ঢাকা ১২:২১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৭ অক্টোবর ২০২২, ২২ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

কবর নিয়ে অবৈধ বাণিজ্যের অভিযোগ

৬ সেপ্টেম্বর, বেলা ১১টা। ঢাকার মিরপুর কবরস্থান। ঢুকতেই নাকে আসে গোলাপজলের গন্ধ। তিনটি কবর খোঁড়া চলছে। একজনের দাফন শেষ হলো। আরেকটিতে দাফন চলছে। তৃতীয় কবরটি তখনো খোঁড়া শেষ হয়নি। ওদিকে আরেক প্রান্তে কবরের ভেতর বসে জনাকয়েক কিশোর নেশা করছে। উৎকট গন্ধ আসছে সেখান থেকে।

তিন কবরের একটি রেহেনা আজিমের। স্বামী মেজবাহুল আজিমের সংরক্ষিত কবরে তাঁকে দাফন করা হয়েছে। মৃতের স্বজন আল আমিন বলেন, সংরক্ষিত স্থানে আবার কবর দেওয়ায় ৩০ হাজার ৫০০ টাকা দিতে হয়েছে। আর বাঁশ, চাটাই ও কবর খোঁড়ার জন্য ঠিকাদারকে দিতে হয়েছে ৫ হাজার টাকা। তিনি বলেন, ‘লাশ সামনে রেখে তো টাকা কমানোর জন্য দরদাম করতে পারি না। ওরা চেয়েছে, দিয়ে দিয়েছি।’

মিরপুর কবরস্থানে তিন বছর ধরে গোরখোদকের কাজ করেন মো. আকাশ। তিনি বলেন, খোঁড়া, বাঁশ ও চাটাইয়ের জন্য প্রতি কবরে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা নেওয়া হয়। কম-বেশিও হয়ে থাকে। যার থেকে যেমন আদায় করা যায়।

মিরপুর কবরস্থানটি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) আওতায়। এই কবরস্থানের মোহরার সানোয়ার হোসেন দাবি করেন, কবরের জায়গার জন্য সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত ফি নেওয়া হয়। তবে খনন, বাঁশ ও চাটাইয়ের টাকা নেয় ঠিকাদার।

এদিকে ডিএনসিসির তথ্য বলছে, সাধারণ কবরে সিটি করপোরেশনের ফি ৫০০ টাকা। আর মিরপুর কবরস্থানের জন্য কবর খনন, বাঁশ ও চাটাইয়ের জন্য ৪৫৭ টাকা ৫০ পয়সা নির্ধারণ করা। অন্য কবরগুলোতেও এই ফি ৫০০ টাকার বেশি নয়। অথচ রেহেনা আজিমের দাফনের সময় ঠিকাদার ১০ গুণ বেশি টাকা নিয়েছিলেন।

উত্তরা ১৪ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানের একজন নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন, ‘কবর দেওয়ার জন্য যে বাড়তি টাকা নেওয়া হয়, তার কোনো রসিদ দেয় না ঠিকাদার।’ এখানে কবর খোঁড়ার কাজ করেন শিপন মিয়া। তিনি দাবি করেন, ‘সরকার-নির্ধারিত ৫০০ টাকায় বাঁশ দিয়ে কবর দেওয়া সম্ভব না। সরকারি ফি, বাঁশ ও চাটাই মিলিয়ে ২ হাজার ৫০০ টাকা খরচ হয়। আমাদের নির্ধারিত বেতন নেই। কবর খোঁড়ার পর যে যা দেয়।’

গত শুক্রবার দুপুরে উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টর কবরস্থানে বেশি টাকা আদায়ের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে বাড়তি টাকা নেওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন কবরস্থানের মোহরার মনিরুল ইসলাম। ডিএনসিসি এলাকায় মিরপুর, ১৪ নম্বর সেক্টর ও উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টর কবরস্থানসহ মোট ছয়টি কবরস্থান রয়েছে। বাকি কবরস্থানগুলো হচ্ছে উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টর কবরস্থান, বনানী কবরস্থান ও রায়েরবাজার বধ্যভূমিসংলগ্ন কবরস্থান।

কবরগুলো থেকে সিটি করপোরেশনের রাজস্ব আয় প্রতিবছর বাড়ছে। ডিএনসিসির তথ্যমতে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে রাজস্ব আয় হয়েছে ৬ কোটি ১২ লাখ ৬১ হাজার ৭০০ টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছরে আদায় হয়েছে ৮ কোটি ৩৬ লাখ ৬৯ হাজার ৬০০ টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে আয় হয়েছে ১১ কোটি ৪৪ লাখ ৭ হাজার ৯০০ টাকা। তবে কবরগুলোর মধ্যে বনানী ও উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টর কবরস্থান থেকে আয়ের পরিমাণ বেড়েছে।

ডিএনসিসির ছয়টি কবরের মধ্যে বনানী ছাড়া বাকি পাঁচটি কবরের ঠিকাদার আব্দুল মালেক। ১৯৯৫ সাল থেকে কবরের ঠিকাদারি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত তিনি। আব্দুল মালেক বলেন, ‘আমরা কম রেট অফার করে কবরের টেন্ডার নিই। কিন্তু জিনিসপত্রের যা দাম, নির্ধারিত টাকায় আমাদের পোষায় না।’

নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, সিটি করপোরেশনের আইন অনুসারে প্রতিটি সেবার ফির চার্ট থাকার কথা। সাধারণ মানুষ হয়তো জানেই না ফির পরিমাণ।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএনসিসির মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘কবরগুলোতে ডিএনসিসির নির্ধারিত সেবামূল্য সাইনবোর্ডের মাধ্যমে প্রকাশের ব্যবস্থা করব। নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি নেওয়ার সুযোগ নেই। কবরসংশ্লিষ্টরা যদি ভুল তথ্য দিয়ে বেশি টাকা দাবি করে, তাহলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।’ খেটে খাওয়া মানুষদের জন্য বিনা পয়সায় কবর দেওয়ার সুযোগ ডিএনসিসিতে রয়েছে বলে জানান মেয়র আতিক।

Tag :

২ লাখ টাকার ফুলদানি নিলামে বিক্রি হলো ৯২ কোটি টাকায়

কবর নিয়ে অবৈধ বাণিজ্যের অভিযোগ

প্রকাশের সময় : ০৯:২৯:৩৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২২

৬ সেপ্টেম্বর, বেলা ১১টা। ঢাকার মিরপুর কবরস্থান। ঢুকতেই নাকে আসে গোলাপজলের গন্ধ। তিনটি কবর খোঁড়া চলছে। একজনের দাফন শেষ হলো। আরেকটিতে দাফন চলছে। তৃতীয় কবরটি তখনো খোঁড়া শেষ হয়নি। ওদিকে আরেক প্রান্তে কবরের ভেতর বসে জনাকয়েক কিশোর নেশা করছে। উৎকট গন্ধ আসছে সেখান থেকে।

তিন কবরের একটি রেহেনা আজিমের। স্বামী মেজবাহুল আজিমের সংরক্ষিত কবরে তাঁকে দাফন করা হয়েছে। মৃতের স্বজন আল আমিন বলেন, সংরক্ষিত স্থানে আবার কবর দেওয়ায় ৩০ হাজার ৫০০ টাকা দিতে হয়েছে। আর বাঁশ, চাটাই ও কবর খোঁড়ার জন্য ঠিকাদারকে দিতে হয়েছে ৫ হাজার টাকা। তিনি বলেন, ‘লাশ সামনে রেখে তো টাকা কমানোর জন্য দরদাম করতে পারি না। ওরা চেয়েছে, দিয়ে দিয়েছি।’

মিরপুর কবরস্থানে তিন বছর ধরে গোরখোদকের কাজ করেন মো. আকাশ। তিনি বলেন, খোঁড়া, বাঁশ ও চাটাইয়ের জন্য প্রতি কবরে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা নেওয়া হয়। কম-বেশিও হয়ে থাকে। যার থেকে যেমন আদায় করা যায়।

মিরপুর কবরস্থানটি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) আওতায়। এই কবরস্থানের মোহরার সানোয়ার হোসেন দাবি করেন, কবরের জায়গার জন্য সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত ফি নেওয়া হয়। তবে খনন, বাঁশ ও চাটাইয়ের টাকা নেয় ঠিকাদার।

এদিকে ডিএনসিসির তথ্য বলছে, সাধারণ কবরে সিটি করপোরেশনের ফি ৫০০ টাকা। আর মিরপুর কবরস্থানের জন্য কবর খনন, বাঁশ ও চাটাইয়ের জন্য ৪৫৭ টাকা ৫০ পয়সা নির্ধারণ করা। অন্য কবরগুলোতেও এই ফি ৫০০ টাকার বেশি নয়। অথচ রেহেনা আজিমের দাফনের সময় ঠিকাদার ১০ গুণ বেশি টাকা নিয়েছিলেন।

উত্তরা ১৪ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানের একজন নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন, ‘কবর দেওয়ার জন্য যে বাড়তি টাকা নেওয়া হয়, তার কোনো রসিদ দেয় না ঠিকাদার।’ এখানে কবর খোঁড়ার কাজ করেন শিপন মিয়া। তিনি দাবি করেন, ‘সরকার-নির্ধারিত ৫০০ টাকায় বাঁশ দিয়ে কবর দেওয়া সম্ভব না। সরকারি ফি, বাঁশ ও চাটাই মিলিয়ে ২ হাজার ৫০০ টাকা খরচ হয়। আমাদের নির্ধারিত বেতন নেই। কবর খোঁড়ার পর যে যা দেয়।’

গত শুক্রবার দুপুরে উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টর কবরস্থানে বেশি টাকা আদায়ের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে বাড়তি টাকা নেওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন কবরস্থানের মোহরার মনিরুল ইসলাম। ডিএনসিসি এলাকায় মিরপুর, ১৪ নম্বর সেক্টর ও উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টর কবরস্থানসহ মোট ছয়টি কবরস্থান রয়েছে। বাকি কবরস্থানগুলো হচ্ছে উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টর কবরস্থান, বনানী কবরস্থান ও রায়েরবাজার বধ্যভূমিসংলগ্ন কবরস্থান।

কবরগুলো থেকে সিটি করপোরেশনের রাজস্ব আয় প্রতিবছর বাড়ছে। ডিএনসিসির তথ্যমতে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে রাজস্ব আয় হয়েছে ৬ কোটি ১২ লাখ ৬১ হাজার ৭০০ টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছরে আদায় হয়েছে ৮ কোটি ৩৬ লাখ ৬৯ হাজার ৬০০ টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে আয় হয়েছে ১১ কোটি ৪৪ লাখ ৭ হাজার ৯০০ টাকা। তবে কবরগুলোর মধ্যে বনানী ও উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টর কবরস্থান থেকে আয়ের পরিমাণ বেড়েছে।

ডিএনসিসির ছয়টি কবরের মধ্যে বনানী ছাড়া বাকি পাঁচটি কবরের ঠিকাদার আব্দুল মালেক। ১৯৯৫ সাল থেকে কবরের ঠিকাদারি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত তিনি। আব্দুল মালেক বলেন, ‘আমরা কম রেট অফার করে কবরের টেন্ডার নিই। কিন্তু জিনিসপত্রের যা দাম, নির্ধারিত টাকায় আমাদের পোষায় না।’

নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, সিটি করপোরেশনের আইন অনুসারে প্রতিটি সেবার ফির চার্ট থাকার কথা। সাধারণ মানুষ হয়তো জানেই না ফির পরিমাণ।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএনসিসির মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘কবরগুলোতে ডিএনসিসির নির্ধারিত সেবামূল্য সাইনবোর্ডের মাধ্যমে প্রকাশের ব্যবস্থা করব। নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি নেওয়ার সুযোগ নেই। কবরসংশ্লিষ্টরা যদি ভুল তথ্য দিয়ে বেশি টাকা দাবি করে, তাহলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।’ খেটে খাওয়া মানুষদের জন্য বিনা পয়সায় কবর দেওয়ার সুযোগ ডিএনসিসিতে রয়েছে বলে জানান মেয়র আতিক।