ঢাকা ০৯:০৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৫ অক্টোবর ২০২২, ২০ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

জোট জোট খেলা শুরু

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ১৫ মাস থাকতেই জোটবদ্ধ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নানা হিসাব-নিকাশ ও সমীকরণ শুরু হয়েছে। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে টানাপড়েন চলছে ১৪ দলের শরিকদের।

একই অবস্থা বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টেও। নতুন বড় ঐক্যের খোঁজে ২০ দলকে নিষ্ক্রিয় করে রেখেছে বিএনপি। সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি নিজেদের সুবিধামতো জোটে যেতে চায়। বিভিন্ন কারণে টানাপড়েন চলছে বামদের জোটেও। বসে নেই ইসলামি দলগুলোও। নয়া উদ্যোগ, নিজেদের মধ্যে সংলাপ, দৌড়ঝাঁপ করছেন তারা। এসব জোটের চিত্রপট শেষ পর্যন্ত কোন দিকে গড়ায় তা সময়ই বলে দেবে।

টানা তিনটি জাতীয় নির্বাচনে ১৪ দলীয় জোটকে সঙ্গে নিয়ে ভোটের মাঠে বাজিমাত করেছে আওয়ামী লীগ। তবে এবার ক্ষমতাসীন দলটি জোট নিয়ে কোন কৌশলে এগোতে চায়, জোটের শরিকদের কাছে এখনও সেটি পরিষ্কার নয়। গত ১৫ মার্চ গণভবনে বৈঠকে আগামী দ্বাদশ নির্বাচনে শরিকদের প্রত্যেককে আসন দেওয়ার কথা বলেন জোটপ্রধান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা; সেই আশা রেখেই সামনের দিকে এগুচ্ছে জোটের শরিকরা। তবে তাদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা স্পষ্ট। গত ২০০৮ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হওয়ার পর শরিক দলগুলোর একাধিক নেতাকে মন্ত্রী করা হয়। কিন্তু ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর শরিকদের আর মন্ত্রিসভায় রাখা হয়নি। এ ছাড়াও ছোট ছোট কিছু চাওয়া-পাওয়া ছিল শরিকদের। সেগুলোও পূরণ হয়নি। এতে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব বাড়ছে জোটে। তবে এখন পর্যন্ত ১৪ দলের শরিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। পাশাপাশি তারা এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়টিও মাথায় রাখছে।

১৪ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি। পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন জোট প্রসঙ্গে সময়ের আলোকে বলেন, ‘কিছুদিন আগে জোটনেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ১৪ দলীয় জোটের নেতাদের বৈঠক হয়। সেখানে জোট ঐক্যবদ্ধ থাকবে-এমন আশ্বাস দিয়েছিলেন। সেভাবেই আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি। তবে কোনো কারণে যদি এর ব্যত্যয় ঘটে সে ক্ষেত্রে এককভাবেও নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি। কারণ আওয়ামী লীগ আমাদের সঙ্গে সবকিছু আলোচনা করে না।’

আর জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘জোট নিয়ে এ মুহূর্তে আওয়ামী লীগ কী কৌশল নিয়েছে, সেটি পরিষ্কার নয়। কিন্তু জোটনেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ১৪ দলের নেতাদের যে বৈঠক হয়েছে, সেখানে সবাইকে তিনি ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচন করার কথা বলেছেন। আমরা জোটবদ্ধ হয়েই নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। তবে আওয়ামী লীগ শেষ পর্যন্ত কী করবে সেটি এখনও জানি না।’

জোটের আরেক শরিক জাসদের সাধারণ সম্পাদক শিরীন আক্তার বলেন, ‘আসলে রাজনীতি কখন কোন দিকে মোড় নেয়, সেটি বলা মুশকিল।’ আওয়ামী লীগ অন্য কোনো দলের সঙ্গে আলোচনা বা নির্বাচনি জোট করবে কি না, সেটি তারা জানে।

জোট নিয়ে চলমান আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও ১৪ দলের ঢাকা মহানগর সমন্বয়ক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া সময়ের আলোকে বলেন, ‘জোট আগের চেয়ে অনেক শক্তিশালী। কোনো সংকট নেই। এটি আদর্শিক জোট, নির্বাচনি জোট নয় যে সহজেই ভেঙে যাবে। আর নতুন করে কোনো জোটও করবে না আওয়ামী লীগ।’

বিএনপি নেতাদের নজর এখন বড় জোটের দিকে, যদিও নিজেদের দুটি জোটই রয়েছে নিষ্ক্রিয়। দীর্ঘদিন ২০ দলীয় জোটের কোনো বৈঠক হয় না, নেই কোনো কর্মসূচিও। তাদের আরেক জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টও দৃশ্যত অকার্যকর। নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন আদায়ে দেশের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলো নিয়ে ‘বৃহত্তর ঐক্য’ গড়ে ২২টি দলের সঙ্গে সংলাপ করেছে বিএনপি। এ ঐক্য গড়ার অংশ হিসেবে সম্প্রতি আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), মাহমুদুর রহমান মান্নার নেতৃত্বে নাগরিক ঐক্য, সাইফুল হকের নেতৃত্বে বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, জোনায়েদ সাকির নেতৃত্বে গণসংহতি আন্দোলন, ড. রেজা কিবরিয়ার নেতৃত্বে গণ-অধিকার পরিষদ, রফিকুল ইসলাম বাবলুর নেতৃত্বে ভাসানী অনুসারী পরিষদ ও অ্যাডভোকেট হাসনাত কাইয়ুমের নেতৃত্বে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন মিলে হয়েছে গণতন্ত্র মঞ্চ।

চারদলীয় জোটের পরিধি বাড়িয়ে প্রথমে ১৮ দল এবং ২০১২ সালে ২০ দলীয় জোট গঠন করে বিএনপি। ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে কামাল হোসেনের গণফোরাম, মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্য এবং আ স ম আবদুর রবের জেএসডিকে নিয়ে বিএনপি গঠন করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর বিএনপির পুরনো জোট ২০ দল গৌণ হয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়া এ জোট থেকে কেউ কেউ ছুটেও যায়।

সম্প্রতি দলের এক সভায় জোট ত্যাগের কথা বলেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। জোটের বর্তমান অবস্থা নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেন তিনি। এর জন্য বিএনপিকেই দোষারোপ করেন। আর আরেক শরিক দল কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বলেন, ‘জোট বলতে গেলে নেই। তবে এখন বিএনপি যুগপৎ আন্দোলনের কথা বলছে। দেখা যাক, পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়। আমরাও সেভাবে চিন্তা করব।’

বিএনপি জোটের অবস্থা নিয়ে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, ‘বৃহৎ প্ল্যাটফর্মে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে চাই আমরা। সেখানে বাম-ডান, গণতান্ত্রিক, দেশপ্রেমিক, রাজনৈতিক সব দলকে একত্র করতে চাই। সেই লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি। কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। আন্দোলনের গতিপ্রকৃতির নিরিখে যুগপৎ, নাকি স্ব স্ব মঞ্চ থেকে চলবে, তা নির্ধারণ হবে।’

গৃহদাহ সামলাতে ব্যস্ত জাপা
সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টিও (জাপা) সম্প্রতি জোট গড়ায় মনোযোগ দেয়। তবে বাগড়া দেয় দলের অন্তর্কোন্দল। দলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদ হঠাৎ কাউন্সিলের ডাক দেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের নেতৃত্বে এমপিরা তাকে সংসদের বিরোধীদলীয় নেতার পদ থেকে সরাতে স্পিকারকে চিঠি দেন। এ ঘটনার রেশ না কাটতেই বুধবার সাবেক মহাসচিব ও চিফ হুইফ মসিউর রহমান রাঙ্গাকে দল থেকে অব্যাহতি দেন জিএম কাদের। এসব টানাপড়েনের মধ্যেও জাপা জোট গড়তে বিএনপি ও অন্য বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে সুবিধামতো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান জাপা চেয়ারম্যান।

বাম ঐক্যে এক দফা টানাপড়েন
নিজেদের বাইরে অন্য দলের সঙ্গে জোট করা হবে কি না তা নিয়ে মতবিরোধ চলছে সরকারবিরোধী অবস্থান নিয়ে থাকা বাম গণতান্ত্রিক জোটে। চলতি বছরের মে মাসে দেশের বামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর মোর্চা বাম গণতান্ত্রিক জোটে গণসংহতি আন্দোলন ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সদস্যপদ স্থগিত করা হয়। কারণ গণতন্ত্র মঞ্চ নামে আলাদা প্ল্যাটফর্মে রয়েছে এ দুটি দল, যারা বিএনপির সঙ্গে বড় ঐক্য গড়ার পথে রয়েছে। তবে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে আমাদের কস্মিনকালেও জোট হতে পারে না। তারাও আমাদের আমন্ত্রণ জানানোর সাহস রাখে না।

নিজেদের মধ্যে সংলাপ করছে ইসলামি দলগুলো
সমমনা ইসলামি দলগুলো ইতিমধ্যে নিজেদের মধ্যে সংলাপ শুরু করেছে। মূলত ইসলামী আন্দোলনের পক্ষ থেকে এ সংলাপের উদ্যোগ নেওয়া হয়। দলটির মহাসচিব মাওলানা ইউনুস আহমদের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি টিম গঠন করা হয়েছে। তারা সমমনা দলগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক এবং অনানুষ্ঠানিক আলাপ-আলোচনা করছেন। ইতোমধ্যে খেলাফত আন্দোলন ও খেলাফত মজলিসের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা করেছেন। এ ছাড়া শিগগিরই অন্য দলের সঙ্গে সংলাপ হওয়ার কথা। তারা বলছেন, এবার দরকষাকষি করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

Tag :

কালীগঞ্জে মায়ের শাড়ি গলায় পেঁচিয়ে ছেলের আত্মহত্যা

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

জোট জোট খেলা শুরু

প্রকাশের সময় : ১১:০২:৫৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২২

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ১৫ মাস থাকতেই জোটবদ্ধ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নানা হিসাব-নিকাশ ও সমীকরণ শুরু হয়েছে। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে টানাপড়েন চলছে ১৪ দলের শরিকদের।

একই অবস্থা বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টেও। নতুন বড় ঐক্যের খোঁজে ২০ দলকে নিষ্ক্রিয় করে রেখেছে বিএনপি। সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি নিজেদের সুবিধামতো জোটে যেতে চায়। বিভিন্ন কারণে টানাপড়েন চলছে বামদের জোটেও। বসে নেই ইসলামি দলগুলোও। নয়া উদ্যোগ, নিজেদের মধ্যে সংলাপ, দৌড়ঝাঁপ করছেন তারা। এসব জোটের চিত্রপট শেষ পর্যন্ত কোন দিকে গড়ায় তা সময়ই বলে দেবে।

টানা তিনটি জাতীয় নির্বাচনে ১৪ দলীয় জোটকে সঙ্গে নিয়ে ভোটের মাঠে বাজিমাত করেছে আওয়ামী লীগ। তবে এবার ক্ষমতাসীন দলটি জোট নিয়ে কোন কৌশলে এগোতে চায়, জোটের শরিকদের কাছে এখনও সেটি পরিষ্কার নয়। গত ১৫ মার্চ গণভবনে বৈঠকে আগামী দ্বাদশ নির্বাচনে শরিকদের প্রত্যেককে আসন দেওয়ার কথা বলেন জোটপ্রধান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা; সেই আশা রেখেই সামনের দিকে এগুচ্ছে জোটের শরিকরা। তবে তাদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা স্পষ্ট। গত ২০০৮ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হওয়ার পর শরিক দলগুলোর একাধিক নেতাকে মন্ত্রী করা হয়। কিন্তু ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর শরিকদের আর মন্ত্রিসভায় রাখা হয়নি। এ ছাড়াও ছোট ছোট কিছু চাওয়া-পাওয়া ছিল শরিকদের। সেগুলোও পূরণ হয়নি। এতে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব বাড়ছে জোটে। তবে এখন পর্যন্ত ১৪ দলের শরিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। পাশাপাশি তারা এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়টিও মাথায় রাখছে।

১৪ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি। পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন জোট প্রসঙ্গে সময়ের আলোকে বলেন, ‘কিছুদিন আগে জোটনেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ১৪ দলীয় জোটের নেতাদের বৈঠক হয়। সেখানে জোট ঐক্যবদ্ধ থাকবে-এমন আশ্বাস দিয়েছিলেন। সেভাবেই আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি। তবে কোনো কারণে যদি এর ব্যত্যয় ঘটে সে ক্ষেত্রে এককভাবেও নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি। কারণ আওয়ামী লীগ আমাদের সঙ্গে সবকিছু আলোচনা করে না।’

আর জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘জোট নিয়ে এ মুহূর্তে আওয়ামী লীগ কী কৌশল নিয়েছে, সেটি পরিষ্কার নয়। কিন্তু জোটনেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ১৪ দলের নেতাদের যে বৈঠক হয়েছে, সেখানে সবাইকে তিনি ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচন করার কথা বলেছেন। আমরা জোটবদ্ধ হয়েই নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। তবে আওয়ামী লীগ শেষ পর্যন্ত কী করবে সেটি এখনও জানি না।’

জোটের আরেক শরিক জাসদের সাধারণ সম্পাদক শিরীন আক্তার বলেন, ‘আসলে রাজনীতি কখন কোন দিকে মোড় নেয়, সেটি বলা মুশকিল।’ আওয়ামী লীগ অন্য কোনো দলের সঙ্গে আলোচনা বা নির্বাচনি জোট করবে কি না, সেটি তারা জানে।

জোট নিয়ে চলমান আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও ১৪ দলের ঢাকা মহানগর সমন্বয়ক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া সময়ের আলোকে বলেন, ‘জোট আগের চেয়ে অনেক শক্তিশালী। কোনো সংকট নেই। এটি আদর্শিক জোট, নির্বাচনি জোট নয় যে সহজেই ভেঙে যাবে। আর নতুন করে কোনো জোটও করবে না আওয়ামী লীগ।’

বিএনপি নেতাদের নজর এখন বড় জোটের দিকে, যদিও নিজেদের দুটি জোটই রয়েছে নিষ্ক্রিয়। দীর্ঘদিন ২০ দলীয় জোটের কোনো বৈঠক হয় না, নেই কোনো কর্মসূচিও। তাদের আরেক জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টও দৃশ্যত অকার্যকর। নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন আদায়ে দেশের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলো নিয়ে ‘বৃহত্তর ঐক্য’ গড়ে ২২টি দলের সঙ্গে সংলাপ করেছে বিএনপি। এ ঐক্য গড়ার অংশ হিসেবে সম্প্রতি আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), মাহমুদুর রহমান মান্নার নেতৃত্বে নাগরিক ঐক্য, সাইফুল হকের নেতৃত্বে বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, জোনায়েদ সাকির নেতৃত্বে গণসংহতি আন্দোলন, ড. রেজা কিবরিয়ার নেতৃত্বে গণ-অধিকার পরিষদ, রফিকুল ইসলাম বাবলুর নেতৃত্বে ভাসানী অনুসারী পরিষদ ও অ্যাডভোকেট হাসনাত কাইয়ুমের নেতৃত্বে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন মিলে হয়েছে গণতন্ত্র মঞ্চ।

চারদলীয় জোটের পরিধি বাড়িয়ে প্রথমে ১৮ দল এবং ২০১২ সালে ২০ দলীয় জোট গঠন করে বিএনপি। ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে কামাল হোসেনের গণফোরাম, মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্য এবং আ স ম আবদুর রবের জেএসডিকে নিয়ে বিএনপি গঠন করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর বিএনপির পুরনো জোট ২০ দল গৌণ হয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়া এ জোট থেকে কেউ কেউ ছুটেও যায়।

সম্প্রতি দলের এক সভায় জোট ত্যাগের কথা বলেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। জোটের বর্তমান অবস্থা নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেন তিনি। এর জন্য বিএনপিকেই দোষারোপ করেন। আর আরেক শরিক দল কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বলেন, ‘জোট বলতে গেলে নেই। তবে এখন বিএনপি যুগপৎ আন্দোলনের কথা বলছে। দেখা যাক, পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়। আমরাও সেভাবে চিন্তা করব।’

বিএনপি জোটের অবস্থা নিয়ে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, ‘বৃহৎ প্ল্যাটফর্মে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে চাই আমরা। সেখানে বাম-ডান, গণতান্ত্রিক, দেশপ্রেমিক, রাজনৈতিক সব দলকে একত্র করতে চাই। সেই লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি। কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। আন্দোলনের গতিপ্রকৃতির নিরিখে যুগপৎ, নাকি স্ব স্ব মঞ্চ থেকে চলবে, তা নির্ধারণ হবে।’

গৃহদাহ সামলাতে ব্যস্ত জাপা
সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টিও (জাপা) সম্প্রতি জোট গড়ায় মনোযোগ দেয়। তবে বাগড়া দেয় দলের অন্তর্কোন্দল। দলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদ হঠাৎ কাউন্সিলের ডাক দেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের নেতৃত্বে এমপিরা তাকে সংসদের বিরোধীদলীয় নেতার পদ থেকে সরাতে স্পিকারকে চিঠি দেন। এ ঘটনার রেশ না কাটতেই বুধবার সাবেক মহাসচিব ও চিফ হুইফ মসিউর রহমান রাঙ্গাকে দল থেকে অব্যাহতি দেন জিএম কাদের। এসব টানাপড়েনের মধ্যেও জাপা জোট গড়তে বিএনপি ও অন্য বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে সুবিধামতো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান জাপা চেয়ারম্যান।

বাম ঐক্যে এক দফা টানাপড়েন
নিজেদের বাইরে অন্য দলের সঙ্গে জোট করা হবে কি না তা নিয়ে মতবিরোধ চলছে সরকারবিরোধী অবস্থান নিয়ে থাকা বাম গণতান্ত্রিক জোটে। চলতি বছরের মে মাসে দেশের বামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর মোর্চা বাম গণতান্ত্রিক জোটে গণসংহতি আন্দোলন ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সদস্যপদ স্থগিত করা হয়। কারণ গণতন্ত্র মঞ্চ নামে আলাদা প্ল্যাটফর্মে রয়েছে এ দুটি দল, যারা বিএনপির সঙ্গে বড় ঐক্য গড়ার পথে রয়েছে। তবে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে আমাদের কস্মিনকালেও জোট হতে পারে না। তারাও আমাদের আমন্ত্রণ জানানোর সাহস রাখে না।

নিজেদের মধ্যে সংলাপ করছে ইসলামি দলগুলো
সমমনা ইসলামি দলগুলো ইতিমধ্যে নিজেদের মধ্যে সংলাপ শুরু করেছে। মূলত ইসলামী আন্দোলনের পক্ষ থেকে এ সংলাপের উদ্যোগ নেওয়া হয়। দলটির মহাসচিব মাওলানা ইউনুস আহমদের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি টিম গঠন করা হয়েছে। তারা সমমনা দলগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক এবং অনানুষ্ঠানিক আলাপ-আলোচনা করছেন। ইতোমধ্যে খেলাফত আন্দোলন ও খেলাফত মজলিসের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা করেছেন। এ ছাড়া শিগগিরই অন্য দলের সঙ্গে সংলাপ হওয়ার কথা। তারা বলছেন, এবার দরকষাকষি করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।