ঢাকা ১১:২৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৭ অক্টোবর ২০২২, ২২ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

কাগজের দাম বৃদ্ধি, দেশে মুদ্রণ ব্যবসায় ধস

বাজারে বাড়ছে কাগজের দাম। এতে বাচ্চাদের খাতা কেনার খরচও বেড়েছে। একইভাবে বেড়েছে স্কুল-পরীক্ষার ফি। এতে বাচ্চাদের লেখাপড়া চালানো অনেকের জন্য দুষ্কর হয়ে পড়েছে। গত বৃহস্পতিবার সকালে চট্টগ্রাম মহানগরীর আন্দরকিল্লার বইপাড়ায় খাতা কেনার সময় এ কথা বলেন একটি প্রাইভেট ক্লিনিকের কর্মচারী সোহেল রায়হান (৩৯)।

অন্যদিকে কাগজের দাম বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায় ধস নেমেছে বলে জানান আন্দরকিল্লা মুদ্রণপাড়ার ব্যবসায়ী জহির উদ্দিন বাবর। তারা বলেন, বাজারে দুই মাস আগের ৪০ টাকায় বিক্রি করা খাতা এখন বিক্রি হচ্ছে ৬৫ টাকায়। ২৮০ টাকায় বিক্রি করা খাতার রিম কাগজের দাম এখন ৩৮০ টাকা। সরেজমিন যাচাই করে যার সত্যতাও মিলেছে।

এ প্রসঙ্গে কাগজ ব্যবসায়ী আরিফুর রহমান জানান, কাগজের দাম বৃদ্ধিতে শিক্ষা উপকরণের ওপর প্রবল নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এক বছর আগে যে খাতা শিক্ষার্থীরা ৪০ টাকায় কিনত এখন তা কিনতে হবে ন্যূনতম ৬৫ টাকায়। এরপরও প্রয়োজন থাকায় খাতার কাগজের বিক্রি ঠিক আছে। মুদ্রণের কাজে ৮০ শতাংশ কাগজ ব্যবহার হওয়ায় আমাদের গড় বিক্রি কমে গেছে।

দাম বৃদ্ধি প্রসঙ্গে আন্দরকিল্লার কাগজ ব্যবসায়ী মেসার্স আহমেদিয়া ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. ইমতিয়াজ বলেন, ‘এক বছর আগে দেশের প্রথম স্তরের পেপার মিলে প্রতি টন মুদ্রণ কাগজের ক্রয়মূল্য ছিল ৭৭ থেকে ৮০ হাজার টাকা। কয়েক দফায় দাম বেড়ে বর্তমানে কাগজের দাম হয়েছে এক লাখ ৩১ হাজার টাকা। আর দুই মাস আগে সাধারণ মানের সাদা এক রিম মুদ্রণ কাগজের দাম ছিল এক হাজার ৪০০ টাকা। এখন তা বেড়ে দুই হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘এসব কাগজ আমরা কম দামে বিক্রি করলেও যে লাভ, বেশি দামে বিক্রি করলেও সমান লাভ হয়। তবে দেশি কাগজের দাম বেশি হওয়ার কোনো কারণ দেখি না। এখন সরকারি পেপার মিল নেই বললেই চলে। তাই টিকে ও পারটেক্সের মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো এক হয়ে তাদের মর্জিমতো দাম বাড়িয়েছে।’

নগরীর পাইকারি কাগজের বাজার আন্দরকিল্লায় দেখা যায়, পূর্ণ আকারের এক রিম সাদা কাগজের দাম দুই মাসে বেড়েছে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ। ফলে ছাপাখানায় আগের মতো গতি নেই। গ্রাহক কমেছে। প্রিন্টিং ব্যবসায়ীরাও কাজের অর্ডার নিচ্ছে মানুষের প্রয়োজন বোঝে। মানুষও খুব বেশি দরকার না হলে ছাপাখানায় না ছাপিয়ে প্রয়োজনমতো ফটোকপি করে নিচ্ছে। কিন্তু এতেও কাগজের ব্যবহার থাকায় ফটোকপি খরচ বেড়ে হয়েছে প্রায় দ্বিগুণ।

মুদ্রণে ব্যবহৃত কাগজ, কালি ও শ্রমিকের মজুরি বাড়ায় ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। মুদ্রণ বাজারের বর্তমান চিত্র প্রসঙ্গে চারুকলা প্রিন্টিং প্রেসের স্বত্বাধিকারী আকরাম হোসেন বলেন, ‘কাগজসহ প্রতিটি কাঁচামালের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি এবং লোডশেডিংয়ের কারণে গ্রাহক চাহিদা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমে গেছে। অতিরিক্ত ব্যয়ের বিপরীতে আয় না বাড়ায় মুদ্রণ শিল্পে ধস নেমেছে। তাই কাগজের দাম যেন মাত্রাতিরিক্ত না বাড়ে এ জন্য সরকারকে আন্তরিক হতে হবে।’

ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, জ্বালানি তেল ও ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় সব ধরনের আমদানি পণ্যের ব্যয় বেড়েছে। ফলে ক্রেতাদেরও গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। কিন্তু দেশি পণ্যের দাম আমদানি পণ্যের সমানতালে বাড়ায় ক্রেতা ও বিক্রেতাদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্য হলো কাগজ। মানভেদে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কাগজের দাম বাড়ায় প্রভাব পড়েছে শিক্ষা খাতসহ মুদ্রণ শিল্পে। ফলে আগামী অমর একুশে বইমেলায় নতুন বই আসার সম্ভাবনাও কমেছে।

এ প্রসঙ্গে টিকে গ্রুপের কাগজ বিভাগের মুখপাত্র রেজাউল হক বলেন, ‘আমদানি করা কাগজের দাম বিভিন্ন কারণে যেমন বেড়েছে, দেশীয় কাগজের দাম বাড়ার পেছনেও অনেক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে আমাদের কাঁচামাল ও পরিবহন খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। তাই এখানে কোনো সিন্ডিকেট নেই। অযথা দাম বাড়ালে আমাদের কি সরকার ধরবে না?’

Tag :

২ লাখ টাকার ফুলদানি নিলামে বিক্রি হলো ৯২ কোটি টাকায়

কাগজের দাম বৃদ্ধি, দেশে মুদ্রণ ব্যবসায় ধস

প্রকাশের সময় : ১০:২৯:৫৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২২

বাজারে বাড়ছে কাগজের দাম। এতে বাচ্চাদের খাতা কেনার খরচও বেড়েছে। একইভাবে বেড়েছে স্কুল-পরীক্ষার ফি। এতে বাচ্চাদের লেখাপড়া চালানো অনেকের জন্য দুষ্কর হয়ে পড়েছে। গত বৃহস্পতিবার সকালে চট্টগ্রাম মহানগরীর আন্দরকিল্লার বইপাড়ায় খাতা কেনার সময় এ কথা বলেন একটি প্রাইভেট ক্লিনিকের কর্মচারী সোহেল রায়হান (৩৯)।

অন্যদিকে কাগজের দাম বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায় ধস নেমেছে বলে জানান আন্দরকিল্লা মুদ্রণপাড়ার ব্যবসায়ী জহির উদ্দিন বাবর। তারা বলেন, বাজারে দুই মাস আগের ৪০ টাকায় বিক্রি করা খাতা এখন বিক্রি হচ্ছে ৬৫ টাকায়। ২৮০ টাকায় বিক্রি করা খাতার রিম কাগজের দাম এখন ৩৮০ টাকা। সরেজমিন যাচাই করে যার সত্যতাও মিলেছে।

এ প্রসঙ্গে কাগজ ব্যবসায়ী আরিফুর রহমান জানান, কাগজের দাম বৃদ্ধিতে শিক্ষা উপকরণের ওপর প্রবল নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এক বছর আগে যে খাতা শিক্ষার্থীরা ৪০ টাকায় কিনত এখন তা কিনতে হবে ন্যূনতম ৬৫ টাকায়। এরপরও প্রয়োজন থাকায় খাতার কাগজের বিক্রি ঠিক আছে। মুদ্রণের কাজে ৮০ শতাংশ কাগজ ব্যবহার হওয়ায় আমাদের গড় বিক্রি কমে গেছে।

দাম বৃদ্ধি প্রসঙ্গে আন্দরকিল্লার কাগজ ব্যবসায়ী মেসার্স আহমেদিয়া ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. ইমতিয়াজ বলেন, ‘এক বছর আগে দেশের প্রথম স্তরের পেপার মিলে প্রতি টন মুদ্রণ কাগজের ক্রয়মূল্য ছিল ৭৭ থেকে ৮০ হাজার টাকা। কয়েক দফায় দাম বেড়ে বর্তমানে কাগজের দাম হয়েছে এক লাখ ৩১ হাজার টাকা। আর দুই মাস আগে সাধারণ মানের সাদা এক রিম মুদ্রণ কাগজের দাম ছিল এক হাজার ৪০০ টাকা। এখন তা বেড়ে দুই হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘এসব কাগজ আমরা কম দামে বিক্রি করলেও যে লাভ, বেশি দামে বিক্রি করলেও সমান লাভ হয়। তবে দেশি কাগজের দাম বেশি হওয়ার কোনো কারণ দেখি না। এখন সরকারি পেপার মিল নেই বললেই চলে। তাই টিকে ও পারটেক্সের মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো এক হয়ে তাদের মর্জিমতো দাম বাড়িয়েছে।’

নগরীর পাইকারি কাগজের বাজার আন্দরকিল্লায় দেখা যায়, পূর্ণ আকারের এক রিম সাদা কাগজের দাম দুই মাসে বেড়েছে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ। ফলে ছাপাখানায় আগের মতো গতি নেই। গ্রাহক কমেছে। প্রিন্টিং ব্যবসায়ীরাও কাজের অর্ডার নিচ্ছে মানুষের প্রয়োজন বোঝে। মানুষও খুব বেশি দরকার না হলে ছাপাখানায় না ছাপিয়ে প্রয়োজনমতো ফটোকপি করে নিচ্ছে। কিন্তু এতেও কাগজের ব্যবহার থাকায় ফটোকপি খরচ বেড়ে হয়েছে প্রায় দ্বিগুণ।

মুদ্রণে ব্যবহৃত কাগজ, কালি ও শ্রমিকের মজুরি বাড়ায় ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। মুদ্রণ বাজারের বর্তমান চিত্র প্রসঙ্গে চারুকলা প্রিন্টিং প্রেসের স্বত্বাধিকারী আকরাম হোসেন বলেন, ‘কাগজসহ প্রতিটি কাঁচামালের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি এবং লোডশেডিংয়ের কারণে গ্রাহক চাহিদা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমে গেছে। অতিরিক্ত ব্যয়ের বিপরীতে আয় না বাড়ায় মুদ্রণ শিল্পে ধস নেমেছে। তাই কাগজের দাম যেন মাত্রাতিরিক্ত না বাড়ে এ জন্য সরকারকে আন্তরিক হতে হবে।’

ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, জ্বালানি তেল ও ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় সব ধরনের আমদানি পণ্যের ব্যয় বেড়েছে। ফলে ক্রেতাদেরও গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। কিন্তু দেশি পণ্যের দাম আমদানি পণ্যের সমানতালে বাড়ায় ক্রেতা ও বিক্রেতাদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্য হলো কাগজ। মানভেদে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কাগজের দাম বাড়ায় প্রভাব পড়েছে শিক্ষা খাতসহ মুদ্রণ শিল্পে। ফলে আগামী অমর একুশে বইমেলায় নতুন বই আসার সম্ভাবনাও কমেছে।

এ প্রসঙ্গে টিকে গ্রুপের কাগজ বিভাগের মুখপাত্র রেজাউল হক বলেন, ‘আমদানি করা কাগজের দাম বিভিন্ন কারণে যেমন বেড়েছে, দেশীয় কাগজের দাম বাড়ার পেছনেও অনেক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে আমাদের কাঁচামাল ও পরিবহন খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। তাই এখানে কোনো সিন্ডিকেট নেই। অযথা দাম বাড়ালে আমাদের কি সরকার ধরবে না?’