ঢাকা ০২:৫৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২২, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ
মিয়ানমার থেকে আবার বাংলাদেশে ঢুকছে রোহিঙ্গারা

উসকানির ফাঁদে পা নয়

প্রতিবেশি রাষ্ট্র মিয়ানমারের অভ্যন্তরে দেশটির জান্তা বাহিনীর সঙ্গে আরাকান আর্মির সংঘর্ষ ও গোলাগুলি চলছে। সেনাশাসিত মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ উত্তেজনা বাংলাদেশের সীমান্তে প্রভাব ফেলেছে। গত ২১ ও ২৮ আগস্ট এবং ৩ সেপ্টেম্বর মিয়ানমার বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মর্টারশেল ও গুলি ছোড়ে এবং তাদের যুদ্ধবিমান দেশের আকাশসীমা লঙ্ঘন করে।

বিশেষজ্ঞরা এমন ঘটনায় বাংলাদেশকে জড়িয়ে মিয়ানমারের উসকানি দেখছেন। তবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘তাদের উসকানির ফাঁদে আমরা পা দিতে চাই না। আমরা পরিকল্পনা করছি বর্তমান পরিস্থিতি আমরা আন্তর্জাতিক বিশ্বে জানিয়ে রাখব।’

এদিকে, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে সশস্ত্র এমন উত্তেজনার ঘটনায় দেশটির আরও নাগরিক সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারে বলে অনেকেই আশঙ্কা করছেন। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ গোলাগুলির ঘটনায় গত শনি ও রোববার এই দুই দিনে ১০-১৫ জন রোহিঙ্গা সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করে কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং ও বালুখালী ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন, ‘আমাদের ভয় হচ্ছে, ওখান থেকে লোক যদি আবার আমাদের দেশে ঢোকার চেষ্টা করে। আমরা এজন্য আমাদের যত বর্ডার গার্ড এবং অন্যান্য সিকিউরিটি সবাইকে সতর্ক করে দিয়েছি। কেউ যেন এখানে না আসতে পারে।’ পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘দেশবাসীকে আশ্বস্ত করতে চাই যে, আমরা সব প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি। আমাদের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত আছে, যার ভিত্তিতে আমরা আমাদের এজেন্সি, বর্ডার গার্ড এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যারা দায়িত্বে আছেন তারা এই বিষয়গুলো নিশ্চিত করবেন।’

ঢাকার কূটনীতিকরা জানান, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ উত্তেজনায় বাংলাদেশকে জড়ানো তাদের উসকানিমূলক আচরণ হতে পারে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রায়ে রোহিঙ্গা সঙ্কট ইস্যুতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে বিচার চলতে কোনো বাধা নেই বলে জানানো হয়। রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমার আন্তর্জাতিক চাপে রয়েছে। এই চাপ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে মিয়ানমার সীমান্তে এমন উসকানি দিতে পারে। তবে কূটনীতিক চ্যানেলে মিয়ানমার বাংলাদেশকে জানিয়েছে, গোলাগোলির ঘটনা মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ ইস্যু। এখানে বাংলাদেশের প্রতি নেতিবাচক বা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ইচ্ছা করে তারা গোলা ছোড়েনি এবং এসব ঘটনা অনিচ্ছাকৃত ও ভুলবশত।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন সম্প্রতি বলেন, ‘মিয়ানমারে ওখানে সংঘাত হচ্ছে। তাদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ সংঘাত হচ্ছে। সেই সংঘাতের কারণে আমাদের এখানেও দুইটা বোমা পড়েছে। ওরা বলেছে, এগুলো হঠাৎ করে চলে এসেছে। কোনো উদ্দেশ্য নেই এর পেছনে।’ পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘প্রায় মাসখানেক ধরে খেয়াল করছি, মিয়ানমার থেকে যে শরণার্থী বা নাগরিকরা বাংলাদেশে এসেছেন সেই অঞ্চলে, রাখাইন অঞ্চলে, উত্তেজনা চলছে। তাদের অভ্যন্তরীণ অবস্থার হয়তো অবনতি হয়েছে। এটা মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়। কিন্তু আমরা তাদেরকে যেটা বলছি সেটা হচ্ছে- এতে যেন বাংলাদেশের সীমান্তে প্রভাব (বর্ডার ইম্প্যাক্ট) না হয়।’

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘তারা (মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত) পরিষ্কারভাবে বলেছেন যে তারা এটা তাদের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে (ক্যাপিটাল) জানাবেন। আর তাদের উসকানির ফাঁদে আমরা পা দিতে চাই না। কারণ এরকম একটা দিকে নিয়ে যেতে পারলে তাদের কৌশলগত কোনো সুবিধা থাকতে পারে এবং রোহিঙ্গা নিয়ে যে সমস্যাতে আমরা আছি এই সমস্যাটির একটি দায় আমাদের দিকেও চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হতে পারে। কারণ এরকম হয়েছে যে, ফাইটিং এ ইনভল্ভ বা সেসব বিদ্রোহী গ্রুপের সাপোর্ট করেন এমন অতীতের দু-একজন যখন আমাদের বর্ডার ক্রস করে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করেছেন আমরা কিন্তু প্রতিবেশি রাষ্ট্রের দায়িত্ববোধ থেকে তাদেরকে গ্রেফতার করে মিয়ানমারকে ফেরত দিয়েছি। এতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আমাদের সম্পর্কে বুঝতে পারছে। আমরা পরিকল্পনা করছি যে বর্তমান পরিস্থিতি আমরা আন্তর্জাতিক বিশ্বে জানিয়ে রাখব। এতে ভবিষ্যতে কোনো অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যেন বুঝতে পারে।’

মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ উত্তেজনায় নতুন করে দেশটির নাগরিকরা বাংলাদেশে প্রবেশের আশঙ্কা করা হচ্ছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, মিয়ানমারের এই অভ্যন্তরীণ ঘটনায় সেখানে বাকি যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী রয়েছে তারাও সীমান্ত অতিক্রম করতে পারে। আমরা এই বিষয়টাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি, কারণ ২০১৬ ও ২০১৭ সালে আমরা তাদের এই চলে আসাটাকে ঠেকাতে পারিনি বা ইচ্ছা করেই আমরা ঠেকাতেও চাইনি কারণ মানবতার দৃষ্টিকোণ থেকে প্রধানমন্ত্রী তাদের জায়গা করে দিয়েছেন। কিন্তু এবার আমাদের কাছে কিছু তথ্য আছে, যা আগে ছিল না।

এখন আমাদের এই ইস্যুতে খুব ভালোভাবে প্রস্তুতি নেওয়া আছে। বিজিবিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় থাকতে, যেন একজনও মিয়ানমারের নাগরিক বাংলাদেশে ঢুকতে না পারে। তবে আমরা মনে করি না যে এবার আগের মতো ঘটনা ঘটবে। কারণ হচ্ছে, যে অঞ্চলে এই ঘটনাগুলো ঘটছে সেখানে কোনো রোহিঙ্গা এখন আর বসবাস করে না। মিয়ানমারের গুথিলং ও লাথি ডং নামের যে জায়গাগুলো আছে সেগুলো এখনো জনবসতিশূন্য। সেই অঞ্চলে তাদের বিদ্রোহী গ্রুপ বা এমন সংক্রান্ত অংশবিশেষ দল থাকতে পারে; কিন্তু ফাইটটা হচ্ছে আমাদের বর্ডার অঞ্চলে। এটা আমাদের বান্দরবান জেলার আলীকদম উপজেলার নিচে অর্থাৎ রাখাইনের উত্তর-পশ্চিম কর্নারে এটা হচ্ছে। আর রোহিঙ্গারা বেশিরভাগ আছেন এখন পূর্বাঞ্চলে, মানে এই অঞ্চলটুকু অতিক্রম করে তাদের বাংলাদেশে ঢোকার কোনো সম্ভাবনা নেই।’

সাবেক পররাষ্ট্রসচিব মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মিয়ানমারের এসব ঘটনায় মিয়ানমার জান্তার অবহেলাপূর্ণ মনোভাব রয়েছে তা পরিষ্কার। মিয়ানমার মনে করে যে, এসব করলে বাংলাদেশ কূটনৈতিক প্রতিবাদের বাইরে যাবে না। তাদের এমন মনোভাব ভেঙে দিতে হবে।’

সাবেক সেনা কর্মকর্তা অধ্যাপক আমিনুল করিম বলেন, ‘এই সময়ে সীমান্তে মিয়ানমারের কর্মকাণ্ড উসকানিমূলক। কিন্তু এই উসকানিতে পা দেওয়া যাবে না। তারা এমন উসকানি দিয়ে নতুন ঝামেলা পাকাতে চায়। যাতে রোহিঙ্গাদের ফেরত না নিতে হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘কূটনৈতিক চ্যানেলে রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধান করতে পারলে সবচেয়ে ভালো হবে।’

সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং মিয়ানমারে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক সামরিক এটাচে মো. শহীদুল হক বলেন, ‘সীমান্তে এই সময়ে মিয়ানমারের কর্মকাণ্ডকে বড় পরিসরে দেখলে এটা তাদের অভ্যন্তরীণ ইস্যু। দেশটির বিদ্রোহীগোষ্ঠী আরাকান আর্মির সঙ্গে তাদের সেনাবাহিনীর যুদ্ধ-বিরতির যে সমাঝোতা হয়েছিল তা ভেঙে গেছে। মিয়ানমারের জান্তা বাহিনী চাচ্ছে তাদের সঙ্গে বাংলাদেশ ও ভারতের যে সীমান্ত আছে তা তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং ওইখানে আরাকান আর্মির সঙ্গে তাদের গোলমাল হচ্ছে। কিন্তু তাই বলে তাদের অভ্যন্তরীণ ঝামেলা বাংলাদেশের সীমান্তে প্রভাব ফেলতে পারে না। এ জন্য বাংলাদেশের শক্ত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।’

পররাষ্ট্র সচিব (সিনিয়র) মাসুদ বিন মোমেন বলেন, ‘আমাদের যে নজরদারি সেটা আছে এবং আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। কোনো উসকানি যদি হয়, ইচ্ছেকৃত হয় সেটা আমরা তখন সেভাবে ব্যবস্থা নেব। যাতে সীমান্ত এলাকায় কোনো রকমের উত্তেজনা না থাকে সে ব্যাপারে আমাদের সর্বোচ্চ সতর্কতা রয়েছে।’

এদিকে, গত ২০১৭ সালের ১৭ আগস্ট মিয়ানমার সরকার ও সেনাবাহিনীর অত্যাচার-নির্যাতন-নিপীড়ন সইতে না পেরে কমবেশি সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। সর্বশেষ ২০১৭ সালের ঘটনার আগে থেকেই আরও চার লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।

এ ছাড়া রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে প্রতি বছর গড়ে ৩০ হাজার করে নতুন শিশু জন্ম নিচ্ছে। এই হিসাবে বাংলাদেশে এখন কমবেশি ১২ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে মিয়ানমার একাধিকবার কথা দিয়েও কথা রাখেনি। প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত আট লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গার তালিকা যাচাই-বাছাইয়ের জন্য মিয়ানমারকে পাঠিয়েছে। সেখান থেকে মাত্র ৫৮ হাজার রোহিঙ্গার তালিকা যাচাই-বাছাই করেছে মিয়ানমার।

এর আগে, ১৯৯২ সালে ২,৫০,৮৭৭ জন রোহিঙ্গার তথ্য রেজিস্ট্রেশনের পর ওই বছরের ২৮ জুলাই থেকে গত ২০০৫ সাল পর্যন্ত সময়ে মোট ২,৩৬,৫৯৯ জন রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন করা হয়।

Tag :
জনপ্রিয়

গোমস্তাপুরে অধ্যক্ষের অফিস ভাংচুর আহত-৪

মিয়ানমার থেকে আবার বাংলাদেশে ঢুকছে রোহিঙ্গারা

উসকানির ফাঁদে পা নয়

প্রকাশের সময় : ১১:১৬:২৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২২

প্রতিবেশি রাষ্ট্র মিয়ানমারের অভ্যন্তরে দেশটির জান্তা বাহিনীর সঙ্গে আরাকান আর্মির সংঘর্ষ ও গোলাগুলি চলছে। সেনাশাসিত মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ উত্তেজনা বাংলাদেশের সীমান্তে প্রভাব ফেলেছে। গত ২১ ও ২৮ আগস্ট এবং ৩ সেপ্টেম্বর মিয়ানমার বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মর্টারশেল ও গুলি ছোড়ে এবং তাদের যুদ্ধবিমান দেশের আকাশসীমা লঙ্ঘন করে।

বিশেষজ্ঞরা এমন ঘটনায় বাংলাদেশকে জড়িয়ে মিয়ানমারের উসকানি দেখছেন। তবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘তাদের উসকানির ফাঁদে আমরা পা দিতে চাই না। আমরা পরিকল্পনা করছি বর্তমান পরিস্থিতি আমরা আন্তর্জাতিক বিশ্বে জানিয়ে রাখব।’

এদিকে, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে সশস্ত্র এমন উত্তেজনার ঘটনায় দেশটির আরও নাগরিক সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারে বলে অনেকেই আশঙ্কা করছেন। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ গোলাগুলির ঘটনায় গত শনি ও রোববার এই দুই দিনে ১০-১৫ জন রোহিঙ্গা সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করে কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং ও বালুখালী ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন, ‘আমাদের ভয় হচ্ছে, ওখান থেকে লোক যদি আবার আমাদের দেশে ঢোকার চেষ্টা করে। আমরা এজন্য আমাদের যত বর্ডার গার্ড এবং অন্যান্য সিকিউরিটি সবাইকে সতর্ক করে দিয়েছি। কেউ যেন এখানে না আসতে পারে।’ পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘দেশবাসীকে আশ্বস্ত করতে চাই যে, আমরা সব প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি। আমাদের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত আছে, যার ভিত্তিতে আমরা আমাদের এজেন্সি, বর্ডার গার্ড এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যারা দায়িত্বে আছেন তারা এই বিষয়গুলো নিশ্চিত করবেন।’

ঢাকার কূটনীতিকরা জানান, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ উত্তেজনায় বাংলাদেশকে জড়ানো তাদের উসকানিমূলক আচরণ হতে পারে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রায়ে রোহিঙ্গা সঙ্কট ইস্যুতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে বিচার চলতে কোনো বাধা নেই বলে জানানো হয়। রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমার আন্তর্জাতিক চাপে রয়েছে। এই চাপ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে মিয়ানমার সীমান্তে এমন উসকানি দিতে পারে। তবে কূটনীতিক চ্যানেলে মিয়ানমার বাংলাদেশকে জানিয়েছে, গোলাগোলির ঘটনা মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ ইস্যু। এখানে বাংলাদেশের প্রতি নেতিবাচক বা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ইচ্ছা করে তারা গোলা ছোড়েনি এবং এসব ঘটনা অনিচ্ছাকৃত ও ভুলবশত।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন সম্প্রতি বলেন, ‘মিয়ানমারে ওখানে সংঘাত হচ্ছে। তাদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ সংঘাত হচ্ছে। সেই সংঘাতের কারণে আমাদের এখানেও দুইটা বোমা পড়েছে। ওরা বলেছে, এগুলো হঠাৎ করে চলে এসেছে। কোনো উদ্দেশ্য নেই এর পেছনে।’ পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘প্রায় মাসখানেক ধরে খেয়াল করছি, মিয়ানমার থেকে যে শরণার্থী বা নাগরিকরা বাংলাদেশে এসেছেন সেই অঞ্চলে, রাখাইন অঞ্চলে, উত্তেজনা চলছে। তাদের অভ্যন্তরীণ অবস্থার হয়তো অবনতি হয়েছে। এটা মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়। কিন্তু আমরা তাদেরকে যেটা বলছি সেটা হচ্ছে- এতে যেন বাংলাদেশের সীমান্তে প্রভাব (বর্ডার ইম্প্যাক্ট) না হয়।’

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘তারা (মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত) পরিষ্কারভাবে বলেছেন যে তারা এটা তাদের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে (ক্যাপিটাল) জানাবেন। আর তাদের উসকানির ফাঁদে আমরা পা দিতে চাই না। কারণ এরকম একটা দিকে নিয়ে যেতে পারলে তাদের কৌশলগত কোনো সুবিধা থাকতে পারে এবং রোহিঙ্গা নিয়ে যে সমস্যাতে আমরা আছি এই সমস্যাটির একটি দায় আমাদের দিকেও চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হতে পারে। কারণ এরকম হয়েছে যে, ফাইটিং এ ইনভল্ভ বা সেসব বিদ্রোহী গ্রুপের সাপোর্ট করেন এমন অতীতের দু-একজন যখন আমাদের বর্ডার ক্রস করে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করেছেন আমরা কিন্তু প্রতিবেশি রাষ্ট্রের দায়িত্ববোধ থেকে তাদেরকে গ্রেফতার করে মিয়ানমারকে ফেরত দিয়েছি। এতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আমাদের সম্পর্কে বুঝতে পারছে। আমরা পরিকল্পনা করছি যে বর্তমান পরিস্থিতি আমরা আন্তর্জাতিক বিশ্বে জানিয়ে রাখব। এতে ভবিষ্যতে কোনো অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যেন বুঝতে পারে।’

মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ উত্তেজনায় নতুন করে দেশটির নাগরিকরা বাংলাদেশে প্রবেশের আশঙ্কা করা হচ্ছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, মিয়ানমারের এই অভ্যন্তরীণ ঘটনায় সেখানে বাকি যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী রয়েছে তারাও সীমান্ত অতিক্রম করতে পারে। আমরা এই বিষয়টাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি, কারণ ২০১৬ ও ২০১৭ সালে আমরা তাদের এই চলে আসাটাকে ঠেকাতে পারিনি বা ইচ্ছা করেই আমরা ঠেকাতেও চাইনি কারণ মানবতার দৃষ্টিকোণ থেকে প্রধানমন্ত্রী তাদের জায়গা করে দিয়েছেন। কিন্তু এবার আমাদের কাছে কিছু তথ্য আছে, যা আগে ছিল না।

এখন আমাদের এই ইস্যুতে খুব ভালোভাবে প্রস্তুতি নেওয়া আছে। বিজিবিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় থাকতে, যেন একজনও মিয়ানমারের নাগরিক বাংলাদেশে ঢুকতে না পারে। তবে আমরা মনে করি না যে এবার আগের মতো ঘটনা ঘটবে। কারণ হচ্ছে, যে অঞ্চলে এই ঘটনাগুলো ঘটছে সেখানে কোনো রোহিঙ্গা এখন আর বসবাস করে না। মিয়ানমারের গুথিলং ও লাথি ডং নামের যে জায়গাগুলো আছে সেগুলো এখনো জনবসতিশূন্য। সেই অঞ্চলে তাদের বিদ্রোহী গ্রুপ বা এমন সংক্রান্ত অংশবিশেষ দল থাকতে পারে; কিন্তু ফাইটটা হচ্ছে আমাদের বর্ডার অঞ্চলে। এটা আমাদের বান্দরবান জেলার আলীকদম উপজেলার নিচে অর্থাৎ রাখাইনের উত্তর-পশ্চিম কর্নারে এটা হচ্ছে। আর রোহিঙ্গারা বেশিরভাগ আছেন এখন পূর্বাঞ্চলে, মানে এই অঞ্চলটুকু অতিক্রম করে তাদের বাংলাদেশে ঢোকার কোনো সম্ভাবনা নেই।’

সাবেক পররাষ্ট্রসচিব মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মিয়ানমারের এসব ঘটনায় মিয়ানমার জান্তার অবহেলাপূর্ণ মনোভাব রয়েছে তা পরিষ্কার। মিয়ানমার মনে করে যে, এসব করলে বাংলাদেশ কূটনৈতিক প্রতিবাদের বাইরে যাবে না। তাদের এমন মনোভাব ভেঙে দিতে হবে।’

সাবেক সেনা কর্মকর্তা অধ্যাপক আমিনুল করিম বলেন, ‘এই সময়ে সীমান্তে মিয়ানমারের কর্মকাণ্ড উসকানিমূলক। কিন্তু এই উসকানিতে পা দেওয়া যাবে না। তারা এমন উসকানি দিয়ে নতুন ঝামেলা পাকাতে চায়। যাতে রোহিঙ্গাদের ফেরত না নিতে হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘কূটনৈতিক চ্যানেলে রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধান করতে পারলে সবচেয়ে ভালো হবে।’

সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং মিয়ানমারে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক সামরিক এটাচে মো. শহীদুল হক বলেন, ‘সীমান্তে এই সময়ে মিয়ানমারের কর্মকাণ্ডকে বড় পরিসরে দেখলে এটা তাদের অভ্যন্তরীণ ইস্যু। দেশটির বিদ্রোহীগোষ্ঠী আরাকান আর্মির সঙ্গে তাদের সেনাবাহিনীর যুদ্ধ-বিরতির যে সমাঝোতা হয়েছিল তা ভেঙে গেছে। মিয়ানমারের জান্তা বাহিনী চাচ্ছে তাদের সঙ্গে বাংলাদেশ ও ভারতের যে সীমান্ত আছে তা তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং ওইখানে আরাকান আর্মির সঙ্গে তাদের গোলমাল হচ্ছে। কিন্তু তাই বলে তাদের অভ্যন্তরীণ ঝামেলা বাংলাদেশের সীমান্তে প্রভাব ফেলতে পারে না। এ জন্য বাংলাদেশের শক্ত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।’

পররাষ্ট্র সচিব (সিনিয়র) মাসুদ বিন মোমেন বলেন, ‘আমাদের যে নজরদারি সেটা আছে এবং আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। কোনো উসকানি যদি হয়, ইচ্ছেকৃত হয় সেটা আমরা তখন সেভাবে ব্যবস্থা নেব। যাতে সীমান্ত এলাকায় কোনো রকমের উত্তেজনা না থাকে সে ব্যাপারে আমাদের সর্বোচ্চ সতর্কতা রয়েছে।’

এদিকে, গত ২০১৭ সালের ১৭ আগস্ট মিয়ানমার সরকার ও সেনাবাহিনীর অত্যাচার-নির্যাতন-নিপীড়ন সইতে না পেরে কমবেশি সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। সর্বশেষ ২০১৭ সালের ঘটনার আগে থেকেই আরও চার লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।

এ ছাড়া রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে প্রতি বছর গড়ে ৩০ হাজার করে নতুন শিশু জন্ম নিচ্ছে। এই হিসাবে বাংলাদেশে এখন কমবেশি ১২ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে মিয়ানমার একাধিকবার কথা দিয়েও কথা রাখেনি। প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত আট লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গার তালিকা যাচাই-বাছাইয়ের জন্য মিয়ানমারকে পাঠিয়েছে। সেখান থেকে মাত্র ৫৮ হাজার রোহিঙ্গার তালিকা যাচাই-বাছাই করেছে মিয়ানমার।

এর আগে, ১৯৯২ সালে ২,৫০,৮৭৭ জন রোহিঙ্গার তথ্য রেজিস্ট্রেশনের পর ওই বছরের ২৮ জুলাই থেকে গত ২০০৫ সাল পর্যন্ত সময়ে মোট ২,৩৬,৫৯৯ জন রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন করা হয়।