ঢাকা ১০:৪৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০২২, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

‘মিনিকেট’ চাল নিয়ে চলছে চালবাজি!

চাল কিনতে গেলেই সাধারণত একজন ক্রেতার চোখ আটকে থাকে ঝকঝকে সাদা মিনিকেট কিংবা নাজিরশাইল চাল। অটোমেটিক মেশিনের মাধ্যমে মোটা চাল ছাঁটাই করে তৈরি করা হয় চিকন চাল। যা দেখতে চকচকে ফর্সা এবং একদম চিকন। পরবর্তীতে যে চালেল নাম দেয়া হয় মিনিকেট চাল। এই চাল এতটাই জনপ্রিয় যে শহরে তো বটেই, প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের মানুষও খাওয়ার পাতে তুলে নেয় এটি। হাট-বাজার সয়লাব হয়ে আছে এসব চালে।

জানা যায়, ৪৮ টাকার জিরাশাইল চাল কেটে তৈরি করা হয় এসব চাল। যা আবার চমকপ্রদ মোড়কে ঢুকে রাজধানীর সুপারশপে প্রিমিয়াম মিনিকেট নামে বিক্রি হচ্ছে ৭৯ থেকে ৮২ টাকায়। এতে দেখা যায় একই চাল মোড়কজাত হয়েই কেজিতে ৩২ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত গুনতে হচ্ছে ভোক্তাকে। এমন কার্যকলাপ বছরের পর বছর চললেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অবশেষে মাঠে নামছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।

তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, বাংলার মাঠে মিনিকেট নামে কোনো ধানের অস্তিত্বই নেই। এদিকে মিনিকেট চালের নামে সস্তা চাল বেশি দামে বিক্রি করে বিপুল পরিমাণ লাভ করছেন মিলের মালিক ও ব্যবসায়ীরা। এছাড়াও নাজিরশাইল কিংবা মোটা চালও চলছে পাশাপাশি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এসব নামের কোনো ধানের আবাদ যেমন দেশের কোথাও নেই, তেমনি এগুলো কেউ আমদানিও করে না। কৃষকের চাষের জিরাশাইল ধান মেশিনে পলিশিংয়ের মাধ্যমে চালের ওপরের ভিটামিনযুক্ত লেয়ার কেটে ফেলে গুণহীন শর্করাসমৃদ্ধ চাল রূপ নিচ্ছে মিনিকেট নামে। মানহীন এসব চালই অতিরিক্ত দামে বিক্রি হচ্ছে খোলাবাজারে।

কৃষি বিজ্ঞানীদের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ধানের মাঠ আর বাজার সয়লাব থাকে ব্রি ধানে, কিন্তু বাজারে ব্রি চাল নামে কোনো চালের অস্তিত্ব নেই। আবার দেশে এখন বিপুল পরিমাণ হাইব্রিড ধান উৎপাদিত হচ্ছে। অথচ বাজারে হাইব্রিড ধানের চাল বলে কিছু পাওয়া যায় না। ছাঁটাইয়ের কারণে পুষ্টিগুণ নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও নামিদামি কোম্পানিগুলোও এ চাল বিক্রির প্রতিযোগিতায় নেমেছে। এ অবস্থায় সরকার বলছে, মিনিকেট, নাজিরশাইলের ব্র্যান্ডিং দেশে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে কাজ করছে তারা।

পরিচয় গোপন রাখার শর্তে এক মিল মালিক স্বীকার করেন সিন্ডিকেটের চাহিদার কারণে মোটা চালের ভিটামিনযুক্ত অংশ ছেঁটে ফেলে নামসর্বস্ব মিনিকেট তৈরি করেন তারা। ওই মিল মালিক বলেন, আসলে মিনিকেট বলতে কিছু নেই। জিরাশাইল চালকেই মিনিকেট বলে বস্তায় প্রিন্ট করা হয়। আমরা যেসব মোকামে চালগুলো বিক্রি করি, বড় বড় আড়তদার যারা চাল কেনেন, তাদের ডিমান্ডে মিনিকেট করে বস্তায় চাল দিতে হয়।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, যখন প্যাকেটজাত চালের দাম অত্যাধিক দেখানো হয়, তখন এটার প্রভাবও খোলাবাজারে চালের ওপর পড়ে। মিনিকেটের নামে ১৪ থেকে ৩৩ শতাংশ অতিরিক্ত মুনাফা করা হচ্ছে। আর পোলাউ চালে বড় ব্যবসায়ীরা বাড়তি লাভ করছে ২১ থেকে ২৯ শতাংশ পর্যন্ত। এসব বন্ধে কঠোর হচ্ছে কর্তৃপক্ষ।

এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে আমাদেরকে বলা হয়েছে যে মিনিকেট নামে কোনো চাল নেই। ৫৪ টাকা কেজি মোটা চাল খুচরা বিক্রি হচ্ছে, এটাকেই সরু ও পলিশ করে সেটা ৭৮ টাকা থেকে ৮২ টাকা কেজি বিক্রি করা হচ্ছে। মিনিকেট নামে চাল বিক্রি বন্ধে ব্যবসায়ীদের চিঠি দিচ্ছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। অনিয়ম রুখতে দ্রুত অভিযানে নামবে কর্তৃপক্ষ।

Tag :
জনপ্রিয়

তিতাসে বর্তমান ও সাবেক চেয়ারম্যান সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে নিহত-১, আহত-১৫

‘মিনিকেট’ চাল নিয়ে চলছে চালবাজি!

প্রকাশের সময় : ০৯:৫৪:৫৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২২

চাল কিনতে গেলেই সাধারণত একজন ক্রেতার চোখ আটকে থাকে ঝকঝকে সাদা মিনিকেট কিংবা নাজিরশাইল চাল। অটোমেটিক মেশিনের মাধ্যমে মোটা চাল ছাঁটাই করে তৈরি করা হয় চিকন চাল। যা দেখতে চকচকে ফর্সা এবং একদম চিকন। পরবর্তীতে যে চালেল নাম দেয়া হয় মিনিকেট চাল। এই চাল এতটাই জনপ্রিয় যে শহরে তো বটেই, প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের মানুষও খাওয়ার পাতে তুলে নেয় এটি। হাট-বাজার সয়লাব হয়ে আছে এসব চালে।

জানা যায়, ৪৮ টাকার জিরাশাইল চাল কেটে তৈরি করা হয় এসব চাল। যা আবার চমকপ্রদ মোড়কে ঢুকে রাজধানীর সুপারশপে প্রিমিয়াম মিনিকেট নামে বিক্রি হচ্ছে ৭৯ থেকে ৮২ টাকায়। এতে দেখা যায় একই চাল মোড়কজাত হয়েই কেজিতে ৩২ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত গুনতে হচ্ছে ভোক্তাকে। এমন কার্যকলাপ বছরের পর বছর চললেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অবশেষে মাঠে নামছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।

তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, বাংলার মাঠে মিনিকেট নামে কোনো ধানের অস্তিত্বই নেই। এদিকে মিনিকেট চালের নামে সস্তা চাল বেশি দামে বিক্রি করে বিপুল পরিমাণ লাভ করছেন মিলের মালিক ও ব্যবসায়ীরা। এছাড়াও নাজিরশাইল কিংবা মোটা চালও চলছে পাশাপাশি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এসব নামের কোনো ধানের আবাদ যেমন দেশের কোথাও নেই, তেমনি এগুলো কেউ আমদানিও করে না। কৃষকের চাষের জিরাশাইল ধান মেশিনে পলিশিংয়ের মাধ্যমে চালের ওপরের ভিটামিনযুক্ত লেয়ার কেটে ফেলে গুণহীন শর্করাসমৃদ্ধ চাল রূপ নিচ্ছে মিনিকেট নামে। মানহীন এসব চালই অতিরিক্ত দামে বিক্রি হচ্ছে খোলাবাজারে।

কৃষি বিজ্ঞানীদের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ধানের মাঠ আর বাজার সয়লাব থাকে ব্রি ধানে, কিন্তু বাজারে ব্রি চাল নামে কোনো চালের অস্তিত্ব নেই। আবার দেশে এখন বিপুল পরিমাণ হাইব্রিড ধান উৎপাদিত হচ্ছে। অথচ বাজারে হাইব্রিড ধানের চাল বলে কিছু পাওয়া যায় না। ছাঁটাইয়ের কারণে পুষ্টিগুণ নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও নামিদামি কোম্পানিগুলোও এ চাল বিক্রির প্রতিযোগিতায় নেমেছে। এ অবস্থায় সরকার বলছে, মিনিকেট, নাজিরশাইলের ব্র্যান্ডিং দেশে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে কাজ করছে তারা।

পরিচয় গোপন রাখার শর্তে এক মিল মালিক স্বীকার করেন সিন্ডিকেটের চাহিদার কারণে মোটা চালের ভিটামিনযুক্ত অংশ ছেঁটে ফেলে নামসর্বস্ব মিনিকেট তৈরি করেন তারা। ওই মিল মালিক বলেন, আসলে মিনিকেট বলতে কিছু নেই। জিরাশাইল চালকেই মিনিকেট বলে বস্তায় প্রিন্ট করা হয়। আমরা যেসব মোকামে চালগুলো বিক্রি করি, বড় বড় আড়তদার যারা চাল কেনেন, তাদের ডিমান্ডে মিনিকেট করে বস্তায় চাল দিতে হয়।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, যখন প্যাকেটজাত চালের দাম অত্যাধিক দেখানো হয়, তখন এটার প্রভাবও খোলাবাজারে চালের ওপর পড়ে। মিনিকেটের নামে ১৪ থেকে ৩৩ শতাংশ অতিরিক্ত মুনাফা করা হচ্ছে। আর পোলাউ চালে বড় ব্যবসায়ীরা বাড়তি লাভ করছে ২১ থেকে ২৯ শতাংশ পর্যন্ত। এসব বন্ধে কঠোর হচ্ছে কর্তৃপক্ষ।

এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে আমাদেরকে বলা হয়েছে যে মিনিকেট নামে কোনো চাল নেই। ৫৪ টাকা কেজি মোটা চাল খুচরা বিক্রি হচ্ছে, এটাকেই সরু ও পলিশ করে সেটা ৭৮ টাকা থেকে ৮২ টাকা কেজি বিক্রি করা হচ্ছে। মিনিকেট নামে চাল বিক্রি বন্ধে ব্যবসায়ীদের চিঠি দিচ্ছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। অনিয়ম রুখতে দ্রুত অভিযানে নামবে কর্তৃপক্ষ।