ঢাকা ০৯:৫৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

৫১ দেশে শীর্ষ নেতৃত্বে নারী

বিশ্ব পরিপ্রেক্ষিতে নারীনেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও নারীর ক্ষমতায়নের পথ কখনই মসৃণ ছিল না। গণতন্ত্রে ভোটের অধিকার অর্জন থেকে শুরু করে বিভিন্ন পদে অধিষ্ঠিত হওয়া অথবা জাতীয় নেতা হওয়া পর্যন্ত পুরুষশাসিত বৈশ্বিক রাজনীতির মঞ্চের প্রতিটি স্তরে নারীরা লড়াই করে আসছেন। তারপরও বিভিন্ন দেশে সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন অনেক নারী। সঙ্গে ভাইস প্রেসিডেন্টকে ধরলে বর্তমানে ৫১টি দেশের শীর্ষ নেতৃত্বে রয়েছেন নারীরা। লিখেছেন নাসরিন শওকত

আধুনিক বিশ্বে নারীর ক্ষমতায়নের প্রথম ভিত রচনা হয় বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে। সে সময়ে তুভান পিপলস রিপাবলিক বা তুভান প্রজাতন্ত্রে (বর্তমান রাশিয়ান ফেডারেশনভুক্ত) প্রথম নারী রাষ্ট্রপ্রধান বা চেয়ারওম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন খেরটেক আনচিমা-টোকা। তিনিই বিশ্বের প্রথম নির্বাচিত নারী রাষ্ট্রপ্রধান। জাতিসংঘের তথ্যমতে ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য রাজনীতি ও সমাজজীবনে নারীর সমান অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব অপরিহার্য। পরিসংখ্যান বলছে, বিশ^জুড়ে সিদ্ধান্তগ্রহণের নানা স্তরে নারীর প্রতিনিধিত্ব এখনো কম। প্রতি বছর নারীর ক্ষমতায়নে অংশগ্রহণ বাড়ার হার মাত্র ০ দশমিক ৫২ শতাংশ। এ হার দিয়ে ২০৭৭ সালের আগে শীর্ষ পদে নারী-পুরুষ সমতা আসবে কি-না সন্দেহ। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের গণনা ও পিউ রিসার্চ সেন্টারের বিশ্লেষণ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ৬৬ বছরে বিশে^র ১৯৬টি দেশের মধ্যে ৭০টি দেশে প্রথম নারী নেতা সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন নারী।

নারীনেতৃত্বে এগিয়ে ইউরোপ

ইউরোপের মোট ৪৫টি দেশের মধ্যে ১৫টি দেশের সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানের পদে রয়েছেন নারী। অর্থাৎ ইউরোপের এক-তৃতীয়াংশ দেশে নারীরা নেতৃত্বে রয়েছেন। মার্গারেট থ্যাচার ও থেরেসা মে’র পর যুক্তরাজ্যের তৃতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন লিজ ট্রাস। ১৯৯৬ সালে কনজারভেটিভ পার্টিতে যোগ দেওয়া লিজ সাউথ ওয়েস্ট নরফ্লোকের পার্লামেন্ট সদস্য। প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের কনজারভেটিভ পার্টির দলীয় ভোটাভুটিতে প্রতিপক্ষ ঋষি সুনাককে হারিয়ে জয়ী হন তিনি। ৬ সেপ্টেম্বর থেকে পশ্চিম ইউরোপের এই দেশটির প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন লিজ ট্রাস। পশ্চিম ইউরোপের দেশ ফ্রান্সে প্রধানমন্ত্রী পদে বসেছেন এলিজাবেথ বোর্ন। তিনি দেশটির প্রথম ৩০ বছর পর প্রথম নারী হিসেবে এই দায়িত্ব পেয়েছেন। ৬১ বছরের এলিজাবেথ ২০২২ সালে সরকারপ্রধানের এই দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে কাজ করে যাচ্ছেন। ইউরোপের আরেক দেশ এস্তোনিয়ার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন ৪৫ বছরের কাজা কালাস। ২০২১ সালে ১৯তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি দায়িত্ব পান। উত্তর ইউরোপের দেশ ফিনল্যান্ড। ২০১৯ সাল থেকে দেশটির ৪৬তম প্রধানমন্ত্রীর পদে রয়েছেন সান্না মারিন। মাত্র ৩৩ বছরের প্রধানমন্ত্রী হওয়া সান্না বহুবার বিতর্কে জড়িয়ে রক্ষণশীলদের সমালোচনার মুখে পড়েছেন। গ্রিসের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ক্যাটরিনা সাকেল্লারোপোলু। ৬৬ বছরের এই রাজনীতিক দেশটির প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট। ২০২০ সাল থেকে তিনি রাষ্ট্রপ্রধানের এই দায়িত্বে রয়েছেন।

মাত্র ৪৪ বছরে হাঙ্গেরির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন কাটালিন নোভাক। ২০২২ সালে দেশটির প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস গড়েছেন তিনি। এদিকে উত্তর ইউরোপের দেশ আইসল্যান্ডের ২৮তম প্রধানমন্ত্রী ক্যাটরিন জেকবসডট্টির। ২০১৭ সাল থেকে ওই পদে রয়েছেন তিনি। মাত্র ৪১ বছর বয়সে তিনি সরকারপ্রধানের এই দায়িত্ব পান। কসোভোর ৫তম প্রেসিডেন্ট পদে রয়েছেন ভিজোসা ওসমানি। ৪০ বছরের এই রাজনীতিক ২০২১ সালের ৪ এপ্রিল রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব নেন। পূর্ব ইউরোপের দেশ মলডোভার দুই নারী রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানের দায়িত্বে রয়েছেন। এর মধ্যে প্রেসিডেন্ট পদে রয়েছেন মারিয়া সান্ডু। এই নারী রাজনীতিক ২০২০ সালের ডিসেম্বরে মলডোভার ষষ্ঠ প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত হন। আর নাতালিয়া গাভ্রিলিটা মলডোভার প্রধানমন্ত্রী পদে রয়েছেন। ৪৪ বছরের নাতালিয়া ২০২১ সালে ১৫তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান। তিনি দেশটির তৃতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী। আবার মধ্য ইউরোপের দেশ সার্বিয়ার প্রধানমন্ত্রী পদে রয়েছেন আনা বার্নাবিক। ৪৬ বছরের আনা প্রথম নারী হিসেবে সরকারপ্রধানের এই দায়িত্ব পেয়ে ইতিহাস গড়েছেন। জুজানা কাপুটোভা সেøাভাকিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন। ২০১৯ সাল থেকে তিনি দেশটির ৫ম প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ৪৫ বছর বয়সী এই পরিবেশকর্মী দেশটির প্রথম নারী প্রেসিডেন্টও। সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী পদে রয়েছেন মাগডালেনা অ্যান্ডারসন। ৫৫ বছর বয়সী দেশটির এই অর্থনীতিবিদ ২০২১ সাল থেকে সরকারপ্রধানের এই দায়িত্ব পালন করছেন। নিউজিল্যান্ডের ৪০তম প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আর্ডেন। দেশটির লেবার পার্টির এই রাজনীতিক ২০১৭ সাল থেকে মাউন্ড অ্যালবার্ট আসন থেকে পার্লামেন্টের সদস্য। ২০১৭ সালে তিনি বিল ইংলিশের স্থলাভিষিক্ত হয়ে সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন। এদিকে লিথুয়ানিয়ার প্রধানমন্ত্রী হলেন ইনগ্রিডা সিমোনেইতে। ২০২০ সালে তিনি দেশটির ১৭তম সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন। আবার দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের দেশ বুলগেরিয়ায় ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে রয়েছেন ইলিয়ানা ইয়োতোভা। তিনি দেশটির ২০১৬ সালের পার্লামেন্টে নির্বাচনে ষষ্ঠতম ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ২০১৭ সাল থেকে তিনি সরকারপ্রধানের কাজ করছেন। এদিকে মেহরিবান জিজি আলিয়েভা আজারবাইজানের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্টের পদে রয়েছেন। তিনি ২০১৭ সাল থেকে সরকারপ্রধানের এই দায়িত্ব পালন করলেও দেশটির ফার্স্ট লেডিও তিনিই।

আমেরিকার ১৭ দেশে নারীর ক্ষমতায়ন

আমেরিকা মহাদেশের ৫৭টি দেশের মধ্যে ১৭টি দেশে নারী সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। অর্থাৎ এই অঞ্চলের এক-তৃতীয়াংশেরও একটু বেশি দেশে নারী নেতৃত্বে রয়েছেন। এর মধ্যে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের দুই দেশে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বে নারী থাকলেও বাকি ১৫টি দেশে রয়েছেন সরকারপ্রধান নারী।

উত্তর আমেরিকার দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৯তম ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন কমলা দেবী হ্যারিস। ক্যালিফোর্নিয়ার সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই মার্কিনি দেশটির প্রথম নির্বাচিত নারী ভাইস প্রেসিডেন্ট। মধ্য আমেরিকার দেশ নিকারাগুয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন রোজারিও মরিয়া মুরিল্লো জামব্রানা। তিনি দেশটির প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল ওর্তেগার স্ত্রী (ফার্স্ট লেডি) ও একজন কবি। ২০১৭ সাল থেকে দায়িত্বে থাকা রোজারিওর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনিজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করছেন ডেলসি এলোইনা রদ্রিগেজ গোমেজ। ২০১৮ সালে দেশটির প্রেসিডেন্ট মাদুরো এলোইনাকে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়োগ দেন। পাঁচ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করা এলোইনা একাধিক আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছেন। এদিকে আর্জেন্টিনার ৩৭তম ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন ক্রিস্টিনা এলিসাবেত ফার্নান্দেজ দ্য কির্চনার। তিনি এর আগে ২০০৭ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত দেশটির প্রথম নির্বাচিত নারী প্রেসিডেন্ট ছিলেন। প্রগতিশীল ভাবধারার ক্রিস্টিনা ২০১৯ সাল থেকে সরকারে দায়িত্ব পালন করছেন। বিট্রিজ আর্গিমন সেডেইরা উরুগুয়ের ১৮তম ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দেশটির ন্যাশনাল পার্টির এই রাজনীতিবিদ ২০২০ সালে প্রথম নির্বাচিত নারী হিসেবে এই পদে বসেন। সে সময় থেকে তিনি তার দলের লুইস আলবার্তো হেবারের স্থলাভিষিক্ত হয়ে দায়িত্ব পালন করছেন। দক্ষিণ আমেরিকার দেশ পেরুর প্রথম নির্বাচিত নারী ভাইস প্রেসিডেন্ট হলেন দিনা এরসিলিয়া বলুয়ার্তে জেগাররা। তিনি মার্টিন ভিজকারার স্থলাভিষিক্ত হন। স্বাধীন পেরুর স্বপ্ন দেখা এই রাজনীতিক ২০২১ সাল থেকে সরকারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। মেরি ডেনিস মুনিভ অ্যাঙ্গারমুলার কোস্টারিকার দ্বিতীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট। তিনি মার্ভিন রদ্রিগেজের স্থলাভিষিক্ত হন। ২০২২ সালের ৮ মে থেকে দায়িত্বে রয়েছেন তিনি। এদিকে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ কলম্বিয়ার ইতিহাসের প্রথম আফ্রো-কলম্বিয়ান ভাইস প্রেসিডেন্ট হলেন ফ্রান্সিয়া এলেনা মার্কেজ। তিনি ২০২২ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে মনোনীত হন। ক্যারিবিয়ান দেশ ডমিনিকান রিপাবলিকের ৪০তম ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে রয়েছেন র‌্যাকুয়েল পেনা দ্য আনতুনা। তিনি ২০২০ সালে মার্গারিটা সেদেনোর স্থলাভিষিক্ত হন। মডার্ন রেভ্যুলুশনারি পার্টির এই রাজনীতিবিদ দুই বছরের বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। ক্যারিবিয়ান দেশ বারবাডোসে দুই নারী সরকারপ্রধান ও রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বে রয়েছেন। ডেম স্যান্ড্রা প্রুনেলা মেসন বারবাডোসের প্রথম প্রেসিডেন্ট। ব্রিটিশ শাসন থেকে বেরিয়ে এসে প্রজাতন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের সময় থেকে (২০২১ সাল) তিনি বারবাডোসের রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এদিকে মিয়া আমর মোত্তেলে ক্যারিবিয়ান এই দেশটির ৮ম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন। বারবাডোস লেবার পার্টির এই নেতা ২০১৮ সাল থেকে সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন। এই অঞ্চলের আরেক দেশ ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর ষষ্ঠতম প্রেসিডেন্ট হলেন পলা-মাই উইকস। তিনি দেশটির প্রথম নারী রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ২০১৮ সাল থেকে দায়িত্বে রয়েছেন।

মধ্য আমেরিকার দেশ হন্ডুরাসে দুই নারী প্রেসিডেন্ট ও ভাইস-প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে রয়েছেন। আইরিস জিওমারা কাস্ত্রো সারমিয়েন্তো দেশটির ৫৬তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন। ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে দেশটির রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন। ডরিস আলেজান্দ্রিনা গুতিয়েরেস ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এদিকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দুই দ্বীপদেশ পালাউ এবং সামাও-এ দুই নারী যথাক্রমে সরকার ও রাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছেন। জে উদচ সেঙ্গেবাউ পালাউ-এর ১০তম ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে ২০২১ সাল থেকে কাজ করছেন। আর সামাও-এর আফিওগা ফিমে নাওমি মাতা’আফা সপ্তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি সামাও-এর প্রথম নারী সরকারপ্রধান হিসেবে ২০২১ সালে দায়িত্ব নেন।

এশিয়ার চিত্র

এশিয়ায় নেতৃত্বে রয়েছে ৮ জন নারী। এই অঞ্চলের ৪৮টি দেশের মধ্যে ৮ দেশের ৫ জন রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বে রয়েছেন। আর ৩ জন সরকারপ্রধান। বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি সময় ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওয়াজেদ। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী এই নেতা দেশটির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল অওয়ামী লীগের সভাপতি। তিনি তৃতীয় মেয়াদে ২০০৯ সাল থেকে সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। ভারতের ১৫তম রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু। রামনাথ কোভিন্দের উত্তরসূরি হিসেবে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মুর্মু ভারতের প্রথম আদিবাসী রাষ্ট্রপতি। দেশটির বিজেপির এই নেতা ২০২২ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিপক্ষের যশবন্ত সিনহাকে পরাজিত করে জয়ী হন। ২৫ জুলাই থেকে মুর্মু রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন। নেপালের দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট হলেন বিদ্যা দেবী ভা-ারি। ২০১৫ সালের অক্টোবরে পার্লামেন্টে অনুষ্ঠিত এক ভোটে নেপালি কংগ্রেস পার্টির কুল বাহাদুর গুরাংকে পরাজিত করে দেশটির প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। সে সময় থেকে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

চীন প্রজাতন্ত্র তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট হলেন সাই ইং-ওয়েন। নিজের স্বাতন্ত্র্য ধরে রাখতে চাওয়া তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ২০১৬ সাল থেকে দায়িত্ব পালন করে আসছেন সাই। ডেমোক্রেটিক পার্টির এই রাজনীতিবিদ দেশটির প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট। সিঙ্গাপুরের ৮তম প্রেসিডেন্ট হলেন হালিমা ইয়াকুব। ২০১৭ সাল থেকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তিনি সিঙ্গাপুরের প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট ও দক্ষিণ এশিয়ার চতুর্থতম রাষ্ট্রপ্রধান। এদিকে ভিয়েতনামের দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে রয়েছেন ভো থি অন জুন। তিনি ২০২১ সালে দেশটির পার্লামেন্টে অনুষ্ঠিত এক ভোটের মাধ্যমে দান থি নোক থিন-এর স্থলাভিষিক্ত হন। তিনি এক বছরেরও বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। লাওসের পানি ইয়াথোটো ২০২১ সাল থেকে ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে রয়েছেন। লাওস পিপলস রেভ্যুলুশনারি পার্টির এই রাজনীতিবিদ দেশটির ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্য ও দেশটির প্রথম নির্বাচিত নারী ভাইস প্রেসিডেন্ট। ফিলিপাইনের ১৫তম ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে রয়েছেন সারা জিমারম্যান দুয়ার্তে-কার্পিও। তিনি দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে তরুণ ও তৃতীয় নারী ভাইস প্রেসিডেন্ট। লেনি রোবারদোর স্থলাভিষিক্ত হয়ে তিনি ২০২২ সালে জুন থেকে দায়িত্ব পালন করছেন।

পিছিয়ে আফ্রিকা

আফ্রিকার ৫৪টি দেশের মধ্যে ৯টি দেশে নারীরা বর্তমানে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তন্মধ্যে দুটি দেশে নারী রাষ্ট্রপ্রধান ছাড়া বাকি সাতটি দেশে রয়েছেন সরকারপ্রধান। ইথিওপিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন সাহলে-ওয়ার্ক জিউদে। তিনি পূর্ব আফ্রিকার এই দেশটির প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট। ২০১৮ সাল থেকে তিনি রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তানজানিয়ার ষষ্ঠতম প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে রয়েছেন সামিয়া সুলুহু হাসান। তিনি ইস্ট আফ্রিকান কমিউনিটির তৃতীয় নারী সরকারপ্রধান। ২০২১ সাল থেকে তিনি তানজানিয়ার সরকারপ্রধান হিসেবে কাজ করছেন। গ্যাবনের ১২তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন রোজ ক্রিস্টিয়ানে রাপন্দা। দেশটির প্রথম এই নারী প্রধানমন্ত্রী ২০২০ সাল থেকে সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন। এদিকে মধ্য আফ্রিকার দেশ টোগোর ১৪তম প্রধানমন্ত্রী হলেন ভিক্টোইরে তোমেগাহ ডগবে। তিনি দেশটির প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। ২০২০ সাল থেকে তিনি সরকারপ্রধানের দায়িত্বে রয়েছেন। দক্ষিণ সুদানের চতুর্থতম ভাইস প্রেসিডেন্ট মাবিওরের রেবেকা নায়ানডেং। তিনি ২০২০ সাল থেকে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এদিকে পূর্ব আফ্রিকার দেশ উগান্ডায় ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন জেসিকা রোজ আলুপো। ২০২১ সাল থেকে তিনি কাজ করছেন। এদিকে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ বেনিন-এর প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্টের পদে রয়েছেন মারিয়াম চাবি তালাতা। তিনি ২০২১ সাল থেকে এই দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়াও জাম্বিয়া ও লাইবেরিয়ায় যথাক্রমে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দুই নারী দায়িত্বে। ২০২১ সাল থেকে মুতালে নালুমাঙ্গো জাম্বিয়ার ১৪তম ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে রয়েছেন। আর জুয়েল টেইলর ৩০তম ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে লাইবেরিয়ায় রয়েছেন ২০১৮ সাল থেকে।

আরব বিশ্ব

আরব বিশ্বে প্রথম বারের মতো ক্ষমতায় বসা নারী প্রধানমন্ত্রী হলেন- তিউনিশিয়ার নাজলা বাউদেন রমধান। ৬৩ বছরের নাজাল কখনো সরাসরি রাজনীতিতে অংশ নেননি। দেশটির প্রেসিডেন্ট কাইস সঈদ দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে সরিয়ে দিয়ে ২০২১ সালে সরকারপ্রধান হিসেবে নাজলাকে নিয়োগ করেছেন। এদিকে সিরিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন নাজা আল-আত্তার। আরব বিশে^র মধ্যে তিনিই প্রথম এ পদে বসেন। ১৯৭৬ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত তিনি দেশটির সংস্কৃতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। পরে ২০০৬ সালে তাকে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিযুক্ত করা হয়।

Tag :

প্রতিমায় রং তুলির আঁচড়ে ব্যস্ত কারিগররা

৫১ দেশে শীর্ষ নেতৃত্বে নারী

প্রকাশের সময় : ০৯:৫৫:১৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২২

বিশ্ব পরিপ্রেক্ষিতে নারীনেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও নারীর ক্ষমতায়নের পথ কখনই মসৃণ ছিল না। গণতন্ত্রে ভোটের অধিকার অর্জন থেকে শুরু করে বিভিন্ন পদে অধিষ্ঠিত হওয়া অথবা জাতীয় নেতা হওয়া পর্যন্ত পুরুষশাসিত বৈশ্বিক রাজনীতির মঞ্চের প্রতিটি স্তরে নারীরা লড়াই করে আসছেন। তারপরও বিভিন্ন দেশে সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন অনেক নারী। সঙ্গে ভাইস প্রেসিডেন্টকে ধরলে বর্তমানে ৫১টি দেশের শীর্ষ নেতৃত্বে রয়েছেন নারীরা। লিখেছেন নাসরিন শওকত

আধুনিক বিশ্বে নারীর ক্ষমতায়নের প্রথম ভিত রচনা হয় বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে। সে সময়ে তুভান পিপলস রিপাবলিক বা তুভান প্রজাতন্ত্রে (বর্তমান রাশিয়ান ফেডারেশনভুক্ত) প্রথম নারী রাষ্ট্রপ্রধান বা চেয়ারওম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন খেরটেক আনচিমা-টোকা। তিনিই বিশ্বের প্রথম নির্বাচিত নারী রাষ্ট্রপ্রধান। জাতিসংঘের তথ্যমতে ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য রাজনীতি ও সমাজজীবনে নারীর সমান অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব অপরিহার্য। পরিসংখ্যান বলছে, বিশ^জুড়ে সিদ্ধান্তগ্রহণের নানা স্তরে নারীর প্রতিনিধিত্ব এখনো কম। প্রতি বছর নারীর ক্ষমতায়নে অংশগ্রহণ বাড়ার হার মাত্র ০ দশমিক ৫২ শতাংশ। এ হার দিয়ে ২০৭৭ সালের আগে শীর্ষ পদে নারী-পুরুষ সমতা আসবে কি-না সন্দেহ। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের গণনা ও পিউ রিসার্চ সেন্টারের বিশ্লেষণ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ৬৬ বছরে বিশে^র ১৯৬টি দেশের মধ্যে ৭০টি দেশে প্রথম নারী নেতা সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন নারী।

নারীনেতৃত্বে এগিয়ে ইউরোপ

ইউরোপের মোট ৪৫টি দেশের মধ্যে ১৫টি দেশের সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানের পদে রয়েছেন নারী। অর্থাৎ ইউরোপের এক-তৃতীয়াংশ দেশে নারীরা নেতৃত্বে রয়েছেন। মার্গারেট থ্যাচার ও থেরেসা মে’র পর যুক্তরাজ্যের তৃতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন লিজ ট্রাস। ১৯৯৬ সালে কনজারভেটিভ পার্টিতে যোগ দেওয়া লিজ সাউথ ওয়েস্ট নরফ্লোকের পার্লামেন্ট সদস্য। প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের কনজারভেটিভ পার্টির দলীয় ভোটাভুটিতে প্রতিপক্ষ ঋষি সুনাককে হারিয়ে জয়ী হন তিনি। ৬ সেপ্টেম্বর থেকে পশ্চিম ইউরোপের এই দেশটির প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন লিজ ট্রাস। পশ্চিম ইউরোপের দেশ ফ্রান্সে প্রধানমন্ত্রী পদে বসেছেন এলিজাবেথ বোর্ন। তিনি দেশটির প্রথম ৩০ বছর পর প্রথম নারী হিসেবে এই দায়িত্ব পেয়েছেন। ৬১ বছরের এলিজাবেথ ২০২২ সালে সরকারপ্রধানের এই দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে কাজ করে যাচ্ছেন। ইউরোপের আরেক দেশ এস্তোনিয়ার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন ৪৫ বছরের কাজা কালাস। ২০২১ সালে ১৯তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি দায়িত্ব পান। উত্তর ইউরোপের দেশ ফিনল্যান্ড। ২০১৯ সাল থেকে দেশটির ৪৬তম প্রধানমন্ত্রীর পদে রয়েছেন সান্না মারিন। মাত্র ৩৩ বছরের প্রধানমন্ত্রী হওয়া সান্না বহুবার বিতর্কে জড়িয়ে রক্ষণশীলদের সমালোচনার মুখে পড়েছেন। গ্রিসের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ক্যাটরিনা সাকেল্লারোপোলু। ৬৬ বছরের এই রাজনীতিক দেশটির প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট। ২০২০ সাল থেকে তিনি রাষ্ট্রপ্রধানের এই দায়িত্বে রয়েছেন।

মাত্র ৪৪ বছরে হাঙ্গেরির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন কাটালিন নোভাক। ২০২২ সালে দেশটির প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস গড়েছেন তিনি। এদিকে উত্তর ইউরোপের দেশ আইসল্যান্ডের ২৮তম প্রধানমন্ত্রী ক্যাটরিন জেকবসডট্টির। ২০১৭ সাল থেকে ওই পদে রয়েছেন তিনি। মাত্র ৪১ বছর বয়সে তিনি সরকারপ্রধানের এই দায়িত্ব পান। কসোভোর ৫তম প্রেসিডেন্ট পদে রয়েছেন ভিজোসা ওসমানি। ৪০ বছরের এই রাজনীতিক ২০২১ সালের ৪ এপ্রিল রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব নেন। পূর্ব ইউরোপের দেশ মলডোভার দুই নারী রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানের দায়িত্বে রয়েছেন। এর মধ্যে প্রেসিডেন্ট পদে রয়েছেন মারিয়া সান্ডু। এই নারী রাজনীতিক ২০২০ সালের ডিসেম্বরে মলডোভার ষষ্ঠ প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত হন। আর নাতালিয়া গাভ্রিলিটা মলডোভার প্রধানমন্ত্রী পদে রয়েছেন। ৪৪ বছরের নাতালিয়া ২০২১ সালে ১৫তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান। তিনি দেশটির তৃতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী। আবার মধ্য ইউরোপের দেশ সার্বিয়ার প্রধানমন্ত্রী পদে রয়েছেন আনা বার্নাবিক। ৪৬ বছরের আনা প্রথম নারী হিসেবে সরকারপ্রধানের এই দায়িত্ব পেয়ে ইতিহাস গড়েছেন। জুজানা কাপুটোভা সেøাভাকিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন। ২০১৯ সাল থেকে তিনি দেশটির ৫ম প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ৪৫ বছর বয়সী এই পরিবেশকর্মী দেশটির প্রথম নারী প্রেসিডেন্টও। সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী পদে রয়েছেন মাগডালেনা অ্যান্ডারসন। ৫৫ বছর বয়সী দেশটির এই অর্থনীতিবিদ ২০২১ সাল থেকে সরকারপ্রধানের এই দায়িত্ব পালন করছেন। নিউজিল্যান্ডের ৪০তম প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আর্ডেন। দেশটির লেবার পার্টির এই রাজনীতিক ২০১৭ সাল থেকে মাউন্ড অ্যালবার্ট আসন থেকে পার্লামেন্টের সদস্য। ২০১৭ সালে তিনি বিল ইংলিশের স্থলাভিষিক্ত হয়ে সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন। এদিকে লিথুয়ানিয়ার প্রধানমন্ত্রী হলেন ইনগ্রিডা সিমোনেইতে। ২০২০ সালে তিনি দেশটির ১৭তম সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন। আবার দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের দেশ বুলগেরিয়ায় ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে রয়েছেন ইলিয়ানা ইয়োতোভা। তিনি দেশটির ২০১৬ সালের পার্লামেন্টে নির্বাচনে ষষ্ঠতম ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ২০১৭ সাল থেকে তিনি সরকারপ্রধানের কাজ করছেন। এদিকে মেহরিবান জিজি আলিয়েভা আজারবাইজানের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্টের পদে রয়েছেন। তিনি ২০১৭ সাল থেকে সরকারপ্রধানের এই দায়িত্ব পালন করলেও দেশটির ফার্স্ট লেডিও তিনিই।

আমেরিকার ১৭ দেশে নারীর ক্ষমতায়ন

আমেরিকা মহাদেশের ৫৭টি দেশের মধ্যে ১৭টি দেশে নারী সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। অর্থাৎ এই অঞ্চলের এক-তৃতীয়াংশেরও একটু বেশি দেশে নারী নেতৃত্বে রয়েছেন। এর মধ্যে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের দুই দেশে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বে নারী থাকলেও বাকি ১৫টি দেশে রয়েছেন সরকারপ্রধান নারী।

উত্তর আমেরিকার দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৯তম ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন কমলা দেবী হ্যারিস। ক্যালিফোর্নিয়ার সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই মার্কিনি দেশটির প্রথম নির্বাচিত নারী ভাইস প্রেসিডেন্ট। মধ্য আমেরিকার দেশ নিকারাগুয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন রোজারিও মরিয়া মুরিল্লো জামব্রানা। তিনি দেশটির প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল ওর্তেগার স্ত্রী (ফার্স্ট লেডি) ও একজন কবি। ২০১৭ সাল থেকে দায়িত্বে থাকা রোজারিওর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনিজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করছেন ডেলসি এলোইনা রদ্রিগেজ গোমেজ। ২০১৮ সালে দেশটির প্রেসিডেন্ট মাদুরো এলোইনাকে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়োগ দেন। পাঁচ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করা এলোইনা একাধিক আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছেন। এদিকে আর্জেন্টিনার ৩৭তম ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন ক্রিস্টিনা এলিসাবেত ফার্নান্দেজ দ্য কির্চনার। তিনি এর আগে ২০০৭ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত দেশটির প্রথম নির্বাচিত নারী প্রেসিডেন্ট ছিলেন। প্রগতিশীল ভাবধারার ক্রিস্টিনা ২০১৯ সাল থেকে সরকারে দায়িত্ব পালন করছেন। বিট্রিজ আর্গিমন সেডেইরা উরুগুয়ের ১৮তম ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দেশটির ন্যাশনাল পার্টির এই রাজনীতিবিদ ২০২০ সালে প্রথম নির্বাচিত নারী হিসেবে এই পদে বসেন। সে সময় থেকে তিনি তার দলের লুইস আলবার্তো হেবারের স্থলাভিষিক্ত হয়ে দায়িত্ব পালন করছেন। দক্ষিণ আমেরিকার দেশ পেরুর প্রথম নির্বাচিত নারী ভাইস প্রেসিডেন্ট হলেন দিনা এরসিলিয়া বলুয়ার্তে জেগাররা। তিনি মার্টিন ভিজকারার স্থলাভিষিক্ত হন। স্বাধীন পেরুর স্বপ্ন দেখা এই রাজনীতিক ২০২১ সাল থেকে সরকারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। মেরি ডেনিস মুনিভ অ্যাঙ্গারমুলার কোস্টারিকার দ্বিতীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট। তিনি মার্ভিন রদ্রিগেজের স্থলাভিষিক্ত হন। ২০২২ সালের ৮ মে থেকে দায়িত্বে রয়েছেন তিনি। এদিকে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ কলম্বিয়ার ইতিহাসের প্রথম আফ্রো-কলম্বিয়ান ভাইস প্রেসিডেন্ট হলেন ফ্রান্সিয়া এলেনা মার্কেজ। তিনি ২০২২ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে মনোনীত হন। ক্যারিবিয়ান দেশ ডমিনিকান রিপাবলিকের ৪০তম ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে রয়েছেন র‌্যাকুয়েল পেনা দ্য আনতুনা। তিনি ২০২০ সালে মার্গারিটা সেদেনোর স্থলাভিষিক্ত হন। মডার্ন রেভ্যুলুশনারি পার্টির এই রাজনীতিবিদ দুই বছরের বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। ক্যারিবিয়ান দেশ বারবাডোসে দুই নারী সরকারপ্রধান ও রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বে রয়েছেন। ডেম স্যান্ড্রা প্রুনেলা মেসন বারবাডোসের প্রথম প্রেসিডেন্ট। ব্রিটিশ শাসন থেকে বেরিয়ে এসে প্রজাতন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের সময় থেকে (২০২১ সাল) তিনি বারবাডোসের রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এদিকে মিয়া আমর মোত্তেলে ক্যারিবিয়ান এই দেশটির ৮ম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন। বারবাডোস লেবার পার্টির এই নেতা ২০১৮ সাল থেকে সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন। এই অঞ্চলের আরেক দেশ ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর ষষ্ঠতম প্রেসিডেন্ট হলেন পলা-মাই উইকস। তিনি দেশটির প্রথম নারী রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ২০১৮ সাল থেকে দায়িত্বে রয়েছেন।

মধ্য আমেরিকার দেশ হন্ডুরাসে দুই নারী প্রেসিডেন্ট ও ভাইস-প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে রয়েছেন। আইরিস জিওমারা কাস্ত্রো সারমিয়েন্তো দেশটির ৫৬তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন। ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে দেশটির রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন। ডরিস আলেজান্দ্রিনা গুতিয়েরেস ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এদিকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দুই দ্বীপদেশ পালাউ এবং সামাও-এ দুই নারী যথাক্রমে সরকার ও রাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছেন। জে উদচ সেঙ্গেবাউ পালাউ-এর ১০তম ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে ২০২১ সাল থেকে কাজ করছেন। আর সামাও-এর আফিওগা ফিমে নাওমি মাতা’আফা সপ্তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি সামাও-এর প্রথম নারী সরকারপ্রধান হিসেবে ২০২১ সালে দায়িত্ব নেন।

এশিয়ার চিত্র

এশিয়ায় নেতৃত্বে রয়েছে ৮ জন নারী। এই অঞ্চলের ৪৮টি দেশের মধ্যে ৮ দেশের ৫ জন রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বে রয়েছেন। আর ৩ জন সরকারপ্রধান। বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি সময় ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওয়াজেদ। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী এই নেতা দেশটির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল অওয়ামী লীগের সভাপতি। তিনি তৃতীয় মেয়াদে ২০০৯ সাল থেকে সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। ভারতের ১৫তম রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু। রামনাথ কোভিন্দের উত্তরসূরি হিসেবে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মুর্মু ভারতের প্রথম আদিবাসী রাষ্ট্রপতি। দেশটির বিজেপির এই নেতা ২০২২ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিপক্ষের যশবন্ত সিনহাকে পরাজিত করে জয়ী হন। ২৫ জুলাই থেকে মুর্মু রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন। নেপালের দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট হলেন বিদ্যা দেবী ভা-ারি। ২০১৫ সালের অক্টোবরে পার্লামেন্টে অনুষ্ঠিত এক ভোটে নেপালি কংগ্রেস পার্টির কুল বাহাদুর গুরাংকে পরাজিত করে দেশটির প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। সে সময় থেকে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

চীন প্রজাতন্ত্র তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট হলেন সাই ইং-ওয়েন। নিজের স্বাতন্ত্র্য ধরে রাখতে চাওয়া তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ২০১৬ সাল থেকে দায়িত্ব পালন করে আসছেন সাই। ডেমোক্রেটিক পার্টির এই রাজনীতিবিদ দেশটির প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট। সিঙ্গাপুরের ৮তম প্রেসিডেন্ট হলেন হালিমা ইয়াকুব। ২০১৭ সাল থেকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তিনি সিঙ্গাপুরের প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট ও দক্ষিণ এশিয়ার চতুর্থতম রাষ্ট্রপ্রধান। এদিকে ভিয়েতনামের দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে রয়েছেন ভো থি অন জুন। তিনি ২০২১ সালে দেশটির পার্লামেন্টে অনুষ্ঠিত এক ভোটের মাধ্যমে দান থি নোক থিন-এর স্থলাভিষিক্ত হন। তিনি এক বছরেরও বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। লাওসের পানি ইয়াথোটো ২০২১ সাল থেকে ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে রয়েছেন। লাওস পিপলস রেভ্যুলুশনারি পার্টির এই রাজনীতিবিদ দেশটির ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্য ও দেশটির প্রথম নির্বাচিত নারী ভাইস প্রেসিডেন্ট। ফিলিপাইনের ১৫তম ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে রয়েছেন সারা জিমারম্যান দুয়ার্তে-কার্পিও। তিনি দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে তরুণ ও তৃতীয় নারী ভাইস প্রেসিডেন্ট। লেনি রোবারদোর স্থলাভিষিক্ত হয়ে তিনি ২০২২ সালে জুন থেকে দায়িত্ব পালন করছেন।

পিছিয়ে আফ্রিকা

আফ্রিকার ৫৪টি দেশের মধ্যে ৯টি দেশে নারীরা বর্তমানে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তন্মধ্যে দুটি দেশে নারী রাষ্ট্রপ্রধান ছাড়া বাকি সাতটি দেশে রয়েছেন সরকারপ্রধান। ইথিওপিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন সাহলে-ওয়ার্ক জিউদে। তিনি পূর্ব আফ্রিকার এই দেশটির প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট। ২০১৮ সাল থেকে তিনি রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তানজানিয়ার ষষ্ঠতম প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে রয়েছেন সামিয়া সুলুহু হাসান। তিনি ইস্ট আফ্রিকান কমিউনিটির তৃতীয় নারী সরকারপ্রধান। ২০২১ সাল থেকে তিনি তানজানিয়ার সরকারপ্রধান হিসেবে কাজ করছেন। গ্যাবনের ১২তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন রোজ ক্রিস্টিয়ানে রাপন্দা। দেশটির প্রথম এই নারী প্রধানমন্ত্রী ২০২০ সাল থেকে সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন। এদিকে মধ্য আফ্রিকার দেশ টোগোর ১৪তম প্রধানমন্ত্রী হলেন ভিক্টোইরে তোমেগাহ ডগবে। তিনি দেশটির প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। ২০২০ সাল থেকে তিনি সরকারপ্রধানের দায়িত্বে রয়েছেন। দক্ষিণ সুদানের চতুর্থতম ভাইস প্রেসিডেন্ট মাবিওরের রেবেকা নায়ানডেং। তিনি ২০২০ সাল থেকে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এদিকে পূর্ব আফ্রিকার দেশ উগান্ডায় ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন জেসিকা রোজ আলুপো। ২০২১ সাল থেকে তিনি কাজ করছেন। এদিকে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ বেনিন-এর প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্টের পদে রয়েছেন মারিয়াম চাবি তালাতা। তিনি ২০২১ সাল থেকে এই দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়াও জাম্বিয়া ও লাইবেরিয়ায় যথাক্রমে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দুই নারী দায়িত্বে। ২০২১ সাল থেকে মুতালে নালুমাঙ্গো জাম্বিয়ার ১৪তম ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে রয়েছেন। আর জুয়েল টেইলর ৩০তম ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে লাইবেরিয়ায় রয়েছেন ২০১৮ সাল থেকে।

আরব বিশ্ব

আরব বিশ্বে প্রথম বারের মতো ক্ষমতায় বসা নারী প্রধানমন্ত্রী হলেন- তিউনিশিয়ার নাজলা বাউদেন রমধান। ৬৩ বছরের নাজাল কখনো সরাসরি রাজনীতিতে অংশ নেননি। দেশটির প্রেসিডেন্ট কাইস সঈদ দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে সরিয়ে দিয়ে ২০২১ সালে সরকারপ্রধান হিসেবে নাজলাকে নিয়োগ করেছেন। এদিকে সিরিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন নাজা আল-আত্তার। আরব বিশে^র মধ্যে তিনিই প্রথম এ পদে বসেন। ১৯৭৬ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত তিনি দেশটির সংস্কৃতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। পরে ২০০৬ সালে তাকে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিযুক্ত করা হয়।