ঢাকা ০৮:২৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৪ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

দূরত্বের ‘কারচুপি’ বিআরটিএর ভাড়ার তালিকায়!

রাজধানীতে গণপরিবহনে ভাড়ার নৈরাজ্য নতুন কিছু নয়। কখনো ‘অবৈধ’ ওয়েবিলের নামে, আবার কখনো নিজেদের মনমতো ভাড়া আদায়ের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে পকেট কাটা যাচ্ছে যাত্রীদের। দূরত্বের কারচুপির ফাঁদে ফেলে অভিনব কায়দায় যাত্রীদের ঠকাচ্ছেন পরিবহন মালিকরা। তাদের এমন কাজে উদাসীন বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ)। ঢাকায় চলাচল করা সব রুটের বাসের ভাড়ার তালিকায় এই দূরত্ব জালিয়াতি দেখা গেছে।

দুই থেকে তিন কিলোমিটার পরপর যেখানে ভাড়া নির্ধারণের কথা সেখানে ৫ থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরত্ব পর্যন্ত স্টপেজ দেখানো হয়েছে বিআরটিএর তালিকায়। আর এই সুযোগে স্বল্প দূরত্বেও বেশি ভাড়া দিতে হচ্ছে যাত্রীদের। দিনের পর দিন এমনটা চললেও তা যেন দেখার কেউ নেই।

এসব বন্ধে দেখভালের দায়িত্বে থাকা বিআরটিএ মাঝেমধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে অভিযান চালালেও পরে আবারও আগের অবস্থায় ফিরে আসে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী মনে করেন, দীর্ঘদিন ধরে বাড়তি ভাড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন রুটে দূরত্বের জালিয়াতি চলছে। একই রুটের ভিন্ন গাড়িতে একই পথের দূরত্ব কম বেশি দেখানো হয়। আবার বিআরটিএর ভাড়ার তালিকায় অল্প দূরত্বের স্টপেজ বাদ দিয়ে অনেক বেশি দূরত্বের নাম উল্লেখ করে ভাড়া লেখা হয়। ফলে যাত্রীদের কম পথ গিয়েও বেশি পথের ভাড়া গুনতে হয়।

ফযধশধ-১জানা গেছে, ঢাকা মেট্রোপলিট যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটি গণপরিবহনের দূরত্ব ও ভাড়া নির্ধারণে কাজ করে। এই কমিটির সদস্য সচিবের দায়িত্বে আছেন বিআরটিএর পক্ষে ঢাকা বিভাগীয় পরিচালক মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ।

এছাড়া বাস মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের প্রভাবশালী নেতারা এই কমিটিতে থাকেন। তারাই ঠিক করেন সবকিছু। বিআরটিএ মূলত সাচিবিক দায়িত্ব পালন করে থাকে।

বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে একাধিকবার মোহাম্মদ শহীদুল্লাহর সঙ্গে টেলিফোন করলেও তিনি ধরেননি।

যেভাবে হচ্ছে দূরত্বের জালিয়াতি?

তেলের দাম বাড়ার পর নতুন করে যে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে তাতে একাধিক রুটে দূরত্বের কারচুপি দেখা গেছে। যেমন- মিরপুর-১২ থেকে কাঁচপুর ব্রিজ পর্যন্ত রুটে মোট দূরত্ব ২৮ দশমিক ৮ কিলোমিটার। সবশেষ ভাড়ার তালিকা অনুযায়ী কিলোমিটার প্রতি ২ টাকা ৪৫ পয়সা ভাড়া নির্ধারণ করা আছে।

এই রুটের ভাড়ার তালিকায় কালশী থেকে কাঁচপুর ব্রিজ পর্যন্ত মোট ১৩টি স্টপেজের কথা উল্লেখ করা আছে। এতে দেখা গেছে, মিরপুর-১২ থেকে যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত স্টপেজগুলোতে কোথাও ১ কিলোমিটার, কোথাও ২ থেকে ৩ কিলোমিটার দূরত্বের ভাড়া চার্টে উল্লেখ করা আছে। কিন্তু যাত্রাবাড়ীর পর সাইনবোর্ডের পর্যন্ত প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরত্বের ভাড়া উল্লেখ করা হয়েছে।

ফযধশধ-২সাইনবোর্ড থেকে কাঁচপুর পর্যন্তও প্রায় ৫ কিলোমিটারের ভাড়া একবারে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে যাত্রাবাড়ী পার হয়ে যাত্রী যেখানেই নামছে তাকে সাইনবোর্ড পর্যন্ত ভাড়া দিতে হচ্ছে। আর ওয়েবিলে চলা বাসের ভাড়া তো কোনো কিলোমিটার মেনেই নেয়া হয় না।

এত গেল এক রুটের অবস্থা। এমন অবস্থা ঢাকার সবগুলো রুটের বাসেই। এসব নিয়ে বাসে কথা কাটাকাটি হলেও শেষ পর্যন্ত বেশি ভাড়া দিয়েই চলতে হয় যাত্রীদের।
বিআরটিএর এই কমিটিতে যাত্রীদের কোনো প্রতিনিধি না থাকায় ইচ্ছেমত সব হচ্ছে। এসব বন্ধে সরকারের নজর দেয়া উচিত। এর দায় বিআরটি এড়াতে পারে না।

সাভার থেকে আমুলিয়া স্টাফ কোয়ার্টার রুটে চলা বাসের ভাড়ার তালিকায় দেখা গেছে, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মোট আটটি স্টপেজ উল্লেখ আছে। এর মধ্যে সাভার থেকে যাত্রা শুরুর পর প্রথম স্টপেজ ১৩ দশমিক ৮ কিলোমিটার দূরত্বের গাবতলী। সে হিসেবে সাভার থেকে প্রথম স্টপেজের ভাড়া উল্লেখ হয়েছে ৩৪ টাকা।

প্রশ্ন উঠেছে ১৩ কিলোমিটারের আগে যেসব স্টপেজ আছে সেখানে যারা নামবে তারা কী হিসাব করে ভাড়া পরিশোধ করবেন? এই সুযোগে মাঝে যেখানেই যাত্রী নামে কন্ট্রাকটর সুযোগ বুঝে লম্বা দূরত্বের ভাড়া নিয়ে নিচ্ছে।

অবশ্য এই রুটের গাড়িতে গাবতলীর পর থেকে মিরপুর-১, মিরপুর-১০ পর্যন্ত সর্বোচ্চ দুই কিলোমিটারের দূরত্বের ভাড়া উল্লেখ আছে। কিন্তু মিরপুর-১০ এর পর একবারে মহাখালী পর্যন্ত চলে গেছে বিআরটিএ। মাঝের দূরত্ব ৭ দশমিক ৫ কিলোমিটার।

একই তালিকায় পরের স্টপেজের দূরত্ব দেখানো হয়েছে গুলশান-১। গুলশান থেকে ৬ দশমিক ৩ কিলোমিটার দূরত্বের বনশ্রী দেখানো হয়েছে পরের স্টজেপ। আবার বনশ্রী থেকে সবশেষ স্টপেজ উল্লেখ করা হয়েছে পাক্কা ৮ কিলোমিটার দূরের আমুলিয়া স্টাফ কোয়ার্টার।

সদরঘাট-সাভার রুটের বাসেও এমন চিত্র দেখা গেছে। সদরঘাট থেকে ইপিজেড পর্যন্ত ৪১ দশমিক ৭ কিলোমিটার দূরত্বের রুটে মোট নয়টি স্টপেজের কথা উল্লেখ আছে তালিকায়। যেখানে সদরঘাট থেকে আসাদগেট পর্যন্ত ৯ দশমিক ৬ কিলোমিটার দূরত্ব উল্লেখ করা আছে। কিন্তু তালিকায় পরের স্টপেজ সরাসরি গাবতলী। অথচ আসাদগেট থেকে গাবতলী পর্যন্ত দূরত্ব ৫ দশমিক ৪ কিলোমিটার।

কিন্তু একই তালিকায় শুরুর দিকে আসাদগেট পর্যন্ত ৪টি স্টপেজে ১ থেকে ৩ কিলোমিটার দূরত্ব ধরে ভাড়া উল্লেখ করা আছে।

অথচ তালিকার কথা বলে আসাদগেট পর্যন্ত ২৫ টাকা নেওয়া হয়। এরপর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, শ্যামলী, কল্যাণপুরে এখন ভাড়া গুনতে হয় ৪০ টাকা। যদিও তালিকা অনুযায়ী গাবতলী পর্যন্ত ভাড়া ৩৮ টাকা।

আবার একই তালিকায় গাবতলীর পরের স্টপেজ উল্লেখ করা হয়েছে সাভার। এই পথের দূরত্ব ১৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার। সাভারের পরের স্টপেজ নবীনগর। দুই জায়গার মধ্যে দূরত্ব ৮ দশমিক ৫ কিলোমিটার।

সরদঘাট থেকে বাইপাইল রুটের মোট দূরত্ব ৩৯ দশমিক ৮ কিলোমিটার। এই রুটের তালিকায় ১২টি স্টপেজের কথা বলা আছে তালিকায়। এখানেই এখানেও একই অবস্থা । প্রথম ৭ দশমিক ৯ কিলোমিটার পর্যন্ত (রামপুরা) ২ থেকে ৩ কিলোমিটার দূরত্বের ভাড়া উল্লেখ থাকলেও রামপুরা থেকে টানা কুড়িল পর্যন্ত পরবর্তী স্টপেজ উল্লেখ করা হয়েছে। মাঝখানের এই পথের দূরত্ব প্রায় ৭ কিলোমিটার।

এই রুটের যাত্রীদের সদরঘাট থেকে রামপুরা ব্রিজ পর্যন্ত ২০ টাকা নেওয়া হলেও মেরুল, মধ্যবাড্ডা নামলেও যাত্রীর কাছ থেকে ৩০ টাকা ভাড়া নেয় কন্ট্রাকটর। অথচ কুড়িল পর্যন্ত ভাড়া ৩৫ টাকা।

এই রুটের তালিকায় কুড়িলের পরে ৪ কিলোমিটারেরও বেশি দূরত্বের এয়ারপোর্টের স্টপেজের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে মাঝের খিলক্ষেত, কাজলা যেখানেই নামবে সেখানেই এয়ারপোর্ট পর্যন্ত ভাড়া গুনতে হয়। আবার ধউর থেকে জিরাবো পর্যন্ত ৬ কিলোমিটার দূরত্বের ভাড়ার কথা উল্লেখ আছে তালিকায়। যদিও এই রুটের বাসগুলো নির্ধারিত জায়গা পর্যন্ত বেশিরভাগ সময় চলাচল না করে নিজেদের সুবিধামতো ঘুরিয়ে দেয়।

এদিকে ওয়েবিল বন্ধ ঘোষণার পরও এই রুটে চলা ভিক্টর ক্লাসিক নামের বাসে অভিনব কায়দায় যাত্রীদের পকেট কাটছে। ফেরার পথে রামপুরা থেকে সদরঘাট পর্যন্ত নির্ধারিত ২০ টাকা ভাড়া হওয়ার কথা থাকা। কেউ শান্তিনগর, কাকরাইল, গুলিস্তান নামলেও যাত্রীদের কাছ থেকে ২০ টাকা নেওয়া হয়। আবার কেউ সদরঘাট গেলেও তার কাছ ২০ টাকা নেয়া হয়।

মোজাম্মেল হক বলেন, বিআরটিএর এই কমিটিতে যাত্রীদের কোনো প্রতিনিধি না থাকায় ইচ্ছেমত সব হচ্ছে। এসব বন্ধে সরকারের নজর দেয়া উচিত। এর দায় বিআরটি এড়াতে পারে না।

Tag :

মধ্যনগরে দুর্গোৎসব উপলক্ষে ৩৩টি পূজামন্ডপে নগদ অর্থ প্রদান করেন, এমপি রতন

দূরত্বের ‘কারচুপি’ বিআরটিএর ভাড়ার তালিকায়!

প্রকাশের সময় : ১০:২৪:০৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২২

রাজধানীতে গণপরিবহনে ভাড়ার নৈরাজ্য নতুন কিছু নয়। কখনো ‘অবৈধ’ ওয়েবিলের নামে, আবার কখনো নিজেদের মনমতো ভাড়া আদায়ের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে পকেট কাটা যাচ্ছে যাত্রীদের। দূরত্বের কারচুপির ফাঁদে ফেলে অভিনব কায়দায় যাত্রীদের ঠকাচ্ছেন পরিবহন মালিকরা। তাদের এমন কাজে উদাসীন বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ)। ঢাকায় চলাচল করা সব রুটের বাসের ভাড়ার তালিকায় এই দূরত্ব জালিয়াতি দেখা গেছে।

দুই থেকে তিন কিলোমিটার পরপর যেখানে ভাড়া নির্ধারণের কথা সেখানে ৫ থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরত্ব পর্যন্ত স্টপেজ দেখানো হয়েছে বিআরটিএর তালিকায়। আর এই সুযোগে স্বল্প দূরত্বেও বেশি ভাড়া দিতে হচ্ছে যাত্রীদের। দিনের পর দিন এমনটা চললেও তা যেন দেখার কেউ নেই।

এসব বন্ধে দেখভালের দায়িত্বে থাকা বিআরটিএ মাঝেমধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে অভিযান চালালেও পরে আবারও আগের অবস্থায় ফিরে আসে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী মনে করেন, দীর্ঘদিন ধরে বাড়তি ভাড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন রুটে দূরত্বের জালিয়াতি চলছে। একই রুটের ভিন্ন গাড়িতে একই পথের দূরত্ব কম বেশি দেখানো হয়। আবার বিআরটিএর ভাড়ার তালিকায় অল্প দূরত্বের স্টপেজ বাদ দিয়ে অনেক বেশি দূরত্বের নাম উল্লেখ করে ভাড়া লেখা হয়। ফলে যাত্রীদের কম পথ গিয়েও বেশি পথের ভাড়া গুনতে হয়।

ফযধশধ-১জানা গেছে, ঢাকা মেট্রোপলিট যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটি গণপরিবহনের দূরত্ব ও ভাড়া নির্ধারণে কাজ করে। এই কমিটির সদস্য সচিবের দায়িত্বে আছেন বিআরটিএর পক্ষে ঢাকা বিভাগীয় পরিচালক মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ।

এছাড়া বাস মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের প্রভাবশালী নেতারা এই কমিটিতে থাকেন। তারাই ঠিক করেন সবকিছু। বিআরটিএ মূলত সাচিবিক দায়িত্ব পালন করে থাকে।

বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে একাধিকবার মোহাম্মদ শহীদুল্লাহর সঙ্গে টেলিফোন করলেও তিনি ধরেননি।

যেভাবে হচ্ছে দূরত্বের জালিয়াতি?

তেলের দাম বাড়ার পর নতুন করে যে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে তাতে একাধিক রুটে দূরত্বের কারচুপি দেখা গেছে। যেমন- মিরপুর-১২ থেকে কাঁচপুর ব্রিজ পর্যন্ত রুটে মোট দূরত্ব ২৮ দশমিক ৮ কিলোমিটার। সবশেষ ভাড়ার তালিকা অনুযায়ী কিলোমিটার প্রতি ২ টাকা ৪৫ পয়সা ভাড়া নির্ধারণ করা আছে।

এই রুটের ভাড়ার তালিকায় কালশী থেকে কাঁচপুর ব্রিজ পর্যন্ত মোট ১৩টি স্টপেজের কথা উল্লেখ করা আছে। এতে দেখা গেছে, মিরপুর-১২ থেকে যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত স্টপেজগুলোতে কোথাও ১ কিলোমিটার, কোথাও ২ থেকে ৩ কিলোমিটার দূরত্বের ভাড়া চার্টে উল্লেখ করা আছে। কিন্তু যাত্রাবাড়ীর পর সাইনবোর্ডের পর্যন্ত প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরত্বের ভাড়া উল্লেখ করা হয়েছে।

ফযধশধ-২সাইনবোর্ড থেকে কাঁচপুর পর্যন্তও প্রায় ৫ কিলোমিটারের ভাড়া একবারে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে যাত্রাবাড়ী পার হয়ে যাত্রী যেখানেই নামছে তাকে সাইনবোর্ড পর্যন্ত ভাড়া দিতে হচ্ছে। আর ওয়েবিলে চলা বাসের ভাড়া তো কোনো কিলোমিটার মেনেই নেয়া হয় না।

এত গেল এক রুটের অবস্থা। এমন অবস্থা ঢাকার সবগুলো রুটের বাসেই। এসব নিয়ে বাসে কথা কাটাকাটি হলেও শেষ পর্যন্ত বেশি ভাড়া দিয়েই চলতে হয় যাত্রীদের।
বিআরটিএর এই কমিটিতে যাত্রীদের কোনো প্রতিনিধি না থাকায় ইচ্ছেমত সব হচ্ছে। এসব বন্ধে সরকারের নজর দেয়া উচিত। এর দায় বিআরটি এড়াতে পারে না।

সাভার থেকে আমুলিয়া স্টাফ কোয়ার্টার রুটে চলা বাসের ভাড়ার তালিকায় দেখা গেছে, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মোট আটটি স্টপেজ উল্লেখ আছে। এর মধ্যে সাভার থেকে যাত্রা শুরুর পর প্রথম স্টপেজ ১৩ দশমিক ৮ কিলোমিটার দূরত্বের গাবতলী। সে হিসেবে সাভার থেকে প্রথম স্টপেজের ভাড়া উল্লেখ হয়েছে ৩৪ টাকা।

প্রশ্ন উঠেছে ১৩ কিলোমিটারের আগে যেসব স্টপেজ আছে সেখানে যারা নামবে তারা কী হিসাব করে ভাড়া পরিশোধ করবেন? এই সুযোগে মাঝে যেখানেই যাত্রী নামে কন্ট্রাকটর সুযোগ বুঝে লম্বা দূরত্বের ভাড়া নিয়ে নিচ্ছে।

অবশ্য এই রুটের গাড়িতে গাবতলীর পর থেকে মিরপুর-১, মিরপুর-১০ পর্যন্ত সর্বোচ্চ দুই কিলোমিটারের দূরত্বের ভাড়া উল্লেখ আছে। কিন্তু মিরপুর-১০ এর পর একবারে মহাখালী পর্যন্ত চলে গেছে বিআরটিএ। মাঝের দূরত্ব ৭ দশমিক ৫ কিলোমিটার।

একই তালিকায় পরের স্টপেজের দূরত্ব দেখানো হয়েছে গুলশান-১। গুলশান থেকে ৬ দশমিক ৩ কিলোমিটার দূরত্বের বনশ্রী দেখানো হয়েছে পরের স্টজেপ। আবার বনশ্রী থেকে সবশেষ স্টপেজ উল্লেখ করা হয়েছে পাক্কা ৮ কিলোমিটার দূরের আমুলিয়া স্টাফ কোয়ার্টার।

সদরঘাট-সাভার রুটের বাসেও এমন চিত্র দেখা গেছে। সদরঘাট থেকে ইপিজেড পর্যন্ত ৪১ দশমিক ৭ কিলোমিটার দূরত্বের রুটে মোট নয়টি স্টপেজের কথা উল্লেখ আছে তালিকায়। যেখানে সদরঘাট থেকে আসাদগেট পর্যন্ত ৯ দশমিক ৬ কিলোমিটার দূরত্ব উল্লেখ করা আছে। কিন্তু তালিকায় পরের স্টপেজ সরাসরি গাবতলী। অথচ আসাদগেট থেকে গাবতলী পর্যন্ত দূরত্ব ৫ দশমিক ৪ কিলোমিটার।

কিন্তু একই তালিকায় শুরুর দিকে আসাদগেট পর্যন্ত ৪টি স্টপেজে ১ থেকে ৩ কিলোমিটার দূরত্ব ধরে ভাড়া উল্লেখ করা আছে।

অথচ তালিকার কথা বলে আসাদগেট পর্যন্ত ২৫ টাকা নেওয়া হয়। এরপর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, শ্যামলী, কল্যাণপুরে এখন ভাড়া গুনতে হয় ৪০ টাকা। যদিও তালিকা অনুযায়ী গাবতলী পর্যন্ত ভাড়া ৩৮ টাকা।

আবার একই তালিকায় গাবতলীর পরের স্টপেজ উল্লেখ করা হয়েছে সাভার। এই পথের দূরত্ব ১৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার। সাভারের পরের স্টপেজ নবীনগর। দুই জায়গার মধ্যে দূরত্ব ৮ দশমিক ৫ কিলোমিটার।

সরদঘাট থেকে বাইপাইল রুটের মোট দূরত্ব ৩৯ দশমিক ৮ কিলোমিটার। এই রুটের তালিকায় ১২টি স্টপেজের কথা বলা আছে তালিকায়। এখানেই এখানেও একই অবস্থা । প্রথম ৭ দশমিক ৯ কিলোমিটার পর্যন্ত (রামপুরা) ২ থেকে ৩ কিলোমিটার দূরত্বের ভাড়া উল্লেখ থাকলেও রামপুরা থেকে টানা কুড়িল পর্যন্ত পরবর্তী স্টপেজ উল্লেখ করা হয়েছে। মাঝখানের এই পথের দূরত্ব প্রায় ৭ কিলোমিটার।

এই রুটের যাত্রীদের সদরঘাট থেকে রামপুরা ব্রিজ পর্যন্ত ২০ টাকা নেওয়া হলেও মেরুল, মধ্যবাড্ডা নামলেও যাত্রীর কাছ থেকে ৩০ টাকা ভাড়া নেয় কন্ট্রাকটর। অথচ কুড়িল পর্যন্ত ভাড়া ৩৫ টাকা।

এই রুটের তালিকায় কুড়িলের পরে ৪ কিলোমিটারেরও বেশি দূরত্বের এয়ারপোর্টের স্টপেজের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে মাঝের খিলক্ষেত, কাজলা যেখানেই নামবে সেখানেই এয়ারপোর্ট পর্যন্ত ভাড়া গুনতে হয়। আবার ধউর থেকে জিরাবো পর্যন্ত ৬ কিলোমিটার দূরত্বের ভাড়ার কথা উল্লেখ আছে তালিকায়। যদিও এই রুটের বাসগুলো নির্ধারিত জায়গা পর্যন্ত বেশিরভাগ সময় চলাচল না করে নিজেদের সুবিধামতো ঘুরিয়ে দেয়।

এদিকে ওয়েবিল বন্ধ ঘোষণার পরও এই রুটে চলা ভিক্টর ক্লাসিক নামের বাসে অভিনব কায়দায় যাত্রীদের পকেট কাটছে। ফেরার পথে রামপুরা থেকে সদরঘাট পর্যন্ত নির্ধারিত ২০ টাকা ভাড়া হওয়ার কথা থাকা। কেউ শান্তিনগর, কাকরাইল, গুলিস্তান নামলেও যাত্রীদের কাছ থেকে ২০ টাকা নেওয়া হয়। আবার কেউ সদরঘাট গেলেও তার কাছ ২০ টাকা নেয়া হয়।

মোজাম্মেল হক বলেন, বিআরটিএর এই কমিটিতে যাত্রীদের কোনো প্রতিনিধি না থাকায় ইচ্ছেমত সব হচ্ছে। এসব বন্ধে সরকারের নজর দেয়া উচিত। এর দায় বিআরটি এড়াতে পারে না।