক্রান্ত মান নির্ধারণ, দুর্ঘটনার ওপর গবেষণা এবং তা রোধে সুপারিশ করা হবে এই সংস্থার প্রধান কাজ। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেবে এ সংস্থা। ডিপ্লোমা ও সার্টিফিকেট কোর্স পরিচালনা করবে সংস্থাটি।

এ ধরনের গবেষণা এবং প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট কেন একটি অধিদপ্তরের অধীনে করা হচ্ছে জানতে চাইলে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর বা শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কোনো কর্মকর্তা আনুষ্ঠানিকভাবে মন্তব্য করতে চাননি। তবে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের এই সংক্রান্ত প্রকল্পের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের আইনানুগ অধিকার ও পেশাগত নিরাপত্তা নিয়ে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর কাজ করে। তাই এই অধিদপ্তরের অধীনেই পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা যুক্তিসংগত।

পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট স্থাপন প্রকল্পের পরিচালক ফরিদ আহাম্মদ জানান, ‘রাজশাহীতে ৫ একর জায়গার ওপর একটি একাডেমিক ভবন, ছয়তলা দুটি হোস্টেল, একটি করে টিচার্স স্টাফ ডরমিটরি এবং ইনস্টিটিউট প্রধানের বাংলোর নির্মাণকাজ চলছে। প্রকল্পের জন্য প্রথমে বরাদ্দ ছিল ১৬৫ কোটি টাকা। পরে কমিয়ে ১৪১ কোটি টাকা করা হয়েছে। সরকারের সাশ্রয়নীতির কারণে আমরা প্রকল্পের খরচ ১১১ কোটি টাকার মধ্যে রাখতে চাই।’

পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষণা এবং প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট বিশেষায়িত হতে হবে কেন জানতে চাইলে শ্রমিক নেতারা বলেন, ‘কেমিক্যাল কারখানার পেশাগত সমস্যা বা পোশাক-কারখানায় অতি উজ্জ্বল আলোতে কাজের সমস্যা, কারখানার অতিশব্দে কাজ করলে কী হয় বা শিপব্রেকিং শিল্পে কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়, পরিবহন শ্রমিকদের ধুলাবালিতে কাজ করার ঝুঁকি কীএসব বিষয়ে গবেষণা হওয়া উচিত। কারখানা নির্মাণের ক্ষেত্রে আলো, আর্দ্রতা, তাপের প্রভাব কী, দীর্ঘ সময় একই ধরনের কাজ করতে গিয়ে সমস্যা কী হয়, টানা বসে থাকার বা টানা দাঁড়িয়ে থাকার কাজ করলে কী হয় এসব নিয়ে গবেষণার বিকল্প নেই। একেকটা পেশার কাজের একেকটা ধরন আছে। শরীরে বিশেষ ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে। এসব নিয়ে গবেষণা হওয়া দরকার। বিষয়গুলো আমলে নিতে হবে। দুই ধরনের ব্যবস্থা নিতে হবে। এক. প্রিভেনশন বা প্রতিরোধ এবং দুই. চিকিৎসা বা পুনর্বাসন। দুর্ঘটনা ঘটলে শ্রমিক আনকিউরেবল কন্ডিশনে চলে গেলে তখন ক্ষতিপূরণ কী হবে এবং কীভাবে পাবেতার স্পষ্ট গাইডলাইন থাকতে হবে। উচ্চতর গবেষণা ও দায়িত্বসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান হওয়ায় অবয়বের দিক থেকেও এটিকে বড় করা দরকার। সংস্থাটির স্বাধীনভাবে কাজের এখতিয়ার না থাকলে এসব কাজ করা সম্ভব নয়।’

রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, ‘সরকারের ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিলেশন ইনস্টিটিউট (আইআরআই) বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে। করার সময় বলা হলো এটা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান হবে। তারা পেশাগত স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করবে। আইআরআইয়ের মতো পেশাগত স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট করা হচ্ছে। অথচ হওয়া উচিত বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান। স্বাধীন প্রতিষ্ঠান না হলে তা ফরমায়েশি কাজ করবে।