ঢাকা ০৯:৪৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ নভেম্বর ২০২২, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

পাঠ্যপুস্তক ছাপার দরপত্র: দামে ছাড় মানে ফাঁকি

বই ছাপানোর জন্য সরকার যে দর দিয়েছে, ঠিকাদার দিয়েছেন তার চেয়ে ২৪ শতাংশ কম। স্বাভাবিক নিয়মে বিষয়টা হতো উল্টো। ঠিকাদারের দর হয় সরকারের দরের চেয়ে কিছুটা বেশি।

এটুকু শুনে মনে হতে পারে, এই ঠিকাদারেরা হয়তো রাষ্ট্রের জন্য নিজের জমিদারি ছেড়ে দিয়ে দানশীলতার প্রবাদপুরুষ দাতা হাতেম তাই হতে চান। কিন্তু সেটা মোটেই ঠিক নয়, আসলে এই দরের মধ্যেই আছে শুভঙ্করের ফাঁকি। তাঁরা দামে ছেড়ে দিলেও লাভের জন্য সরবরাহ করবেন নিম্নমানের বই। যে বই দিয়ে এক বছরও পড়াশোনা করা যাবে না। এরপর শিক্ষার্থীদের বাধ্য হয়েই বাজার থেকে বই কিনতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শত শত কোটি টাকার এই কাজ বাগিয়ে নিতে এবং বিদেশি প্রকাশনা সংস্থাগুলো ঠেকাতে মুদ্রাকরদের একটি সংঘবদ্ধ চক্র পরিকল্পিতভাবে অস্বাভাবিক কম দরে টেন্ডার দিয়েছে। বিষয়টি জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) হয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনও পেয়েছে।

বই ছাপানো ও বিতরণের দায়িত্বে থাকা সরকারি প্রতিষ্ঠান জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. ফরহাদুল ইসলামও এমন আশঙ্কা করেছেন। তিনি বলেন, ‘এবারও প্রাক্কলিত দরের চেয়ে কম দরে টেন্ডার জমা দিয়েছেন মুদ্রাকরেরা। এতে মান নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হওয়া অমূলক নয়। তবে শিক্ষার্থীরা যাতে মানসম্মত বই পায়, সে জন্য কঠোর নজরদারি করা হবে।’

তবে অনেকেই বলছেন, চেয়ারম্যান যা-ই বলুন না কেন, ঊর্ধ্বমুখী এই বাজারে প্রাক্কলিত দরের চেয়ে কম দরে কোনো অবস্থাতেই মানসম্মত বই সরবরাহ করা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি এবং পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ ও বিপণন সমিতির সভাপতি তোফায়েল খানও সে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, যারা কম দরে কাজ নিচ্ছে, তারা নিম্নমানের বই সরবরাহ করবে। দরপত্রের অন্যান্য শর্তও পূরণ করবে না, করতে পারবেও না। গত কয়েক মাসে বই ছাপার উপকরণ কাগজ, কালি, বাঁধাইয়ের গ্লু, ইউভি লেমিনেটিং, পরিবহন খরচ ও শ্রমিকের মজুরিÍসবকিছুরই দাম বেড়েছে।

দেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের ২০১০ সাল থেকে বিনা মূল্যে নতুন বই দিয়ে আসছে সরকার। আগামী বছরের জন্য প্রায় ৩৪ কোটি ৬১ লাখ ৬৩ হাজার কপি পাঠ্যবই ছাপানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এগুলোর মধ্যে প্রাক্-প্রাথমিক থেকে প্রাথমিক স্তরের ৯ কোটি ৯৮ লাখ ৫৩ হাজার কপি এবং মাধ্যমিক স্তরের জন্য মোট ২৪ কোটি ৬৩ লাখ ১০ হাজার কপি পাঠ্যবই ছাপানো হবে।

এনসিটিবি সূত্রে জানা যায়, প্রাথমিক স্তরের বই ছাপতে ৯৮টি লটে দরপত্র আহ্বান করা হয়। এগুলোর মধ্যে তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির বই ছাপতে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে সর্বোচ্চ কাজ পেতে যাচ্ছে অগ্রণী প্রিন্টিং প্রেস সর্বোচ্চ ১৮টি, সাগরিকা ১৭টি, নুরুল ইসলাম প্রেস ১৩টি, টাইমস মিডিয়া ১৩টি, আমিন আর্ট ৫টি ও আনন্দ প্রিন্টিং প্রেস ৭টি লটের। বাকি ১১টি প্রতিষ্ঠান একটি বা দুটি করে লটের কাজ পাচ্ছে।

মাধ্যমিকের বই ছাপাতে মোট ২৮০টি লটে দরপত্র আহ্বান করা হয়। এগুলোর মধ্যে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণি বাদে অন্যান্য শ্রেণির বই ছাপতে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে সবচেয়ে বেশি কাজ পেতে যাচ্ছে অগ্রণী প্রিন্টিং প্রেস সর্বোচ্চ ৪৮টি, বারোতোপা প্রিন্টার্স ৩০টি, কচুয়া প্রিন্টার্স ১৭টি, লেটার অ্যান্ড কালার ১৩টি, আনন্দ প্রিন্টার্স ১১টি এবং আনন্দ প্রিন্টার্স ও এপেক্স যৌথভাবে ১৪টি লট। বাকি লটগুলো আরও ৩০টি প্রতিষ্ঠান একটি বা দুটি করে কাজ পেতে যাচ্ছে।

আগামী শিক্ষাবর্ষের জন্য সর্বনিম্ন দরে সবচেয়ে বেশি কাজ পেতে যাচ্ছে অগ্রণী প্রিন্টিং প্রেস। এখন পর্যন্ত অগ্রণী প্রিন্টিং প্রেস প্রাথমিক ও মাধ্যমিক মিলিয়ে প্রায় ৩০০ কোটির টাকার কাজ পেতে যাচ্ছে। এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গত বছরও কম দরে কাজ নিয়ে নিম্নমানের বই সরবরাহের অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু অদৃশ্য ক্ষমতাবলে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি এনসিটিবি।

কম দরে কীভাবে মানসম্মত বই সরবরাহ করা হবে, এমন প্রশ্নে প্রতিষ্ঠানটির মালিক কাওসার উজ্জামান রুবেল বলেন, ‘দরপত্রের স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী বই সরবরাহ এ দরেই করা হবে। এতে লোকসান হবে না; বরং ৪ থেকে ৫ শতাংশ লাভ হবে।’ গতবারও প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে নিম্নমানের বই সরবরাহের অভিযোগ ছিল। এ প্রসঙ্গে কাওসার উজ্জামান বলেন, ‘মুদ্রণ সমিতি সিন্ডিকেট করে এমন অনেক অভিযোগই করে।’

প্রাক্কলিত দরের চেয়ে কম দর দেওয়ার ঘটনা প্রথম ঘটে ২০১৬ সালে। শিক্ষার্থীরা যখন ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে বই হাতে পায়, তখন দেখা যায় অধিকাংশ বই নিম্নমানের। পরে এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। এরপর কয়েক বছর ধরে একই কৌশলে বই ছাপার কাজ নিচ্ছে সংঘবদ্ধ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিবারই এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিম্নমানের বই সরবরাহের অভিযোগ ওঠে। কিন্তু এ ধরনের ঘটনায় অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিয়ে নামমাত্র সাজা দেওয়া হয় অন্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে।

এনসিটিবি থেকে জানা যায়, এবার প্রাথমিকের বই প্রতি ফর্মা (৮ পৃষ্ঠা) ২ টাকা ৯০ পয়সা আর মাধ্যমিকের বই প্রতি ফর্মা (৮ পৃষ্ঠা) প্রাক্কলন করা হয় ২ টাকা ৬৮ পয়সা। কিন্তু মুদ্রাকরেরা দুই স্তর মিলিয়ে প্রাক্কলনের চেয়ে সর্বনিম্ন ১০ থেকে সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ কমে টেন্ডার জমা দিয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনসিটিবির দায়িত্বশীল কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, দুই স্তর মিলিয়ে প্রাক্কলিত দরের চেয়ে প্রায় ২৪ শতাংশ কম দরে কাজ পেতে যাচ্ছেন মুদ্রাকরেরা। এতে সরকারের খরচ কমবে ২৮০ কোটি টাকা।

দরপত্রের শর্তানুযায়ী প্রাথমিক স্তর ও ইবতেদায়ির বই ৮০ জিএসএমের (গ্রাম/স্কয়ার মিটার) কাগজে ৮৫ শতাংশ উজ্জ্বলতা বা পাল্প থাকতে হয়। নবম-দশম শ্রেণির বিজ্ঞানের বই চার রঙা মুদ্রণে ৭০ জিএসএম কাগজে এবং অন্য শ্রেণির বই ৬০ জিএসএম কাগজে ছাপতে হয়। আর বইয়ের কভারে ২৩০ জিএসএমের আর্ট কার্ড (মোটা কাগজ) ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু বর্তমানে কাগজ ও কালির দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে এই দরে (প্রাক্কলিত দরের চেয়ে কম দর) কোনোভাবেই মানসম্মত বই ছাপানো সম্ভব নয় বলে জানান একাধিক মুদ্রাকর।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক প্রেসমালিক বলেন, এর আগে যখন মুদ্রাকরেরা কম দামে কাজ নিয়েছিলেন, তখন তাঁরা ডিসেম্বর মাসের জন্য অপেক্ষা করেছিলেন। কেননা ১ জানুয়ারি যেহেতু বই দিতে হবে, তাই ডিসেম্বর এলে এনসিটিবি আর মানের দিকে তাকায় না। তখন যে বই-ই দেওয়া হয়, এনসিটিবি তা গ্রহণ করে। এবারের পরিস্থিতিও সেদিকে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।সূত্র ‍আজকের পত্রিকা

Tag :
জনপ্রিয়

করোনা মোকাবিলার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে স্বাস্থ্যখাতের মানোন্নয়ন করা হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

পাঠ্যপুস্তক ছাপার দরপত্র: দামে ছাড় মানে ফাঁকি

প্রকাশের সময় : ০৯:২৯:৩৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২২

বই ছাপানোর জন্য সরকার যে দর দিয়েছে, ঠিকাদার দিয়েছেন তার চেয়ে ২৪ শতাংশ কম। স্বাভাবিক নিয়মে বিষয়টা হতো উল্টো। ঠিকাদারের দর হয় সরকারের দরের চেয়ে কিছুটা বেশি।

এটুকু শুনে মনে হতে পারে, এই ঠিকাদারেরা হয়তো রাষ্ট্রের জন্য নিজের জমিদারি ছেড়ে দিয়ে দানশীলতার প্রবাদপুরুষ দাতা হাতেম তাই হতে চান। কিন্তু সেটা মোটেই ঠিক নয়, আসলে এই দরের মধ্যেই আছে শুভঙ্করের ফাঁকি। তাঁরা দামে ছেড়ে দিলেও লাভের জন্য সরবরাহ করবেন নিম্নমানের বই। যে বই দিয়ে এক বছরও পড়াশোনা করা যাবে না। এরপর শিক্ষার্থীদের বাধ্য হয়েই বাজার থেকে বই কিনতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শত শত কোটি টাকার এই কাজ বাগিয়ে নিতে এবং বিদেশি প্রকাশনা সংস্থাগুলো ঠেকাতে মুদ্রাকরদের একটি সংঘবদ্ধ চক্র পরিকল্পিতভাবে অস্বাভাবিক কম দরে টেন্ডার দিয়েছে। বিষয়টি জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) হয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনও পেয়েছে।

বই ছাপানো ও বিতরণের দায়িত্বে থাকা সরকারি প্রতিষ্ঠান জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. ফরহাদুল ইসলামও এমন আশঙ্কা করেছেন। তিনি বলেন, ‘এবারও প্রাক্কলিত দরের চেয়ে কম দরে টেন্ডার জমা দিয়েছেন মুদ্রাকরেরা। এতে মান নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হওয়া অমূলক নয়। তবে শিক্ষার্থীরা যাতে মানসম্মত বই পায়, সে জন্য কঠোর নজরদারি করা হবে।’

তবে অনেকেই বলছেন, চেয়ারম্যান যা-ই বলুন না কেন, ঊর্ধ্বমুখী এই বাজারে প্রাক্কলিত দরের চেয়ে কম দরে কোনো অবস্থাতেই মানসম্মত বই সরবরাহ করা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি এবং পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ ও বিপণন সমিতির সভাপতি তোফায়েল খানও সে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, যারা কম দরে কাজ নিচ্ছে, তারা নিম্নমানের বই সরবরাহ করবে। দরপত্রের অন্যান্য শর্তও পূরণ করবে না, করতে পারবেও না। গত কয়েক মাসে বই ছাপার উপকরণ কাগজ, কালি, বাঁধাইয়ের গ্লু, ইউভি লেমিনেটিং, পরিবহন খরচ ও শ্রমিকের মজুরিÍসবকিছুরই দাম বেড়েছে।

দেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের ২০১০ সাল থেকে বিনা মূল্যে নতুন বই দিয়ে আসছে সরকার। আগামী বছরের জন্য প্রায় ৩৪ কোটি ৬১ লাখ ৬৩ হাজার কপি পাঠ্যবই ছাপানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এগুলোর মধ্যে প্রাক্-প্রাথমিক থেকে প্রাথমিক স্তরের ৯ কোটি ৯৮ লাখ ৫৩ হাজার কপি এবং মাধ্যমিক স্তরের জন্য মোট ২৪ কোটি ৬৩ লাখ ১০ হাজার কপি পাঠ্যবই ছাপানো হবে।

এনসিটিবি সূত্রে জানা যায়, প্রাথমিক স্তরের বই ছাপতে ৯৮টি লটে দরপত্র আহ্বান করা হয়। এগুলোর মধ্যে তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির বই ছাপতে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে সর্বোচ্চ কাজ পেতে যাচ্ছে অগ্রণী প্রিন্টিং প্রেস সর্বোচ্চ ১৮টি, সাগরিকা ১৭টি, নুরুল ইসলাম প্রেস ১৩টি, টাইমস মিডিয়া ১৩টি, আমিন আর্ট ৫টি ও আনন্দ প্রিন্টিং প্রেস ৭টি লটের। বাকি ১১টি প্রতিষ্ঠান একটি বা দুটি করে লটের কাজ পাচ্ছে।

মাধ্যমিকের বই ছাপাতে মোট ২৮০টি লটে দরপত্র আহ্বান করা হয়। এগুলোর মধ্যে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণি বাদে অন্যান্য শ্রেণির বই ছাপতে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে সবচেয়ে বেশি কাজ পেতে যাচ্ছে অগ্রণী প্রিন্টিং প্রেস সর্বোচ্চ ৪৮টি, বারোতোপা প্রিন্টার্স ৩০টি, কচুয়া প্রিন্টার্স ১৭টি, লেটার অ্যান্ড কালার ১৩টি, আনন্দ প্রিন্টার্স ১১টি এবং আনন্দ প্রিন্টার্স ও এপেক্স যৌথভাবে ১৪টি লট। বাকি লটগুলো আরও ৩০টি প্রতিষ্ঠান একটি বা দুটি করে কাজ পেতে যাচ্ছে।

আগামী শিক্ষাবর্ষের জন্য সর্বনিম্ন দরে সবচেয়ে বেশি কাজ পেতে যাচ্ছে অগ্রণী প্রিন্টিং প্রেস। এখন পর্যন্ত অগ্রণী প্রিন্টিং প্রেস প্রাথমিক ও মাধ্যমিক মিলিয়ে প্রায় ৩০০ কোটির টাকার কাজ পেতে যাচ্ছে। এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গত বছরও কম দরে কাজ নিয়ে নিম্নমানের বই সরবরাহের অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু অদৃশ্য ক্ষমতাবলে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি এনসিটিবি।

কম দরে কীভাবে মানসম্মত বই সরবরাহ করা হবে, এমন প্রশ্নে প্রতিষ্ঠানটির মালিক কাওসার উজ্জামান রুবেল বলেন, ‘দরপত্রের স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী বই সরবরাহ এ দরেই করা হবে। এতে লোকসান হবে না; বরং ৪ থেকে ৫ শতাংশ লাভ হবে।’ গতবারও প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে নিম্নমানের বই সরবরাহের অভিযোগ ছিল। এ প্রসঙ্গে কাওসার উজ্জামান বলেন, ‘মুদ্রণ সমিতি সিন্ডিকেট করে এমন অনেক অভিযোগই করে।’

প্রাক্কলিত দরের চেয়ে কম দর দেওয়ার ঘটনা প্রথম ঘটে ২০১৬ সালে। শিক্ষার্থীরা যখন ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে বই হাতে পায়, তখন দেখা যায় অধিকাংশ বই নিম্নমানের। পরে এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। এরপর কয়েক বছর ধরে একই কৌশলে বই ছাপার কাজ নিচ্ছে সংঘবদ্ধ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিবারই এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিম্নমানের বই সরবরাহের অভিযোগ ওঠে। কিন্তু এ ধরনের ঘটনায় অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিয়ে নামমাত্র সাজা দেওয়া হয় অন্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে।

এনসিটিবি থেকে জানা যায়, এবার প্রাথমিকের বই প্রতি ফর্মা (৮ পৃষ্ঠা) ২ টাকা ৯০ পয়সা আর মাধ্যমিকের বই প্রতি ফর্মা (৮ পৃষ্ঠা) প্রাক্কলন করা হয় ২ টাকা ৬৮ পয়সা। কিন্তু মুদ্রাকরেরা দুই স্তর মিলিয়ে প্রাক্কলনের চেয়ে সর্বনিম্ন ১০ থেকে সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ কমে টেন্ডার জমা দিয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনসিটিবির দায়িত্বশীল কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, দুই স্তর মিলিয়ে প্রাক্কলিত দরের চেয়ে প্রায় ২৪ শতাংশ কম দরে কাজ পেতে যাচ্ছেন মুদ্রাকরেরা। এতে সরকারের খরচ কমবে ২৮০ কোটি টাকা।

দরপত্রের শর্তানুযায়ী প্রাথমিক স্তর ও ইবতেদায়ির বই ৮০ জিএসএমের (গ্রাম/স্কয়ার মিটার) কাগজে ৮৫ শতাংশ উজ্জ্বলতা বা পাল্প থাকতে হয়। নবম-দশম শ্রেণির বিজ্ঞানের বই চার রঙা মুদ্রণে ৭০ জিএসএম কাগজে এবং অন্য শ্রেণির বই ৬০ জিএসএম কাগজে ছাপতে হয়। আর বইয়ের কভারে ২৩০ জিএসএমের আর্ট কার্ড (মোটা কাগজ) ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু বর্তমানে কাগজ ও কালির দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে এই দরে (প্রাক্কলিত দরের চেয়ে কম দর) কোনোভাবেই মানসম্মত বই ছাপানো সম্ভব নয় বলে জানান একাধিক মুদ্রাকর।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক প্রেসমালিক বলেন, এর আগে যখন মুদ্রাকরেরা কম দামে কাজ নিয়েছিলেন, তখন তাঁরা ডিসেম্বর মাসের জন্য অপেক্ষা করেছিলেন। কেননা ১ জানুয়ারি যেহেতু বই দিতে হবে, তাই ডিসেম্বর এলে এনসিটিবি আর মানের দিকে তাকায় না। তখন যে বই-ই দেওয়া হয়, এনসিটিবি তা গ্রহণ করে। এবারের পরিস্থিতিও সেদিকে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।সূত্র ‍আজকের পত্রিকা