ঢাকা ১০:৫৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৭ অক্টোবর ২০২২, ২২ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

নদীগর্ভে ভিটেবাড়ি, নৌকায় মানবেতর জীবন

একজন ঘরছাড়া ঠিকানাহীন মানুষের চেয়ে অসহায় এই পৃথিবীতে আর কেউ নয়। গৃহহীনরা পৃথিবীর সব দেশেই মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হন। অবহেলা আর বঞ্চনায় কাটে তাদের জীবন। আধুনিক যুগে মানুষ স্বপ্ন দেখে চাঁদে কিংবা বহুতল ভবনে বসবাস করার। ঠিক এমন সময়ে উপজেলার সিংপুর ইউনিয়নের ধনু নদীর তীরে অসুস্থ প্যারালাইসিস স্ত্রী পারভীন বেগম (৫২)-কে নিয়ে নৌকায় বসবাস করছেন তাহের আলী (৬০)। রান্না-খাওয়া সবকিছুই চলে নৌকাতে। ডাঙায় থাকা লোকজনের সঙ্গে নেই তার সম্পৃক্ততা।

উপজেলার সিংপুর ইউনিয়নের ভাটি ভড়াটিয়া গ্রামের মৃত রমজান আলীর ছেলে তাহের আলীর সঙ্গে পারভিন বেগমের বিয়ে হয় প্রায় ৪০ পূর্বে। তাদের দাম্পত্য জীবনে দুই ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। তাহের দিনমজুর ছিলেন। পূর্বপুরুষদের থাকার ভিটে বাড়িটি ২০১৬ সালে ধনু নদীর ভাঙনে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। সেই থেকে তিনি হয়ে পড়ন ভূমি ও সহায়সম্বলহীন। তার স্ত্রী পারভীন প্যারালাইসিস হয়ে পড়লে, তাহের আলীর জীবনে নেমে আসে অমাবস্যা। ছেলে-মেয়ে অন্যত্র চলে যায়। দিশেহারা তাহের আলী অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে পানিতে বসবাসের সিদ্ধান্ত নেন। সেই থেকে তার দিনানিপাত চলছে খরস্রোতা ধনু নদীর বুকে।

তাহের আর পারভীনের মাথা গুজার ঠাই হয় সামান্য ছোট্ট একটি ডিঙ্গি নৌকায়। এখানে দীর্ঘ পাঁচ বছর যাবত প্যারালাইসিস আক্রান্ত স্ত্রীকে নিয়ে যাযাবরের মতো জীবনযাপন করছেন। অল্প একটু সহায়তার আশায় এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে বিত্তবানদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ান তাহের আলী। প্রাকৃতিক দুর্যোগে বর্ষাকালে ধনু নদীর উত্তাল ঢেউয়ের ও শীতকালে তীব্র ঠান্ডার সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকতে হয়। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে গৃহহীন ও ভূমিহীনদের মাঝে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘরবাড়ির দলিল হস্তান্তর করা হলেও, তাহের আলীর এ করুণ অবস্থা নজরে আসেনি কোনো জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের। অসহায় অবলম্বনহীন তাহেরের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে পানি যন্ত্রণায়। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে যুদ্ধ করে টিকে থাকতে হয়। জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকা রণক্ষেত্রে টিকে থাকার চেয়েও কঠিন।

অনেকেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া উপহার জমিসহ ঘরবাড়ি পাচ্ছেন, আমি কেন পাচ্ছি না? দুবেলা খেয়ে না খেয়ে অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে পাঁচ বছর যাবত নৌকায় বসবাস করছি। কখন ঈদ আসে বলতে পারি না। টাকার অভাবে অসুস্থ স্ত্রীর চিকিৎসা করাতে পারছি না। স্থানীয় মেম্বার-চেয়ারম্যান আমার খোঁজ কখনো নেননি। সরকার যদি আমাকে একটু মাথা গুজার ঠাঁই দিত, তাহলে প্রাণে বেঁচে যেতাম। কান্নাজড়িত কণ্ঠে এ প্রতিনিধিকে জানান তাহের আলী।

সিংপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী বলেন, তাহের আলীর আইডি কার্ড নারায়ণগঞ্জ জেলায় হওয়ায় তাকে সরকারি সাহায্য-সহযোগিতা করা সম্ভব হচ্ছে না।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাকিলা পারভীন এ প্রতিনিধিকে বলেন, পািনতে বসবাসকারী তাহের আলীর অসুস্থ স্ত্রীকে স্থানীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের মাধ্যমে ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে তাকে প্রধানমন্ত্রীর গৃহায়ন আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় একটি ঘর দেওয়ার অনুমোদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

Tag :

নজিরবিহীন ধকল দক্ষিণ এশিয়ায় : বিশ্বব্যাংক

নদীগর্ভে ভিটেবাড়ি, নৌকায় মানবেতর জীবন

প্রকাশের সময় : ০৯:৪৩:০২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২২

একজন ঘরছাড়া ঠিকানাহীন মানুষের চেয়ে অসহায় এই পৃথিবীতে আর কেউ নয়। গৃহহীনরা পৃথিবীর সব দেশেই মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হন। অবহেলা আর বঞ্চনায় কাটে তাদের জীবন। আধুনিক যুগে মানুষ স্বপ্ন দেখে চাঁদে কিংবা বহুতল ভবনে বসবাস করার। ঠিক এমন সময়ে উপজেলার সিংপুর ইউনিয়নের ধনু নদীর তীরে অসুস্থ প্যারালাইসিস স্ত্রী পারভীন বেগম (৫২)-কে নিয়ে নৌকায় বসবাস করছেন তাহের আলী (৬০)। রান্না-খাওয়া সবকিছুই চলে নৌকাতে। ডাঙায় থাকা লোকজনের সঙ্গে নেই তার সম্পৃক্ততা।

উপজেলার সিংপুর ইউনিয়নের ভাটি ভড়াটিয়া গ্রামের মৃত রমজান আলীর ছেলে তাহের আলীর সঙ্গে পারভিন বেগমের বিয়ে হয় প্রায় ৪০ পূর্বে। তাদের দাম্পত্য জীবনে দুই ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। তাহের দিনমজুর ছিলেন। পূর্বপুরুষদের থাকার ভিটে বাড়িটি ২০১৬ সালে ধনু নদীর ভাঙনে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। সেই থেকে তিনি হয়ে পড়ন ভূমি ও সহায়সম্বলহীন। তার স্ত্রী পারভীন প্যারালাইসিস হয়ে পড়লে, তাহের আলীর জীবনে নেমে আসে অমাবস্যা। ছেলে-মেয়ে অন্যত্র চলে যায়। দিশেহারা তাহের আলী অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে পানিতে বসবাসের সিদ্ধান্ত নেন। সেই থেকে তার দিনানিপাত চলছে খরস্রোতা ধনু নদীর বুকে।

তাহের আর পারভীনের মাথা গুজার ঠাই হয় সামান্য ছোট্ট একটি ডিঙ্গি নৌকায়। এখানে দীর্ঘ পাঁচ বছর যাবত প্যারালাইসিস আক্রান্ত স্ত্রীকে নিয়ে যাযাবরের মতো জীবনযাপন করছেন। অল্প একটু সহায়তার আশায় এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে বিত্তবানদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ান তাহের আলী। প্রাকৃতিক দুর্যোগে বর্ষাকালে ধনু নদীর উত্তাল ঢেউয়ের ও শীতকালে তীব্র ঠান্ডার সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকতে হয়। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে গৃহহীন ও ভূমিহীনদের মাঝে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘরবাড়ির দলিল হস্তান্তর করা হলেও, তাহের আলীর এ করুণ অবস্থা নজরে আসেনি কোনো জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের। অসহায় অবলম্বনহীন তাহেরের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে পানি যন্ত্রণায়। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে যুদ্ধ করে টিকে থাকতে হয়। জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকা রণক্ষেত্রে টিকে থাকার চেয়েও কঠিন।

অনেকেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া উপহার জমিসহ ঘরবাড়ি পাচ্ছেন, আমি কেন পাচ্ছি না? দুবেলা খেয়ে না খেয়ে অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে পাঁচ বছর যাবত নৌকায় বসবাস করছি। কখন ঈদ আসে বলতে পারি না। টাকার অভাবে অসুস্থ স্ত্রীর চিকিৎসা করাতে পারছি না। স্থানীয় মেম্বার-চেয়ারম্যান আমার খোঁজ কখনো নেননি। সরকার যদি আমাকে একটু মাথা গুজার ঠাঁই দিত, তাহলে প্রাণে বেঁচে যেতাম। কান্নাজড়িত কণ্ঠে এ প্রতিনিধিকে জানান তাহের আলী।

সিংপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী বলেন, তাহের আলীর আইডি কার্ড নারায়ণগঞ্জ জেলায় হওয়ায় তাকে সরকারি সাহায্য-সহযোগিতা করা সম্ভব হচ্ছে না।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাকিলা পারভীন এ প্রতিনিধিকে বলেন, পািনতে বসবাসকারী তাহের আলীর অসুস্থ স্ত্রীকে স্থানীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের মাধ্যমে ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে তাকে প্রধানমন্ত্রীর গৃহায়ন আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় একটি ঘর দেওয়ার অনুমোদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।