ঢাকা ০৬:০৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০২২, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

কথায় কথায় ধর্মঘটের যুগ শেষ হয়ে যাচ্ছে!

কথায় কথায় ধর্মঘটের হুমকি দিয়ে জ্বালানি সেক্টরকে জিম্মি করার দিন শেষ হতে চলেছে। এসপিএম (সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং), চট্টগ্রাম-ঢাকা পাইপলাইন ও বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী পাইপলাইন জিম্মিদশার অবসান ঘটাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এখন পান থেকে চুন খসলেই ধর্মঘটের হুমকি দিয়ে বসেন। এমনও দেখা গেছে ওজনে কম দেওয়ার জন্য ভ্রাম্যমাণ বিচারক শাস্তি দিয়েছে, তারও বিরুদ্ধে ধর্মঘট ডেকে বসেছে ট্যাংকলরী মালিক সমিতি। সরবরাহ চেইন অব্যাহত রাখতে সরকারও অনেক সময় তাদের অন্যায় আবদার চোখ বুজে হজম করেছে। কিন্তু সে সব দিন আর থাকছে না, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তিন প্রকল্প জ্বালানি খাতকে আমুল বদলে দিতে যাচ্ছে। প্রকল্পগুলো একদিকে যেমন নিরবিচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করবে, একই সঙ্গে সিস্টেমলস ও কাড়ি কাড়ি পরিবহন খরচের পরিসমাপ্তি টানতে সক্ষম হবে।

বাংলাদেশে জ্বালানি তেল উৎপাদন হয় না, গ্যাস ফিল্ডগুলো থেকে প্রাপ্ত কনডেনসেট থেকে পেট্রোল এবং ৪০ শতাংশের মতো অকটেন যোগান আসে। বিপুল পরিমাণ ডিজেলসহ অন্যান্য পণ্য আমদানি করে যোগান দেওয়া হয়। বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আমদানি করা হয় নদী পথে। কিন্তু নদীবন্দরগুলোতে নাব্যতার অভাবে বড় জাহাজ বন্দরে ভিড়তে পারে না। গভীর সমুদ্রে নোঙ্গর করে জ্বালানি তেলবাহী মাদার ভেসেল বা বড় জাহাজ। সেখান থেকে লাইটার বা ছোট জাহাজে তেল আনা হয় বিপিসির ডিপোতে। বিপিসি থেকে আবার জাহাজে করে তেল দেশের বিভিন্ন জায়গায় পৌঁছে দেওয়া হয়। তেল পরিবহনের এসব প্রক্রিয়া ঝামেলাপূর্ণ ও ব্যয়বহুল।

মাদার ভেসেল থেকে তেল খালাস করতে অন্তত ১১ দিন সময় লাগে। কখনো কখনো এই তেল খালাস করতে আরও সময় লেগে যায়। জাহাজ মালিকদের সঙ্গে চুক্তির চেয়ে বেশি সময় লাগায় কখনো কখনো জরিমানা গুনতে হয়। এসপিএম প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে ২৮ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় ডিজেল ও ক্রড অয়েল খালাস করা সম্ভব হবে। এতে একদিকে যেমন জাহাজ ভাড়া কমে আসবে, অন্যদিকে তেল পরিবহনে সিস্টেম লস ও নানা ধরনের চুরিও প্রতিরোধ হবে। সরকারের বছরে অন্তত হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে ধারণা করা হচ্ছে। বছরে ৮০০ কোটি টাকার মতো সাশ্রয় হবে বলে পরিসংখ্যান বলছে।

জাহাজ থেকে তেল খালাসের জটিলতা দূর করতে নেওয়া হয় এসপিএম উইথ ডাবল পাইপলাইন প্রকল্প। এসপিএম মহেশখালী দ্বীপের পশ্চিম পাশে বঙ্গোপসাগরে স্থাপন করা হবে। বিদেশ থেকে বড় জাহাজে আমদানি করা জ্বালানি তেল পাইপলাইনের মাধ্যমে মহেশখালী এলাকায় স্থাপিত স্টোরেজ ট্যাংকে জমা হবে। সেখান থেকে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা ডিপো, ইস্টার্ন রিফাইনারির স্টোরেজ ট্যাংক ছাড়াও প্রয়োজনে তেল বিপণন কোম্পানির বিভিন্ন স্টোরেজ ট্যাংকে জমা করা যাবে।

২০১০ সালে ইস্টার্ন রিফাইনারী লিমিটেডের (ইআরএল) মাধ্যমে এসপিএম নির্মাণের পরিকল্পনা করে বিপিসি। ২০১৫ সালের ২৪ আগস্ট পুরনো প্রকল্পটি বাতিল করে নতুন উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) তৈরি করে জ্বালানি বিভাগ। সে অনুযায়ী প্রকল্পের নাম পরিবর্তন করে ‘ইনস্টলেশন অব সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং উইথ ডাবল পাইপলাইন’ রাখা হয়। প্রথমে ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্প শেষ করার পরিকল্পনা নিয়ে দুই দফায় সময় বাড়ানো হয়।

গভীর সমুদ্রে থাকছে প্রধান কেন্দ্র, সেখান থেকে ১৭ কিলোমিটার (৩৬ ইঞ্চি) দূরত্বে থাকছে রিজার্ভার ট্যাংক। গভীর সমুদ্রে মাদার ভ্যাসেল থেকে ক্রুড অয়েল সরাসরি পাইপের মাধ্যে রির্জাভারে আসবে। স্টোরেজ ট্যাংকার থেকে ইআরএল পর্যন্ত অবসোরে ৬৩ কিলোমিটার এবং অনসোরে ৩০ কিলোমিটার মোট ৯৩ কিলোমিটার ডাবল পাইপ লাইন। একটি হচ্ছে ১৮ ইঞ্চি ডায়া অপরটি থাকছে ১০ ইঞ্চি ডায়া।

গত ২৫ আগস্ট জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় বিপিসি জানায়, ২২০ কিলোমিটার পাইপ লাইনের মধ্যে ২১৪ কিলোমিটার সম্পন্ন হয়েছে। কুতুবদিয়া চ্যানেল ও মাতারবাড়ী এ্যাপ্রোচ অংশে নির্ধারিত চারটি পাইপলাইন স্থাপন শেষ। পিএসটিএফ এলাকার ভূমি উন্নয়ন ৯৩ শতাংশ, স্টোরেজ ট্যাংকের মেকানিক্যাল কাজ ৯৫ শতাংশ, অবশোরে (সাগরে) ১৩৫ কিলোমিটার পাইপলাইন বসানো হয়েছে। চট্টগ্রামের গহিরা, কোরিয়ান ইপিজেড এবং কক্সবাজারের মহেশখালীতে ১৭টি এইচডিডিসহ ৭৯ কিলোমিটার পাইপলাইন বসানো শেষ। বঙ্গোপসাগরে নির্ধারিত স্থানে এসপিএম বয়া ও পাইপলাইন মেনিফোডের কাজ শেষ হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে চালু করার লক্ষে কাজ এগিয়ে চলছে।

এসপিএম চট্টগ্রাম পর‌্যন্ত সাশ্রয়ী খরচে নিরবিচ্ছিন্ন তেল সরবরাহ নিশ্চিত করবে। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর‌্যন্ত তেল সরবরাহে রয়েছে ঢাকা-চট্টগ্রাম পাইপলাইন প্রকল্প। প্রকল্পের মুল ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৮’শ ৬১ কোটি টাকা। প্রকল্পের আওতায় ঢাকা-চট্টগ্রাম ২৩৭ কিলোমিটার, কুমিল্লা থেকে চাঁদপুর পর‌্যন্ত ৫৯ কিলোমিটার, ফতুল্লা হতে থেকে গোদনাইল ডিপো পর‌্যন্ত সাড়ে ৮ কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপন করা হবে।

বিপিসির এক হিসেবে দেখা গেছে, ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে ৬.৭১ মিলিয়ন টন জ্বালানি তেল বাজারজাত করে। এরমধ্যে নারয়নগঞ্জের গোদনাইল ও ফতুল্লা ডিপোর মাধ্যমে ৩২ শতাংশ অর্থাৎ ২.২ মিলিয়ন টন বিতরণ করা হয়ে থাকে। এই জ্বালানির প্রায় পুরোটাই চট্টগ্রাম থেকে লাইটারেজ জাহাজে করা চট্টগ্রামে নেওয়া হয়।

বিপিসির এক সমীক্ষায় দেখা গেছে প্রতি টন জ্বালানি তেল বহনের জন্য নটিক্যাল মাইল প্রতি ৪.৬৯ টাকা হারে মাসুল দিতে হয়। বছরে ১৫ লাখ মে. টন জ্বালানি তেল চট্টগ্রাম থেকে নারায়নগঞ্জে (১৫৩.৮ নটিক্যাল মাইল) পরিবহনের জন্য ১০৮ কোটি ১৯ লাখ টাকা গুনতে হয়। এরসঙ্গে দশমিক ১৭ শতাংশ হারে সিস্টেমলস সমান ১৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকা গচ্চা গেছে। একই পরিমাণ জ্বালানি তেল পরিবহনে পাইপ লাইনের অপেরশনার খরচসহ পড়বে ৬২ কোটি টাকা মতো। সিস্টেমলস নেই, পরিবহনের ঝুঁকিও থাকছে না।

প্রকল্পটি শুরু থেকেই ব্যক্তিবিশেষের অসহযোগিতার কারণে ঢিমেতালে চলে এসেছে। সর্বশেষ সেনাবাহিনীকে দেওয়ার পর কাজে গতি সঞ্চার হয়েছে। ২৪৬ কিলোমিটার পাইপলাইনের মধ্যে ১৮৭কিলোমিটারের ওয়েল্ডিং, ১৯৫ কিলোমিটার স্ট্রিনজিং, ২০৬ কিলোমিটার ক্লিনিং এবং গ্রেডিং, ১২৬ কিলোমিটার লোয়ারিং শেষ হয়েছে। ১০টি বড় নদীর মধ্যে ৫টিতে পাইপ বসানো শেষ, ফুলদি নদীতে পাইপলাইন বসানোর কাজ চলমান। অন্য ৪টি নদীতে কাজ করার জন্য শুষ্ক মৌসুমের জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে। পাইপলাইন হুকিংয়ের জন্য ট্যাংকের ফিটনেস যাচাই এবং নতুন ট্যাংক স্থাপন দরপত্রের কারিগরি মূল্যায়ন শেষে আর্থিক প্রস্তাব যাচাই বাছাই চলছে।

ওই পাইপলাইন রাজধানী ও তার আশপাশের এলাকাকে নির্ভার করবে। দেশের শষ্যভান্ডার খ্যাত উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলার জন্য কাজ চলমান। ওই অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহ করা হয় পার্বতীপুর তেল ডিপো থেকে। এখানে মূলত তেল আসে বাঘাবাড়ি থেকে ট্রেনের মাধ্যমে। পরিবহন খরচ কমানো এবং মাঠ পর্যায়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে ডিজেল (জ্বালানি) সরবরাহ নিশ্চিত করতে ভারত থেকে বাংলাদেশে পাইপলাইনের মাধ্যমে ডিজেল আমদানির কাজ শেষ পথে। ২০১৮ সালের ৯ এপ্রিল বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর হয়। ভারতের শিলিগুড়ির নুমালীগড় তেল শোধনাগার কেন্দ্র থেকে ১৩১.৫ কিলোমিটার পাইপলাইন দিয়ে পঞ্চগড় হয়ে তেল পৌঁছাবে পার্বতীপুরের রেলহেড ডিপো পর্যন্ত।

প্রাথমিকভাবে ১৫ বছর ধরে ডিজেল সরবরাহের চুক্তি হয়েছে দুই দেশের মধ্যে। প্রথম তিন বছর দুই লাখ টন, পরবর্তী তিন বছর তিন লাখ টন, এরপর চার বছর পাঁচ লাখ টন এবং বাকি পাঁচ বছরে ১০ লাখ টন জ্বালানি তেল সরবরাহ করবে নুমালীগড় রিফাইনারি। আন্তর্জাতিক বাজারদরের সঙ্গে প্রতি ব্যারেলে ৫ ডলার করে বেশি দাম দিতে হবে। যেদিন তেল সরবরাহ করবে নুমালীগড় রিফাইনারি, বাংলাদেশের পরিশোধের জন্য সেদিনকার আন্তর্জাতিক দর প্রযোজ্য হবে। বাড়তি পাঁচ ডলার দিতে হবে পরিবহন খরচ বাবদ।

মৈত্রী পাইপলাইন প্রসঙ্গে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোঃ মাহবুব হোসেন বার্তা২৪.কমকে বলেছেন, করোনা এবং রিভার ক্রসিংয়ের কারণে প্রকল্পটি কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে। রিভার ক্রসিংয়ে নতুন মেথড ব্যবহার করা হচ্ছে। খুব দ্রুতই আমরা এর উদ্বোধন করতে পারবো।

এসপিএম, ঢাকা-চট্টগ্রাম পাইপলাইন ও বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী পাইপলাইন শেষ হলে আর সড়কপথে তেল পরিবহনের ঝাক্কি ঝামেলা থাকছে না। এতোদিন যারা কথায় কথায় ধর্মঘটের হুমকি দিয়ে নিজের আখের গোছাতেন তাদের সুর‌্য এখন ডুবু ডুবু । পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্েযাগ ও রাজনৈতিক অস্থিরতাতেও তেল সরবরাহ নিয়ে থাকছেনা কোন টেনশন।

বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বার্তা২৪.কমকে বলেছেন, প্রকল্পগুলো জ্বালানি খাতকে শক্ত ভিতের উপর প্রতিষ্ঠা করবে। এসপিএম বিশাল খরচ সাশ্রয় করবে। একটি মাদার ভেসেল একদিন বেশি বসে থাকলে বিপুল পরিমাণ জরিমানা গুনতে হয়। এসপিএম হলে অল্প সময়ে খালাস করা যাবে, এতে কমে আসবে জাহাজ ভাড়া। সেখানে বিশাল রিজার্ভার গড়ে তোলা হয়েছে। অন্যান্য পাইপলাইনগুলো হলে সরবরাহ নিয়ে দুশ্চিন্তা দূর হয়ে যাবে, কমে আসবে খরচ। বর্তমান সরকার দেশকে এগিয়ে নিতে সবদিক থেকেই কাজ করে যাচ্ছে। অতীতের সরকারগুলো এসব বিষয়ে চিন্তাই করেনি।

Tag :
জনপ্রিয়

রসিক নির্বাচন ; আ’লীগের মেয়র প্রার্থী ডালিয়ার গণসংযোগ অনুষ্ঠিত

কথায় কথায় ধর্মঘটের যুগ শেষ হয়ে যাচ্ছে!

প্রকাশের সময় : ০৯:০১:১৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২২

কথায় কথায় ধর্মঘটের হুমকি দিয়ে জ্বালানি সেক্টরকে জিম্মি করার দিন শেষ হতে চলেছে। এসপিএম (সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং), চট্টগ্রাম-ঢাকা পাইপলাইন ও বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী পাইপলাইন জিম্মিদশার অবসান ঘটাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এখন পান থেকে চুন খসলেই ধর্মঘটের হুমকি দিয়ে বসেন। এমনও দেখা গেছে ওজনে কম দেওয়ার জন্য ভ্রাম্যমাণ বিচারক শাস্তি দিয়েছে, তারও বিরুদ্ধে ধর্মঘট ডেকে বসেছে ট্যাংকলরী মালিক সমিতি। সরবরাহ চেইন অব্যাহত রাখতে সরকারও অনেক সময় তাদের অন্যায় আবদার চোখ বুজে হজম করেছে। কিন্তু সে সব দিন আর থাকছে না, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তিন প্রকল্প জ্বালানি খাতকে আমুল বদলে দিতে যাচ্ছে। প্রকল্পগুলো একদিকে যেমন নিরবিচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করবে, একই সঙ্গে সিস্টেমলস ও কাড়ি কাড়ি পরিবহন খরচের পরিসমাপ্তি টানতে সক্ষম হবে।

বাংলাদেশে জ্বালানি তেল উৎপাদন হয় না, গ্যাস ফিল্ডগুলো থেকে প্রাপ্ত কনডেনসেট থেকে পেট্রোল এবং ৪০ শতাংশের মতো অকটেন যোগান আসে। বিপুল পরিমাণ ডিজেলসহ অন্যান্য পণ্য আমদানি করে যোগান দেওয়া হয়। বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আমদানি করা হয় নদী পথে। কিন্তু নদীবন্দরগুলোতে নাব্যতার অভাবে বড় জাহাজ বন্দরে ভিড়তে পারে না। গভীর সমুদ্রে নোঙ্গর করে জ্বালানি তেলবাহী মাদার ভেসেল বা বড় জাহাজ। সেখান থেকে লাইটার বা ছোট জাহাজে তেল আনা হয় বিপিসির ডিপোতে। বিপিসি থেকে আবার জাহাজে করে তেল দেশের বিভিন্ন জায়গায় পৌঁছে দেওয়া হয়। তেল পরিবহনের এসব প্রক্রিয়া ঝামেলাপূর্ণ ও ব্যয়বহুল।

মাদার ভেসেল থেকে তেল খালাস করতে অন্তত ১১ দিন সময় লাগে। কখনো কখনো এই তেল খালাস করতে আরও সময় লেগে যায়। জাহাজ মালিকদের সঙ্গে চুক্তির চেয়ে বেশি সময় লাগায় কখনো কখনো জরিমানা গুনতে হয়। এসপিএম প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে ২৮ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় ডিজেল ও ক্রড অয়েল খালাস করা সম্ভব হবে। এতে একদিকে যেমন জাহাজ ভাড়া কমে আসবে, অন্যদিকে তেল পরিবহনে সিস্টেম লস ও নানা ধরনের চুরিও প্রতিরোধ হবে। সরকারের বছরে অন্তত হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে ধারণা করা হচ্ছে। বছরে ৮০০ কোটি টাকার মতো সাশ্রয় হবে বলে পরিসংখ্যান বলছে।

জাহাজ থেকে তেল খালাসের জটিলতা দূর করতে নেওয়া হয় এসপিএম উইথ ডাবল পাইপলাইন প্রকল্প। এসপিএম মহেশখালী দ্বীপের পশ্চিম পাশে বঙ্গোপসাগরে স্থাপন করা হবে। বিদেশ থেকে বড় জাহাজে আমদানি করা জ্বালানি তেল পাইপলাইনের মাধ্যমে মহেশখালী এলাকায় স্থাপিত স্টোরেজ ট্যাংকে জমা হবে। সেখান থেকে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা ডিপো, ইস্টার্ন রিফাইনারির স্টোরেজ ট্যাংক ছাড়াও প্রয়োজনে তেল বিপণন কোম্পানির বিভিন্ন স্টোরেজ ট্যাংকে জমা করা যাবে।

২০১০ সালে ইস্টার্ন রিফাইনারী লিমিটেডের (ইআরএল) মাধ্যমে এসপিএম নির্মাণের পরিকল্পনা করে বিপিসি। ২০১৫ সালের ২৪ আগস্ট পুরনো প্রকল্পটি বাতিল করে নতুন উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) তৈরি করে জ্বালানি বিভাগ। সে অনুযায়ী প্রকল্পের নাম পরিবর্তন করে ‘ইনস্টলেশন অব সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং উইথ ডাবল পাইপলাইন’ রাখা হয়। প্রথমে ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্প শেষ করার পরিকল্পনা নিয়ে দুই দফায় সময় বাড়ানো হয়।

গভীর সমুদ্রে থাকছে প্রধান কেন্দ্র, সেখান থেকে ১৭ কিলোমিটার (৩৬ ইঞ্চি) দূরত্বে থাকছে রিজার্ভার ট্যাংক। গভীর সমুদ্রে মাদার ভ্যাসেল থেকে ক্রুড অয়েল সরাসরি পাইপের মাধ্যে রির্জাভারে আসবে। স্টোরেজ ট্যাংকার থেকে ইআরএল পর্যন্ত অবসোরে ৬৩ কিলোমিটার এবং অনসোরে ৩০ কিলোমিটার মোট ৯৩ কিলোমিটার ডাবল পাইপ লাইন। একটি হচ্ছে ১৮ ইঞ্চি ডায়া অপরটি থাকছে ১০ ইঞ্চি ডায়া।

গত ২৫ আগস্ট জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় বিপিসি জানায়, ২২০ কিলোমিটার পাইপ লাইনের মধ্যে ২১৪ কিলোমিটার সম্পন্ন হয়েছে। কুতুবদিয়া চ্যানেল ও মাতারবাড়ী এ্যাপ্রোচ অংশে নির্ধারিত চারটি পাইপলাইন স্থাপন শেষ। পিএসটিএফ এলাকার ভূমি উন্নয়ন ৯৩ শতাংশ, স্টোরেজ ট্যাংকের মেকানিক্যাল কাজ ৯৫ শতাংশ, অবশোরে (সাগরে) ১৩৫ কিলোমিটার পাইপলাইন বসানো হয়েছে। চট্টগ্রামের গহিরা, কোরিয়ান ইপিজেড এবং কক্সবাজারের মহেশখালীতে ১৭টি এইচডিডিসহ ৭৯ কিলোমিটার পাইপলাইন বসানো শেষ। বঙ্গোপসাগরে নির্ধারিত স্থানে এসপিএম বয়া ও পাইপলাইন মেনিফোডের কাজ শেষ হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে চালু করার লক্ষে কাজ এগিয়ে চলছে।

এসপিএম চট্টগ্রাম পর‌্যন্ত সাশ্রয়ী খরচে নিরবিচ্ছিন্ন তেল সরবরাহ নিশ্চিত করবে। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর‌্যন্ত তেল সরবরাহে রয়েছে ঢাকা-চট্টগ্রাম পাইপলাইন প্রকল্প। প্রকল্পের মুল ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৮’শ ৬১ কোটি টাকা। প্রকল্পের আওতায় ঢাকা-চট্টগ্রাম ২৩৭ কিলোমিটার, কুমিল্লা থেকে চাঁদপুর পর‌্যন্ত ৫৯ কিলোমিটার, ফতুল্লা হতে থেকে গোদনাইল ডিপো পর‌্যন্ত সাড়ে ৮ কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপন করা হবে।

বিপিসির এক হিসেবে দেখা গেছে, ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে ৬.৭১ মিলিয়ন টন জ্বালানি তেল বাজারজাত করে। এরমধ্যে নারয়নগঞ্জের গোদনাইল ও ফতুল্লা ডিপোর মাধ্যমে ৩২ শতাংশ অর্থাৎ ২.২ মিলিয়ন টন বিতরণ করা হয়ে থাকে। এই জ্বালানির প্রায় পুরোটাই চট্টগ্রাম থেকে লাইটারেজ জাহাজে করা চট্টগ্রামে নেওয়া হয়।

বিপিসির এক সমীক্ষায় দেখা গেছে প্রতি টন জ্বালানি তেল বহনের জন্য নটিক্যাল মাইল প্রতি ৪.৬৯ টাকা হারে মাসুল দিতে হয়। বছরে ১৫ লাখ মে. টন জ্বালানি তেল চট্টগ্রাম থেকে নারায়নগঞ্জে (১৫৩.৮ নটিক্যাল মাইল) পরিবহনের জন্য ১০৮ কোটি ১৯ লাখ টাকা গুনতে হয়। এরসঙ্গে দশমিক ১৭ শতাংশ হারে সিস্টেমলস সমান ১৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকা গচ্চা গেছে। একই পরিমাণ জ্বালানি তেল পরিবহনে পাইপ লাইনের অপেরশনার খরচসহ পড়বে ৬২ কোটি টাকা মতো। সিস্টেমলস নেই, পরিবহনের ঝুঁকিও থাকছে না।

প্রকল্পটি শুরু থেকেই ব্যক্তিবিশেষের অসহযোগিতার কারণে ঢিমেতালে চলে এসেছে। সর্বশেষ সেনাবাহিনীকে দেওয়ার পর কাজে গতি সঞ্চার হয়েছে। ২৪৬ কিলোমিটার পাইপলাইনের মধ্যে ১৮৭কিলোমিটারের ওয়েল্ডিং, ১৯৫ কিলোমিটার স্ট্রিনজিং, ২০৬ কিলোমিটার ক্লিনিং এবং গ্রেডিং, ১২৬ কিলোমিটার লোয়ারিং শেষ হয়েছে। ১০টি বড় নদীর মধ্যে ৫টিতে পাইপ বসানো শেষ, ফুলদি নদীতে পাইপলাইন বসানোর কাজ চলমান। অন্য ৪টি নদীতে কাজ করার জন্য শুষ্ক মৌসুমের জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে। পাইপলাইন হুকিংয়ের জন্য ট্যাংকের ফিটনেস যাচাই এবং নতুন ট্যাংক স্থাপন দরপত্রের কারিগরি মূল্যায়ন শেষে আর্থিক প্রস্তাব যাচাই বাছাই চলছে।

ওই পাইপলাইন রাজধানী ও তার আশপাশের এলাকাকে নির্ভার করবে। দেশের শষ্যভান্ডার খ্যাত উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলার জন্য কাজ চলমান। ওই অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহ করা হয় পার্বতীপুর তেল ডিপো থেকে। এখানে মূলত তেল আসে বাঘাবাড়ি থেকে ট্রেনের মাধ্যমে। পরিবহন খরচ কমানো এবং মাঠ পর্যায়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে ডিজেল (জ্বালানি) সরবরাহ নিশ্চিত করতে ভারত থেকে বাংলাদেশে পাইপলাইনের মাধ্যমে ডিজেল আমদানির কাজ শেষ পথে। ২০১৮ সালের ৯ এপ্রিল বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর হয়। ভারতের শিলিগুড়ির নুমালীগড় তেল শোধনাগার কেন্দ্র থেকে ১৩১.৫ কিলোমিটার পাইপলাইন দিয়ে পঞ্চগড় হয়ে তেল পৌঁছাবে পার্বতীপুরের রেলহেড ডিপো পর্যন্ত।

প্রাথমিকভাবে ১৫ বছর ধরে ডিজেল সরবরাহের চুক্তি হয়েছে দুই দেশের মধ্যে। প্রথম তিন বছর দুই লাখ টন, পরবর্তী তিন বছর তিন লাখ টন, এরপর চার বছর পাঁচ লাখ টন এবং বাকি পাঁচ বছরে ১০ লাখ টন জ্বালানি তেল সরবরাহ করবে নুমালীগড় রিফাইনারি। আন্তর্জাতিক বাজারদরের সঙ্গে প্রতি ব্যারেলে ৫ ডলার করে বেশি দাম দিতে হবে। যেদিন তেল সরবরাহ করবে নুমালীগড় রিফাইনারি, বাংলাদেশের পরিশোধের জন্য সেদিনকার আন্তর্জাতিক দর প্রযোজ্য হবে। বাড়তি পাঁচ ডলার দিতে হবে পরিবহন খরচ বাবদ।

মৈত্রী পাইপলাইন প্রসঙ্গে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোঃ মাহবুব হোসেন বার্তা২৪.কমকে বলেছেন, করোনা এবং রিভার ক্রসিংয়ের কারণে প্রকল্পটি কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে। রিভার ক্রসিংয়ে নতুন মেথড ব্যবহার করা হচ্ছে। খুব দ্রুতই আমরা এর উদ্বোধন করতে পারবো।

এসপিএম, ঢাকা-চট্টগ্রাম পাইপলাইন ও বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী পাইপলাইন শেষ হলে আর সড়কপথে তেল পরিবহনের ঝাক্কি ঝামেলা থাকছে না। এতোদিন যারা কথায় কথায় ধর্মঘটের হুমকি দিয়ে নিজের আখের গোছাতেন তাদের সুর‌্য এখন ডুবু ডুবু । পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্েযাগ ও রাজনৈতিক অস্থিরতাতেও তেল সরবরাহ নিয়ে থাকছেনা কোন টেনশন।

বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বার্তা২৪.কমকে বলেছেন, প্রকল্পগুলো জ্বালানি খাতকে শক্ত ভিতের উপর প্রতিষ্ঠা করবে। এসপিএম বিশাল খরচ সাশ্রয় করবে। একটি মাদার ভেসেল একদিন বেশি বসে থাকলে বিপুল পরিমাণ জরিমানা গুনতে হয়। এসপিএম হলে অল্প সময়ে খালাস করা যাবে, এতে কমে আসবে জাহাজ ভাড়া। সেখানে বিশাল রিজার্ভার গড়ে তোলা হয়েছে। অন্যান্য পাইপলাইনগুলো হলে সরবরাহ নিয়ে দুশ্চিন্তা দূর হয়ে যাবে, কমে আসবে খরচ। বর্তমান সরকার দেশকে এগিয়ে নিতে সবদিক থেকেই কাজ করে যাচ্ছে। অতীতের সরকারগুলো এসব বিষয়ে চিন্তাই করেনি।