ঢাকা ১১:২৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০২২, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

রানীর স্মৃতিবিজড়িত সেই রেলকোচ এখন ইতিহাস

ছয় কামরা বিশিষ্ট ট্রেনের কোচটির বাহির ও ভেতর অংশ সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে নীলফামারীর সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায়

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সিংহাসনে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় আসীন ও বিশ্বের প্রবীণতম রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ বৃহস্পতিবার ৯৬ বছর বয়সে মারা যান। ভারত ও বাংলাদেশ সফরের সময় রানী ট্রেনের যে কোচটিতে ভ্রমণ করেছিলেন তা এখন ইতিহাসের সাক্ষী। সেই স্মৃতি বাংলাদেশ রেলওয়ের জাদুঘরে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে।

১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ সফর করেছিলেন রানী। এর আগে তিনি ১৯৬১ সালে প্রথম ভারতবর্ষ সফর করেন। ওই সময় ট্রেন ভ্রমণ করেছিলেন।

প্রথম ব্রিটেনের রানীর ওই সফর ছিল স্মৃতিবিজড়িত। তখন রানীর ভ্রমণের জন্য বিশেষ ধরনের কাঠের ট্রেনের দুটি কোচ তৈরি করা হয়েছিল। তার মধ্যে সৈয়দপুরে রেলওয়ে কারখানায় রানী এলিজাবেথের ব্যবহার করা ছয় কামরার একটি সেলুন এখনও সযত্নে রাখা আছে। ভেতরে আছে রাজকীয় শয়নকক্ষ ও একটি কনফারেন্স রুম। সেলুন কোচটির নৈপুণ্য বলে দেয় এটি রানীর ট্রেন ভ্রমণের সময়ে এক ক্ষুদ্র রাজপ্রাসাদ।

নীলফামারীর সৈয়দপুরে দেশের বৃহত্তম রেলওয়ে কারখানায় গেলেই দেখা যাবে রানীর এই ক্ষুদ্র রাজপ্রাসাদ রেল কোচটি। রানীর স্মৃতি ধরে রাখার জন্য এই কোচটির টুকটাক মেরামতের জন্য কারখানার ক্যারেজ শপে নেয়া হয়েছে। কোচটির ভেতরে ঢুকলেই মনে হবে ক্ষুদ্র রাজপ্রাসাদ। প্রবেশদ্বারেই রয়েছে কোচটির ইতিহাস সংবলিত একটি ওয়ালবোর্ড। এক পা এগোতেই চোখে পড়বে নিরাপত্তাকর্মীদের জন্য বরাদ্দ করা একটি কামরা। রয়েছে রানীর সঙ্গে আসা পাইক-পেয়াদা ও তাঁর স্টাফদের জন্য থাকার আলাদা কক্ষ। এরপর দেখা যাবে একটি সভাকক্ষ। সেগুন কাঠের তৈরি বড় দুটি সোফা রাখা আছে সেখানে, সেই সোফার সামনে আছে ৮ থেকে ১০টি চেয়ার। নান্দনিক কারুকার্য দেয়ালজুড়ে।

লালগালিচা আর সাদা কাপড় দিয়ে মোড়ানো পুরো সভাকক্ষ। সেখানে আলমারিতে আছে ড্রিংকস কেস ও ছাইদানি। রয়েছে এসি, নান্দনিক ডিজাইনের লাইটিং, ফ্যান, উন্নত কাঠের আসবাব আর দামি ঝাড়বাতি। এরপরেই আছে খাট, ফোল্ডিং বেসিনযুক্ত রানীর জন্য বরাদ্দ করা দুই বিছানার একটি শয়নকক্ষ। দোতলা আলমারি, জিনিসপত্র রাখার জন্য তামার তৈরি ছোট দুটি পাত্র ও ঝাড়বাতি। এরপর এক কক্ষজুড়ে বাথরুম। তার পুরো দেয়াল উন্নতমানের ছোট ছোট টাইলসে বাঁধানো। স্ক্রু দিয়ে আটকানো প্রতিটি টাইলস। সিলিংও সবুজাভ টাইলসে মোড়ানো। মেঝেতে কাঠের ওপর মোজাইক। সেখানকার ঝাড়বাতিগুলো নকশাদার ও রঙিন। দেয়ালজুড়ে তামা-পিতলের আলপনা। সাবান-শ্যা¤পু আর ব্রাশ রাখার জন্য আছে তামার তৈরি নান্দনিক ঝুড়ি। আছে বিশাল সবুজ মার্বেলের বাথটাব ও পিতলের ঝরনা। এরপরের কক্ষটি বাবুর্চিদের থাকার জন্য।

তারপরের কক্ষটি রান্নাঘর। বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই এই কোচের ভেতরে রানীর জন্য ক্ষুদ্র রাজপ্রাসাদ তৈরি করা হয়েছিল। লাইটগুলো অচল হওয়ায় আলোর জন্য নতুন করে লাইট লাগানো হয়েছে। ছয় কামরাবিশিষ্ট এই পুরো কোচ লাল মখমলে কার্পেটিং করা। প্রতিটি কক্ষের সঙ্গে একটি করে অ্যাটাচ বাথরুম ও বেলজিয়ামের উন্নত স্যানিটারি ফিটিংস। বোঝাই যায় না, এগুলো ৬৫ বছর আগের তৈরি। ট্রেনের সাধারণ কোচে ৮টি চাকা থাকলেও রানীর এই সেলুনটিতে রয়েছে ১২টি চাকা।

সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়ক (ডিএস) সাদেকুর রহমান বলেন, রানী এলিজাবেথ এই কোচে ভ্রমণ করেন। পরে এটি পরিবর্তিত হয়ে প্রেসিডেন্ট সেলুন কোচ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়লে এটি মেরামতের জন্য আনা হয় সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায়। বর্তমানে ব্যবহার না হলেও, আমরা ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষী হিসেবে সযত্নে রেখে দিয়েছি এটি। রেলওয়ে কারখানাসূত্রে জানা গেছে, এটি ব্রিটিশদের বানানো বিশেষায়িত একটি রেল কোচ। রানী যখন ১৯৬১ সালে প্রথম ভারত সফর করেছিলেন তখন এই রেলকোচটি ভ্রমণ করেছিলেন। তিনি ভারত সফর করে ব্রিটেনে ফিরে যাওয়ার পর ব্রিটিশ সরকার তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান রেলওয়েকে এই সেলুন কোচটি উপহার হিসেবে দিয়ে যায়। এক সময় কোচটি চলাচলের উপযোগী থাকলেও ১৯৮১ সালে কোচটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। তখন থেকে এটি সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় সংরক্ষিত রয়েছে। কারখানার ক্যারেজ শপের ইনচার্জ মোমিনুল ইসলাম বলেন, রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ মারা গেলেন। তাঁর এই স্মৃতিটুকু আমরা বাংলাদেশ রেলওয়ের পক্ষে কালের সাক্ষী হিসেবে রেখে দিতে চাই। তাই বর্তমানে সেলুন কোচটি কারখানার ক্যারেজ শপে আনা হয়েছে। কিছু জিনিস মেরামত করে দর্শনার্থীদের জন্য রাখা হবে নবনির্মিত রেলওয়ে জাদুঘরে।

Tag :
জনপ্রিয়

রামপালে বিএনপির ২০ নেতাকর্মীর নামে মামলা আটক-৬

রানীর স্মৃতিবিজড়িত সেই রেলকোচ এখন ইতিহাস

প্রকাশের সময় : ০৮:৪১:১৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২২

ছয় কামরা বিশিষ্ট ট্রেনের কোচটির বাহির ও ভেতর অংশ সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে নীলফামারীর সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায়

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সিংহাসনে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় আসীন ও বিশ্বের প্রবীণতম রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ বৃহস্পতিবার ৯৬ বছর বয়সে মারা যান। ভারত ও বাংলাদেশ সফরের সময় রানী ট্রেনের যে কোচটিতে ভ্রমণ করেছিলেন তা এখন ইতিহাসের সাক্ষী। সেই স্মৃতি বাংলাদেশ রেলওয়ের জাদুঘরে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে।

১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ সফর করেছিলেন রানী। এর আগে তিনি ১৯৬১ সালে প্রথম ভারতবর্ষ সফর করেন। ওই সময় ট্রেন ভ্রমণ করেছিলেন।

প্রথম ব্রিটেনের রানীর ওই সফর ছিল স্মৃতিবিজড়িত। তখন রানীর ভ্রমণের জন্য বিশেষ ধরনের কাঠের ট্রেনের দুটি কোচ তৈরি করা হয়েছিল। তার মধ্যে সৈয়দপুরে রেলওয়ে কারখানায় রানী এলিজাবেথের ব্যবহার করা ছয় কামরার একটি সেলুন এখনও সযত্নে রাখা আছে। ভেতরে আছে রাজকীয় শয়নকক্ষ ও একটি কনফারেন্স রুম। সেলুন কোচটির নৈপুণ্য বলে দেয় এটি রানীর ট্রেন ভ্রমণের সময়ে এক ক্ষুদ্র রাজপ্রাসাদ।

নীলফামারীর সৈয়দপুরে দেশের বৃহত্তম রেলওয়ে কারখানায় গেলেই দেখা যাবে রানীর এই ক্ষুদ্র রাজপ্রাসাদ রেল কোচটি। রানীর স্মৃতি ধরে রাখার জন্য এই কোচটির টুকটাক মেরামতের জন্য কারখানার ক্যারেজ শপে নেয়া হয়েছে। কোচটির ভেতরে ঢুকলেই মনে হবে ক্ষুদ্র রাজপ্রাসাদ। প্রবেশদ্বারেই রয়েছে কোচটির ইতিহাস সংবলিত একটি ওয়ালবোর্ড। এক পা এগোতেই চোখে পড়বে নিরাপত্তাকর্মীদের জন্য বরাদ্দ করা একটি কামরা। রয়েছে রানীর সঙ্গে আসা পাইক-পেয়াদা ও তাঁর স্টাফদের জন্য থাকার আলাদা কক্ষ। এরপর দেখা যাবে একটি সভাকক্ষ। সেগুন কাঠের তৈরি বড় দুটি সোফা রাখা আছে সেখানে, সেই সোফার সামনে আছে ৮ থেকে ১০টি চেয়ার। নান্দনিক কারুকার্য দেয়ালজুড়ে।

লালগালিচা আর সাদা কাপড় দিয়ে মোড়ানো পুরো সভাকক্ষ। সেখানে আলমারিতে আছে ড্রিংকস কেস ও ছাইদানি। রয়েছে এসি, নান্দনিক ডিজাইনের লাইটিং, ফ্যান, উন্নত কাঠের আসবাব আর দামি ঝাড়বাতি। এরপরেই আছে খাট, ফোল্ডিং বেসিনযুক্ত রানীর জন্য বরাদ্দ করা দুই বিছানার একটি শয়নকক্ষ। দোতলা আলমারি, জিনিসপত্র রাখার জন্য তামার তৈরি ছোট দুটি পাত্র ও ঝাড়বাতি। এরপর এক কক্ষজুড়ে বাথরুম। তার পুরো দেয়াল উন্নতমানের ছোট ছোট টাইলসে বাঁধানো। স্ক্রু দিয়ে আটকানো প্রতিটি টাইলস। সিলিংও সবুজাভ টাইলসে মোড়ানো। মেঝেতে কাঠের ওপর মোজাইক। সেখানকার ঝাড়বাতিগুলো নকশাদার ও রঙিন। দেয়ালজুড়ে তামা-পিতলের আলপনা। সাবান-শ্যা¤পু আর ব্রাশ রাখার জন্য আছে তামার তৈরি নান্দনিক ঝুড়ি। আছে বিশাল সবুজ মার্বেলের বাথটাব ও পিতলের ঝরনা। এরপরের কক্ষটি বাবুর্চিদের থাকার জন্য।

তারপরের কক্ষটি রান্নাঘর। বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই এই কোচের ভেতরে রানীর জন্য ক্ষুদ্র রাজপ্রাসাদ তৈরি করা হয়েছিল। লাইটগুলো অচল হওয়ায় আলোর জন্য নতুন করে লাইট লাগানো হয়েছে। ছয় কামরাবিশিষ্ট এই পুরো কোচ লাল মখমলে কার্পেটিং করা। প্রতিটি কক্ষের সঙ্গে একটি করে অ্যাটাচ বাথরুম ও বেলজিয়ামের উন্নত স্যানিটারি ফিটিংস। বোঝাই যায় না, এগুলো ৬৫ বছর আগের তৈরি। ট্রেনের সাধারণ কোচে ৮টি চাকা থাকলেও রানীর এই সেলুনটিতে রয়েছে ১২টি চাকা।

সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়ক (ডিএস) সাদেকুর রহমান বলেন, রানী এলিজাবেথ এই কোচে ভ্রমণ করেন। পরে এটি পরিবর্তিত হয়ে প্রেসিডেন্ট সেলুন কোচ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়লে এটি মেরামতের জন্য আনা হয় সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায়। বর্তমানে ব্যবহার না হলেও, আমরা ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষী হিসেবে সযত্নে রেখে দিয়েছি এটি। রেলওয়ে কারখানাসূত্রে জানা গেছে, এটি ব্রিটিশদের বানানো বিশেষায়িত একটি রেল কোচ। রানী যখন ১৯৬১ সালে প্রথম ভারত সফর করেছিলেন তখন এই রেলকোচটি ভ্রমণ করেছিলেন। তিনি ভারত সফর করে ব্রিটেনে ফিরে যাওয়ার পর ব্রিটিশ সরকার তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান রেলওয়েকে এই সেলুন কোচটি উপহার হিসেবে দিয়ে যায়। এক সময় কোচটি চলাচলের উপযোগী থাকলেও ১৯৮১ সালে কোচটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। তখন থেকে এটি সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় সংরক্ষিত রয়েছে। কারখানার ক্যারেজ শপের ইনচার্জ মোমিনুল ইসলাম বলেন, রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ মারা গেলেন। তাঁর এই স্মৃতিটুকু আমরা বাংলাদেশ রেলওয়ের পক্ষে কালের সাক্ষী হিসেবে রেখে দিতে চাই। তাই বর্তমানে সেলুন কোচটি কারখানার ক্যারেজ শপে আনা হয়েছে। কিছু জিনিস মেরামত করে দর্শনার্থীদের জন্য রাখা হবে নবনির্মিত রেলওয়ে জাদুঘরে।