ঢাকা ০৮:২৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২২, ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

‘হিজরতের’ গন্তব্য বিদেশ, জড়িত পরিবার

ক’দিন আগে কুমিল্লায় বাসা থেকে নিখোঁজ হন আস সামি নামে এক কিশোর ও তার ৬ বন্ধু। নিখোঁজ কিশোরদের মধ্যে ১৮ বছর বয়েসী আবরারুল ইসলামকে গত সপ্তাহে ঢাকার মগবাজার থেকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী রামপুরা থেকে শাকির বিন ওয়ালি নামের এক তরুণ চিকিৎসককে গ্রেফতার করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ। এই হঠাৎ নিখোঁজ, গ্রেফতার একই সূত্রে গাঁথা। সেটি হচ্ছে জঙ্গিবাদ বলে ধারণা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। তারা জানাচ্ছে আবারও দেশে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চাচ্ছে ধর্মের নামে উগ্রবাদী সংগঠনগুলো।

প্রতিবারই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জে পড়তে হয় এই ধরনের কর্মকাণ্ডে। কেননা, এরা (জঙ্গি) নিত্যদিন নতুন কৌশলে নতুন ধরনের হুমকি সৃষ্টি করছে।

ঘটনা বিশ্লেষণে জানা যায়, হঠাৎ ‘নিখোঁজ’ এই তালিকায় সারাদেশে সংখ্যাটা মোট ১৬ জন। আবার এক্ষেত্রে তাদের বয়সও অনেক কম। আর এই ‘নিখোঁজ’ কারণ তথাকথিত ‘হিজরত’। যার প্রধান গন্তব্য বিদেশে পাড়ি জমানো।

এলিট ফোর্স র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন, পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট এবং সিআইডি’র আশঙ্কা, এরা (নিখোঁজ কিশোর ও যুবক) সবাই বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের সদস্য। বিশেষ করে আনসার আল-ইসলাম এর নামটি এক্ষেত্রে সর্ব প্রথমে। আর এই হিজরতের জন্য তাদের (নিখোঁজ) প্রধান গন্তব্য ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও সৌদি আরব।

সিআইডি’র ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে ব্রেকিংনিউজকে বলেন, প্রথমে আবরারকে নিয়ে আসা হয়। বয়সে একদমই বাচ্চা। কিন্তু সে আনসার আল ইসলামের একজন সক্রিয় সদস্য। তার মূল কাজ ছিল সদস্য সংগ্রহ ও পাশাপাশি উগ্রবাদ ছড়ানো। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ীই শাকিরকে আনা হয়েছে। শাকিরও আনসার আল ইসলামের সদস্য। শুধু তাই নয়, তার বাবা একেএম ওয়ালী উল্লাহও যিনি নিজেও একজন চিকিৎসক, তিনিও সম্ভবত এর সাথে জড়িত। কেননা তিনি অনেক সময় তার ছেলের এবং অন্যদের এই উগ্রবাদ ছড়ানোর কাজে সাহায্য করেছেন। এছাড়া, উগ্রবাদী আদর্শে বিশ্বাসী শাকিরের স্ত্রী পেশায় চিকিৎসক, আয়েশা বিনতে মুস্তাফিজও। আয়েশার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনসেট জব্দ করার পর এই সংক্রান্ত প্রমাণ মিলেছে।

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট এর প্রধান আসাদুজ্জামান ব্রেকিংনিউজকে বলেন, শাকির বিন ওয়ালীর প্ররোচণায় হিজরতের নামে নিখোঁজ হয়েছেন আস সামি ও বাকি ছয় জন। শাকিরের আনসার আল-ইসলামের সদস্য হওয়া সংক্রান্ত নানা প্রমাণ ও নথি আমাদের হাতে এসেছে। এছাড়া আরও একজন আছে। তার নাম আবরারুল ইসলাম।

অন্যদিকে, র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন ব্রেকিংনিউজকে বলেন, এদের (নিখোঁজ) মুভমেন্ট, আচার-আচরণ ও অন্যান্য সম্পৃক্ত অনেক দিক আমরা বারং বার বিশ্লেষণ করেছি। আর রেজাল্ট একটিই বেরিয়েছে শেষ পর্যন্ত। এরা সবাই জঙ্গিবাদের সাথে জড়িত। এদের মধ্যে বেশিরভাগই আনসার আল ইসলামের কার্যকরি সদস্য।

জঙ্গিবাদ কী ভাবে প্রতিরোধ করা যায় এর উপায় হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জিয়া রহমান ব্রেকিংনিউজকে বলেন, দেশের গণ্ডি পেরিয়ে জঙ্গিদের হিজরতের গন্তব্য যেহেতু এখন বিদেশ, জঙ্গিরা নতুন সদস্য আহরণে ও উগ্রবাদ ছড়াতে ধর্মীয় জ্ঞান কম এমন তরুণদের বিভ্রান্ত করে দলে ভিড়াচ্ছে। ধর্মীয়ভাবে মুসলিমদের মধ্যে ‘হিজরত’ কথাটির একটি মহত্ব আছে। আর জঙ্গিরা এটাকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ও অপরাধ গবেষক তৌহিদুল হক ব্রেকিংনিউজকে বলেন, হিজরত হচ্ছে জঙ্গি রিক্রুট (নিয়োগ) ও রেডিক্যালাইজেশনের (মৌলবাদ) সর্বপ্রধান অনুসঙ্গ। হঠাৎ এ ধরনের নিখোঁজ, জঙ্গি তৎপরতা বৃদ্ধির একটা ইঙ্গিত। এই ‘হিজরত’ বন্ধে অভিযান, গ্রেফতার ও সাজার পাশাপাশি একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শ পরিবর্তনের প্রক্রিয়া (ডি-রেডিক্যালাইজেশন) একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

Tag :
জনপ্রিয়

গোমস্তাপুরে বাল্য বিয়ে বন্ধ করলো উপজেলা প্রশাসন

‘হিজরতের’ গন্তব্য বিদেশ, জড়িত পরিবার

প্রকাশের সময় : ১১:০২:৫৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২২

ক’দিন আগে কুমিল্লায় বাসা থেকে নিখোঁজ হন আস সামি নামে এক কিশোর ও তার ৬ বন্ধু। নিখোঁজ কিশোরদের মধ্যে ১৮ বছর বয়েসী আবরারুল ইসলামকে গত সপ্তাহে ঢাকার মগবাজার থেকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী রামপুরা থেকে শাকির বিন ওয়ালি নামের এক তরুণ চিকিৎসককে গ্রেফতার করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ। এই হঠাৎ নিখোঁজ, গ্রেফতার একই সূত্রে গাঁথা। সেটি হচ্ছে জঙ্গিবাদ বলে ধারণা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। তারা জানাচ্ছে আবারও দেশে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চাচ্ছে ধর্মের নামে উগ্রবাদী সংগঠনগুলো।

প্রতিবারই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জে পড়তে হয় এই ধরনের কর্মকাণ্ডে। কেননা, এরা (জঙ্গি) নিত্যদিন নতুন কৌশলে নতুন ধরনের হুমকি সৃষ্টি করছে।

ঘটনা বিশ্লেষণে জানা যায়, হঠাৎ ‘নিখোঁজ’ এই তালিকায় সারাদেশে সংখ্যাটা মোট ১৬ জন। আবার এক্ষেত্রে তাদের বয়সও অনেক কম। আর এই ‘নিখোঁজ’ কারণ তথাকথিত ‘হিজরত’। যার প্রধান গন্তব্য বিদেশে পাড়ি জমানো।

এলিট ফোর্স র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন, পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট এবং সিআইডি’র আশঙ্কা, এরা (নিখোঁজ কিশোর ও যুবক) সবাই বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের সদস্য। বিশেষ করে আনসার আল-ইসলাম এর নামটি এক্ষেত্রে সর্ব প্রথমে। আর এই হিজরতের জন্য তাদের (নিখোঁজ) প্রধান গন্তব্য ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও সৌদি আরব।

সিআইডি’র ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে ব্রেকিংনিউজকে বলেন, প্রথমে আবরারকে নিয়ে আসা হয়। বয়সে একদমই বাচ্চা। কিন্তু সে আনসার আল ইসলামের একজন সক্রিয় সদস্য। তার মূল কাজ ছিল সদস্য সংগ্রহ ও পাশাপাশি উগ্রবাদ ছড়ানো। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ীই শাকিরকে আনা হয়েছে। শাকিরও আনসার আল ইসলামের সদস্য। শুধু তাই নয়, তার বাবা একেএম ওয়ালী উল্লাহও যিনি নিজেও একজন চিকিৎসক, তিনিও সম্ভবত এর সাথে জড়িত। কেননা তিনি অনেক সময় তার ছেলের এবং অন্যদের এই উগ্রবাদ ছড়ানোর কাজে সাহায্য করেছেন। এছাড়া, উগ্রবাদী আদর্শে বিশ্বাসী শাকিরের স্ত্রী পেশায় চিকিৎসক, আয়েশা বিনতে মুস্তাফিজও। আয়েশার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনসেট জব্দ করার পর এই সংক্রান্ত প্রমাণ মিলেছে।

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট এর প্রধান আসাদুজ্জামান ব্রেকিংনিউজকে বলেন, শাকির বিন ওয়ালীর প্ররোচণায় হিজরতের নামে নিখোঁজ হয়েছেন আস সামি ও বাকি ছয় জন। শাকিরের আনসার আল-ইসলামের সদস্য হওয়া সংক্রান্ত নানা প্রমাণ ও নথি আমাদের হাতে এসেছে। এছাড়া আরও একজন আছে। তার নাম আবরারুল ইসলাম।

অন্যদিকে, র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন ব্রেকিংনিউজকে বলেন, এদের (নিখোঁজ) মুভমেন্ট, আচার-আচরণ ও অন্যান্য সম্পৃক্ত অনেক দিক আমরা বারং বার বিশ্লেষণ করেছি। আর রেজাল্ট একটিই বেরিয়েছে শেষ পর্যন্ত। এরা সবাই জঙ্গিবাদের সাথে জড়িত। এদের মধ্যে বেশিরভাগই আনসার আল ইসলামের কার্যকরি সদস্য।

জঙ্গিবাদ কী ভাবে প্রতিরোধ করা যায় এর উপায় হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জিয়া রহমান ব্রেকিংনিউজকে বলেন, দেশের গণ্ডি পেরিয়ে জঙ্গিদের হিজরতের গন্তব্য যেহেতু এখন বিদেশ, জঙ্গিরা নতুন সদস্য আহরণে ও উগ্রবাদ ছড়াতে ধর্মীয় জ্ঞান কম এমন তরুণদের বিভ্রান্ত করে দলে ভিড়াচ্ছে। ধর্মীয়ভাবে মুসলিমদের মধ্যে ‘হিজরত’ কথাটির একটি মহত্ব আছে। আর জঙ্গিরা এটাকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ও অপরাধ গবেষক তৌহিদুল হক ব্রেকিংনিউজকে বলেন, হিজরত হচ্ছে জঙ্গি রিক্রুট (নিয়োগ) ও রেডিক্যালাইজেশনের (মৌলবাদ) সর্বপ্রধান অনুসঙ্গ। হঠাৎ এ ধরনের নিখোঁজ, জঙ্গি তৎপরতা বৃদ্ধির একটা ইঙ্গিত। এই ‘হিজরত’ বন্ধে অভিযান, গ্রেফতার ও সাজার পাশাপাশি একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শ পরিবর্তনের প্রক্রিয়া (ডি-রেডিক্যালাইজেশন) একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।