ঢাকা ০৯:৪৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৫ অক্টোবর ২০২২, ২০ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

রাজনৈতিক অস্থিরতায় জঙ্গি উত্থানের শঙ্কা!

নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে পালস্না দিয়ে আগামীতে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ সুযোগে ঘাপটি মেরে থাকা জঙ্গিরা ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে; নিজেদের শক্তিশালী অবস্থানের জানান দিতে সশস্ত্র সন্ত্রাসী এ গোষ্ঠী বড় ধরনের

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এখনও বছর দেড়েক বাকি থাকলেও এরই মধ্যে রাজপথ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও রাজনৈতিক সংঘাত-সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সেদিকেই বেশি তৎপর থাকতে হচ্ছে। নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে পালস্না দিয়ে আগামীতে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ সুযোগে ঘাপটি মেরে থাকা জঙ্গিরা ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে; নিজেদের শক্তিশালী অবস্থানের জানান দিতে সশস্ত্র সন্ত্রাসী এ গোষ্ঠী বড় ধরনের নাশকতার ঘটনা ঘটাতে পারে। এ আশঙ্কা প্রকাশ করে সরকারের একটি দায়িত্বশীল গোয়েন্দা সংস্থা সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন দাখিল করেছে।

এতে বলা হয়েছে, সরকার বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো যেভাবে এখনই রাজপথ উত্তপ্ত করে রেখেছে, তাতে নির্বাচনের আগে বেশ কয়েক মাস রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বেশি ব্যস্ত থাকতে হবে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই জঙ্গি দমনে তাদের তৎপরতা কিছুটা কমার সম্ভাবনা রয়েছে। আর ওই সুযোগে জঙ্গিরা ফের সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। এ আশঙ্কা মাথায় রেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সতর্ক থাকার পাশাপাশি এ ব্যাপারে আগাম প্রস্তুতি রাখার সুপারিশ করেছেন গোয়েন্দারা।

মাঠপর্যায়ের গোয়েন্দারা জানান,র্ যাব-পুলিশ ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতায় দেশে জঙ্গি নেটওয়ার্ক পুরোপুরি ভেঙে পড়লেও এ গোষ্ঠীর বেশকিছু নেতা এখনও দেশে-বিদেশে ঘাপটি মেরে আছে। তারা নিজেদের সংগঠিত করতে নানা তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। ক্লোজড গ্রম্নপের মাধ্যমে অত্যন্ত গোপনে তরুণদের মগজ ধোলাই কার্যক্রম চলিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে আনাসারুলস্নাহ বাংলা টিম (এটিবি) সবচেয়ে বেশি সক্রিয় রয়েছে। এবিটির মতাদর্শে বিশ্বাসী হয়ে এরই মধ্যে বেশকিছু তরুণ জঙ্গি কর্মকান্ডে যুক্ত হতে বাড়ি ছেড়েছে। তাদের একাধিক জন এরই মধ্যে গোয়েন্দাদের হাতে ধরা পড়ে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, জঙ্গিরা সংঘবদ্ধ না হয়ে এককভাবে বিচ্ছিন্ন বড় হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম বলেন, জঙ্গিরা সবসময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি তীক্ষ্ন দৃষ্টি রাখে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা যখন রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলা বা বিশেষ কোনো বিষয়ে ব্যস্ত থাকেন, তখন জঙ্গিদের বিষয়ে নজরদারি স্বভাবতই কমে যায়। জঙ্গিরা ওই সুযোগ কাজে লাগানোর চেষ্টা করে। তবে এবার জঙ্গিরা যাতে সম্ভাব্য রাজনৈতিক সংকটের সুযোগ নিতে না পারে সেজন্য আগে থেকেই পরিকল্পিতভাবে অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট (এটিইউ) এবং কাউন্টার টোরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) প্রস্তুত রয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুরো পুলিশ বাহিনী নিয়োজিত হলেও এটিইউ এবং সিটিটিসি এর বাইরে থাকবে। তারা জঙ্গি বিরোধী কার্যক্রমে সক্রিয় থাকবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জঙ্গি সদস্যরা কোনো বড় হামলা চালানোর আগে বাড়ি থেকে

॥হ’হিজরত’ করে। হোলি আর্টিজান হামলার আগেও তারা হিজরত করেছিল। ওই সময়ের হিজরতকারীরা ছিল মূলত নব্য জেএমবির সদস্য। সাম্প্রতিক সময়ে যারা হিজরত করছে তারা আনসার আল ইসলামের সদস্য। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে একের পর এক হিজরতের ঘটনা ঘটলেও সব তথ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে আসছে না। যেসব পরিবারের অভিভাবক তাদের সন্তানদের উদ্ধারের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা চাচ্ছেন কেবল তাদের তথ্যই গোয়েন্দারা পাচ্ছেন। তবে সম্প্রতি কুমিলস্না থেকে একসঙ্গে সাত এবং সিলেট থেকে কাছাকাছি সময়ে নয় তরুণের নিখোঁজের পর আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা নড়েচড়ে বসেছেন।

উলেস্নখ্য, ‘হিজরতের’ উদ্দেশ্যে বের হওয়ার কথা জানিয়ে গত ২৩ আগস্ট মো. ইমতিয়াজ আহম্মেদ ওরফে রিফাত, নিহাল আবদুলস্নাহ, মো. আমিনুল ইসলাম ওরফে আল আমিন, সরতাজ ইসলাম ওরফে নিলয়, ইমরান বিন রহমান ওরফে শিথিল, মো. হাসিবুল ইসলাম ও আস সামী নামে কুমিলস্নার বিভিন্ন এলাকার সাত তরুণ একযোগে নিখোঁজ হন। এ ঘটনায় তাদের অভিভাবকরা কুমিলস্না ও ঢাকার পৃথক থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন।

নিখোঁজদের মধ্যে ইমতিয়াজ আহম্মেদ কুমিলা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। তার গ্রামের বাড়ি কুমিলস্নার মুরাদনগরে। নিহাল আবদুলস্নাহ কুমিলস্না সরকারি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র। কুমিলস্না শহরের অশোকতলায় তার বাসা। আমিনুল ইসলাম ওরফে আল আমিন কুমিলস্না ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ইসলাম শিক্ষা চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। তার বাড়ি কুমিলস্নার আদর্শ সদর উপজেলার বড় আলমপুর গ্রামে। তবে তিনি কুমিলস্না শহরের ঝাউতলা এলাকার বাসায় থাকতেন। সরতাজ ইসলাম ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করেছেন। ইমরান বিন রহমান ওরফে শিথিল কুমিলস্না ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ছাত্র। বাসা কুমিলস্না শহরে।

কুমিলস্না থেকে নিখোঁজ কাউকে খুঁজে পাওয়া না গেলেও তাদের পথ অনুসরণ করে ঘর ছেড়ে যাওয়ার সময় ৫ সেপ্টেম্বর অন্য চার কিশোরকে আটক করের্ যাব। তাদের ডি-ল্যাডিকালাইজেশনের পর ৬ সেপ্টেম্বর পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।র্ যাব কর্মকর্তারা জানান, নিখোঁজ তরুণদের সন্ধান চেয়ে গত ২৫ আগস্টর্ যাবের কাছে আবেদন করে তাদের পরিবারের সদস্যরা। তাদের বয়স ১৬ থেকে ১৭-এর মধ্যে। তাদের সঙ্গে নিখোঁজ সাতজনের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল।

সূত্র মতে, চলতি বছরের শুরুতে সিলেট থেকে যে ৯ তরুণ নিখোঁজ হয়েছেন তাদের মধ্যে অন্যতম লিডিং ইউনিভার্সিটির ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের (ট্রিপল-ই) ছাত্র শেখ আহমদ মামুন (২০)। তাকে উদ্ধারের জন্য পরিবারের সদস্যরা থানায় জিডি করলেও এখনও তার হদিস মেলেনি। মামুনের সঙ্গে একই দিন ঘর ছেড়েছিলেন সিলেটের আরও তিন তরুণ। তারা এখনও অধরা। এছাড়া কাছাকাছি সময়ে সিলেট থেকে আরও ৫ জন নিখোঁজ হন।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ও কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান আসাদুজ্জামান বলেন, ‘জঙ্গিবাদে ধাবিত হয়ে কেউ কেউ ”হিজরত” করছে। হিজরতকারীদের আমরা নিয়মিতভাবে খুঁজে বের করছি। সিটিটিসি প্রতি মাসেই দুই-একজনকে বের করে। যারা প্রাথমিক অবস্থায় থাকে তাদেরকে বুঝিয়ে আমার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করি। নিজের এবং পরিবারের নিরাপত্তার কারণে আমরা এগুলো প্রকাশ করি না। তবে যাদেরকে বুঝিয়ে ভালো পথে আনা না যায়, তাদের বিরুদ্ধে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নিই।’

যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার লে. কর্নেল খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘কুমিলস্না এবং সিলেট থেকে একযোগে কয়েকজন নিখোঁজ হওয়া ছাড়াও বিচ্ছিন্নভাবে আরও অনেকে নিখোঁজ হচ্ছেন বলে আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে। সম্প্রতি যাদের উদ্ধার করা হয়েছে তাদের কাছ থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। যারা নিখোঁজ রয়েছেন, তাদের উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি যারা তরুণদের মগজ ধোলাই করে বিপথে পরিচালিত করছে তাদেরকেও আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।’

কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘বিশেষ অ্যাপের মাধ্যমে তারা একটি ক্লোজড গ্রম্নপ বজায় রাখছে। আর সে কারণেই মূলত অনুসন্ধানী কার্যক্রমের মাধ্যমে তাদের তথ্য খুঁজে বের করাটা এখন পর্যন্ত একটু কষ্টসাধ্য। তবে আমাদের গোয়েন্দারা কাজ করে যাচ্ছে। তাদেরকে শনাক্ত করতে আমাদের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশে ফের জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটলে মানি লন্ডারিংয়ের ঘটনা আরও বাড়বে। হুন্ডি, বাট্টা ইত্যাদির মাধ্যমে দেশে বিদেশে অর্থ লেনদেন হবে, পাচার হবে। ধীরে ধীরে রেমিট্যান্সের পরিমাণ কমে আসবে, রিজার্ভে সংকট দেখা দেবে। রিজার্ভ সংকট ঘটলে বাংলাদেশের স্থিতাবস্থা নষ্ট হয়ে যাবে। জঙ্গিদের হাতে নিয়ন্ত্রণ চলে গেলে সরকারের ভারসাম্য নষ্ট হবে, দেশের ভেতরে গভীর সংকটের সৃষ্টি হবে।’

এই অপরাধ বিশেষজ্ঞ মনে করেন, জঙ্গিদের দৌরাত্ম্য বৃদ্ধি পেলে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পের লেলিহান শিখায় সাধারণ জনগণের জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে, সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা বাড়বে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির উত্থান হবে, দখলদারিত্বের রাজনীতি বাড়বে এবং দেশীয় উৎপাদন কমে যাবে। বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাবে, অর্থনীতিতে ধস নামবে। ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতির আবির্ভাব ঘটবে। তাই শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীই নয়, সাধারণ মানুষকেও এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।

Tag :

জাতীয় গ্রিডে বিপর্যয়ের ঘটনা বিদ্যুৎ খাতসহ সরকারের সার্বিক ব্যর্থতা: মির্জা ফখরুল।

রাজনৈতিক অস্থিরতায় জঙ্গি উত্থানের শঙ্কা!

প্রকাশের সময় : ০৯:৫৮:৫৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২২

নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে পালস্না দিয়ে আগামীতে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ সুযোগে ঘাপটি মেরে থাকা জঙ্গিরা ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে; নিজেদের শক্তিশালী অবস্থানের জানান দিতে সশস্ত্র সন্ত্রাসী এ গোষ্ঠী বড় ধরনের

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এখনও বছর দেড়েক বাকি থাকলেও এরই মধ্যে রাজপথ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও রাজনৈতিক সংঘাত-সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সেদিকেই বেশি তৎপর থাকতে হচ্ছে। নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে পালস্না দিয়ে আগামীতে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ সুযোগে ঘাপটি মেরে থাকা জঙ্গিরা ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে; নিজেদের শক্তিশালী অবস্থানের জানান দিতে সশস্ত্র সন্ত্রাসী এ গোষ্ঠী বড় ধরনের নাশকতার ঘটনা ঘটাতে পারে। এ আশঙ্কা প্রকাশ করে সরকারের একটি দায়িত্বশীল গোয়েন্দা সংস্থা সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন দাখিল করেছে।

এতে বলা হয়েছে, সরকার বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো যেভাবে এখনই রাজপথ উত্তপ্ত করে রেখেছে, তাতে নির্বাচনের আগে বেশ কয়েক মাস রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বেশি ব্যস্ত থাকতে হবে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই জঙ্গি দমনে তাদের তৎপরতা কিছুটা কমার সম্ভাবনা রয়েছে। আর ওই সুযোগে জঙ্গিরা ফের সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। এ আশঙ্কা মাথায় রেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সতর্ক থাকার পাশাপাশি এ ব্যাপারে আগাম প্রস্তুতি রাখার সুপারিশ করেছেন গোয়েন্দারা।

মাঠপর্যায়ের গোয়েন্দারা জানান,র্ যাব-পুলিশ ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতায় দেশে জঙ্গি নেটওয়ার্ক পুরোপুরি ভেঙে পড়লেও এ গোষ্ঠীর বেশকিছু নেতা এখনও দেশে-বিদেশে ঘাপটি মেরে আছে। তারা নিজেদের সংগঠিত করতে নানা তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। ক্লোজড গ্রম্নপের মাধ্যমে অত্যন্ত গোপনে তরুণদের মগজ ধোলাই কার্যক্রম চলিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে আনাসারুলস্নাহ বাংলা টিম (এটিবি) সবচেয়ে বেশি সক্রিয় রয়েছে। এবিটির মতাদর্শে বিশ্বাসী হয়ে এরই মধ্যে বেশকিছু তরুণ জঙ্গি কর্মকান্ডে যুক্ত হতে বাড়ি ছেড়েছে। তাদের একাধিক জন এরই মধ্যে গোয়েন্দাদের হাতে ধরা পড়ে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, জঙ্গিরা সংঘবদ্ধ না হয়ে এককভাবে বিচ্ছিন্ন বড় হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম বলেন, জঙ্গিরা সবসময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি তীক্ষ্ন দৃষ্টি রাখে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা যখন রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলা বা বিশেষ কোনো বিষয়ে ব্যস্ত থাকেন, তখন জঙ্গিদের বিষয়ে নজরদারি স্বভাবতই কমে যায়। জঙ্গিরা ওই সুযোগ কাজে লাগানোর চেষ্টা করে। তবে এবার জঙ্গিরা যাতে সম্ভাব্য রাজনৈতিক সংকটের সুযোগ নিতে না পারে সেজন্য আগে থেকেই পরিকল্পিতভাবে অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট (এটিইউ) এবং কাউন্টার টোরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) প্রস্তুত রয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুরো পুলিশ বাহিনী নিয়োজিত হলেও এটিইউ এবং সিটিটিসি এর বাইরে থাকবে। তারা জঙ্গি বিরোধী কার্যক্রমে সক্রিয় থাকবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জঙ্গি সদস্যরা কোনো বড় হামলা চালানোর আগে বাড়ি থেকে

॥হ’হিজরত’ করে। হোলি আর্টিজান হামলার আগেও তারা হিজরত করেছিল। ওই সময়ের হিজরতকারীরা ছিল মূলত নব্য জেএমবির সদস্য। সাম্প্রতিক সময়ে যারা হিজরত করছে তারা আনসার আল ইসলামের সদস্য। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে একের পর এক হিজরতের ঘটনা ঘটলেও সব তথ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে আসছে না। যেসব পরিবারের অভিভাবক তাদের সন্তানদের উদ্ধারের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা চাচ্ছেন কেবল তাদের তথ্যই গোয়েন্দারা পাচ্ছেন। তবে সম্প্রতি কুমিলস্না থেকে একসঙ্গে সাত এবং সিলেট থেকে কাছাকাছি সময়ে নয় তরুণের নিখোঁজের পর আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা নড়েচড়ে বসেছেন।

উলেস্নখ্য, ‘হিজরতের’ উদ্দেশ্যে বের হওয়ার কথা জানিয়ে গত ২৩ আগস্ট মো. ইমতিয়াজ আহম্মেদ ওরফে রিফাত, নিহাল আবদুলস্নাহ, মো. আমিনুল ইসলাম ওরফে আল আমিন, সরতাজ ইসলাম ওরফে নিলয়, ইমরান বিন রহমান ওরফে শিথিল, মো. হাসিবুল ইসলাম ও আস সামী নামে কুমিলস্নার বিভিন্ন এলাকার সাত তরুণ একযোগে নিখোঁজ হন। এ ঘটনায় তাদের অভিভাবকরা কুমিলস্না ও ঢাকার পৃথক থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন।

নিখোঁজদের মধ্যে ইমতিয়াজ আহম্মেদ কুমিলা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। তার গ্রামের বাড়ি কুমিলস্নার মুরাদনগরে। নিহাল আবদুলস্নাহ কুমিলস্না সরকারি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র। কুমিলস্না শহরের অশোকতলায় তার বাসা। আমিনুল ইসলাম ওরফে আল আমিন কুমিলস্না ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ইসলাম শিক্ষা চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। তার বাড়ি কুমিলস্নার আদর্শ সদর উপজেলার বড় আলমপুর গ্রামে। তবে তিনি কুমিলস্না শহরের ঝাউতলা এলাকার বাসায় থাকতেন। সরতাজ ইসলাম ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করেছেন। ইমরান বিন রহমান ওরফে শিথিল কুমিলস্না ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ছাত্র। বাসা কুমিলস্না শহরে।

কুমিলস্না থেকে নিখোঁজ কাউকে খুঁজে পাওয়া না গেলেও তাদের পথ অনুসরণ করে ঘর ছেড়ে যাওয়ার সময় ৫ সেপ্টেম্বর অন্য চার কিশোরকে আটক করের্ যাব। তাদের ডি-ল্যাডিকালাইজেশনের পর ৬ সেপ্টেম্বর পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।র্ যাব কর্মকর্তারা জানান, নিখোঁজ তরুণদের সন্ধান চেয়ে গত ২৫ আগস্টর্ যাবের কাছে আবেদন করে তাদের পরিবারের সদস্যরা। তাদের বয়স ১৬ থেকে ১৭-এর মধ্যে। তাদের সঙ্গে নিখোঁজ সাতজনের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল।

সূত্র মতে, চলতি বছরের শুরুতে সিলেট থেকে যে ৯ তরুণ নিখোঁজ হয়েছেন তাদের মধ্যে অন্যতম লিডিং ইউনিভার্সিটির ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের (ট্রিপল-ই) ছাত্র শেখ আহমদ মামুন (২০)। তাকে উদ্ধারের জন্য পরিবারের সদস্যরা থানায় জিডি করলেও এখনও তার হদিস মেলেনি। মামুনের সঙ্গে একই দিন ঘর ছেড়েছিলেন সিলেটের আরও তিন তরুণ। তারা এখনও অধরা। এছাড়া কাছাকাছি সময়ে সিলেট থেকে আরও ৫ জন নিখোঁজ হন।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ও কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান আসাদুজ্জামান বলেন, ‘জঙ্গিবাদে ধাবিত হয়ে কেউ কেউ ”হিজরত” করছে। হিজরতকারীদের আমরা নিয়মিতভাবে খুঁজে বের করছি। সিটিটিসি প্রতি মাসেই দুই-একজনকে বের করে। যারা প্রাথমিক অবস্থায় থাকে তাদেরকে বুঝিয়ে আমার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করি। নিজের এবং পরিবারের নিরাপত্তার কারণে আমরা এগুলো প্রকাশ করি না। তবে যাদেরকে বুঝিয়ে ভালো পথে আনা না যায়, তাদের বিরুদ্ধে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নিই।’

যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার লে. কর্নেল খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘কুমিলস্না এবং সিলেট থেকে একযোগে কয়েকজন নিখোঁজ হওয়া ছাড়াও বিচ্ছিন্নভাবে আরও অনেকে নিখোঁজ হচ্ছেন বলে আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে। সম্প্রতি যাদের উদ্ধার করা হয়েছে তাদের কাছ থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। যারা নিখোঁজ রয়েছেন, তাদের উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি যারা তরুণদের মগজ ধোলাই করে বিপথে পরিচালিত করছে তাদেরকেও আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।’

কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘বিশেষ অ্যাপের মাধ্যমে তারা একটি ক্লোজড গ্রম্নপ বজায় রাখছে। আর সে কারণেই মূলত অনুসন্ধানী কার্যক্রমের মাধ্যমে তাদের তথ্য খুঁজে বের করাটা এখন পর্যন্ত একটু কষ্টসাধ্য। তবে আমাদের গোয়েন্দারা কাজ করে যাচ্ছে। তাদেরকে শনাক্ত করতে আমাদের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশে ফের জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটলে মানি লন্ডারিংয়ের ঘটনা আরও বাড়বে। হুন্ডি, বাট্টা ইত্যাদির মাধ্যমে দেশে বিদেশে অর্থ লেনদেন হবে, পাচার হবে। ধীরে ধীরে রেমিট্যান্সের পরিমাণ কমে আসবে, রিজার্ভে সংকট দেখা দেবে। রিজার্ভ সংকট ঘটলে বাংলাদেশের স্থিতাবস্থা নষ্ট হয়ে যাবে। জঙ্গিদের হাতে নিয়ন্ত্রণ চলে গেলে সরকারের ভারসাম্য নষ্ট হবে, দেশের ভেতরে গভীর সংকটের সৃষ্টি হবে।’

এই অপরাধ বিশেষজ্ঞ মনে করেন, জঙ্গিদের দৌরাত্ম্য বৃদ্ধি পেলে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পের লেলিহান শিখায় সাধারণ জনগণের জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে, সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা বাড়বে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির উত্থান হবে, দখলদারিত্বের রাজনীতি বাড়বে এবং দেশীয় উৎপাদন কমে যাবে। বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাবে, অর্থনীতিতে ধস নামবে। ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতির আবির্ভাব ঘটবে। তাই শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীই নয়, সাধারণ মানুষকেও এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।