ঢাকা ০৮:১২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৪ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

মিয়ানমার আসলে কী চায়?

গত ১৫ দিনে চারবার মিয়ানমারের মর্টার শেল ও গুলি এসে পড়েছে বাংলাদেশের ভেতরে। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে প্রায়ই বাংলাদেশের আকাশসীমায় ঢুকে পড়ছে মিয়ানমারের যুদ্ধবিমান। সর্বশেষ গত শুক্রবার বিকেলে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার তুমব্রু সীমান্তের প্রায় ২৫০ গজ ভেতরে কোনারপাড়া এলাকায় কৃষক শাহজানের বাড়ির আঙিনায় পড়ে একে ৪৭-এর একটি গুলি। এসব ঘটনায় উদ্বেগ ছড়িয়েছে এলাকায়।

গত ২৮ আগস্ট থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চার দফায় একই ঘটনা ঘটে। ইতিমধ্যে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে কড়া প্রতিবাদ জানায় বাংলাদেশ। তার পরও ঘটনার পুনরাবৃত্তি হওয়ায় প্রশ্ন উঠছে, মিয়ানমারের এমন আচরণ কি ইচ্ছাকৃত? এই সংঘাতময় উপসর্গ সৃষ্টির পেছনে তাদের ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্য আছে কি না?

মিয়ানমার বারবার আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করলেও ধৈর্যের পরিচয় দিচ্ছে বাংলাদেশ। বলা হচ্ছে, দেশটির অভ্যন্তরীণ যুদ্ধপরিস্থিতির ফলেই এসব ঘটছে। তবে তাতে আতঙ্ক কাটছে না বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের এপারে।

ঘুমধুম সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের পাহাড়ে গোলাগুলি চলে। সকাল ৯টার পর থেকে গোলাগুলির শব্দ আসতে থাকে। বেলা দুইটা পর্যন্ত থেমে থেমে আর্টিলারি ও মর্টার শেল ছোড়ার আওয়াজ পাওয়া যায়। গোলাগুলির মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় এপারের জনবসতিতে বিরাজ করছে আতঙ্ক।

আলাপে একাধিক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেন, মিয়ানমার বাংলাদেশের সঙ্গে যুদ্ধ বাধাবে না হয়তো। বিশেষ করে উত্তর রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনী আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে ব্যাপক সেনা অভিযান চালাচ্ছে। তারই গোলা এসে পড়ছে এপারে।

তবে ভিন্ন উদ্দেশ্যের বিষয়টিও উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশেষজ্ঞরা। কেননা, ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরুর নামে সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টির পর ৮ লাখ রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। বর্তমানে বাংলাদেশে তাদের সংখ্যা সব মিলিয়ে ১২ লাখের মতো। মিয়ানমারে আরও যে ৬ লাখ রোহিঙ্গা রয়েছে, তাদের বাংলাদেশ ও ভারতে ঢুকতে বাধ্য করার জন্য ফাঁদও হতে পারে সীমান্তের এই সাম্প্রতিক উত্তেজনা, এমন শঙ্কাও দেখছেন বিশ্লেষকরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মিয়ানমার অতীতে চীন ও থাইল্যান্ডের আকাশসীমাও লঙ্ঘন করেছে। তবে তারা ক্ষমা ও দুঃখ প্রকাশের পর আর পুনরাবৃত্তি ঘটায়নি। কিন্তু বাংলাদেশে পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে। সেক্ষেত্রে সীমান্তে বাংলাদেশের আরও কড়াকড়ি আরোপ, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধিসহ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থান নেওয়ার বিকল্প নেই। বিষয়টি আন্তর্জাতিক ফোরামে উত্থাপনেরও পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুর রশিদ বলেন, এবার মিয়ানমারের অভ্যন্তরে যে যুদ্ধাবস্থা চলছে তার ধরনটা ভিন্ন। সেখানে শুধু রোহিঙ্গাদেরই টার্গেট করা হয়নি। ওই দেশের অন্য শ্রেণি-পেশার মানুষের ওপরও হামলা হচ্ছে। যারা পালাচ্ছে, তারা কিন্তু ভারতমুখী হচ্ছে।

বাংলাদেশ ধৈর্যের পরিচয় দিচ্ছে উল্লেখ করে এই নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে গোলা পড়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। প্রশ্ন আসতে পারে যে, বাংলাদেশ কেন সামরিক জবাব দিচ্ছে না। আমি মনে করি, সামরিক জবাবের জন্য যেসব উপাদান থাকা দরকার তা ওই ঘটনায় হয়তো নেই। কারণ শেল বাংলাদেশে পড়ছে ঠিকই, তবে লক্ষ্যবস্তু বাংলাদেশ নয়। এমন পরিস্থিতিতে কঠিন কোনো সামরিক জবাব দেওয়া উৎকৃষ্ট হবে না।’

যেহেতু মিয়ানমার বারবার আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছে, সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ কূটনীতি আরও জোরদার করতে পারে বলে মন্তব্য করেন মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুর রশিদ। বলেন, ‘শেল যেখান থেকে আসছে ওই সীমান্তে ধৈর্য সহকারে সামরিক পাওয়ার ডিসপ্লে বা সম্মেলন ঘটাতে পারে। বাংলাদেশ রেসপন্ড (জবাব) করতে পারে। এটাও একটি মিলিটারি টার্ম। এছাড়া গোয়েন্দা তৎপরতা আরও সক্রিয় করা যেতে পারে।’

‘আরেকটি বিষয় হলো- ওই শেল মিয়ামারের সরকারি বাহিনী ছুড়েছে, নাকি বিদ্রোহীরা ছুড়েছে সেটা দেখার বিষয় নয়। যে-ই ছুড়ুক, শেল তো মিয়ানমার থেকে এসেছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী শেল বা গুলি যেখান থেকে ছোড়া হয়েছে সেই উৎসস্থল ধ্বংসে বাংলাদেশ চাইলে ব্যবস্থা নিতে পারে।’ বলেন তিনি।

মিয়ানমার আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘যেহেতু বারবার মিয়ানমার একই ঘটনা ঘটাচ্ছে, সেক্ষেত্রে এটি এখন আন্তর্জাতিক ফোরামে ওঠানো দরকার। আশা করি প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি জাতিসংঘে উত্থাপন করবেন।’

এটি মিয়ানমারের কোনো ফাঁদ কি না, জানতে চাইলে ড. ইমতিয়াজ বলেন, ‘ট্র্যাপ (ফাঁদ) হতে পারে। সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করার পেছনে ভিন্ন উদ্দেশ্য থাকতে পারে। কেননা, জীবন হুমকিতে পড়লে তো রোহিঙ্গারা পালাবেই। আর পালালে তারা বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টা করবে। মিয়ামারের উদ্দেশ্য কী তা পরিষ্কার হতে আন্তর্জাতিক ফোরামে এ বিষয় নিয়ে বাংলাদেশকে কথা বলতে হবে।’ সৃষ্ট পরিস্থিতিতে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানোর পরামর্শ দেন এই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক।

আবার ঘটলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তোলা হবে

মিয়ানমার থেকে গোলা এসে পড়ার বিষয়ে দেশটি সতর্ক হবে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। তিনি বলেন, মিয়ানমারের ছোড়া গোলা যাতে সীমান্ত অতিক্রম না করে সে ব্যাপারে সংযত হতে বলে দেশটির রাষ্ট্রদূতের কাছে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। খুব শিগগির এ বিষয়ে মিয়ানমার সংযত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন স্বরাষ্টমন্ত্রী। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঘটলে দেশের সব পর্যায় থেকে আরও কঠোর প্রতিবাদ জানানো হবে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তোলা হবে বলেও জানান তিনি।

জাপানের নিন্দা

রাজধানীর একটি হোটেলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়োজনে এক সেমিনারে মিয়ানমারের এই উস্কানিমূলক আচরণের নিন্দা জানান ঢাকায় নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকি। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ সীমান্তে মিয়ানমারের মর্টার শেল পড়েছে, যা গ্রহণযোগ্য নয়। সামরিক উত্তেজনা জাপান নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।’

এদিকে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মিয়ানমার সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে (বিজিবি) সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে। সেখানে সীমান্ত নিরাপত্তা ও টহল জোরদার করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বর্ডার সিল করা হয়েছে, যেন কোনো মিয়ানমার নাগরিক বাংলাদেশে ঢুকতে না পারে।

২৮ আগস্ট বিকালে তমব্রু সীমান্তে উত্তরপাড়ার নুর আহমদের বাড়ির আঙিনায় দুটি মর্টার শেল এসে পড়ে, পাশাপাশি আকাশসীমায় একাধিক হেলিকপ্টারকে চক্কর দিতে দেখা যায়। গত ৩ সেপ্টেম্বরও একই এলাকায় মিয়ানমার থেকে ছোড়া দুটি মর্টারশেল এসে পড়ে। আর ৬ সেপ্টেম্বর দিনব্যাপী বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে গোলা ছোড়ার শব্দ শোনা যায়। বাংকার থেকে ছোড়া গোলার বিকট শব্দে কাঁপে সীমান্তের বসতিগুলো। মাঝেমধ্যেই মিয়ানমারের যুদ্ধবিমান বাংলাদেশের আকাশসীমায় ঢুকে পড়ছিল।

এর দুদিন আগে ৪ সেপ্টেম্বর তুমব্রু পশ্চিমকুল সীমান্তে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে খনন করা হয় বাংকার, রাখা হয় ভারী অস্ত্র। যা দেখা যায় তুমব্রু পশ্চিমকুল সীমান্তে বাংলাদেশের অভ্যন্তর থেকে।

বান্দরবানের ঘুমধুম ও তুমব্রু সীমান্তে স্থানীয় বাসিন্দা রয়েছে ২২ হাজারের বেশি। আর ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থান করছে সাড়ে ৪ হাজার রোহিঙ্গা।

Tag :

মধ্যনগরে দুর্গোৎসব উপলক্ষে ৩৩টি পূজামন্ডপে নগদ অর্থ প্রদান করেন, এমপি রতন

মিয়ানমার আসলে কী চায়?

প্রকাশের সময় : ০৯:৪৮:৪০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২২

গত ১৫ দিনে চারবার মিয়ানমারের মর্টার শেল ও গুলি এসে পড়েছে বাংলাদেশের ভেতরে। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে প্রায়ই বাংলাদেশের আকাশসীমায় ঢুকে পড়ছে মিয়ানমারের যুদ্ধবিমান। সর্বশেষ গত শুক্রবার বিকেলে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার তুমব্রু সীমান্তের প্রায় ২৫০ গজ ভেতরে কোনারপাড়া এলাকায় কৃষক শাহজানের বাড়ির আঙিনায় পড়ে একে ৪৭-এর একটি গুলি। এসব ঘটনায় উদ্বেগ ছড়িয়েছে এলাকায়।

গত ২৮ আগস্ট থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চার দফায় একই ঘটনা ঘটে। ইতিমধ্যে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে কড়া প্রতিবাদ জানায় বাংলাদেশ। তার পরও ঘটনার পুনরাবৃত্তি হওয়ায় প্রশ্ন উঠছে, মিয়ানমারের এমন আচরণ কি ইচ্ছাকৃত? এই সংঘাতময় উপসর্গ সৃষ্টির পেছনে তাদের ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্য আছে কি না?

মিয়ানমার বারবার আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করলেও ধৈর্যের পরিচয় দিচ্ছে বাংলাদেশ। বলা হচ্ছে, দেশটির অভ্যন্তরীণ যুদ্ধপরিস্থিতির ফলেই এসব ঘটছে। তবে তাতে আতঙ্ক কাটছে না বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের এপারে।

ঘুমধুম সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের পাহাড়ে গোলাগুলি চলে। সকাল ৯টার পর থেকে গোলাগুলির শব্দ আসতে থাকে। বেলা দুইটা পর্যন্ত থেমে থেমে আর্টিলারি ও মর্টার শেল ছোড়ার আওয়াজ পাওয়া যায়। গোলাগুলির মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় এপারের জনবসতিতে বিরাজ করছে আতঙ্ক।

আলাপে একাধিক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেন, মিয়ানমার বাংলাদেশের সঙ্গে যুদ্ধ বাধাবে না হয়তো। বিশেষ করে উত্তর রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনী আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে ব্যাপক সেনা অভিযান চালাচ্ছে। তারই গোলা এসে পড়ছে এপারে।

তবে ভিন্ন উদ্দেশ্যের বিষয়টিও উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশেষজ্ঞরা। কেননা, ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরুর নামে সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টির পর ৮ লাখ রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। বর্তমানে বাংলাদেশে তাদের সংখ্যা সব মিলিয়ে ১২ লাখের মতো। মিয়ানমারে আরও যে ৬ লাখ রোহিঙ্গা রয়েছে, তাদের বাংলাদেশ ও ভারতে ঢুকতে বাধ্য করার জন্য ফাঁদও হতে পারে সীমান্তের এই সাম্প্রতিক উত্তেজনা, এমন শঙ্কাও দেখছেন বিশ্লেষকরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মিয়ানমার অতীতে চীন ও থাইল্যান্ডের আকাশসীমাও লঙ্ঘন করেছে। তবে তারা ক্ষমা ও দুঃখ প্রকাশের পর আর পুনরাবৃত্তি ঘটায়নি। কিন্তু বাংলাদেশে পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে। সেক্ষেত্রে সীমান্তে বাংলাদেশের আরও কড়াকড়ি আরোপ, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধিসহ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থান নেওয়ার বিকল্প নেই। বিষয়টি আন্তর্জাতিক ফোরামে উত্থাপনেরও পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুর রশিদ বলেন, এবার মিয়ানমারের অভ্যন্তরে যে যুদ্ধাবস্থা চলছে তার ধরনটা ভিন্ন। সেখানে শুধু রোহিঙ্গাদেরই টার্গেট করা হয়নি। ওই দেশের অন্য শ্রেণি-পেশার মানুষের ওপরও হামলা হচ্ছে। যারা পালাচ্ছে, তারা কিন্তু ভারতমুখী হচ্ছে।

বাংলাদেশ ধৈর্যের পরিচয় দিচ্ছে উল্লেখ করে এই নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে গোলা পড়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। প্রশ্ন আসতে পারে যে, বাংলাদেশ কেন সামরিক জবাব দিচ্ছে না। আমি মনে করি, সামরিক জবাবের জন্য যেসব উপাদান থাকা দরকার তা ওই ঘটনায় হয়তো নেই। কারণ শেল বাংলাদেশে পড়ছে ঠিকই, তবে লক্ষ্যবস্তু বাংলাদেশ নয়। এমন পরিস্থিতিতে কঠিন কোনো সামরিক জবাব দেওয়া উৎকৃষ্ট হবে না।’

যেহেতু মিয়ানমার বারবার আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছে, সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ কূটনীতি আরও জোরদার করতে পারে বলে মন্তব্য করেন মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুর রশিদ। বলেন, ‘শেল যেখান থেকে আসছে ওই সীমান্তে ধৈর্য সহকারে সামরিক পাওয়ার ডিসপ্লে বা সম্মেলন ঘটাতে পারে। বাংলাদেশ রেসপন্ড (জবাব) করতে পারে। এটাও একটি মিলিটারি টার্ম। এছাড়া গোয়েন্দা তৎপরতা আরও সক্রিয় করা যেতে পারে।’

‘আরেকটি বিষয় হলো- ওই শেল মিয়ামারের সরকারি বাহিনী ছুড়েছে, নাকি বিদ্রোহীরা ছুড়েছে সেটা দেখার বিষয় নয়। যে-ই ছুড়ুক, শেল তো মিয়ানমার থেকে এসেছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী শেল বা গুলি যেখান থেকে ছোড়া হয়েছে সেই উৎসস্থল ধ্বংসে বাংলাদেশ চাইলে ব্যবস্থা নিতে পারে।’ বলেন তিনি।

মিয়ানমার আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘যেহেতু বারবার মিয়ানমার একই ঘটনা ঘটাচ্ছে, সেক্ষেত্রে এটি এখন আন্তর্জাতিক ফোরামে ওঠানো দরকার। আশা করি প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি জাতিসংঘে উত্থাপন করবেন।’

এটি মিয়ানমারের কোনো ফাঁদ কি না, জানতে চাইলে ড. ইমতিয়াজ বলেন, ‘ট্র্যাপ (ফাঁদ) হতে পারে। সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করার পেছনে ভিন্ন উদ্দেশ্য থাকতে পারে। কেননা, জীবন হুমকিতে পড়লে তো রোহিঙ্গারা পালাবেই। আর পালালে তারা বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টা করবে। মিয়ামারের উদ্দেশ্য কী তা পরিষ্কার হতে আন্তর্জাতিক ফোরামে এ বিষয় নিয়ে বাংলাদেশকে কথা বলতে হবে।’ সৃষ্ট পরিস্থিতিতে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানোর পরামর্শ দেন এই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক।

আবার ঘটলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তোলা হবে

মিয়ানমার থেকে গোলা এসে পড়ার বিষয়ে দেশটি সতর্ক হবে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। তিনি বলেন, মিয়ানমারের ছোড়া গোলা যাতে সীমান্ত অতিক্রম না করে সে ব্যাপারে সংযত হতে বলে দেশটির রাষ্ট্রদূতের কাছে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। খুব শিগগির এ বিষয়ে মিয়ানমার সংযত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন স্বরাষ্টমন্ত্রী। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঘটলে দেশের সব পর্যায় থেকে আরও কঠোর প্রতিবাদ জানানো হবে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তোলা হবে বলেও জানান তিনি।

জাপানের নিন্দা

রাজধানীর একটি হোটেলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়োজনে এক সেমিনারে মিয়ানমারের এই উস্কানিমূলক আচরণের নিন্দা জানান ঢাকায় নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকি। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ সীমান্তে মিয়ানমারের মর্টার শেল পড়েছে, যা গ্রহণযোগ্য নয়। সামরিক উত্তেজনা জাপান নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।’

এদিকে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মিয়ানমার সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে (বিজিবি) সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে। সেখানে সীমান্ত নিরাপত্তা ও টহল জোরদার করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বর্ডার সিল করা হয়েছে, যেন কোনো মিয়ানমার নাগরিক বাংলাদেশে ঢুকতে না পারে।

২৮ আগস্ট বিকালে তমব্রু সীমান্তে উত্তরপাড়ার নুর আহমদের বাড়ির আঙিনায় দুটি মর্টার শেল এসে পড়ে, পাশাপাশি আকাশসীমায় একাধিক হেলিকপ্টারকে চক্কর দিতে দেখা যায়। গত ৩ সেপ্টেম্বরও একই এলাকায় মিয়ানমার থেকে ছোড়া দুটি মর্টারশেল এসে পড়ে। আর ৬ সেপ্টেম্বর দিনব্যাপী বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে গোলা ছোড়ার শব্দ শোনা যায়। বাংকার থেকে ছোড়া গোলার বিকট শব্দে কাঁপে সীমান্তের বসতিগুলো। মাঝেমধ্যেই মিয়ানমারের যুদ্ধবিমান বাংলাদেশের আকাশসীমায় ঢুকে পড়ছিল।

এর দুদিন আগে ৪ সেপ্টেম্বর তুমব্রু পশ্চিমকুল সীমান্তে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে খনন করা হয় বাংকার, রাখা হয় ভারী অস্ত্র। যা দেখা যায় তুমব্রু পশ্চিমকুল সীমান্তে বাংলাদেশের অভ্যন্তর থেকে।

বান্দরবানের ঘুমধুম ও তুমব্রু সীমান্তে স্থানীয় বাসিন্দা রয়েছে ২২ হাজারের বেশি। আর ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থান করছে সাড়ে ৪ হাজার রোহিঙ্গা।