ঢাকা ০৪:৫৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০১ অক্টোবর ২০২২, ১৫ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ
বিশ্বে চাল উৎপাদনে শীর্ষ তৃতীয় দেশ হয়েও দুশ্চিন্তা বাড়ছে

চাল নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্যমতে সারা বিশ্বে চাল উৎপাদনে বাংলাদেশ তৃতীয়। চলতি বছর দেশে ৩ কোটি ৮৪ লাখ টন চালের উৎপাদন হবে বলেও পূর্বাভাসও দিয়েছে সংস্থাটি। গত বছর বাংলাদেশে চাল উৎপাদন হয় ৩ কোটি ৭৮ লাখ টন। অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে দেশে এখন বছরে চালের চাহিদা ৩ কোটি ৫ লাখ টনের মতো। অর্থাৎ চাহিদার চেয়েও চাল উদ্বৃত্ত থাকার কথা ৭০-৭৩ লাখ টন। অথচ প্রতি বছর ২৫-২৬ লাখ টন চাল আমদানি করতে হয় বাংলাদেশকে। চাল উৎপাদনে শীর্ষ তৃতীয় দেশে এখন চালের সঙ্কট চলছে।

চাল নিয়ে এখন যে সঙ্কট তৈরি হয়েছে নিকট অতীতে তেমনটি কখনও দেখা যায়নি। এ বছর বোরো, আউশ ও আমন- তিনটি মৌসুমেই ধানের উৎপাদন কম হয়েছে। বিশ্ববাজারে চালের দাম বেশি হওয়ায় আমদানিকারকদের চাল আমদানিতে খুব একটা আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। সরকার এখন পর্যন্ত বেসরকারি পর্যায়ে ১০ লাখ টন চাল আমদানির অনুমতি দিলেও এ পর্যন্ত আমদানি হয়েছে মাত্র ৯৫ হাজার টনের মতো। তা ছাড়া যেটুকু আমদানি হয়েছে সেগুলোও বন্দর থেকে ছাড় করছেন না আমদানিকারকরা। কারণ বাজার দরের চেয়ে আমদানি খরচ পড়ে যাচ্ছে বেশি। এর মধ্যে আবার ভারত চাল রফতানিতে ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। এতে চাল আমদানিতে ব্যবসায়ীদের আগ্রহে আরও ভাটা পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর বাইরে এমনিতেই প্রতি বছর সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে বাজারে চালের সঙ্কট থাকে এবং দামও বেশি থাকে। এবারের পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ায় চাল নিয়ে দুশ্চিন্তা আরও বাড়বে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।

চাল নিয়ে এই সঙ্কট মোকাবিলা করার জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতিও নেই বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে সঙ্কট মোকাবিলার জন্য করণীয় কী- জানতে চাইলে কনজ্যুমাস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, ‘চালের চলমান সঙ্কট দূর করার জন্য সবার আগে সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানিতে জোর দিতে হবে। কীভাবে এবং কোন দেশ থেকে দ্রুত সময়ের মধ্যে চাল এনে দেশের বাজারে চালের সরবরাহ বাড়ানো যায় সে চেষ্টা করতে হবে। এ ছাড়া চালের সঙ্কট দূর করতে অভ্যন্তরীণ সরবরাহ বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে ধানের সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। বিভিন্ন সময় জানা গেছে, মিলমালিক এবং একশ্রেণির মধ্যস্বত্বভোগী ফড়িয়ারা অবৈধভাবে ধানের মজুদ করে রাখে। সরকারের উচিত মিল এবং ফড়িয়া পর্যায়ে মজুদ করা ধান বাজারে ছাড়তে অভিযানে নামা দরকার। কোন মিলে কি পরিমাণে ধান মজুদ রয়েছে সেটি জানতে চাওয়া দরকার। আমার বিশ্বাস এসব ধান বাজারে নিয়ে আসতে পারলে এক সপ্তাহের মধ্যে চালের দাম কমে আসবে।’

জানা গেছে, চলতি বছর বোরো মৌসুমে হাওরাঞ্চলে তিন দফা বন্যার কারণে বিপুল পরিমাণ ফসলের ক্ষতি হয়। উপকূল ও উত্তরাঞ্চলে হঠাৎ অতিবৃষ্টির কারণেও মাঠে পাকা ফসল নষ্ট হয়। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের হিসাবে, বোরোতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৩ লাখ টন ফলন কম হয়েছে। আউশ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৭ লাখ টন। উৎপাদন হয়েছে ২০ লাখ ৫০ হাজার টন। অন্যান্য বারের তুলনায় এবার প্রায় ৪০ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে। ফলে আমনের ফলন ১০-১৫ শতাংশ কম হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। আগামী নভেম্বর থেকে আমন ধান কাটা শুরু হবে। এ ছাড়া এবার আমনেও উৎপাদন কম হয়েছে সাড়ে ৬ লাখ টনের মতো। এ কারণে বাজারে ধানের সরবরাহও কিছুটা কম রয়েছে। যার প্রভাব পড়েছে চালের বাজারে।

দেশের বাজারে চালের দাম গত তিন বছর ধরে অনেক চড়া। এ বছরের শুরু থেকে আরও বাড়তে বাড়তে এখন দেশের ইতিহাসে চালের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। বাজারে এখন সবচেয়ে ভালো মানের নাজিরশাইল চাল প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৮৫- ৯০ টাকায়। ভালো মানের মিনিকেট চাল বিক্রি হচ্ছে ৭৫-৮০ টাকায়। মাঝারি মানের মিনিকেট চাল বিক্রি হচ্ছে ৭০-৭২ টাকায়। বি-আর ২৮ চালের কেজি এখন ৬০-৬৫ টাকা। স্বর্ণা, পারি ও পাইজাম চালের কেজি ৫২-৫৮ টাকার মধ্যে। অর্থাৎ বাজারে এখন ৫২ টাকার নিচে কোনো চাল মিলছে না। চালের এই ঊর্ধ্বমুখী দামের লাগাম টানার জন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, কিন্তু সেখানেও সফল হওয়া যাচ্ছে না।

চালের সম্ভাব্য সঙ্কট মোকাবিলায় সরকার গত ২০ জুলাই ৩৮০টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ১০ লাখ টন চাল আমদানির অনুমতি দেয়। অথচ খাদ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, শনিবার পর্যন্ত বেসরকারি খাতে মাত্র ৯৫ হাজার টন চাল আমদানি হয়েছে। গত ২৮ আগস্ট চাল আমদানির শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করে সরকার। শর্ত সাপেক্ষে অন্যান্য শুল্কও কমায়। কিন্তু এরই মধ্যে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বাসমতি ছাড়া অন্যান্য চাল রফতানিতে নতুন করে শুল্ক ২০ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে ভারত থেকে চাল আমদানিতে জটিলতা দেখা দেয়। অর্থাৎ বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানিতে খুব একটা গতি নেই।
আবার খাদ্য অধিদফতরের অভ্যন্তরীণ খাদ্য মজুদ কার্যক্রমেও খুব একটা গতি নেই। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, গত বোরো ধান সংগ্রহ মৌসুমে সরকার সাড়ে ৬ লাখ টন ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে। বিপরীতে ২ লাখ ৬২ লাখ টন ধান সংগ্রহ করেছে। তবে ১১ লাখ টন চাল কেনার লক্ষ্যমাত্রা অনেকটাই পূরণ হয়েছে।
অন্যদিকে সরকারি উদ্যোগে চাল আমদানি করা গেলেও তাতে গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। জানা গেছে বেসরকারি উদ্যোক্তারা যেখানে ভারত থেকে ৪০০ ডলার দরে প্রতি টন চাল আমদানি করছে সেখানে সরকার ভিয়েতনাম থেকে চাল আমদানি করছে প্রতি টন ৫২১ ডলার রেটে। এ ছাড়া ভারত থেকে আমদানি করছে ৪৪৩ ও ৪৬৫ ডলারে এবং মিয়ানমার থেকে আমদানি করছে ৪৬৫ ডলারে। সরকার মূলত এসব দেশ থেকে চাল আমদানি করে সরকারি খাদ্য মজুদ বাড়িয়েছে। এ জন্য চালের এই সঙ্কটকালীন সময়েও একটি বিষয় কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে সরকারি খাদ্য মজুদ পরিস্থিতি।

খাদ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, শনিবার পর্যন্ত সরকারি গুদামে মোট খাদ্য মজুদ রয়েছে ১৯ লাখ ১৫ হাজার টন। এর মধ্যে চালের মজুদ ১৭ লাখ ২৬ হাজার টন। ধানের মজুদ ৮৯ হাজার টন এবং গমের মজুদ ১ লাখ ৩১ হাজর টন। সরকারি খাদ্য মজুদ আরও বাড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে জানিয়ে খাদ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. শাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘কীভাবে খাদ্যশস্যের মজুদ আরও বাড়ানো যায় আমরা সেদিকেই বেশি কাজ করছি এখন। এ ক্ষেত্রে আমরা অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ কার্যক্রম কীভাবে আরও বাড়ানো যায় সে চেষ্টা যেমন করছি, তেমনই আমদানি কীভাবে বাড়ানো যায় সেদিকেও আমরা জোর দিচ্ছি। আশা করছি আমরা চলতি মাসের মধ্যে সরকারি খাদ্য মজুদ আরও বাড়াতে পারব।’

তিন আরও বলেন, ‘চালের দাম বেশি হওয়ায় স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য আমরা ৩০ টাকা দরে ওএমএস’-এর মাধ্যমে চাল বিক্রি করছি। ঢাকাসহ সারা দেশে একযোগে আমরা ওএমএস কার্যক্রম চালাচ্ছি। প্রয়োজনে ওএমএস আরও বাড়ানো হবে। এ ছাড়া টিসিবির মাধ্যমেও চাল বিক্রি করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে আমরা যেসব উদ্যোগ নিচ্ছি তা চালের বাজারে প্রভাব ফেলবে বলে আমার বিশ্বাস।’

অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ ও সিপিডির সম্মানীয় ফেলো প্রফেসর মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশে ধান-চালের উৎপাদন ও চাহিদার তথ্যে গরমিল রয়েছে। বলা হয় চাহিদার চেয়ে চাল বেশি উৎপাদন হয়, তাহলে তো সঙ্কট থাকার কথা না। সঙ্কট যেহেতু আছে, সেহেতু বুঝতে হবে চালের উৎপাদনের তথ্য ঠিক নেই। আসলে যে পরিমাণে ধান-চাল উৎপাদন হয় তার মধ্যে সিস্টেম লস থাকে, নষ্ট হয় কিছু অংশ। এগুলো বাদ দিলে চাহিদার তুলনায় আসলে চালের ঘাটতি থেকে যায়। এ জন্য ধান-চালের তথ্যগত সমস্যাও দূর করা উচিত।’

Tag :
জনপ্রিয়

হোসেনপুর বাজার সনাতন ধর্মাবলম্বী ব্যাবসায়িকদের উদ্যোগে বস্ত্র বিতরণ

বিশ্বে চাল উৎপাদনে শীর্ষ তৃতীয় দেশ হয়েও দুশ্চিন্তা বাড়ছে

চাল নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে

প্রকাশের সময় : ১০:১০:১৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২২

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্যমতে সারা বিশ্বে চাল উৎপাদনে বাংলাদেশ তৃতীয়। চলতি বছর দেশে ৩ কোটি ৮৪ লাখ টন চালের উৎপাদন হবে বলেও পূর্বাভাসও দিয়েছে সংস্থাটি। গত বছর বাংলাদেশে চাল উৎপাদন হয় ৩ কোটি ৭৮ লাখ টন। অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে দেশে এখন বছরে চালের চাহিদা ৩ কোটি ৫ লাখ টনের মতো। অর্থাৎ চাহিদার চেয়েও চাল উদ্বৃত্ত থাকার কথা ৭০-৭৩ লাখ টন। অথচ প্রতি বছর ২৫-২৬ লাখ টন চাল আমদানি করতে হয় বাংলাদেশকে। চাল উৎপাদনে শীর্ষ তৃতীয় দেশে এখন চালের সঙ্কট চলছে।

চাল নিয়ে এখন যে সঙ্কট তৈরি হয়েছে নিকট অতীতে তেমনটি কখনও দেখা যায়নি। এ বছর বোরো, আউশ ও আমন- তিনটি মৌসুমেই ধানের উৎপাদন কম হয়েছে। বিশ্ববাজারে চালের দাম বেশি হওয়ায় আমদানিকারকদের চাল আমদানিতে খুব একটা আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। সরকার এখন পর্যন্ত বেসরকারি পর্যায়ে ১০ লাখ টন চাল আমদানির অনুমতি দিলেও এ পর্যন্ত আমদানি হয়েছে মাত্র ৯৫ হাজার টনের মতো। তা ছাড়া যেটুকু আমদানি হয়েছে সেগুলোও বন্দর থেকে ছাড় করছেন না আমদানিকারকরা। কারণ বাজার দরের চেয়ে আমদানি খরচ পড়ে যাচ্ছে বেশি। এর মধ্যে আবার ভারত চাল রফতানিতে ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। এতে চাল আমদানিতে ব্যবসায়ীদের আগ্রহে আরও ভাটা পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর বাইরে এমনিতেই প্রতি বছর সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে বাজারে চালের সঙ্কট থাকে এবং দামও বেশি থাকে। এবারের পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ায় চাল নিয়ে দুশ্চিন্তা আরও বাড়বে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।

চাল নিয়ে এই সঙ্কট মোকাবিলা করার জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতিও নেই বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে সঙ্কট মোকাবিলার জন্য করণীয় কী- জানতে চাইলে কনজ্যুমাস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, ‘চালের চলমান সঙ্কট দূর করার জন্য সবার আগে সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানিতে জোর দিতে হবে। কীভাবে এবং কোন দেশ থেকে দ্রুত সময়ের মধ্যে চাল এনে দেশের বাজারে চালের সরবরাহ বাড়ানো যায় সে চেষ্টা করতে হবে। এ ছাড়া চালের সঙ্কট দূর করতে অভ্যন্তরীণ সরবরাহ বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে ধানের সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। বিভিন্ন সময় জানা গেছে, মিলমালিক এবং একশ্রেণির মধ্যস্বত্বভোগী ফড়িয়ারা অবৈধভাবে ধানের মজুদ করে রাখে। সরকারের উচিত মিল এবং ফড়িয়া পর্যায়ে মজুদ করা ধান বাজারে ছাড়তে অভিযানে নামা দরকার। কোন মিলে কি পরিমাণে ধান মজুদ রয়েছে সেটি জানতে চাওয়া দরকার। আমার বিশ্বাস এসব ধান বাজারে নিয়ে আসতে পারলে এক সপ্তাহের মধ্যে চালের দাম কমে আসবে।’

জানা গেছে, চলতি বছর বোরো মৌসুমে হাওরাঞ্চলে তিন দফা বন্যার কারণে বিপুল পরিমাণ ফসলের ক্ষতি হয়। উপকূল ও উত্তরাঞ্চলে হঠাৎ অতিবৃষ্টির কারণেও মাঠে পাকা ফসল নষ্ট হয়। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের হিসাবে, বোরোতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৩ লাখ টন ফলন কম হয়েছে। আউশ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৭ লাখ টন। উৎপাদন হয়েছে ২০ লাখ ৫০ হাজার টন। অন্যান্য বারের তুলনায় এবার প্রায় ৪০ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে। ফলে আমনের ফলন ১০-১৫ শতাংশ কম হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। আগামী নভেম্বর থেকে আমন ধান কাটা শুরু হবে। এ ছাড়া এবার আমনেও উৎপাদন কম হয়েছে সাড়ে ৬ লাখ টনের মতো। এ কারণে বাজারে ধানের সরবরাহও কিছুটা কম রয়েছে। যার প্রভাব পড়েছে চালের বাজারে।

দেশের বাজারে চালের দাম গত তিন বছর ধরে অনেক চড়া। এ বছরের শুরু থেকে আরও বাড়তে বাড়তে এখন দেশের ইতিহাসে চালের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। বাজারে এখন সবচেয়ে ভালো মানের নাজিরশাইল চাল প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৮৫- ৯০ টাকায়। ভালো মানের মিনিকেট চাল বিক্রি হচ্ছে ৭৫-৮০ টাকায়। মাঝারি মানের মিনিকেট চাল বিক্রি হচ্ছে ৭০-৭২ টাকায়। বি-আর ২৮ চালের কেজি এখন ৬০-৬৫ টাকা। স্বর্ণা, পারি ও পাইজাম চালের কেজি ৫২-৫৮ টাকার মধ্যে। অর্থাৎ বাজারে এখন ৫২ টাকার নিচে কোনো চাল মিলছে না। চালের এই ঊর্ধ্বমুখী দামের লাগাম টানার জন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, কিন্তু সেখানেও সফল হওয়া যাচ্ছে না।

চালের সম্ভাব্য সঙ্কট মোকাবিলায় সরকার গত ২০ জুলাই ৩৮০টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ১০ লাখ টন চাল আমদানির অনুমতি দেয়। অথচ খাদ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, শনিবার পর্যন্ত বেসরকারি খাতে মাত্র ৯৫ হাজার টন চাল আমদানি হয়েছে। গত ২৮ আগস্ট চাল আমদানির শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করে সরকার। শর্ত সাপেক্ষে অন্যান্য শুল্কও কমায়। কিন্তু এরই মধ্যে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বাসমতি ছাড়া অন্যান্য চাল রফতানিতে নতুন করে শুল্ক ২০ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে ভারত থেকে চাল আমদানিতে জটিলতা দেখা দেয়। অর্থাৎ বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানিতে খুব একটা গতি নেই।
আবার খাদ্য অধিদফতরের অভ্যন্তরীণ খাদ্য মজুদ কার্যক্রমেও খুব একটা গতি নেই। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, গত বোরো ধান সংগ্রহ মৌসুমে সরকার সাড়ে ৬ লাখ টন ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে। বিপরীতে ২ লাখ ৬২ লাখ টন ধান সংগ্রহ করেছে। তবে ১১ লাখ টন চাল কেনার লক্ষ্যমাত্রা অনেকটাই পূরণ হয়েছে।
অন্যদিকে সরকারি উদ্যোগে চাল আমদানি করা গেলেও তাতে গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। জানা গেছে বেসরকারি উদ্যোক্তারা যেখানে ভারত থেকে ৪০০ ডলার দরে প্রতি টন চাল আমদানি করছে সেখানে সরকার ভিয়েতনাম থেকে চাল আমদানি করছে প্রতি টন ৫২১ ডলার রেটে। এ ছাড়া ভারত থেকে আমদানি করছে ৪৪৩ ও ৪৬৫ ডলারে এবং মিয়ানমার থেকে আমদানি করছে ৪৬৫ ডলারে। সরকার মূলত এসব দেশ থেকে চাল আমদানি করে সরকারি খাদ্য মজুদ বাড়িয়েছে। এ জন্য চালের এই সঙ্কটকালীন সময়েও একটি বিষয় কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে সরকারি খাদ্য মজুদ পরিস্থিতি।

খাদ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, শনিবার পর্যন্ত সরকারি গুদামে মোট খাদ্য মজুদ রয়েছে ১৯ লাখ ১৫ হাজার টন। এর মধ্যে চালের মজুদ ১৭ লাখ ২৬ হাজার টন। ধানের মজুদ ৮৯ হাজার টন এবং গমের মজুদ ১ লাখ ৩১ হাজর টন। সরকারি খাদ্য মজুদ আরও বাড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে জানিয়ে খাদ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. শাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘কীভাবে খাদ্যশস্যের মজুদ আরও বাড়ানো যায় আমরা সেদিকেই বেশি কাজ করছি এখন। এ ক্ষেত্রে আমরা অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ কার্যক্রম কীভাবে আরও বাড়ানো যায় সে চেষ্টা যেমন করছি, তেমনই আমদানি কীভাবে বাড়ানো যায় সেদিকেও আমরা জোর দিচ্ছি। আশা করছি আমরা চলতি মাসের মধ্যে সরকারি খাদ্য মজুদ আরও বাড়াতে পারব।’

তিন আরও বলেন, ‘চালের দাম বেশি হওয়ায় স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য আমরা ৩০ টাকা দরে ওএমএস’-এর মাধ্যমে চাল বিক্রি করছি। ঢাকাসহ সারা দেশে একযোগে আমরা ওএমএস কার্যক্রম চালাচ্ছি। প্রয়োজনে ওএমএস আরও বাড়ানো হবে। এ ছাড়া টিসিবির মাধ্যমেও চাল বিক্রি করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে আমরা যেসব উদ্যোগ নিচ্ছি তা চালের বাজারে প্রভাব ফেলবে বলে আমার বিশ্বাস।’

অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ ও সিপিডির সম্মানীয় ফেলো প্রফেসর মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশে ধান-চালের উৎপাদন ও চাহিদার তথ্যে গরমিল রয়েছে। বলা হয় চাহিদার চেয়ে চাল বেশি উৎপাদন হয়, তাহলে তো সঙ্কট থাকার কথা না। সঙ্কট যেহেতু আছে, সেহেতু বুঝতে হবে চালের উৎপাদনের তথ্য ঠিক নেই। আসলে যে পরিমাণে ধান-চাল উৎপাদন হয় তার মধ্যে সিস্টেম লস থাকে, নষ্ট হয় কিছু অংশ। এগুলো বাদ দিলে চাহিদার তুলনায় আসলে চালের ঘাটতি থেকে যায়। এ জন্য ধান-চালের তথ্যগত সমস্যাও দূর করা উচিত।’