ঢাকা ১০:৩৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২২, ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

বগুড়া শহরের এক রুটি বিক্রেতার গল্প

দশ বছর ধরে ড্রেনের ওপর অস্থায়ী স্থাপনা বসিয়ে রুটি বিক্রি করছেন মোকলেছার। পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া দেড় শতক জমির ওপর পুরনো বাড়ি ছাড়া কিছুই ছিল না তার। তবে এখন সেই মোকলেছার দু’তলা বাড়ির মালিক। রুটি বিক্রিতেই বদলে গেছে তার জীবন। তার দুই সন্তানও করছে পড়াশোনা। সংসারে এসেছে তার স্বচ্ছলতা।

৫০ বছরের মোকলেছার রহমান বগুড়ার শহরের হাকির মোড় এলাকার বাসিন্দা। নিজ এলাকায় পৌরসভার ড্রেনের ওপর অস্থায়ীভাবে দোকান বসিয়ে রুটি বিক্রি করেন। তবে এর আগে, কানে কম শোনায় জীবিকার তাগিদে একের পর এক পেশা বদলাতে হয়েছে তাকে। সবশেষে বেছে নেন রুটি বিক্রির পেশা। দিনে আট কেজি গমের আটার রুটি তৈরি করে বিক্রি করেন তিনি। তার তৈরি রুটি খেতে পছন্দ করেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। প্রতিদিন সকাল থেকে ভিড় বাড়তে থাকে তার দোকানে। তবে দুপুরে বেচাকেনা বন্ধ করে মোকলেছার চলে যান বাড়ি।

মোকলেছার রুটি বিক্রি করে দৈনিক গড়ে ৭০০-৮০০ টাকা আয় করেন। দশ বছরে সংসারের খরচ মিটিয়েও সঞ্চয়ের টাকা দিয়ে নিজের দেড় শতক জায়গার ওপর পুরনো বাড়ি ভেঙে গড়ে তোলেন স্বপ্নের দু’তলা বাড়ি। তবে এর আগের কিছু জমানো অর্থ ছিল তার কাছে। ২০২০ সালে বাড়ি নির্মাণে জমানো অর্থও ব্যয় করেন তিনি।

দাম্পত্য জীবনে তার দুই ছেলে সন্তান রয়েছে। তাদের একজন বগুড়া শাহ সুলতান কলেজের শিক্ষার্থী। অন্যজন করোনেশন স্কুলের শিক্ষার্থী। মোকলেছার রহমানের স্বপ্ন ছেলেরা পড়াশোনা শিখে অনেক বড় চাকরি করবে। রুটি বিক্রির শুরুতে তার পুঁজি ছিল কম। একারণে প্রথমদিকে তার সীমিত আয় হত। টাকা সঞ্চয় করে ধীরে ধীরে পুঁজি বেশি করেন । এরপর তাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।

মোকলেছারের দোকানে নিয়মিত রুটি খেতে আসেন হাকির মোড় এলাকার বাসিন্দা তানভীর। তিনি বলেন, ‘ মোকলেছার চাচা সবসময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকেন। তার তৈরি রুটিও স্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি। তাই প্রতিদিন দুপুরে এই দোকানে এসে রুটি, সবজি, ডিম খাই।’

বগুড়া শহরের রিকশা চালক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘ আমি দৈনিক এই দোকান থেকে দুটি করে রুটি খাই। দুপুরে বাড়িতে না গিয়ে মোকলেছারের দোকানে এসে রুটি খেয়ে রিকশা চালাই। আমি চার বছর ধরে ওই দোকানের রুটি দুপুরের খাবার হিসেবে খাই।’

আব্দুর রাজ্জাকের মত একই কথা বলেন রিকশা চালক মনসুর আলী। তিনি চার বছর ধরে মোকলেছারের দোকানে রুটি খাচ্ছেন। মোকলেছার দুই আকারের রুটি বিক্রি করেন। একটি দশ টাকা পিস। অন্যটির পিস ১৫ টাকা। রুটির সঙ্গে সবজি ফ্রি দেয়া হয়। তবে কেউ ডিম খেতে চাইলে তাকে ভেজে দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে ডিমের দাম ধরা হয় ১৫ টাকা।

মোকলেছার রহমান বলেন, ‘ কানে কম শোনার কারণে অনেক পেশা বদলাতে হয়েছে। সবশেষে বছর দশেক আগে রুটি বিক্রি করা শুরু করি। রুটি বিক্রির আয়ের টাকা দিয়ে পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া দেড় শতক জমিতে পুরনো বাড়ি ভেঙে নতুন বাড়ি করেছি। আমার দুই ছেলেই পড়াশোনা করছে। সংসারে আগে অভাব ছিল। তবে এখন আমরা অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল।’

Tag :
জনপ্রিয়

দেশে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স ভয়াবহ আকার ধারণ করতে চলেছে: স্বাস্থ্য মহাপরিচালক।

বগুড়া শহরের এক রুটি বিক্রেতার গল্প

প্রকাশের সময় : ০৯:৫৪:৪৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২২

দশ বছর ধরে ড্রেনের ওপর অস্থায়ী স্থাপনা বসিয়ে রুটি বিক্রি করছেন মোকলেছার। পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া দেড় শতক জমির ওপর পুরনো বাড়ি ছাড়া কিছুই ছিল না তার। তবে এখন সেই মোকলেছার দু’তলা বাড়ির মালিক। রুটি বিক্রিতেই বদলে গেছে তার জীবন। তার দুই সন্তানও করছে পড়াশোনা। সংসারে এসেছে তার স্বচ্ছলতা।

৫০ বছরের মোকলেছার রহমান বগুড়ার শহরের হাকির মোড় এলাকার বাসিন্দা। নিজ এলাকায় পৌরসভার ড্রেনের ওপর অস্থায়ীভাবে দোকান বসিয়ে রুটি বিক্রি করেন। তবে এর আগে, কানে কম শোনায় জীবিকার তাগিদে একের পর এক পেশা বদলাতে হয়েছে তাকে। সবশেষে বেছে নেন রুটি বিক্রির পেশা। দিনে আট কেজি গমের আটার রুটি তৈরি করে বিক্রি করেন তিনি। তার তৈরি রুটি খেতে পছন্দ করেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। প্রতিদিন সকাল থেকে ভিড় বাড়তে থাকে তার দোকানে। তবে দুপুরে বেচাকেনা বন্ধ করে মোকলেছার চলে যান বাড়ি।

মোকলেছার রুটি বিক্রি করে দৈনিক গড়ে ৭০০-৮০০ টাকা আয় করেন। দশ বছরে সংসারের খরচ মিটিয়েও সঞ্চয়ের টাকা দিয়ে নিজের দেড় শতক জায়গার ওপর পুরনো বাড়ি ভেঙে গড়ে তোলেন স্বপ্নের দু’তলা বাড়ি। তবে এর আগের কিছু জমানো অর্থ ছিল তার কাছে। ২০২০ সালে বাড়ি নির্মাণে জমানো অর্থও ব্যয় করেন তিনি।

দাম্পত্য জীবনে তার দুই ছেলে সন্তান রয়েছে। তাদের একজন বগুড়া শাহ সুলতান কলেজের শিক্ষার্থী। অন্যজন করোনেশন স্কুলের শিক্ষার্থী। মোকলেছার রহমানের স্বপ্ন ছেলেরা পড়াশোনা শিখে অনেক বড় চাকরি করবে। রুটি বিক্রির শুরুতে তার পুঁজি ছিল কম। একারণে প্রথমদিকে তার সীমিত আয় হত। টাকা সঞ্চয় করে ধীরে ধীরে পুঁজি বেশি করেন । এরপর তাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।

মোকলেছারের দোকানে নিয়মিত রুটি খেতে আসেন হাকির মোড় এলাকার বাসিন্দা তানভীর। তিনি বলেন, ‘ মোকলেছার চাচা সবসময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকেন। তার তৈরি রুটিও স্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি। তাই প্রতিদিন দুপুরে এই দোকানে এসে রুটি, সবজি, ডিম খাই।’

বগুড়া শহরের রিকশা চালক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘ আমি দৈনিক এই দোকান থেকে দুটি করে রুটি খাই। দুপুরে বাড়িতে না গিয়ে মোকলেছারের দোকানে এসে রুটি খেয়ে রিকশা চালাই। আমি চার বছর ধরে ওই দোকানের রুটি দুপুরের খাবার হিসেবে খাই।’

আব্দুর রাজ্জাকের মত একই কথা বলেন রিকশা চালক মনসুর আলী। তিনি চার বছর ধরে মোকলেছারের দোকানে রুটি খাচ্ছেন। মোকলেছার দুই আকারের রুটি বিক্রি করেন। একটি দশ টাকা পিস। অন্যটির পিস ১৫ টাকা। রুটির সঙ্গে সবজি ফ্রি দেয়া হয়। তবে কেউ ডিম খেতে চাইলে তাকে ভেজে দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে ডিমের দাম ধরা হয় ১৫ টাকা।

মোকলেছার রহমান বলেন, ‘ কানে কম শোনার কারণে অনেক পেশা বদলাতে হয়েছে। সবশেষে বছর দশেক আগে রুটি বিক্রি করা শুরু করি। রুটি বিক্রির আয়ের টাকা দিয়ে পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া দেড় শতক জমিতে পুরনো বাড়ি ভেঙে নতুন বাড়ি করেছি। আমার দুই ছেলেই পড়াশোনা করছে। সংসারে আগে অভাব ছিল। তবে এখন আমরা অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল।’