ঢাকা ০৫:২০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০১ অক্টোবর ২০২২, ১৫ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

ঐতিহ্যের সাক্ষী বিবি সাইবানির দরগা

বগুড়ার ইতিহাসসমৃদ্ধ উপজেলা সোনাতলা। উপজেলাটির গড়ফতেপুর, কাবিলপুর ও গড়চৈতন্যপুর গ্রামগুলো ঘিরে থাকা উঁচু মাটির গড়বেষ্টিত সামরিক দুর্গ (অধুনা বিলুপ্ত), রাজা নীলাম্বর রায়ের বাড়ি (বিলুপ্ত), পাথর সাহেবের দরগার মতো স্থাপত্য নিদর্শন এলাকাটিকে ইতিহাস-স্থানের পরিচিতি দিয়েছে। দেশের ইতিহাসের সোনালি অধ্যায়ে স্থান করে দেওয়া আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য নিদর্শন উপজেলার জোড়গাছা ইউনিয়নের নওদাবগা গ্রামে সুফি ইসলামের আধ্যাত্মিকতা চর্চার ঐতিহাসিক নিদর্শন ৪০০ বছরের পুরোনো ‘বিবি সাইবানির দরগা’।

সোনাতলা উপজেলা সদর থেকে সোনাতলা-গাবতলী ভায়া বগুড়া সড়ক ধরে এগোতেই চোখে পড়বে বিরল প্রজাতির পারুল গাছ শোভিত সরকারি নাজির আখতার কলেজ। সরকারি নাজির আখতার কলেজ পেছনে ফেলে গাবতলী সড়ক ধরে একটু এগোলেই কাবিলপুরের ‘পাথর সাহেবের দরগা’। সে পথেই সর্পিল গতিতে এঁকেবেঁকে ৭ কিলোমিটার যাওয়ার পর দেখা যাবে ড. এনামুল হক কলেজ। আরো দুই কিলোমিটার এগোলেই অপূর্ব প্রাকৃতিক দৃশ্যের সোনাকানিয়া মোড়। সেখান থেকে দুই কিলোমিটারের মধ্যে বয়ড়া টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও বয়ড়া কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ নামে দুটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বয়ড়া থেকে তিন কিলোমিটার পথ ধরে এগোলেই নওদাবগা গ্রাম। সোনাতলা-গাবতলী পাকা সড়কের সংলগ্ন নওদাবগা জামে মসজিদের বাম পাশ দিয়ে একটি সেতু পেরিয়ে উত্তর দিকে যেতেই সবুজের সমারোহ। প্রায় পাঁচণ্ডছয় একর জমিজুড়ে বৃক্ষরাজিতে ভরা অরণ্যে পাখপাখালিদের অবাধ বিচরণ। পাখিদের কিচিরমিচির শব্দে মনে হবে যেন তারা স্বাগতই জানাচ্ছে অভ্যাগতদের। কিছুদূর এগিয়ে একটি গেট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই নজরে আসবে একটি সুদৃশ্য মসজিদ, সাবেক আমলের জমিদার বাড়ি, পুরোনো কবর ও মোগল আমলে তৈরি দরগা।

মোগল রীতিতে তৈরি এ দরগাটিকে দীর্ঘদিন ‘পুরাতন ইবাদতখানা’ বলা হলেও এত দিন অগোচরে ছিল বিবি সাইবানির কথা, যে ক্ষমতাবান মহিলার কারণে মূলত এ দরগাটি তৈরি করা হয়। দরগা সংলগ্নস্থানেই সুনামধন্য, সর্বজনপরিচিত সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান শাহ্ আমান উল্লাহ টেপা ও তার সহধর্মিণী সোনাতলা উপজেলা পরিষদের সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান রিজিয়া আমানের বাড়ি। মূলত তাদের পরিবারকে ঘিরেই দরগাটির ইতিহাস। জানা যায়, সাবেক চেয়ারম্যান শাহ্ আমান উল্লাহ টেপার পূর্ব পুরুষ আনার আকন্দ এসে সোনাতলার নওদাবগায় বসতি স্থাপন করেন। আনার আকন্দের পুত্রবধূ বিবি সাবিয়ানী ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ মহিলা তৎকালীন সমাজে সম্মানিত ক্ষমতাবান। তিনি বেশিরভাগ সময় ইবাদত-বন্দেগি ও আধ্যাত্মিকতা চর্চায় ব্যস্ত থাকতেন। তার আধ্যাত্মিকতা চর্চা বিশেষত মোরাকাবা ও মোসাহাদা করার জন্য ছোট্ট পরিসরের দুইকক্ষ বিশিষ্ট এ দরগাটি তৈরি করা হয়। মাটি থেকে প্রায় দুই ফুট উঁচু ইটের কমপ্লেক্সের ওপর ইবাদত করার স্থানটিতে মোগল আমলের স্থাপত্য রীতি বিদ্যমান। এর একটির দৈর্ঘ্য ১৪ ফুট ও প্রস্থ ৮ ফুট এবং অপরটির দৈর্ঘ্য ১০ ফুট ও প্রস্থ ১০ ফুট। স্থাপনাটি দেখতে অনেকটা শিয়া ধর্মাবলম্বীদের ইমামবাড়ার মতো। ছোট ছোট ইট দিয়ে প্লাস্টারবিহীন অবস্থায় ঘর দুটো তৈরি। ঘর দুটোর ওপরে রয়েছে ছোট আকারের একটি করে গম্বুজ। একটি ঘরে দুটি ও অপর ঘরে রয়েছে একটি দরজা। ঘর দুটোর গায়ে রয়েছে বিশেষ নকশা। দরগাটি তৈরির সময় এর পাশে তৈরি করা হয় একটি মসজিদ যা বর্তমানে আধুনিক অবয়ব পেয়েছে।

এ ব্যাপারে কথা হয় সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান শাহ্ আমান উল্লাহ টেপার দ্বিতীয় ছেলে শাহ কালিমুল্লাহ্ রাজের সঙ্গে। তিনি জানান, ‘আমাদের পূর্বপুরুষ আনার আকন্দের পুত্রবধূ ‘বিবি সাইবানির নামে’ ১৬০০ খ্রিস্টাব্দের দ্বিতীয় দশকে মোগল রীতিতে দরগাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি প্রতিষ্ঠা করেন ‘বিবি সাইবানির স্বামী দেওয়ান আকন্দ (আনার আকন্দের পুত্র)। আনার আকন্দ ও তার পুত্র দেওয়ান আকন্দও ছিলেন আধ্যাত্মিক কামেল ও অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী। আধ্যাত্মিকতা চর্চার জন্যই দরগাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। বিবি সাইবানির উত্তরসূরি হিসেবে আমরা এ দরগাটির দেখভাল করছি ও আধ্যাত্মিকতা চর্চা অব্যাহত রেখেছি।’

সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান শাহ্ আমান উল্লাহ টেপার স্ত্রী ও উপজেলা পরিষদের সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান রিজিয়া আমান জানিয়েছেন, ‘২০১২ সালে উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় তিনি এই পুরাকীর্তিটিকে সংস্কারের উদ্দেশ্যে প্রশাসনকে জানালে প্রত্নতত্ব অধিদপ্তরের ডিডি ও কাস্টডিয়ান এসেছিলেন দেখার জন্য। পরে প্রত্নতত্ব অধিদপ্তরের লোকজন এসে এটি আংশিক সংস্কার করে। সংস্কারের ক্ষেত্রে সরকারি টিআরের পাশাপাশি আমি ব্যক্তিগতভাবে অর্থ ব্যয় করেছি। এটি রক্ষায় এখনো বাকি রয়েছে অনেক কাজ। সময়মতো সেটি করা না গেলে বিলীন হয়ে যাবে ঐতিহাসিক এ নিদর্শন।’

মোগল আমলে তৈরি বিবি সাইবানির এ দরগাটিতে ভ্রমণে এলে যে কেউ পুলকিত হবে, আনন্দে উদ্বেলিত হবে সৌন্দর্যপিপাসু মন, পাশাপাশি জানতে পারবে ইতিহাসের অজানা তথ্য।

Tag :
জনপ্রিয়

হোসেনপুর বাজার সনাতন ধর্মাবলম্বী ব্যাবসায়িকদের উদ্যোগে বস্ত্র বিতরণ

ঐতিহ্যের সাক্ষী বিবি সাইবানির দরগা

প্রকাশের সময় : ১০:৫৭:২৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২২

বগুড়ার ইতিহাসসমৃদ্ধ উপজেলা সোনাতলা। উপজেলাটির গড়ফতেপুর, কাবিলপুর ও গড়চৈতন্যপুর গ্রামগুলো ঘিরে থাকা উঁচু মাটির গড়বেষ্টিত সামরিক দুর্গ (অধুনা বিলুপ্ত), রাজা নীলাম্বর রায়ের বাড়ি (বিলুপ্ত), পাথর সাহেবের দরগার মতো স্থাপত্য নিদর্শন এলাকাটিকে ইতিহাস-স্থানের পরিচিতি দিয়েছে। দেশের ইতিহাসের সোনালি অধ্যায়ে স্থান করে দেওয়া আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য নিদর্শন উপজেলার জোড়গাছা ইউনিয়নের নওদাবগা গ্রামে সুফি ইসলামের আধ্যাত্মিকতা চর্চার ঐতিহাসিক নিদর্শন ৪০০ বছরের পুরোনো ‘বিবি সাইবানির দরগা’।

সোনাতলা উপজেলা সদর থেকে সোনাতলা-গাবতলী ভায়া বগুড়া সড়ক ধরে এগোতেই চোখে পড়বে বিরল প্রজাতির পারুল গাছ শোভিত সরকারি নাজির আখতার কলেজ। সরকারি নাজির আখতার কলেজ পেছনে ফেলে গাবতলী সড়ক ধরে একটু এগোলেই কাবিলপুরের ‘পাথর সাহেবের দরগা’। সে পথেই সর্পিল গতিতে এঁকেবেঁকে ৭ কিলোমিটার যাওয়ার পর দেখা যাবে ড. এনামুল হক কলেজ। আরো দুই কিলোমিটার এগোলেই অপূর্ব প্রাকৃতিক দৃশ্যের সোনাকানিয়া মোড়। সেখান থেকে দুই কিলোমিটারের মধ্যে বয়ড়া টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও বয়ড়া কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ নামে দুটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বয়ড়া থেকে তিন কিলোমিটার পথ ধরে এগোলেই নওদাবগা গ্রাম। সোনাতলা-গাবতলী পাকা সড়কের সংলগ্ন নওদাবগা জামে মসজিদের বাম পাশ দিয়ে একটি সেতু পেরিয়ে উত্তর দিকে যেতেই সবুজের সমারোহ। প্রায় পাঁচণ্ডছয় একর জমিজুড়ে বৃক্ষরাজিতে ভরা অরণ্যে পাখপাখালিদের অবাধ বিচরণ। পাখিদের কিচিরমিচির শব্দে মনে হবে যেন তারা স্বাগতই জানাচ্ছে অভ্যাগতদের। কিছুদূর এগিয়ে একটি গেট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই নজরে আসবে একটি সুদৃশ্য মসজিদ, সাবেক আমলের জমিদার বাড়ি, পুরোনো কবর ও মোগল আমলে তৈরি দরগা।

মোগল রীতিতে তৈরি এ দরগাটিকে দীর্ঘদিন ‘পুরাতন ইবাদতখানা’ বলা হলেও এত দিন অগোচরে ছিল বিবি সাইবানির কথা, যে ক্ষমতাবান মহিলার কারণে মূলত এ দরগাটি তৈরি করা হয়। দরগা সংলগ্নস্থানেই সুনামধন্য, সর্বজনপরিচিত সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান শাহ্ আমান উল্লাহ টেপা ও তার সহধর্মিণী সোনাতলা উপজেলা পরিষদের সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান রিজিয়া আমানের বাড়ি। মূলত তাদের পরিবারকে ঘিরেই দরগাটির ইতিহাস। জানা যায়, সাবেক চেয়ারম্যান শাহ্ আমান উল্লাহ টেপার পূর্ব পুরুষ আনার আকন্দ এসে সোনাতলার নওদাবগায় বসতি স্থাপন করেন। আনার আকন্দের পুত্রবধূ বিবি সাবিয়ানী ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ মহিলা তৎকালীন সমাজে সম্মানিত ক্ষমতাবান। তিনি বেশিরভাগ সময় ইবাদত-বন্দেগি ও আধ্যাত্মিকতা চর্চায় ব্যস্ত থাকতেন। তার আধ্যাত্মিকতা চর্চা বিশেষত মোরাকাবা ও মোসাহাদা করার জন্য ছোট্ট পরিসরের দুইকক্ষ বিশিষ্ট এ দরগাটি তৈরি করা হয়। মাটি থেকে প্রায় দুই ফুট উঁচু ইটের কমপ্লেক্সের ওপর ইবাদত করার স্থানটিতে মোগল আমলের স্থাপত্য রীতি বিদ্যমান। এর একটির দৈর্ঘ্য ১৪ ফুট ও প্রস্থ ৮ ফুট এবং অপরটির দৈর্ঘ্য ১০ ফুট ও প্রস্থ ১০ ফুট। স্থাপনাটি দেখতে অনেকটা শিয়া ধর্মাবলম্বীদের ইমামবাড়ার মতো। ছোট ছোট ইট দিয়ে প্লাস্টারবিহীন অবস্থায় ঘর দুটো তৈরি। ঘর দুটোর ওপরে রয়েছে ছোট আকারের একটি করে গম্বুজ। একটি ঘরে দুটি ও অপর ঘরে রয়েছে একটি দরজা। ঘর দুটোর গায়ে রয়েছে বিশেষ নকশা। দরগাটি তৈরির সময় এর পাশে তৈরি করা হয় একটি মসজিদ যা বর্তমানে আধুনিক অবয়ব পেয়েছে।

এ ব্যাপারে কথা হয় সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান শাহ্ আমান উল্লাহ টেপার দ্বিতীয় ছেলে শাহ কালিমুল্লাহ্ রাজের সঙ্গে। তিনি জানান, ‘আমাদের পূর্বপুরুষ আনার আকন্দের পুত্রবধূ ‘বিবি সাইবানির নামে’ ১৬০০ খ্রিস্টাব্দের দ্বিতীয় দশকে মোগল রীতিতে দরগাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি প্রতিষ্ঠা করেন ‘বিবি সাইবানির স্বামী দেওয়ান আকন্দ (আনার আকন্দের পুত্র)। আনার আকন্দ ও তার পুত্র দেওয়ান আকন্দও ছিলেন আধ্যাত্মিক কামেল ও অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী। আধ্যাত্মিকতা চর্চার জন্যই দরগাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। বিবি সাইবানির উত্তরসূরি হিসেবে আমরা এ দরগাটির দেখভাল করছি ও আধ্যাত্মিকতা চর্চা অব্যাহত রেখেছি।’

সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান শাহ্ আমান উল্লাহ টেপার স্ত্রী ও উপজেলা পরিষদের সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান রিজিয়া আমান জানিয়েছেন, ‘২০১২ সালে উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় তিনি এই পুরাকীর্তিটিকে সংস্কারের উদ্দেশ্যে প্রশাসনকে জানালে প্রত্নতত্ব অধিদপ্তরের ডিডি ও কাস্টডিয়ান এসেছিলেন দেখার জন্য। পরে প্রত্নতত্ব অধিদপ্তরের লোকজন এসে এটি আংশিক সংস্কার করে। সংস্কারের ক্ষেত্রে সরকারি টিআরের পাশাপাশি আমি ব্যক্তিগতভাবে অর্থ ব্যয় করেছি। এটি রক্ষায় এখনো বাকি রয়েছে অনেক কাজ। সময়মতো সেটি করা না গেলে বিলীন হয়ে যাবে ঐতিহাসিক এ নিদর্শন।’

মোগল আমলে তৈরি বিবি সাইবানির এ দরগাটিতে ভ্রমণে এলে যে কেউ পুলকিত হবে, আনন্দে উদ্বেলিত হবে সৌন্দর্যপিপাসু মন, পাশাপাশি জানতে পারবে ইতিহাসের অজানা তথ্য।