ঢাকা ০৯:৫২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ নভেম্বর ২০২২, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

রাজধানীতে তীব্র পানিসংকট

রাজধানীর আদাবর শেখেরটেক এলাকার বাড়িওয়ালা আইনজীবী আশিকুর রেজা চৌধুরী। তিনি জানান, গত চার বছর ধরে তার এলাকায় পানির সমস্যা রয়েছে। দিনের বেলায় পানি সরবরাহ করা হয় না। রাত আড়াইটার পর পানি। যে পরিমাণ পানি আসে তা যথেষ্ট নয়। এমনকি যেটুকু পানি আসে তাও গন্ধযুক্ত ও লালচে।

অথচ শেখেরটেক ১নং সড়কে পানির পাম্প করার জন্য আমরা ওয়াসাকে জায়গা দেই। সেই পানির পাম্পের পানিও আমাদের দেয় না। অন্য একটি সোসাইটিকে (মোহাম্মদিয়া হাউজিং) পানি দেয়া হচ্ছে। আমাদের এলাকার এ সমস্যার কথা ওয়াসার এমডি জানেন। তিনি আমাদের আশ্বস্ত করলেও বাস্তবে তা কার্যকর হচ্ছে না। রাজধানীর ভাটারা কোকাকোলা এলাকার বাড়িওয়ালা রাজু আহমেদ।

তিনি জানান, আমাদের এলাকায় এক সপ্তাহ বা ১৫ দিন পর্যন্ত পানি থাকে না। দিনের বেলা তো কখনোই পানি পাই না। রাত ১২টার পর পানি আসে। তবে যে পানি আসে তাতে ময়লা ও দুর্গন্ধ থাকে। এ পানি দিয়ে গোসল করা যায় না। প্রতি বছর গরমের সময় এ সমস্যা তীব্র আকার ধারণ করে। আমরা নিয়মিত পানির বিল পরিশোধ করছি। অথচ আমাদের পর্যাপ্ত সেবা তো দিচ্ছেই না বরং ভোগান্তিতে ফেলছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

এদিকে তিন মাসের বেশি সময় ধরে পানি সংকটে ভুগছে দক্ষিণখান এলাকার কয়েক লাখ মানুষ। এ এলাকার বাসিন্দারা জানান, পানির অভাবে ব্যাহত হচ্ছে রান্নাসহ গৃহস্থালির কাজকর্ম। পাশাপাশি পানির অভাবে রান্না বন্ধ থাকায় তাদের কিনে খেতে হচ্ছে খাবার।

ভুক্তভোগীরা আরও জানান, পানি সংকটে তারা নিয়মিত গোসল করতে পারছেন না। দু-একদিন পরপর গোসল করতে হচ্ছে। ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন অনেকে। এলাকাবাসী ওয়াসার সাথে যোগাযোগ করলে অবস্থার একটি উন্নতি ঘটলেও কয়েকদিন পর আবার একই সমস্যা দেখা দেয়। স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরও বিষয়টি অবগত আছেন এবং এ সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিলেও তা বাস্তবে কোনো কাজ হচ্ছে না। শুধু আদাবর ও দক্ষিণ খান এলাকা নয়, রাজধানীর আরও বেশকিছু এলাকায় রয়েছে তীব্র পানির সংকট।

এছাড়াও সেসব এলাকায় রয়েছে বিশুদ্ধ পানির অভাব। রাজধানীর নর্দ্দা, কালাচাঁদপুর, ভাটারা, শাহজাদপুরের খিলবাড়ির টেক, উত্তর বাড্ডা, মধ্য বাড্ডা, কুড়িল, মিরপুর ১ ও ১০, সেনপাড়া, দক্ষিণ পাইকপাড়া, মাতুয়াইল, জুরাইন এলাকাসহ কয়েকটি এলাকায় খোঁজ নিয়ে তীব্র পানির সংকট ও বিশুদ্ধ পানির অভাবের কথা জানা যায়।

মিরপুর-১ এর দক্ষিণ পাইকপাড়া এলাকায় চার মাসের বেশি সময় ধরে রয়েছে পানির সমস্যা। যে পানি আসে তাও দুর্গন্ধযুক্ত। রাতে কয়েক ঘণ্টার জন্য পানি আসে বলে অভিযোগ এ এলাকার বাসিন্দাদের।

এ এলাকার বাড়িওয়ালারা জানান, পানির সমস্যার কারণে বাসা ছেড়ে দিচ্ছেন অনেকে। ওয়াসা বরাবর অভিযোগ দেয়া হয়েছে তবে কোনো কাজে আসছে না। ভারাটিয়ারা বলছেন, পানি না থাকলে তো এ এলাকায় থাকা যাবে না। পানি সংগ্রহ করার জন্য রাত জেগে থাকতে হয়। যে পানি সংগ্রহ করা হয় তা দিয়ে দৈনন্দিন কাজ করা যাচ্ছে না।

মাতুয়াইল ও জুরাইন এলাকার বাসিন্দারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমাদের এলাকায় সবসময় ওয়াসার পানির সমস্যা। একটা নির্দিষ্ট সময়ে আসে। আবার মাঝে মাঝে তিন-চারদিন পানি থাকে না। অভিযোগ দিলেও কোনো কাজ হয় না। শেখেরটেক এলাকার বাড়িওয়ালা আইনজীবী আশিকুর রেজা চৌধুরী বলেন, রাত জেগে পানি সংগ্রহ করতে হয়। দিনের বেলায় তো পানি আসে না। গত চার বছর ধরে এ সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছি। যে পানি সরবরাহ করা হয় তা গন্ধযুক্ত ও লালচে। গণমাধ্যমে কিছু খবর প্রকাশিত হওয়ায় একটু একটু পানি আসছে তবে এটি কোনো স্থায়ী সমাধান না। ওয়াসার এমডিও এ বিষয়ে অবগত তারপরও কাজ হচ্ছে না। ওয়াসার অবহেলার কারণে আমরা আজ ভোগান্তিতে আছি বলে অভিযোগ তার।

শাহজাদপুরের খিলবাড়ির টেক এলাকার বাসিন্দা নিলয় আহমেদ বলেন, গত এক বছর ধরে পানির সমস্যা। এখন এ সমস্যা আরও বেশি হচ্ছে। দিনের বেলায় অল্প সময়ের জন্য পানি আসে। আর বাকি সময় পানি থাকে না। যেটুকু আসে তা সংরক্ষণ করে রেখে কাজ সারতে হচ্ছে। দক্ষিণখান এলাকার বাসিন্দা রিতু আক্তার ও সুমন প্রতিবেদককে বলেন, দিনের বেলায় কোনো পানি আসে। গভীর রাতে আসে পানি। রাত জেগে পানি সংগ্রহ করতে হয়। একটি পানির ট্যাব ছাড়লে অন্যটিতে থাকে না পানি। যে পানি সংগ্রহ করা হয় তা দিয়েই কোনোমতে রান্নাবান্না ও গোসল করতে হয়। তবে প্রতিদিন গোসল করতে পারেন না তারা। ফলে বয়স্ক থেকে শিশু সবার হচ্ছে স্বাস্থ্যহানি। যে পানি আসে তাও গন্ধযুক্ত। এ সমস্যার কথা স্থানীয় কাউন্সিলর ডি এম শামীম ও ওয়াসাকে জানালেও কোনো সমাধান হচ্ছে না।

রাজধানীর যেসব এলাকায় পানির সংকট রয়েছে সেসব এলাকার স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ওয়াসাকে বারবার জানানোর পরও কোনো কাজ হচ্ছে না। বরাবরই তারা আমাদের এ সমস্যা সমাধান করবেন বলে আশ্বস্ত করে যাচ্ছেন।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ৩৯নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, গরমের সময় পানির সমস্যাটা তীব্র আকার ধারণ করে। এ সমস্যা সব জায়গায় আছে। আমি প্রতিদিনই ওয়াসাকে পানির সমস্যার কথা জানাচ্ছি। আমার এলাকায় পানির পাম্প বসানোর জন্য দুইটা জায়গা চেয়েছে। একটি জায়গা ইতোমধ্যে পেয়েছি। পাম্প বসাতে পারলে এ সমস্যা দ্রুতই সমাধান হবে বলে জানান তিনি।

এ বিষয়ে জানতে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খানকে কয়েকবার তার নাম্বারে ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।

Tag :
জনপ্রিয়

করোনা মোকাবিলার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে স্বাস্থ্যখাতের মানোন্নয়ন করা হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

রাজধানীতে তীব্র পানিসংকট

প্রকাশের সময় : ১০:৫১:০৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২২

রাজধানীর আদাবর শেখেরটেক এলাকার বাড়িওয়ালা আইনজীবী আশিকুর রেজা চৌধুরী। তিনি জানান, গত চার বছর ধরে তার এলাকায় পানির সমস্যা রয়েছে। দিনের বেলায় পানি সরবরাহ করা হয় না। রাত আড়াইটার পর পানি। যে পরিমাণ পানি আসে তা যথেষ্ট নয়। এমনকি যেটুকু পানি আসে তাও গন্ধযুক্ত ও লালচে।

অথচ শেখেরটেক ১নং সড়কে পানির পাম্প করার জন্য আমরা ওয়াসাকে জায়গা দেই। সেই পানির পাম্পের পানিও আমাদের দেয় না। অন্য একটি সোসাইটিকে (মোহাম্মদিয়া হাউজিং) পানি দেয়া হচ্ছে। আমাদের এলাকার এ সমস্যার কথা ওয়াসার এমডি জানেন। তিনি আমাদের আশ্বস্ত করলেও বাস্তবে তা কার্যকর হচ্ছে না। রাজধানীর ভাটারা কোকাকোলা এলাকার বাড়িওয়ালা রাজু আহমেদ।

তিনি জানান, আমাদের এলাকায় এক সপ্তাহ বা ১৫ দিন পর্যন্ত পানি থাকে না। দিনের বেলা তো কখনোই পানি পাই না। রাত ১২টার পর পানি আসে। তবে যে পানি আসে তাতে ময়লা ও দুর্গন্ধ থাকে। এ পানি দিয়ে গোসল করা যায় না। প্রতি বছর গরমের সময় এ সমস্যা তীব্র আকার ধারণ করে। আমরা নিয়মিত পানির বিল পরিশোধ করছি। অথচ আমাদের পর্যাপ্ত সেবা তো দিচ্ছেই না বরং ভোগান্তিতে ফেলছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

এদিকে তিন মাসের বেশি সময় ধরে পানি সংকটে ভুগছে দক্ষিণখান এলাকার কয়েক লাখ মানুষ। এ এলাকার বাসিন্দারা জানান, পানির অভাবে ব্যাহত হচ্ছে রান্নাসহ গৃহস্থালির কাজকর্ম। পাশাপাশি পানির অভাবে রান্না বন্ধ থাকায় তাদের কিনে খেতে হচ্ছে খাবার।

ভুক্তভোগীরা আরও জানান, পানি সংকটে তারা নিয়মিত গোসল করতে পারছেন না। দু-একদিন পরপর গোসল করতে হচ্ছে। ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন অনেকে। এলাকাবাসী ওয়াসার সাথে যোগাযোগ করলে অবস্থার একটি উন্নতি ঘটলেও কয়েকদিন পর আবার একই সমস্যা দেখা দেয়। স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরও বিষয়টি অবগত আছেন এবং এ সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিলেও তা বাস্তবে কোনো কাজ হচ্ছে না। শুধু আদাবর ও দক্ষিণ খান এলাকা নয়, রাজধানীর আরও বেশকিছু এলাকায় রয়েছে তীব্র পানির সংকট।

এছাড়াও সেসব এলাকায় রয়েছে বিশুদ্ধ পানির অভাব। রাজধানীর নর্দ্দা, কালাচাঁদপুর, ভাটারা, শাহজাদপুরের খিলবাড়ির টেক, উত্তর বাড্ডা, মধ্য বাড্ডা, কুড়িল, মিরপুর ১ ও ১০, সেনপাড়া, দক্ষিণ পাইকপাড়া, মাতুয়াইল, জুরাইন এলাকাসহ কয়েকটি এলাকায় খোঁজ নিয়ে তীব্র পানির সংকট ও বিশুদ্ধ পানির অভাবের কথা জানা যায়।

মিরপুর-১ এর দক্ষিণ পাইকপাড়া এলাকায় চার মাসের বেশি সময় ধরে রয়েছে পানির সমস্যা। যে পানি আসে তাও দুর্গন্ধযুক্ত। রাতে কয়েক ঘণ্টার জন্য পানি আসে বলে অভিযোগ এ এলাকার বাসিন্দাদের।

এ এলাকার বাড়িওয়ালারা জানান, পানির সমস্যার কারণে বাসা ছেড়ে দিচ্ছেন অনেকে। ওয়াসা বরাবর অভিযোগ দেয়া হয়েছে তবে কোনো কাজে আসছে না। ভারাটিয়ারা বলছেন, পানি না থাকলে তো এ এলাকায় থাকা যাবে না। পানি সংগ্রহ করার জন্য রাত জেগে থাকতে হয়। যে পানি সংগ্রহ করা হয় তা দিয়ে দৈনন্দিন কাজ করা যাচ্ছে না।

মাতুয়াইল ও জুরাইন এলাকার বাসিন্দারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমাদের এলাকায় সবসময় ওয়াসার পানির সমস্যা। একটা নির্দিষ্ট সময়ে আসে। আবার মাঝে মাঝে তিন-চারদিন পানি থাকে না। অভিযোগ দিলেও কোনো কাজ হয় না। শেখেরটেক এলাকার বাড়িওয়ালা আইনজীবী আশিকুর রেজা চৌধুরী বলেন, রাত জেগে পানি সংগ্রহ করতে হয়। দিনের বেলায় তো পানি আসে না। গত চার বছর ধরে এ সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছি। যে পানি সরবরাহ করা হয় তা গন্ধযুক্ত ও লালচে। গণমাধ্যমে কিছু খবর প্রকাশিত হওয়ায় একটু একটু পানি আসছে তবে এটি কোনো স্থায়ী সমাধান না। ওয়াসার এমডিও এ বিষয়ে অবগত তারপরও কাজ হচ্ছে না। ওয়াসার অবহেলার কারণে আমরা আজ ভোগান্তিতে আছি বলে অভিযোগ তার।

শাহজাদপুরের খিলবাড়ির টেক এলাকার বাসিন্দা নিলয় আহমেদ বলেন, গত এক বছর ধরে পানির সমস্যা। এখন এ সমস্যা আরও বেশি হচ্ছে। দিনের বেলায় অল্প সময়ের জন্য পানি আসে। আর বাকি সময় পানি থাকে না। যেটুকু আসে তা সংরক্ষণ করে রেখে কাজ সারতে হচ্ছে। দক্ষিণখান এলাকার বাসিন্দা রিতু আক্তার ও সুমন প্রতিবেদককে বলেন, দিনের বেলায় কোনো পানি আসে। গভীর রাতে আসে পানি। রাত জেগে পানি সংগ্রহ করতে হয়। একটি পানির ট্যাব ছাড়লে অন্যটিতে থাকে না পানি। যে পানি সংগ্রহ করা হয় তা দিয়েই কোনোমতে রান্নাবান্না ও গোসল করতে হয়। তবে প্রতিদিন গোসল করতে পারেন না তারা। ফলে বয়স্ক থেকে শিশু সবার হচ্ছে স্বাস্থ্যহানি। যে পানি আসে তাও গন্ধযুক্ত। এ সমস্যার কথা স্থানীয় কাউন্সিলর ডি এম শামীম ও ওয়াসাকে জানালেও কোনো সমাধান হচ্ছে না।

রাজধানীর যেসব এলাকায় পানির সংকট রয়েছে সেসব এলাকার স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ওয়াসাকে বারবার জানানোর পরও কোনো কাজ হচ্ছে না। বরাবরই তারা আমাদের এ সমস্যা সমাধান করবেন বলে আশ্বস্ত করে যাচ্ছেন।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ৩৯নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, গরমের সময় পানির সমস্যাটা তীব্র আকার ধারণ করে। এ সমস্যা সব জায়গায় আছে। আমি প্রতিদিনই ওয়াসাকে পানির সমস্যার কথা জানাচ্ছি। আমার এলাকায় পানির পাম্প বসানোর জন্য দুইটা জায়গা চেয়েছে। একটি জায়গা ইতোমধ্যে পেয়েছি। পাম্প বসাতে পারলে এ সমস্যা দ্রুতই সমাধান হবে বলে জানান তিনি।

এ বিষয়ে জানতে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খানকে কয়েকবার তার নাম্বারে ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।