ঢাকা ০৫:১৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০১ অক্টোবর ২০২২, ১৫ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

বৃত্তবন্দি ঢাকার বৃত্তাকার পথ

রাজধানী ঢাকার চারপাশে বৃত্তাকার পথ চালুর চিন্তা দীর্ঘদিনের। এর ফলে সড়কপথে শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যাওয়ার গাড়ি নগরীতে প্রবেশ করতে হবে না। তাতে কমে যাবে রাজধানীর যানজট। আরেকটি যুক্তি হচ্ছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে পদ্মা সেতুতে যাওয়ার গাড়ির শহরের ভেতর দিয়ে ঢুকতে হবে না। গাবতলী কিংবা টঙ্গী থেকে আসা গাড়িও ঢাকা শহর এড়িয়ে পদ্মা সেতু হয়ে দক্ষিণাঞ্চলে যেতে পারবে। কিন্তু সময়মতো কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় এ গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের কার্যক্রম আটকে আছে।

জানা গেছে, জাপান, এডিবিসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করেও অর্থায়নে সাড়া মেলেনি। এর মধ্যে বৃত্তাকার পথের ইনার সার্কুলার রুটের একটি অংশ এখন এআইআইবির (এশিয়া অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক) মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে।

অন্যদিকে, বৃত্তাকার সড়কপথ ঘিরে রেললাইন নির্মাণে সমীক্ষা হলেও দাতা সংস্থার সাড়া নেই। ফলে সমীক্ষার টাকাটাই এক রকম জলে গেছে। এ ছাড়া বৃত্তাকার নৌপথ চালু হলেও সেতুর উচ্চতার ঘাটতিসহ নানা সীমাবদ্ধতায় তা বন্ধ হয়ে যায়। সর্বশেষ ১০ সেপ্টেম্বর দুটি রুটে স্পিডবোট চালু করলেও কাক্সিক্ষত সাড়া নেই। অথচ যথাযথ পদক্ষেপ নিতে পারলে নৌপথ দিয়ে পণ্য ও যাত্রী পরিবহন সাশ্রয়ী হতো।

জানা গেছে, গত ২৫ জুন পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর গাবতলী, মহাখালী, টঙ্গী বা উত্তরার গাড়ি পদ্মা সেতুতে সহজে যেতে পারছে না। কেবল সায়েদাবাদ ও যাত্রাবাড়ী এলাকা দিয়ে চলাচলের কারণে ওই অঞ্চলে তীব্র যানজট তৈরি হয়। এর জেরে মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারেও গাড়ি আটকে থাকে। অথচ বৃত্তাকার সড়কপথটি চালু হলে অনায়াসে পদ্মা পাড়ি দেওয়া সম্ভব হতো।

রাজধানীর পরিবহন পরিকল্পনায় (এসটিপি) ঢাকায় ইনার ও আউটার সার্কুলার দুই ধরনের বৃত্তাকার সড়ক গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। এর সঙ্গে বৃত্তাকার নৌ ও রেলপথ তৈরির কথা রয়েছে। এ ছাড়া রাজধানীতে যানবাহনের চাপ কমানো এবং নৌপথে সাশ্রয়ীমূল্যে যাত্রী ও মালামাল পরিবহন ব্যবস্থা চালু করার লক্ষ্যে কয়েকটি ধাপে ঢাকার চারটি নদীর ১১০ কিলোমিটারে নৌপথে নৌযান পরিচালনার পদক্ষেপ নেওয়া হয় ২০০০ সালে। কিন্তু বৃত্তাকার নৌপথে ২০০৪, ২০১০, ২০১৩ ও ২০১৪ সালে চার দফা ওয়াটার বাস ও লঞ্চ নামানো হলেও সব কটি অল্প দিনের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায়।

নৌমন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃক বৃত্তাকার নৌপথের নদী খননসহ নয়টি ল্যান্ডিং স্টেশন নির্মাণের মাধ্যমে নৌপথটি চালু করা হয়। বর্তমানে এ নৌপথে মালামাল পরিবহন ব্যবস্থায় গুরুত্ব পেলেও কম উচ্চতার সেতু, অতিরিক্ত সময় এবং পরিবেশের অভাবের কারণে সাশ্রয়ীমূল্যে ও যাত্রীবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তী সময়ে বিআইডব্লিউটিসি কর্তৃক ওয়াটার বাস চালু করা হলেও বিভিন্ন কারণে তা বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। গত ১০ সেপ্টেম্বর পাঁচটি দ্রুতগামী স্পিডবোট দিয়ে টঙ্গী নদী বন্দর থেকে ঢাকা বৃত্তাকার নৌপথে স্পিডবোট সার্ভিস চালু করা হয়েছে। পদ্মা সেতু নির্মাণের ফলে মাওয়ায় অলস বসে থাকা স্পিডবোট দিয়ে এ কার্যক্রম চালু হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে টঙ্গী, আব্দুল্লাহপুর ও কড্ডা এবং টঙ্গী, আব্দুল্লাহপুর ও উলুখোলা (কালীগঞ্জ)- এই দুটি রুটে স্পিডবোট চলাচল করবে। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চাহিদা বাড়লে বৃত্তাকার পথে নতুন নৌপথ সৃষ্টি করে স্পিডবোট চালুর আরও পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

এদিকে সবচেয়ে দরকারি বৃত্তাকার সড়কপথ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিশেষজ্ঞরা কথা বলছেন। কিন্তু গুরুত্ব পায়নি। ঢাকা শহর ঘিরে ৮৮ দশমিক ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ইনার সার্কুলার রুট দুটি ভাগে বাস্তবায়নের কথা। ইনার সার্কুলার রুট ফেজ ১-এর আওতায় আবদুল্লাহপুর রেলগেট থেকে তেরমুখ, পূর্বাচল, বেরাইদ, ডেমরা পর্যন্ত ২৫ দশমিক ৮ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করা হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে নতুন করে এই অংশে সড়ক নির্মাণ করতে হবে, যা সময়সাপেক্ষ।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) জানায়, আবদুল্লাহপুর রেলগেট থেকে ধউর, বিরুলিয়া, গাবতলী, বছিলা, হাজারীবাগ, সোয়ারীঘাট, কদমতলী, তেঘরিয়া, পোস্তগোলা, ফতুল্লা, চাষাঢ়া, শিমরাইল হয়ে ডেমরা পর্যন্ত ৬৩ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করা হবে ইনার সার্কুলার রুট ফেজ ২-এর আওতায়। এখানে আগে থেকেই সড়ক আছে, যা প্রশস্ত করতে হবে। তবে সাকল্যে সড়ক নির্মাণ করতে হবে ৪৭ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। কারণ তেঘরিয়া থেকে পোস্তগোলা পর্যন্ত সাড়ে ৮ কিলোমিটার পথ ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের অংশ এবং আবদুল্লাহপুর রেলগেট থেকে ধউর পর্যন্ত ৮ কিলোমিটার পথ নির্মাণ করছে সেতু কর্তৃপক্ষ, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের আওতায়। এজন্য ১২ হাজার ১২৫ কোটি টাকা ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছিল। কিন্তু বেশিদূর অগ্রসর হয়নি। এখন এ অংশটি দুই ধাপে বাস্তবায়ন করতে চায় সওজ। এর মধ্যে জিওবি অর্থায়নে ২৫ কিলোমিটার এবং বাকি ২১ কিলোমিটারের কিছু বেশি অংশ নির্মাণ করা হতে পারে এআইআইবির (এশিয়া অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংক) অর্থায়নে। এ পরিকল্পনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের ঢাকা জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সবুজউদ্দিন খান।

সওজের তথ্য মতে, ১৯৮৭ সালে আবদুল্লাহপুর থেকে সোয়ারীঘাট পর্যন্ত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ করা হয়, যা বেড়িবাঁধ নামে পরিচিত। এর ওপরে বর্তমানে দুই লেনের সড়ক রয়েছে। দুই পাশে বাঁধের বিস্তর জমি রয়েছে। সওজের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইনার সার্কুলার রুট সব মিলিয়ে ২২০ ফুট পর্যন্ত প্রশস্ত হবে। ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের আদলে চার লেনের মূল সড়কের দুই পাশে থাকবে ধীরগতির যান চলাচলের জন্য পৃথক লেন। মূল সড়কে উভয়মুখী ৯ দশমিক ৮ মিটার প্রশস্ত ডাবল লেন থাকবে। মূল সড়কের দুপাশে দেড় মিটার চওড়া শোল্ডার থাকবে। এর পর থাকবে ধীরগতির যান চলাচলে ৬ দশমিক ২ মিটার চওড়া সড়ক। সড়কের দুপাশেই সার্ভিস লেনের পর তিন মিটার করে জায়গা খালি রাখা হবে। এক পাশে ১০ মিটার জায়গা খালি রাখা হবে ভবিষ্যতে মেট্রোরেল নির্মাণের জন্য।

বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান বলেন, সরকারের পরিবহন পরিকল্পনায় পদ্মা সেতুর কথা চিন্তা করেই রিং রোড ও বৃত্তাকার পথ রাখা হয়েছিল। এটি করতে পারলে রাজধানীর ভেতর দিয়ে গাড়ির চাপ পড়বে না। শহরের বাইরে দিয়ে এক প্রান্তের গাড়ি অন্য প্রান্তে যেতে পারবে।

রেল সূত্র জানায়, রাজধানী ঢাকাকে ঘিরে বৃত্তাকার রেলপথ নির্মাণ করবে বাংলাদেশ রেলওয়ে। এজন্য সরকারি অর্থায়নে ইতিমধ্যে ২৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকায় প্রকল্পের সমীক্ষা করা হয়েছে। সেখানে ৮০ দশমিক ৮৯ কিলোমিটার ইলেক্ট্রিক রেলপথ নির্মাণের কথা বলা হয়। বৃত্তাকার রেলপথের পুরোটা একবার ঘুরতে ট্রেনের এক ঘণ্টা ৭ মিনিট সময় লাগবে। এজন্য প্রায় ৭১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে। প্রতিদিন ১৬৪ জোড়া অর্থাৎ ৩২৮টি ট্রেন চলতে পারবে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে (পিপিপি) সার্কুলার রেলপথ নির্মাণের কথা জানিয়েছেন রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন। তবে ২০১৯ সালে অর্থনৈতিক বিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের পর এখনো আগ্রহ দেখায়নি কেউ। বিনিয়োগকারী বা দাতা সংস্থা কারও তরফ থেকে আগ্রহের কথা জানা যায়নি।

সমীক্ষা প্রতিবেদন উপস্থাপনকালে বলা হয়, বৃত্তাকার রেলপথের প্রতি কিলোমিটারে ৮৭৯ কোটি টাকা ব্যয় হবে। সড়কের পাশ দিয়ে এই রেলপথ নির্মাণ করতে চায় রেলওয়ে। প্রস্তাবিত সার্কুলার রেলপথের স্টেশনগুলো হবে ধউর, উত্তরা, চিড়িয়াখানা, চিড়িয়াখানা দক্ষিণ, গাবতলী, মোহাম্মদপুর, রায়েরবাজার, কামরাঙ্গীরচর, সদরঘাট, পোস্তগোলা, পাগলা, ফতুল্লা, চাষাড়া, চিত্তরঞ্জন, আদমজী, সিদ্ধিরগঞ্জ, ডেমরা, ত্রিমোহনী, বেরাইদ, পূর্বাঞ্চল, পূর্বাঞ্চল উত্তর, ত্রিমুখ, টঙ্গী ও বিশ্ব ইজতেমা মাঠ। অর্থাৎ বিশ্ব ইজতেমা মাঠ থেকে শুরু হয়ে ঢাকাকে ঘিরে নারায়ণগঞ্জ হয়ে ফের বিশ্ব ইজতেমায় এসে শেষ হবে এ রেলপথ। গাবতলী, সদরঘাট ও পোস্তগোলা স্টেশন হবে পাতালে। রেলওয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়, বৃত্তাকার রেলপথ চালু হলে ঢাকা শহরের ভেতরে প্রবেশ না করেই যাত্রীরা এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে পারবেন। যানজট কমবে, মানুষের দুর্ভোগও পোহাতে হবে না।

সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রস্তাবিত সার্কুলার রেলপথের ৭০ দশমিক ৯৯ কিলোমিটার রেলপথ হবে এলিভেটেড (উড়াল)। বাকি ৯ দশমিক ৯ কিলোমিটার রেলপথ হবে পাতাল। প্রস্তাবিত এ রেলপথে ২৪টি স্টেশন হবে। এর মধ্যে ২১টি এলিভেটেড এবং তিনটি হবে পাতাল। ১১টি স্টেশন যুক্ত হবে মেট্রোরেলের সঙ্গে। একটি যুক্ত হবে সদরঘাটের সঙ্গে। বৃত্তাকার রেলপথের সম্ভাব্য রুট নির্ধারণ ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে ২০১৯ সালের ৩০ এপ্রিল ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি করে রেলওয়ে। চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে সিয়ুয়ান সার্ভে অ্যান্ড ডিজাইন গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেড এবং বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান বেটস কনসাল্টিং সার্ভিসেস লিমিটেড ও ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যান্ড অ্যাডভাইজারস লিমিটেড যৌথভাবে এ সমীক্ষা করেছে। সরকারি অর্থায়নে এ সমীক্ষা করা হয়।

Tag :
জনপ্রিয়

হোসেনপুর বাজার সনাতন ধর্মাবলম্বী ব্যাবসায়িকদের উদ্যোগে বস্ত্র বিতরণ

বৃত্তবন্দি ঢাকার বৃত্তাকার পথ

প্রকাশের সময় : ১০:০৯:৩৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২২

রাজধানী ঢাকার চারপাশে বৃত্তাকার পথ চালুর চিন্তা দীর্ঘদিনের। এর ফলে সড়কপথে শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যাওয়ার গাড়ি নগরীতে প্রবেশ করতে হবে না। তাতে কমে যাবে রাজধানীর যানজট। আরেকটি যুক্তি হচ্ছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে পদ্মা সেতুতে যাওয়ার গাড়ির শহরের ভেতর দিয়ে ঢুকতে হবে না। গাবতলী কিংবা টঙ্গী থেকে আসা গাড়িও ঢাকা শহর এড়িয়ে পদ্মা সেতু হয়ে দক্ষিণাঞ্চলে যেতে পারবে। কিন্তু সময়মতো কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় এ গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের কার্যক্রম আটকে আছে।

জানা গেছে, জাপান, এডিবিসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করেও অর্থায়নে সাড়া মেলেনি। এর মধ্যে বৃত্তাকার পথের ইনার সার্কুলার রুটের একটি অংশ এখন এআইআইবির (এশিয়া অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক) মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে।

অন্যদিকে, বৃত্তাকার সড়কপথ ঘিরে রেললাইন নির্মাণে সমীক্ষা হলেও দাতা সংস্থার সাড়া নেই। ফলে সমীক্ষার টাকাটাই এক রকম জলে গেছে। এ ছাড়া বৃত্তাকার নৌপথ চালু হলেও সেতুর উচ্চতার ঘাটতিসহ নানা সীমাবদ্ধতায় তা বন্ধ হয়ে যায়। সর্বশেষ ১০ সেপ্টেম্বর দুটি রুটে স্পিডবোট চালু করলেও কাক্সিক্ষত সাড়া নেই। অথচ যথাযথ পদক্ষেপ নিতে পারলে নৌপথ দিয়ে পণ্য ও যাত্রী পরিবহন সাশ্রয়ী হতো।

জানা গেছে, গত ২৫ জুন পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর গাবতলী, মহাখালী, টঙ্গী বা উত্তরার গাড়ি পদ্মা সেতুতে সহজে যেতে পারছে না। কেবল সায়েদাবাদ ও যাত্রাবাড়ী এলাকা দিয়ে চলাচলের কারণে ওই অঞ্চলে তীব্র যানজট তৈরি হয়। এর জেরে মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারেও গাড়ি আটকে থাকে। অথচ বৃত্তাকার সড়কপথটি চালু হলে অনায়াসে পদ্মা পাড়ি দেওয়া সম্ভব হতো।

রাজধানীর পরিবহন পরিকল্পনায় (এসটিপি) ঢাকায় ইনার ও আউটার সার্কুলার দুই ধরনের বৃত্তাকার সড়ক গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। এর সঙ্গে বৃত্তাকার নৌ ও রেলপথ তৈরির কথা রয়েছে। এ ছাড়া রাজধানীতে যানবাহনের চাপ কমানো এবং নৌপথে সাশ্রয়ীমূল্যে যাত্রী ও মালামাল পরিবহন ব্যবস্থা চালু করার লক্ষ্যে কয়েকটি ধাপে ঢাকার চারটি নদীর ১১০ কিলোমিটারে নৌপথে নৌযান পরিচালনার পদক্ষেপ নেওয়া হয় ২০০০ সালে। কিন্তু বৃত্তাকার নৌপথে ২০০৪, ২০১০, ২০১৩ ও ২০১৪ সালে চার দফা ওয়াটার বাস ও লঞ্চ নামানো হলেও সব কটি অল্প দিনের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায়।

নৌমন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃক বৃত্তাকার নৌপথের নদী খননসহ নয়টি ল্যান্ডিং স্টেশন নির্মাণের মাধ্যমে নৌপথটি চালু করা হয়। বর্তমানে এ নৌপথে মালামাল পরিবহন ব্যবস্থায় গুরুত্ব পেলেও কম উচ্চতার সেতু, অতিরিক্ত সময় এবং পরিবেশের অভাবের কারণে সাশ্রয়ীমূল্যে ও যাত্রীবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তী সময়ে বিআইডব্লিউটিসি কর্তৃক ওয়াটার বাস চালু করা হলেও বিভিন্ন কারণে তা বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। গত ১০ সেপ্টেম্বর পাঁচটি দ্রুতগামী স্পিডবোট দিয়ে টঙ্গী নদী বন্দর থেকে ঢাকা বৃত্তাকার নৌপথে স্পিডবোট সার্ভিস চালু করা হয়েছে। পদ্মা সেতু নির্মাণের ফলে মাওয়ায় অলস বসে থাকা স্পিডবোট দিয়ে এ কার্যক্রম চালু হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে টঙ্গী, আব্দুল্লাহপুর ও কড্ডা এবং টঙ্গী, আব্দুল্লাহপুর ও উলুখোলা (কালীগঞ্জ)- এই দুটি রুটে স্পিডবোট চলাচল করবে। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চাহিদা বাড়লে বৃত্তাকার পথে নতুন নৌপথ সৃষ্টি করে স্পিডবোট চালুর আরও পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

এদিকে সবচেয়ে দরকারি বৃত্তাকার সড়কপথ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিশেষজ্ঞরা কথা বলছেন। কিন্তু গুরুত্ব পায়নি। ঢাকা শহর ঘিরে ৮৮ দশমিক ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ইনার সার্কুলার রুট দুটি ভাগে বাস্তবায়নের কথা। ইনার সার্কুলার রুট ফেজ ১-এর আওতায় আবদুল্লাহপুর রেলগেট থেকে তেরমুখ, পূর্বাচল, বেরাইদ, ডেমরা পর্যন্ত ২৫ দশমিক ৮ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করা হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে নতুন করে এই অংশে সড়ক নির্মাণ করতে হবে, যা সময়সাপেক্ষ।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) জানায়, আবদুল্লাহপুর রেলগেট থেকে ধউর, বিরুলিয়া, গাবতলী, বছিলা, হাজারীবাগ, সোয়ারীঘাট, কদমতলী, তেঘরিয়া, পোস্তগোলা, ফতুল্লা, চাষাঢ়া, শিমরাইল হয়ে ডেমরা পর্যন্ত ৬৩ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করা হবে ইনার সার্কুলার রুট ফেজ ২-এর আওতায়। এখানে আগে থেকেই সড়ক আছে, যা প্রশস্ত করতে হবে। তবে সাকল্যে সড়ক নির্মাণ করতে হবে ৪৭ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। কারণ তেঘরিয়া থেকে পোস্তগোলা পর্যন্ত সাড়ে ৮ কিলোমিটার পথ ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের অংশ এবং আবদুল্লাহপুর রেলগেট থেকে ধউর পর্যন্ত ৮ কিলোমিটার পথ নির্মাণ করছে সেতু কর্তৃপক্ষ, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের আওতায়। এজন্য ১২ হাজার ১২৫ কোটি টাকা ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছিল। কিন্তু বেশিদূর অগ্রসর হয়নি। এখন এ অংশটি দুই ধাপে বাস্তবায়ন করতে চায় সওজ। এর মধ্যে জিওবি অর্থায়নে ২৫ কিলোমিটার এবং বাকি ২১ কিলোমিটারের কিছু বেশি অংশ নির্মাণ করা হতে পারে এআইআইবির (এশিয়া অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংক) অর্থায়নে। এ পরিকল্পনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের ঢাকা জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সবুজউদ্দিন খান।

সওজের তথ্য মতে, ১৯৮৭ সালে আবদুল্লাহপুর থেকে সোয়ারীঘাট পর্যন্ত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ করা হয়, যা বেড়িবাঁধ নামে পরিচিত। এর ওপরে বর্তমানে দুই লেনের সড়ক রয়েছে। দুই পাশে বাঁধের বিস্তর জমি রয়েছে। সওজের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইনার সার্কুলার রুট সব মিলিয়ে ২২০ ফুট পর্যন্ত প্রশস্ত হবে। ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের আদলে চার লেনের মূল সড়কের দুই পাশে থাকবে ধীরগতির যান চলাচলের জন্য পৃথক লেন। মূল সড়কে উভয়মুখী ৯ দশমিক ৮ মিটার প্রশস্ত ডাবল লেন থাকবে। মূল সড়কের দুপাশে দেড় মিটার চওড়া শোল্ডার থাকবে। এর পর থাকবে ধীরগতির যান চলাচলে ৬ দশমিক ২ মিটার চওড়া সড়ক। সড়কের দুপাশেই সার্ভিস লেনের পর তিন মিটার করে জায়গা খালি রাখা হবে। এক পাশে ১০ মিটার জায়গা খালি রাখা হবে ভবিষ্যতে মেট্রোরেল নির্মাণের জন্য।

বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান বলেন, সরকারের পরিবহন পরিকল্পনায় পদ্মা সেতুর কথা চিন্তা করেই রিং রোড ও বৃত্তাকার পথ রাখা হয়েছিল। এটি করতে পারলে রাজধানীর ভেতর দিয়ে গাড়ির চাপ পড়বে না। শহরের বাইরে দিয়ে এক প্রান্তের গাড়ি অন্য প্রান্তে যেতে পারবে।

রেল সূত্র জানায়, রাজধানী ঢাকাকে ঘিরে বৃত্তাকার রেলপথ নির্মাণ করবে বাংলাদেশ রেলওয়ে। এজন্য সরকারি অর্থায়নে ইতিমধ্যে ২৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকায় প্রকল্পের সমীক্ষা করা হয়েছে। সেখানে ৮০ দশমিক ৮৯ কিলোমিটার ইলেক্ট্রিক রেলপথ নির্মাণের কথা বলা হয়। বৃত্তাকার রেলপথের পুরোটা একবার ঘুরতে ট্রেনের এক ঘণ্টা ৭ মিনিট সময় লাগবে। এজন্য প্রায় ৭১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে। প্রতিদিন ১৬৪ জোড়া অর্থাৎ ৩২৮টি ট্রেন চলতে পারবে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে (পিপিপি) সার্কুলার রেলপথ নির্মাণের কথা জানিয়েছেন রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন। তবে ২০১৯ সালে অর্থনৈতিক বিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের পর এখনো আগ্রহ দেখায়নি কেউ। বিনিয়োগকারী বা দাতা সংস্থা কারও তরফ থেকে আগ্রহের কথা জানা যায়নি।

সমীক্ষা প্রতিবেদন উপস্থাপনকালে বলা হয়, বৃত্তাকার রেলপথের প্রতি কিলোমিটারে ৮৭৯ কোটি টাকা ব্যয় হবে। সড়কের পাশ দিয়ে এই রেলপথ নির্মাণ করতে চায় রেলওয়ে। প্রস্তাবিত সার্কুলার রেলপথের স্টেশনগুলো হবে ধউর, উত্তরা, চিড়িয়াখানা, চিড়িয়াখানা দক্ষিণ, গাবতলী, মোহাম্মদপুর, রায়েরবাজার, কামরাঙ্গীরচর, সদরঘাট, পোস্তগোলা, পাগলা, ফতুল্লা, চাষাড়া, চিত্তরঞ্জন, আদমজী, সিদ্ধিরগঞ্জ, ডেমরা, ত্রিমোহনী, বেরাইদ, পূর্বাঞ্চল, পূর্বাঞ্চল উত্তর, ত্রিমুখ, টঙ্গী ও বিশ্ব ইজতেমা মাঠ। অর্থাৎ বিশ্ব ইজতেমা মাঠ থেকে শুরু হয়ে ঢাকাকে ঘিরে নারায়ণগঞ্জ হয়ে ফের বিশ্ব ইজতেমায় এসে শেষ হবে এ রেলপথ। গাবতলী, সদরঘাট ও পোস্তগোলা স্টেশন হবে পাতালে। রেলওয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়, বৃত্তাকার রেলপথ চালু হলে ঢাকা শহরের ভেতরে প্রবেশ না করেই যাত্রীরা এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে পারবেন। যানজট কমবে, মানুষের দুর্ভোগও পোহাতে হবে না।

সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রস্তাবিত সার্কুলার রেলপথের ৭০ দশমিক ৯৯ কিলোমিটার রেলপথ হবে এলিভেটেড (উড়াল)। বাকি ৯ দশমিক ৯ কিলোমিটার রেলপথ হবে পাতাল। প্রস্তাবিত এ রেলপথে ২৪টি স্টেশন হবে। এর মধ্যে ২১টি এলিভেটেড এবং তিনটি হবে পাতাল। ১১টি স্টেশন যুক্ত হবে মেট্রোরেলের সঙ্গে। একটি যুক্ত হবে সদরঘাটের সঙ্গে। বৃত্তাকার রেলপথের সম্ভাব্য রুট নির্ধারণ ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে ২০১৯ সালের ৩০ এপ্রিল ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি করে রেলওয়ে। চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে সিয়ুয়ান সার্ভে অ্যান্ড ডিজাইন গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেড এবং বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান বেটস কনসাল্টিং সার্ভিসেস লিমিটেড ও ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যান্ড অ্যাডভাইজারস লিমিটেড যৌথভাবে এ সমীক্ষা করেছে। সরকারি অর্থায়নে এ সমীক্ষা করা হয়।